প্রতিটি মানুষকেই নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতাকে মোকাবিলা করে সমাজ ও রাষ্ট্রে নিজের অবস্থান তৈরি করতে হয়। তবে শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সেই যুদ্ধটা আরও কঠিন। তার পরও শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেই সমাজের মূল ধারায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন অনেক নারী। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে খবরের কাগজের পাঠকদের জন্য থাকছে প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সংগ্রামী তিন নারীর গল্প। লিখেছেন সিনিয়র রিপোর্টার শাহনাজ পারভীন এলিস।
ফিরোজা খাতুন, ডেপুটি ম্যানেজার, বার্ডো
ফিরোজা খাতুন (৪৭)। তার গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার ইসলামপুরে। মাত্র ৩ বছর বয়সে ফিরোজা পোলিওতে আক্রান্ত হন। তার দুটি পা-ই সরু। তার মধ্যে একটি পা খাটো ও বলহীন। তবে কঠোর মনোবল আর পরিবারের সহযোগিতায় এক হাতে লাঠিতে ভর দিয়েই স্কুলে যেতেন ফিরোজা। নিজের মেধার জোরে এইচএসসি পাস করেন সংগ্রামী এই নারী। ফিরোজা বেগম এখন ঢাকার মিরপুরের রূপনগর এলাকার ব্লাইন্ড এডুকেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (বার্ডো) ডেপুটি ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন।
ছোটবেলার গল্প জানতে চাইলে ফিরোজা বলেন, ‘পোলিও আক্রান্ত হওয়ায় মাত্র ৩ বছর বয়সে আমার জীবন থমকে গিয়েছিল। মায়ের কাছে শুনেছি পোলিও জ্বরের তীব্রতায় আমার হাত-পা বাঁকা হয়ে গিয়েছিল, তিন দিন অজ্ঞান ছিলাম। তবে বাবা-মায়ের অসচেতনতায় আমি সঠিক সেবা পাইনি। তারা আমাকে গ্রাম্য ফকির-কবিরাজের কাছে নিয়ে ঝাড়ফুঁক করিয়েছেন। ডাক্তারে কাছে নিয়ে যাননি। সঠিক চিকিৎসার অভাবে আমার পা দুটি সরু ও বলহীন হয়ে পড়ে। ফলে ৫ বছর বয়স পর্যন্ত আমি হামাগুড়ি দিয়েছি। এরপর প্রতিবেশী বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে খেলতে লাঠিতে ভর করে দাঁড়াতে শিখি। বাড়ি থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার লাঠিতে ভর করে হেঁটেই স্কুলে যেতাম। খুব কষ্ট লাগত, তবে থেমে থাকিনি। পড়তে আমার ভালো লাগত। এসএসসি পাস করার পর মনে হলো নিজে কিছু করব, স্বাবলম্বী হব। আমি বয়স্ক নারীদের স্কুল ও ব্র্যাকের প্রি-প্রাইমারি স্কুলে পড়াতাম। কয়েকজন নারীকে নিয়ে একটি সমিতি করে মুরগির খামারও করেছিলাম।’
ফিরোজা জানান, তার এক ছোটভাই বার্ডোর বরিশাল শাখায় চাকরি করত। সে বার্ডোর প্রধান কার্যালয়ে ফিরোজার চাকরির জন্য যোগাযোগ করে। এরপর ২০০৫ সালের অক্টোবরে এখানে ফিরোজা প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজের সুযোগ পান এবং দুটি পদোন্নতিও হয় তার। এরপর চাকরির আয় দিয়ে পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিন ছোটভাইকে পড়ালেখা করিয়েছেন। তার অন্য দুই ভাইও স্বাবলম্বী। ফিরোজা জানান, ২০১৩ সালে একজনকে বিয়ে করে প্রতারিত হয়ে বর্তমানে একাই আছেন। চাকরি জীবন শেষে ভবিষ্যতে তিনি ব্যবসা করতে চান এবং তার মতো প্রতিবন্ধিতার শিকার নারীদের মনোবল বাড়াতে অনুপ্রেরণা দিতে চান।
সুমাইয়া আক্তার অহনা, শিক্ষার্থী
জন্ম থেকে কনুইয়ের নিচ থেকে ডান হাত নেই ঢাকার রূপনগর এলাকার শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার অহনার (১৮)। তবে ছোটবেলা থেকেই অহনা লিখতেন বাঁ হাতে। সম্প্রতি সরকারি রূপনগর মডেল স্কুল থেকে তিনি জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেছেন। অহনা জানান, তার বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি পড়ালেখা করেছেন। স্কুলের অন্যান্য স্বাভাবিক বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেছেন। অহনার স্বপ্ন পড়ালেখা করে ভবিষ্যতে তিনি বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হবেন। পড়ালেখার পাশাপাশি ছবি আঁকতে ও রান্না করতে ভালোবাসেন অহনা। এজন্য সুমোটুমো আর্ট চ্যানেল এবং মায়ের সঙ্গে যৌথভাবে মি অ্যান্ড মম ফুডস নামে পেইজে কন্টেন্ট বানানোর কাজও করছেন।
ফাবলিহা আজিম অর্ণা, নারী উদ্যোক্তা
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (অটিস্টিক) নারী ফাবলিহা আজিম অর্ণা (৩০)। ছোটবেলায় ফাবলিহা সামনে যাকে পেত, তাকেই চিমটি দিয়ে চামড়া তুলে ফেলত অথবা কামড় দিয়ে মাংস তুলে ফেলত। ভীষণ চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলত, ফাবলিহাকে সামলানো খুব কঠিন ছিল তার মায়ের জন্য। অথচ এখন ফাবলিহা অর্ণা তার মা সৈয়দা মুনিরা ইসলামের গর্ব। কারণ তার মেয়ে অর্ণা পুঁতি দিয়ে মালাসহ বিভিন্ন গহনা বানাতে পারে। আর মেয়ের বানানো সেসব গয়না অনলাইন বাজারে উপস্থাপন করতে ফাবলিহা’স ওয়ার্ল্ড নামে একটি ফেসবুক পেজ ওপেন করেছেন সৈয়দা মুনিরা। এ ছাড়া ছবি আঁকতে ও মডেলিং করতে পছন্দ করেন ফাবলিহা।
অর্ণার মা সৈয়দা মুনিরা ইসলাম একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত। সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান ‘হাত বাড়িয়ে দিলাম’-এর ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করছেন। ‘অদম্য সুর’ নামের একটি রিয়্যালিটি শো করছেন। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিভা বিকাশ ও সহায়তায় গড়ে তুলেছেন ‘ইন্সপিরেশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ নামে একটি সংগঠন।
অর্ণা সম্পর্কে মুনিরা বেগম খবরের কাগজকে বলেন, ‘মেয়েকে আমরা কখনোই লুকিয়ে রাখিনি। দাওয়াত বা যেকোনো উৎসবে তাকে নিয়ে যাই। শুরুতে এ নিয়ে মানুষের অনেক বাজে কথাও শুনতে হয়েছে। এখন এই অটিস্টিক মেয়েই আমার বড় শক্তি। মেয়ের জন্যই নতুন করে বাঁচতে শিখেছি। অনেক সম্মাননা পেয়েছি। আজকের আমি হয়ে উঠতে পেরেছি। সঠিক প্রশিক্ষণ ও পরিবার থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা পেলে বিশেষ চাহিদার বা অটিজম বৈশিষ্ট্যের মানুষও যে এগিয়ে যেতে পারে, ফাবলিহা তার প্রমাণ।’
প্রতিবন্ধী মানেই যে প্রতিভাবন্ধী নয়- তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত একুশে পদকপ্রাপ্ত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মো. সাইদুল হক। তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের জন্য ১৯৯১ সালে জাতীয় পর্যায়ে ‘ব্লাইন্ড এডুকেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (বার্ডো)’ প্রতিষ্ঠা করেন।
খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮-১০ ভাগ বা প্রায় ২ কোটি লোক কোনো না কোনো প্রতিবন্ধিতার শিকার। তাদের মধ্যে যারা নারী তাদের জীবনযুদ্ধ সবচেয়ে কঠিন। কাজেই অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধিত্ব ও অটিজমের শিকার ব্যক্তিদের উন্নয়ন এবং তাদের সমাজের মূল স্রোতধারায় আনার বিকল্প নেই। তবে এখনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা, বিশেষ করে নারীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের ও বৈষম্যের শিকার হন। তাদের কর্মক্ষেত্রের জন্য উপযোগী মনে করা হয় না। তাদের অধিকার আদায়ে এখনো বাস্তবায়ন হয়নি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩।’
প্রতিবন্ধকতার শিকার এসব ব্যক্তির প্রতি মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলের পাশাপাশি তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো খুব জরুরি মনে করেন এই বিশ্লেষক।