নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি উজানে ভারত গজলডোবা এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করায় শুকনো মৌসুমের শুরুতেই তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে জেগে উঠেছে ছোট-বড় অনেক চর। ফলে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও রংপুরের আশপাশের কয়েকটি জেলায় সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তিস্তাপারের চাষিদের।
তবে ব্যারাজের উজানে পানি থাকায় ৭৭৫ কিলোমিটার সেচখালে এখনো প্রয়োজনীয় পানি আছে বলে জানান কর্মকর্তারা। কিন্তু এ পানি দিয়ে কত দিন চাষাবাদ করা সম্ভব হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যারাজের উজান ও ভাটি এলাকায় তিস্তার পানিতে সেচ নিশ্চিত করতে হলে পানি চুক্তির কোনো বিকল্প নেই। আর সেই সঙ্গে সারা বছর পানি ধরে রাখার জন্য খনন করতে হবে নদী।
রংপুরে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডব্লিউডিবি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আহসান হাবিব জানান, তিস্তার উজানে ভারত অবকাঠামো নির্মাণ করে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করায় প্রতিবছরই শুকনো মৌসুমের শুরুতেই কমতে থাকে পানি। তখন উজান ও ভাটিতে জেগে ওঠে ছোট-বড় অসংখ্য চর। পরিণামে ব্যাহত হয় সেচ।
এ সংকট মোকাবিলায় কী করা প্রয়োজন- এ প্রশ্নের উত্তরে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (এসই) মো. আহসান হাবিব বলেন, ‘নদী খননের পাশাপাশি পানি চুক্তির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রবাহ নিশ্চিত করা।’ পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ হিসেবে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনকেও দায়ী করেন।
তিনি আরও জানান, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রামসহ ছয়টি জেলায় তিস্তার পানিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে আশির দশকে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল তিস্তা ব্যারাজের। প্রধানসহ তিন ধরনের ৭৭৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের খালের মাধ্যমে কম খরচে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক না থাকায় তা সম্ভব হয় না অনেক সময়।
দিনাজপুর পানি বিজ্ঞান উপবিভাগ জানায়, ২০২০ সালের ১৫ মার্চ ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ ছিল ৫৬ দশমিক ৫৮২ কিউমেক। পরের বছর ২০২১ সালে একই দিনে ওই পয়েন্টে তিস্তায় প্রবাহ ছিল ৮০ দশমিক ৫২১২ কিউমেক। কিন্তু ২০২২ সালে পানিপ্রবাহ কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৮০ দশমিক ৫০৭ কিউমেক। গত বছর ২০২৩ সালে ওই একই পয়েন্টে ১৫ মার্চ পানিপ্রবাহ নেমে আসে ২৭ দশমিক ৯৯৯ কিউমেকে। তবে পানিপ্রবাহ আবার কিছুটা বৃদ্ধি পায়, এ বছরের ১৫ মার্চ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৪০ কিউমেক।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তার চরের একটি ইউনিয়ন লক্ষ্মীটারি। ওই ইউনিয়নে তিস্তার বুকে জেগে ওঠা চরে এখন চাষাবাদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে শ্যালো মেশিন। লক্ষ্মীটারি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আব্দুল মান্নাফ। তিনি এবার ভুট্টা চাষ করেছেন ২৭ বিঘায়, তামাক ১৫ বিঘায় আর গম এক বিঘা জমিতে। শ্যালো মেশিন দিয়ে এসব ফসলে সেচ দিতে গিয়ে তাকে গুনতে হচ্ছে ১১ হাজার টাকা। নদীর পানি দিয়ে সেচ দিলে কত ব্যয় হতো? এ প্রশ্নের উত্তরে আব্দুল মান্নাফ বলেন, ‘৪৩ বিঘায় আমার সব মিলিয়ে খরচ হতো দেড় হাজার টাকা। কিন্তু নদীতে পানি কমে যাওয়ায় নিজে শ্যালো মেশিন বসিয়ে আমাকেই সেচ দিতে হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, কয়েক বছর ধরেই তিস্তায় এ সময় পানি কমছে। গত বছরের তুলনায় এবার কমেছে আরও বেশি।
তিস্তাপারের আরেক চাষি এরশাদুল হক আসাদ। থাকেন কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ক্ষিতাপাড়া চরে। এবার তিনি ১০ বিঘায় জমিতে চাষ করেছেন আলু, মরিচ, পেঁয়াজ, বাদামসহ নানা ধরনের ফসল। নদীতে পানি না থাকায় শ্যালো মেশিন বসিয়ে সেচ দিতে হচ্ছে তাকেও। পালাক্রমে বিভিন্ন ফসলে সেচ দিতে গিয়ে তাকে সপ্তাহে ডিজেল কিনতে হয় প্রায় আড়াই হাজার টাকার। নদীর পাড়ে কেন শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ দিচ্ছেন? এ প্রশ্নের উত্তরে এরশাদুল হক আসাদ বলেন, ‘আগে নদীতে যখন পানি থাকত, তখন আমরা এলএলপি (লো-লিফট পাম্প) দিয়ে জমিতে সেচ দিতাম। তখন খরচ কম হতো, পানিও পাওয়া যেত বেশি। এখন নদীতে পানি নেই। সে কারণে শ্যালো মেশিন ছাড়া সেচ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’