ঢাকা ৫ আষাঢ় ১৪৩১, বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪

ফোন ছিনতাই ধানমন্ডিতে, উদ্ধার গুজরাট থেকে

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ০৩:৪৪ পিএম
আপডেট: ১৭ মে ২০২৪, ০৩:৪৪ পিএম
ফোন ছিনতাই ধানমন্ডিতে, উদ্ধার গুজরাট থেকে
ছবি : সংগৃহীত

‘ধানমন্ডির এক বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ডাক্তার দেখিয়ে রিকশায় ৮ নম্বর রোড দিয়ে এক আত্মীয়র বাসায় যাচ্ছিলাম। রাস্তার এক পাশে ছিল একটি বটগাছ। জায়গাটা ছিল কিছুটা অন্ধকার। রাস্তায় হালকা যানজট থাকায় রিকশাটি একটু আস্তে যাচ্ছিল। ঠিক এমন সময় হেলমেট পরা দুজন মোটরসাইকেল আরোহী রিকশার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, বেশ ধীরগতিতে। জন্মদিন উপলক্ষে প্রিয়জনের কাছ থেকে পেয়েছিলাম স্যামসাংয়ের এস২৩ আলট্রা। এত কিছু চিন্তা না করে ফোনটি স্বাভাবিকভাবেই ডান হাতে আলতোভাবে রাখা ছিল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজন মোটরসাইকেল আরোহীর একজন খুব সহজেই ফোনটি হাত থেকে টান নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তোবা আমার কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী ফান করেছে। কিন্তু না।’

গত বছরের ৭ নভেম্বর মোবাইল ফোন ছিনতাই হওয়ার পর এভাবে ফেসবুক স্ট্যাটাসে বিষয়টি লিখেছেন দিনাজপুরের ডেপুটি জেলার ফেরদৌস মিয়া। ওই রাতেই ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। এরপর ফোনটি দেশের ভেতর নয়, উদ্ধার হয়েছে ভারতের গুজরাট রাজ্য থেকে।

ঢাকা থেকে ছিনতাই কিংবা চুরি হওয়া অসংখ্য মোবাইল ফোন প্রতিনিয়ত এ দেশ থেকে পাচার হচ্ছে ভারতে। দিনকে দিন বেড়েই চলেছে চুরি-ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন পাচারের লাভজনক বাণিজ্য।

এরপর তিনি বিষয়টি পুলিশকে জানানোর পাশাপাশি নিজেই ইন্টারনেট ঘেঁটে গুজরাটের স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার, রাজ্য পুলিশের নোডাল অফিসার, দিল্লির হাইকমিশন ও ঢাকার হাইকমিশনের ই-মেইল ঠিকানা জোগাড় করে নিজের পরিচয়সহ ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে ফোনের লোকেশনের স্ক্রিনশট ও জিডির কপি পাঠিয়ে নিজের ফোনটি উদ্ধারের অনুরোধ জানান। কিন্তু এরপর যা ঘটল, তার জন্য তিনি নিজেও প্রস্তুত ছিলেন না।

এর মাঝে পেরিয়ে গেল আড়াই মাস। হঠাৎ ১ মার্চ ভারতের গুজরাটের আমরেলি থানা থেকে তাকে জানানো হয়, তার হারিয়ে যাওয়া ফোনটি পাওয়া গেছে। এরপর গুজরাট পুলিশ কুরিয়ারের মাধ্যমে সেই ফোন গত ২৩ মার্চ পাঠায় বাংলাদেশে। অবশেষে হারিয়ে যাওয়া শখের ফোনটি হাতে পেয়ে আনন্দে বাকরুদ্ধ হয়ে যান ডেপুটি জেলার ফেরদৌস।

ছিনতাই হওয়ার পর ফোনটি ফেরত পাওয়ার আশা তিনি ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি হাল না ছেড়ে প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে চেষ্টার পাশাপাশি ভারতীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আন্তরিক সহযোগিতার ফলে হারিয়ে যাওয়া শখের ফোনটি ফিরে পেতে সফল হন। সেই সঙ্গে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন গুজরাট পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি। 

এক দেশের মোবাইল ফোন পাচার হয়ে যদি অন্য দেশে চলে যায়, তাহলে অপারেটর পাল্টে যাওয়ায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেগুলো আর দেশীয় ট্র্যাকিং সিস্টেমে ধরা পড়ে না। সে ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু অ্যাপসের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া পণ্যের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব। তবে যেকোনো পণ্যদ্রব্য পাচার একটি আন্তর্দেশীয় অপরাধ। কেউ এমন দুর্দশার শিকার হলে পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) শাখার সহযোগিতা নিয়ে হারিয়ে যাওয়া পণ্যদ্রব্য উদ্ধারের সুযোগ রয়েছে।

ডেপুটি জেলার ফেরদৌস মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না গুজরাটের একজন পুলিশ ফোন ফেরত দেওয়ার জন্য ফোন করেছে। আমার কুরিয়ার ঠিকানা চাইল, দিয়ে দিলাম। ফোন হাতে পাওয়ার পর খুব ভালো লেগেছে।’

তিনি বলেন, ‘কোনো রকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই ফোনটি এখন ব্যবহার করছি। শুকরিয়া আদায় করছি মহান আল্লাহতায়ালার। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সব শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছে। লেগে থাকলে সফলতা আসবেই।’

ভূ-রাজনীতির টার্গেট সেন্ট মার্টিন!

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৪, ০১:৫৩ পিএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৪, ০২:০৯ পিএম
ভূ-রাজনীতির টার্গেট সেন্ট মার্টিন!
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পরাশক্তিগুলো এখন বেশ সক্রিয়। চীনের বিপুল কর্মযজ্ঞ সেখানে চলমান। ভারতও চীনকে পাল্লা দিয়ে অঞ্চলটিতে এতদিন পর্যন্ত বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। শুধু তা-ই নয়, গৃহযুদ্ধবিধ্বস্ত এ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় পিছিয়ে নেই যুক্তরাষ্ট্রও। এ অবস্থায় কক্সবাজারের টেকনাফের পাশাপাশি এবং অনিন্দ্যসুন্দর প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন কি পরাশক্তিগুলোর বলি হতে যাচ্ছে! এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। 

সেন্ট মার্টিন থেকে নাফ নদীতে মায়ানমারের জলসীমায় সম্প্রতি তিনটি যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, দেশটির আকাশসীমায় উড়েছে যুদ্ধবিমান। ফলে ভয় ও আতঙ্ক ধরে গেছে সেন্ট মার্টিনের মানুষের মধ্যে। মূল ভূখণ্ড থেকে ঠিকমতো রসদ পৌঁছানো যায়নি বেশ কয়েক দিন। তাই সেখানে দেখা গেছে খাদ্যসংকটও। অবশেষে শুক্রবার রাতে বিশষ সামরিক পাহারায় সেখানে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানো হয়েছে।

গেল সপ্তাহে পরিস্থিতির এমন অবনতি হয় যে, মায়ানমারের দিক থেকে বাংলাদেশের জলসীমায় চলাচল করা কয়েকটি নৌযানকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছে। তবে গুলি মায়ানমারের সেনাবাহিনী করেছে না বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি করেছে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরিস্থিতি বোঝার জন্য ঢাকার পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার নেপিডোর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মিয়া মো. মাইনুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মায়ানমারের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগ করেছি। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি। তবে সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস সব সময় সক্রিয় আছে।’

রাখাইন ঘিরে চীনের বিশাল স্বার্থ
মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। রয়েছে ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের বিশাল মজুত। ২০০৪ সালে এই মজুত আবিষ্কারের পরপরই অঞ্চলটি ঘিরে চীনের আগ্রহ বাড়তে থাকে। তারপর ২০০৮ সালে চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করে মায়ানমারের জান্তা সরকার। রাখাইন থেকে গ্যাস চীনের ইউনান প্রদেশে নিতে পাইপলাইন স্থাপন করেছে বেইজিং। এ ব্যবস্থায় প্রতিবছর ১২ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। 

রাখাইনে রয়েছে তেলেরও বিশাল মজুত। সেখান থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের জন্য ২০০৮ সালে পাইপলাইন স্থাপনের চুক্তি করে চীন। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালানোর মাত্র চার মাস আগে থেকে এই পাইপলাইনে চীনের ইউনান প্রদেশে তেল সরবরাহ শুরু হয়। চীনের ওয়ান বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য। 

চীনের সঙ্গে রাখাইন রাজ্য সম্পর্কিত ৩৩টি  চুক্তি করেছে মায়ানমার। চীন রাখাইনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশাপাশি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করারও চুক্তি করেছে। 

চুক্তি অনুযায়ী রাখাইনের কিউকফিউ শহরে নির্মিত সমুদ্রবন্দরের সিংহভাগ, অর্থাৎ ৭০ শতাংশ মালিকানা থাকবে চীনের। বাকি মাত্র ৩০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ থাকবে মায়ানমারের হাতে। রাখাইনের সঙ্গে ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটারের একটি অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তুলছে চীন। এর উদ্দেশ্য হলো ভারত মহাসাগরের সঙ্গে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিংয়ের সংযোগ ঘটানো। চাওকপিউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চাওকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এই বিশেষ করিডরের অংশ।

চাওকপিউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে চীন বিনিয়োগ করছে ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার। আর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে খরচ হবে ৭৩০ কোটি ডলার। রাখাইন রাজ্যের চাওকপিউ টাউনশিপের মাদে দ্বীপে ১৫০ হেক্টর ও রামরি দ্বীপে ৯৬ হেক্টর জমিতে এই দুই প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে।

চীনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে ভারতও
দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব খর্ব করতে মায়ানমারকে কাছে টানতে চাইছে ভারত। তাই রাখাইনে বড় ধরনের বিনিয়োগ করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। ভারত চাইছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাখাইনের সিটওয়ে বন্দর প্রকল্পের কাজ। সিটওয়েতে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর ও অভ্যন্তরীণ নৌ-টার্মিনাল নির্মাণ করছে ভারত। ভারতের এখানে বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৮৪ মিলিয়ন ডলার। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে সমুদ্রপথে কলকাতার সঙ্গে রাখাইনের সিটওয়ে (আগের আকিয়াব) সংযুক্ত হবে। ভারত অনেক আগেই এ প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। 

বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে সিটওয়ে বন্দর ভারতের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা থেকে ভারতের সাত রাজ্যে পণ্য পরিবহনে এই রুটটি ব্যবহৃত হবে। এটা সম্পন্ন হলে নদীপথে সিটওয়ের সঙ্গে মায়ানমারের চিন রাজ্যের পালেটওয়া বন্দরকে সংযুক্ত করবে। এরপর সড়কপথে পালেটওয়া সংযুক্ত হবে মিজোরামের জরিনপুইয়ের সঙ্গে। এ প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে একদিকে মায়ানমার-ভারত বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়বে, অন্যদিকে ভারতের সাত রাজ্যে পণ্য পরিবহন সহজ হবে। 

ভারতের সঙ্গে মায়ানমারের প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। বঙ্গোপসাগরেও উভয় দেশের সীমান্ত রয়েছে। রাখাইনের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদ ভারতের নরেন্দ্র মোদি প্রশাসনের লুক ইস্ট নীতি বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

সক্রিয় যুক্তরাষ্ট্রও 
রাখাইন রাজ্যের বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে অঞ্চলটির প্রতি আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররাও। এ জন্য রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মায়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ ছাড়া তেমন উচ্চবাচ্য করে না দেশটি। 

যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় কোম্পানি রাখাইন রাজ্যে তেল-গ্যাসে বিনিয়োগ করছে। ব্যবসা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে রাখাইন রাজ্য ঘিরে। দেশটি ভারত মহাসাগরে তার উপস্থিতি বাড়াতে চায়।  তাছাড়া তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন যেহেতু রাজ্যটিতে সক্রিয়, কাজেই যুক্তরাষ্ট্রও সক্রিয়। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র চায় এই অঞ্চলে তার ইন্দোপ্যাসিফিক কৌশল (আইপিএস) বাস্তবায়ন করতে এবং এশিয়ার ন্যাটো বলে পরিচিত কোয়াডের বিস্তার ঘটাতে। 

এ প্রসঙ্গে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা আগে ভারতের চোখ দিয়ে এই অঞ্চলকে দেখত। এখন যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতির পরিবর্তন হচ্ছে। তারা সরাসরি এই অঞ্চলে সম্পৃক্ত হতে চায়।’
 
সেন্ট মার্টিনের বর্তমান অবস্থা
বিকট বিস্ফোরণের শব্দ আসছে। স্থানীয়রা বলছেন, আগে মাঝে মাঝে বিস্ফোরণের শব্দ আসত। সম্প্রতি একটানা বিকট বিস্ফোরণের শব্দ আসছে। এ ছাড়া নাফ নদীতে মায়ানমারের জলসীমায় তিনটি যুদ্ধজাহাজ সেন্ট মার্টিন থেকে দেখা গেছে। দেশটির আকাশসীমার মধ্যে উড়তে দেখা যায় যুদ্ধবিমানও। পরে যুদ্ধজাহাজ চলে গেলেও আতঙ্ক কাটেনি। 

দ্বীপটির ১০ হাজার মানুষ খাদ্যসংকটের মুখে পড়েছে। এ অবস্থা গত ৭-৮ দিন ধরেই। সর্বশষ গত শুক্রবার চাল, ডাল, পেঁয়াজ, তেলসহ নানা ধরনের খাদ্যসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করে ‘বার আউলিয়া’ নামের একটি জাহাজ। শুক্রবার বেলা ২টা ১৫ মিনিটে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএর ঘাট থেকে জাহাজটি সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। জাহাজটিতে দেড় শতাধিক মানুষ ও সরকারি সহায়তায় খাদ্যপণ্য এবং পাঁচটি কোরবানির গরু ছিল।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. ইয়ামিন হোসেন জানান, দ্বীপের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয় করে জাহাজটি পাঠানো হয়। এটি বঙ্গোপসাগর দিয়ে টেকনাফ পৌঁছে ঘোলারচর হয়ে সেন্ট মার্টিন যায়। পণ্যসামগ্রীর পাশাপাশি কক্সবাজারে আটকা পড়া সেন্ট মার্টিনের অনেক বাসিন্দাও এই জাহাজে করে ফিরে আসেন।

কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর পরামর্শ 
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশকে এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিকভাবেই অগ্রসর হতে হবে এবং বাংলাদেশ সে পথেই অগ্রসর হচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। মায়ানমার বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে রাখাইনের পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে তার প্রভাব বাংলাদেশের জন্য সুখকর হবে না বলেই মনে করছেন তারা। 

এ প্রসঙ্গে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার কূটনৈতিকভাবেই অগ্রসর হচ্ছে। আমিও মনে করি, কোনো ধরনের যুদ্ধে না জড়িয়ে কূটনৈতিক উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত বাংলাদেশের। প্রয়োজনে জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, মায়ানমারের ওপর চীনের প্রভাব বেশি। দেশটির জান্তা সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি উভয়ের সঙ্গেই চীনের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তাই এ ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শ তাদের।

এ প্রসঙ্গে চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘চীনের সঙ্গে মায়ানমারের জান্তা সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো যেতে পারে। ভারেতর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতে হবে।’

বিশিষ্টজনের অভিমত

আক্রান্ত হলে ছেড়ে দেব না: ওবায়দুল কাদের

সেন্ট মার্টিন-টেকনাফ নৌরুটে মায়ানমারের গোলাগুলি নিয়ে দেশটির সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, ‘মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত-সংকটে আমরা ভুক্তভোগী হলে সেটা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। যুদ্ধকে পরিহার করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে এবং চলবে। তবে আমাদের কেউ আক্রান্ত হলে, ছেড়ে দেব না। সেই আক্রমণের জবাব দেওয়া হবে।’

শনিবার (১৫ জুন) দুপুরে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, আমাদের দরকার রোহিঙ্গা চাপ সরিয়ে নেওয়া। সার্বিকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছি। শেখ হাসিনার সরকার সব জায়গায় (বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে) প্রথমে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ উত্থাপন করে। কিন্তু এটা দুঃখজনক, জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠান এখন নখদন্তহীনে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েল, বড় বড় দেশ তাদের কথা শোনে না। জাতিসংঘের অনুরোধের কোনো কার্যকারিতা বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি না।

সেন্ট মার্টিনে মায়ানমারের গুলি প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘নিজেদের এত খাটো করে দেখব কেন? আমরাও প্রস্তুত। আক্রমণ করব না, কিন্তু আক্রান্ত হলে কী ছেড়ে দেব? আক্রান্ত হলে প্রতিরোধ করতে হবে। 

তিনি বলেন, ‘মায়ানমারের সরকারের সঙ্গে আমাদের কোনো বৈরিতা নেই। আলাপ-আলোচনার দরজা খোলা আছে। আমরা কথা বলতে পারি। যতক্ষণ কথা বলা যাবে, আলাপ আলোচনা করা যাবে; আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা (সেন্ট মার্টিনে গুলি) সমাধানের চেষ্টা করছি এবং করে যাব। আমাদের যেন কোনো উসকানি না থাকে।’

ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারে অভ্যন্তরীণ কিছু সংকট আছে। দেশটির নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী রয়েছে ৫৪টি। তাদের নিজেদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। তবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সমস্যা জেঁকে বসেছে। বিশ্ব আমাদের প্রশংসা করছে তাদের (রোহিঙ্গাদের) আশ্রয় দেওয়ার জন্য। কিন্তু এই রোহিঙ্গাদের জন্য যে সাহায্যের পরিমাণ ছিল, সেটি অনেক কমে গেছে।

চলমান বিশ্ব সংকটে (করোনা মহামারির পর আর্থিক সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি আগ্রাসন) আমরা নিজেরাই সংকটে আছি জানিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, নিজেদেরই দুশ্চিন্তামুক্ত হওয়ার কারণ নেই। সেখানে ১১-১২ লাখ রোহিঙ্গা বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে আছে। সেতুমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুনিয়ার বড় বড় দেশ যারা রোহিঙ্গা নিয়ে কথা বলে, তাদের লিপ সার্ভিসের দরকার নেই।

সড়কে যানজট নিয়ে সেতুমন্ত্রী বলেন, যানজটের জন্য রাস্তা কোনো সমস্যা নয়। ধীর গতির কোরবানির পশুবাহী গাড়ি, সড়কের পাশে পশুর হাট একটা সমস্যা। তারপরও ঈদ যাত্রায় কিছু কিছু জায়গায় যানজট হলেও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়নি। আশা করি সামনের দিনগুলো ভালো যাবে। অবশ্য আজ (শনিবার) এবং আগামীকাল (রবিবার) গার্মেন্ট ছুটি হলে কোনো কোনো জায়গায় চাপটা বাড়তে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক ও সুজিত রায় নন্দী, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, উপপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সৈয়দ আবদুল আউয়াল শামীম প্রমুখ।

মায়ানমারকেও কিছু বলা যাচ্ছে না: মির্জা ফখরুল 

মায়ানমার সীমান্ত থেকে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে নৌযান লক্ষ্য করে গুলির ঘটনার উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘মায়ানমারের মতো একটা দেশকেও আজ কিছু বলা যাচ্ছে না? এটা যে কতটা নতজানু, দাসসুলভ মনোভাব হতে পারে। সেন্ট মার্টিন ইস্যুতে সরকারের নীরবতা দাস সুলভ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।’

শনিবার (১৫ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস উপলক্ষে’ এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আয়োজন করে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) একাংশ। অনুষ্ঠানে ধারণাপত্র পাঠ করেন, বিএফইউজের একাংশের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী। এতে আরও বক্তব্য রাখেন, নয়া দিগন্তের সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, বিএফইউজের সভাপতি রহুল আমিন গাজী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, সৈয়দ আবদাল আহমেদ, সাংবাদিক আবদুল হাই শিকদার প্রমুখ।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সীমান্তে মানুষ মারছে। পানি দিচ্ছে না। অথচ সরকার একটা কথা বলে না। বাংলাদশকে পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলেছে সরকার। চীন বিশ্বে একনায়কতন্ত্র চলছে- এমন দেশের দিকে ঝুঁকছে। সারা বিশ্বেই একনায়কতন্ত্র বাড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন প্রতিদিনই পুরো জাতির জন্যই কালো দিবস। বর্তমান সরকার ১৯৯৬ সালে এসেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ শুরু করেছে। কিছু সাংবাদিক সাহস করে কাজ করছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, বেনজীর, আজিজ, আনারের ঘটনা সাংবাদিকরাই তুলে এনেছেন।’ 

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘সেনাপ্রধান জালিয়াতি করবেন, পুলিশপ্রধান ডাকাতি করে দেশে সাম্রাজ্য গড়ে তুলবেন, কল্পনা করা যায়? বর্তমান সরকারের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। বেনজীর-আজিজ ও আনারের ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য গণমাধ্যমে উঠে আসতে শুরু করেছে। ভাইদের পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠা সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের বিচারের তিনি দাবি করেন।’

সংবাদের আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু বাণী প্রচার করা হয়, তিনি তা শুনছিলেন উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘উনি বলছিলেন, যারা আজকে সম্পদ লুণ্ঠন করে পাচার করে নিয়ে যায়, তাদের এ দেশের মাটিতে জায়গা নেই।’ তিনি বলেন, ‘যারা এখন ক্ষমতায় আছে, তারা কি একবারও এ কথা শুনছে?’

বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে বিপ্লব করেছেন। আমাদেরও এটা সম্ভব। বলছি না যে এখান থেকেই করতে হবে। বাইরে যারা থাকেন, তারা করুক। দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ অমুক–তমুক আইন, গুম করে দেওয়ার বিষয় আছে।’

ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক অঙ্গনে বাম-ডান সবাইকে একটা জায়গায় নিয়ে এসেছি। সাংবাদিকরাও যদি এক প্ল্যাটফর্মে আসেন, তা হলে দেশে গণতন্ত্র ফিরবে।’

সার্বভৌমত্বে আঘাত হেনেছে: জি এম কাদের 

মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নাইক্ষ্যংদিয়া থেকে নাফ নদের বাংলাদেশ সীমান্তে শাহপরীর দ্বীপে বাংলাদেশি নৌযান লক্ষ্য করে দফায় দফায় গুলির ঘটনায় উষ্মা প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান জি এম কাদের। শনিবার (১৫ জুন) দুপুরে রংপুর সার্কিট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি আমার কাছে অদ্ভুত লাগছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার আমাদের সেন্ট মার্টিনে মানুষকে ঢুকতে দেবে না। দীর্ঘদিন থেকে তারা এখানে হামলা করছে। তারা বিভিন্নভাবে আমাদের ভূখণ্ডে চলে আসতে চাচ্ছে। তারা আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলা করছে।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী অনেক শক্তিশালী, অনেক কিছু আমরা শুনি। তাদের ভূমিকা আমরা দেখছি না। মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এটা দুঃখজনক।’ 

রোহিঙ্গা সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এর আগে এক মিলিয়ন রোহিঙ্গাকে আমাদের দিকে ঠেলে দেওয়া হলো। তখন বিভিন্ন অজুহাতে আমরা মানবতাবাদী হয়ে গেলাম তাদের রক্ষা করতে গিয়ে। আমাদের ঘাড়ে তাদের বোঝাটা নিলাম। এখন তারা যদি আমাদের ভূখণ্ড দখল করে ফেলে, সেন্ট মার্টিন কন্ট্রোলে নিয়ে ফেলে সরকার কি করবে আমরা জানি না। এটা আবার কোনো মহত্ত্বের পরিচয় দিয়ে দেওয়া হবে কি না! সার্বভৌমত্ব বিষয়ে সরকারকে বক্তব্য দেওয়া উচিত কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, ওনারা কী করছেন। আমরা উৎকণ্ঠিত। জনগণ এর উত্তর চায়।’   

এদিকে ঈদুল আজহায় দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে জি এম কাদের বলেন, ‘আজ আমরা ঈদুল আজহার শিক্ষার মধ্যে নেই। আজকে সমাজে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। আল্লাহর নির্দেশিত পথের বাইরে আমরা প্রতিযোগিতা করছি, সর্বশক্তি নিয়োগ করছি। ত্যাগের মহিমায় আমরা নিজেদের উদ্ভাসিত করতে পারছি না। সেই কারণে আমি মনে করি, ঈদুল আজহার দিনে এই শপথ নিতে হবে, পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি ও দুর্নীতির জন্য প্রতিযোগিতাও কোরবানি করব। ঈদুল আজহার শিক্ষা নিয়ে সকলকে এগিয়ে যেতে হবে। এটাই হোক আজকের দিনের প্রত্যয় ও শপথ।’ 

হামলা হলে ছাড় নয়: জেনারেল শফিউদ্দিন

বিদায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহম্মেদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোনো বহির্শত্রু আক্রমণ করতে চাইলে আমরা প্রতিহত করব। বর্তমানে যে বর্ডার ভায়োলেট হচ্ছে, সেখানে বর্ডার গার্ড রয়েছে, কোস্টগার্ড রয়েছে, নৌবাহিনী রয়েছে। তারা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে কাজ করছে। এর চেয়ে বেশি খারাপ হলে বা আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলা হলে আমরা কাউকে ছাড় দেব না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না, আমরা শান্তি চাই। যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।’ 

শনিবার (১৫ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯ পদাতিক ডিভিশনের তত্ত্বাবধানে শেখ রাসেল সেনানিবাসে একটি ব্রিগেড সিগন্যাল কোম্পানির পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তিনি এ কথা বলেন। 

এস এম শফিউদ্দিন আহম্মেদ আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘ মিশনে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। বর্তমানে কুয়েত ও কাতারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। ভবিষ্যতে এসব দেশে সেনাসদস্য সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। পদ্মা সেতুর নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক কাজ করছে শেখ রাসেল সেনানিবাস।’

অনুষ্ঠানে জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ, এসবিপি (বার), ওএসপি, এনডিইউ, পিএসসি, পিএইচডি প্রধান অতিথি হিসেবে নবগঠিত ইউনিটের পতাকা উত্তোলন করেন।

বিদায়ী সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমার দায়িত্বকালীন সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সেবার মানসিকতা নিয়ে প্রদত্ত দায়িত্বসমূহ যথাযথভাবে পালন করতে পারায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মর্যাদা সমুন্নত ও স্বাধীন ভূখণ্ড নিরাপদ রাখতে অর্পিত সব দায়িত্ব পালন করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অঙ্গীকারবদ্ধ। দেশের সংকটময় মুহূর্তসহ যেকোনো পরিস্থিতিতে অকুতোভয় দায়িত্ব পালনে সেনাবাহিনী সদা প্রস্তুত।’

এ সময় একজন সাংবাদিক বিদায়ী সেনাপ্রধানের অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি জানান, নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পেরে তিনি আত্মতৃপ্ত। তবে দীর্ঘদিনের পোশাক খুলতে কিছুটা কষ্ট হবে বলে জানান তিনি। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।

পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে বিদায়ী সেনাপ্রধান তার মূল্যবান বক্তব্যে সেনাবাহিনীর নতুন ইউনিটের সদস্যদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। এ সময় তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এবং সেই সব বীর শহিদদের যাদের আত্মত্যাগে অর্জিত হয়েছে দেশের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।’

তিনি বলেন, ‘‘১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিরক্ষা নীতির আলোকে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় প্রণীত হয় ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’। আজকের এই পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ এর আরেক ধাপ বাস্তবায়িত হলো।’’

পতাকা উত্তোলন ও কেক কাটা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নতুন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, সেনা সদরের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারাসহ ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন শরীয়তপুর-২ (নড়িয়া-সখিপুর) আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম এনামুল হক শামীম, জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ ও পুলিশ সুপার মো. মাহবুবুল আলম।

শেষবেলার অপেক্ষায় ক্রেতা-বিক্রেতারা

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৪, ০১:৪১ পিএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৪, ০১:৪৬ পিএম
শেষবেলার অপেক্ষায় ক্রেতা-বিক্রেতারা
কার্টুন: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

পবিত্র ঈদুল আজহা সোমবার (১৭ জুন)। শনিবার (১৫ জুন) রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে দেখা গেছে, ক্রেতা-বিক্রেতা-দর্শনার্থীদের ঠাসা ভিড়। আগের দুই দিনের চেয়ে কোরবানির পশুর দাম কিছুটা কম দেখা গেছে। তবে অনেক বিক্রেতা এখন শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা করছেন। 

কুষ্টিয়া থেকে তিনটি গরু নিয়ে ঢাকায় এসেছেন খলিল। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘হাটে ক্রেতাদের প্রচুর ভিড়। একটি গরু বিক্রি করেছি। বাকি দুটি গরুর দরদাম চলছে। আশা করছি, আজকালের মধ্যে বিক্রি হয়ে যাবে। হাটে ক্রেতাদের জটলা দেখে ভালো লাগছে। অনেক আশা নিয়ে ঢাকায় এসেছি। উপযুক্ত দামে গরু বিক্রি করে বাড়ি ফিরতে চাই।’ 

রাজধানীর মিরপুর-১৪ থেকে গাবতলীর হাটে কোরবানির গরু কিনতে এসেছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা আরিফুর রহমান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, হাটে প্রচণ্ড ভিড় ও ভ্যাপসা গরমে শ্বাস নেওয়া কঠিন। এর আগেও এই হাটে এসেছি। তখন দাম বেশি থাকলেও ভিড় ছিল কম। গত দুই দিনের চেয়ে এখন গরুর দাম কিছুটা কমেছে।

রাজধানীর গাবতলীসহ ৯টি পশুর হাট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ৩ দিনে এই হাটগুলোতে ১০০ কোটি টাকার পশু বিক্রি হয়েছে। সরেজমিনে গতকাল রাজধানীর গাবতলীসহ উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেটের পশুর বাজার, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট, কমলাপুর স্টেডিয়াম, দনিয়া কলেজসংলগ্ন এলাকা, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর কদমতলী ও ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনালসংলগ্ন পশুর হাট ঘুরে এ তথ্য পাওয়া গেছে। 

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ঢাকার ভেতরে পশুর হাটে যারা (স্বেচ্ছাসেবীসহ হাট ইজারাদার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী) কাজ করবেন, তাদের মধ্যে সমন্বয় রয়েছে। পশুর হাটে অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির ব্যাপারে ডিবির টিম সজাগ আছে। হাট ও হাটের আশপাশে এমন অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির কাউকে দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি জাল টাকার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। 

তিনি বলেন, ‘জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিন পশুর হাটগুলোতে রয়েছে। এসব বিষয়ে আমাদের গোয়েন্দারা সতর্ক। যারা গরু কেনাবেচা করছেন, তাদের নিরাপত্তার জন্য গোয়েন্দা পুলিশ রয়েছে। পাশাপাশি যারা ঢাকার বাইরে থেকে ট্রাকে গরু আনছেন, তাদেরও পুলিশ নিরাপত্তা দিচ্ছে। পশুর হাটগুলোতে ইজারাদাররা নির্ধারিত পরিমাণের বাইরে অতিরিক্ত হাসিল আদায় করলে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। হাটগুলোতে ২৪ ঘণ্টাই পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।’ 

প্রতিবারের মতো এবারও রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে দালাল ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য রয়েছে। এক হাটের পশু অন্য হাটে নেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে হাটের ইজারা যারা নিয়েছেন তাদের কর্মীদের বিরুদ্ধে।

গরু কিনে আদাবরের বাসায় ফিরছিলেন রাজু। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, গরু কিনে পিকআপে নিয়ে বাসায় ফিরছেন। ফিরতি পথে হাট থেকে গাড়ি সামান্য এগোতেই বেশ কয়েকজন ঘিরে ধরে ও ড্রাইভারের কাছ থেকে জোর করে ২০০ টাকা আদায় করে। তিনি জিজ্ঞাসা করলে তারা জানায়, এটি হাটের ফি। কারা এই ফি নিচ্ছে জানতে চাইলে বলা হয়, ডিপজলের লোকেরা। এ বিষয়ে কথা হয় ডিপজলের কর্মী শাহবুদ্দিনের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, কারা চাঁদা নিচ্ছেন তিনি জানেন না। 

ঈদের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, হাটে সংখ্যা বাড়ছে কোরবানির পশুর। পশুদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য হাটে নিয়োজিত রয়েছে ৩৬ সদস্যের একটি মেডিকেল টিম। হাটে পশু ও মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ডা. শেখ মাসুদুর রহমান খবরের কাগজকে জানান, হাটে পশু এলেই তারা ফিটনেস পরীক্ষা করে ট্যাগ লাগিয়ে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত দুই হাজার পশুকে তারা স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন। 

তিনি জানান, অতিরিক্ত গরমে অনেক সময় গরুর হিট স্ট্রোক হয়। সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক পরীক্ষার পর কোনো পশুর শারীরিক সমস্যা থাকলে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসাও দেওয়া হচ্ছে। 

আরও ৮ পশুর হাট সরেজমিন
ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সারা দেশের মতো রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী পশুর হাটগুলো জমে উঠেছে। প্রতিবারের মতো এবারও ঈদ ঘিরে পশু বেচাকেনা চলবে চাঁদরাত পর্যন্ত। এসব বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক রয়েছে পুলিশ-র‌্যাব। গরু ব্যবসায়ী ও হাট কর্তৃপক্ষ বলছেন, গতকাল থেকে জমজমাট বেচাকেনা শুরু হয়েছে।

এবারের হাটে বিদেশি গরু বেশ ভালোই দেখা গেছে। ভারত, নেপাল, মায়ানমারের গরুর পাশাপাশি রয়েছে মহিষ, ষাঁড়, ভুট্টি, উট ও দুম্বা। এ ছাড়া হাটের ভেতর গরু বাঁধার জন্য বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে শেড তৈরি করা হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কথা মাথায় রেখে বাড়তি বালু রাখা হয়েছে হাটের ভেতর, যেন বৃষ্টি হলেও নির্বিঘ্নে ক্রেতা-বিক্রেতারা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারেন। 

হাট ঘুরে দেখা যায়, ইতোমধ্যে হাটে খামারি ও ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন আকারের গরু তুলেছেন। তবে বরাবরের মতোই এবারও ছোটো ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি। এ বছর নগরীর দুই সিটিতে বসেছে পশুর ২০টি অস্থায়ী হাট। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ৯টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) বসেছে ১১টি অস্থায়ী পশুর হাট। 

পশুর হাটগুলো ঘুরে দেখা যায়, কোরবানির পশু যারা কিনতে আসছেন, তাদের বেশির ভাগই মাঝারি সাইজের গরু কেনার চেষ্টা করছেন। ৭০ বা ৮০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে বা তার একটু বেশি বাজেট। অনেক ক্রেতা হাট ঘুরে ঘুরে কোরবানির পশু দেখার পাশাপাশি দাম যাচাই করতে দেখা গেছে।

কমলাপুর স্টেডিয়াম পশুর হাটে কথা হয় বিক্রেতা দেলোয়ারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দাম চাচ্ছি ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু ক্রেতারা বলছেন ১ লাখ ১০ এবং ২০ হাজারের মতো।’ দনিয়া হাটের এক বিক্রেতা নয়ন মিয়া বলেন, ‘৮টি গরু নিয়ে ৪ দিন আগে হাটে এসেছি। এখনো একটিও বিক্রি হয়নি। সবাই দাম শুনে চলে যান। মনে হয়, আজকালের মধ্যে দাম কমাতে হবে এবং বিক্রি করতে হবে।’

যশোর থেকে রাজধানীর পোস্তগোলা শ্মশান ঘাট হাটে গরু নিয়ে আসা বিক্রেতা তোরাব হোসেন বলেন, ‘১২টি গরু হাটে এনেছি। একেকটি গরুর পেছনে আমার অনেক টাকা খরচ। সবকিছু হিসাব করেই আমার গরু বিক্রি করতে হবে।’

একাধিক ক্রেতা বলেছেন, গরুর দাম একটু বেশি হলেও আগেই কিনতে তারা হাটমুখী হচ্ছেন। তবে আগে কিনলেও সমস্যা আছে। ঢাকায় সবার তো গরু রাখার মতো জায়গা নেই।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আরাফাত ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোরবানির ঈদ ঘিরে রাজধানীসহ সারা দেশের হাটে আমাদের গোয়েন্দারা কাজ করছেন। প্রতিটি হাটে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে। র‌্যাব সদস্যদের বলা হয়েছে কোনো গরুর বেচাকেনার ক্ষেত্রে কেউ প্রতারিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জাল টাকার চক্রের ব্যাপারে আমরা সতর্ক রয়েছি।’

খাতুনগঞ্জে আদা কেজিতে বাড়ল ৮০ টাকা

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৪, ১১:৩১ এএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৪, ১১:৪৯ এএম
খাতুনগঞ্জে আদা কেজিতে বাড়ল ৮০ টাকা
ছবি: খবরের কাগজ

পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের বৃহত্তর ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জে প্রতি কেজি চায়না আদার দাম বেড়েছে ৮০ টাকা। এ ছাড়া চার দিনের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজ কেজিতে বেড়েছে ৪ থেকে ৫ টাকা। অন্যদিকে ভারতীয় পেঁয়াজ কেজিতে বেড়েছে ৫ থেকে ৭ টাকা। 

ব্যবসায়ীরা জানান, এক মাস আগে চায়না আদা ১৭০-১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। কারণ ওই আদা আমদানিতে টনপ্রতি বুকিং রেট পড়েছিল ১ হাজার ৪৫০ ডলার। তবে দুই মাস আগে পণ্যটি আমদানিতে বুকিং রেট বেড়ে যায়। দুই মাস আগে প্রতি টন আদা আমদানিতে বুকিং রেট ছিল ১ হাজার ৬৫০ ডলার। ওসব আদা এখন ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ বর্তমানে চায়না আদা প্রতি কেজি ২২০ টাকায় কিনে পাইকারিতে ২৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। মূলত আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় আদার দামটা আগের চেয়ে বেড়েছে। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ার আদা কেজিপ্রতি পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ১৮০-১৮৫ টাকা।

এদিকে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন কৃষকরা। বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ তারা বিক্রি করছেন ৩ হাজার ১০০ টাকায়। তাই দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। অর্থাৎ গত ১০ জুন খাতুনগঞ্জে আকারভেদে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৭০-৭৮ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। বর্তমানে পাইকারিতে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭৫-৮২ টাকা। এদিকে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কম থাকায় ভারতীয় পেঁয়াজও বাড়তি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। বর্তমানে পাইকারিতে প্রতি কেজি ভারতীয় পেঁয়াজে দাম ঠেকেছে ৮০-৮৫ টাকা।

খাতুনগঞ্জে হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস খবরের কাগজকে বলেন, ‘চায়না থেকে আদা আমদানিতে খরচ বেড়ে গেছে। তাই আমদানিকারকরা বাড়তি দরে পণ্যটি বিক্রি করছেন। অন্যদিকে কৃষক পর্যায়ে দাম বাড়ায় দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। আর বর্তমানে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে রেখেছে। অধিকাংশ আমদানিকারক পেঁয়াজ আনছেন না। আর যারা সীমিত পরিমাণে আমদানি করছেন তাদের আমদানি খরচ বেশি পড়ছে। তাই এর প্রভাব পাইকারি বাজারেও পড়েছে।’ 

নগরের ঈদগাহ এলাকার বাসিন্দা মো. আব্দুর রহিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘এক মাস আগেও খুচরা দোকান থেকে প্রতি কেজি চায়না আদা ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় কিনেছি। বর্তমানে খুচরা বাজারে পণ্যটি প্রতি কেজি ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজের দামও বাড়তি। কোরবানি ঘনিয়ে আসায় ব্যবসায়ীরা নানা অজুহাতে প্রয়োজনীয় মসলাজাতীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমাদের আয়-রোজগার ভোগ্যপণ্যের দামের মতো হঠাৎ করে তো বেড়ে যায় না। আমরা সাধারণ মানুষ, বাড়তি দাম দিয়ে পণ্য কিনতে কষ্ট হয়।’ 

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা রোজার সময় দেখেছি নানা অজুহাতে ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। আমরা সব সময় দেখেছি, কোনো ধর্মীয় উৎসবের সময় ঘনিয়ে এলে নানা অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা হয়। ব্যবসায়ীরা সারা বছরের লাভ এ সময়টায় করতে চান। কিন্তু সাধারণ মানুষের দিকটাও তো বিবেচনা করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেট বা ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তারা অভিযানে গেলে তো ব্যবসায়ীদের নানা অপরাধ প্রমাণ হয়। এলাচের ক্ষেত্রে আমরা ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা করতে দেখেছি। কাজেই আমরা বলব, ব্যবসায়ী কত টাকায় পণ্যটা আমদানি করছেন, পাইকারি ব্যবসায়ী তা কত টাকায় কিনে কত টাকায় বিক্রি করছেন। পাশাপাশি খুচরা পর্যায়েও তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। তাহলে কোনো প্রকার অসংগতি থাকলে তা ধরা পড়বে।’
 
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বিভিন্ন বাজারে অভিযান পরিচালনা করছি। মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা, বেশি দামে পণ্য বিক্রি, ক্রয়-বিক্রয় রসিদ সংরক্ষণ না করাসহ নানা অসংগতি পাচ্ছি। আমরা ব্যবসায়ীদের সতর্ক করার পাশাপাশি অপরাধ প্রমাণ পেলে বিধি মোতাবেক শাস্তির আওতায় আনছি। লাভের জন্যই তো ব্যবসা। কিন্তু ব্যবসায়ীদেরও নীতিনৈতিকতার সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। আর আমাদের ভোক্তারা যদি প্রতারণা বা হয়রানির শিকার হলে আমাদের জানালে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

সিলেটের চিনি চোরাকারবারে বাঘা বাঘা নেতা জড়িত

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৪, ১০:৪৭ এএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৪, ১২:৫১ পিএম
সিলেটের চিনি চোরাকারবারে বাঘা বাঘা নেতা জড়িত
বিয়ানীবাজার উপজেলার চেয়ারম্যান (ফুলের মালা গলায়) আবুল কাশেম পল্লবের সঙ্গে ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহুদুল হক তাহমিদ। ছবি: সংগৃহীত

সিলেটে চোরাই চিনির সঙ্গে আওয়ামী লীগের বাঘা বাঘা নেতা জড়িত! খবরের কাগজকে এ রকম এক সত্য বয়ান দিয়েছেন বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিষদের টানা দুবারের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আবুল কাশেম পল্লব। 

বিয়ানীবাজারে সরকারি নিলাম ডাকের ২৪ লাখ টাকার চিনি লুটের ঘটনায় ছাত্রলীগের নাম আসায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে পল্লব মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। খবরের কাগজের অনুসন্ধানে তার এ ভূমিকা দলীয় অঙ্গনে ‘সত্যবাদী যুধিষ্ঠির’ হিসেবে সমালোচিত হয়।

পল্লব স্থানীয় ছাত্রলীগের জড়িত থাকার বিষয়টি ধামাচাপা দিতে নিলাম ডাকে চিনি কেনা ব্যবসায়ীকেও হুমকি-ধমকি দিয়েছিলেন। সেসব হুমকির ফোনালাপ খবরের কাগজের হাতে এলে যোগাযোগ করলে পল্লব হুমকির বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তার দাবি, ঘটনা ধামাচাপা নয়, লুটের চিনি উদ্ধার করে ছাত্রলীগের নতুন কমিটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সমাধান করতে চেয়েছিলেন তিনি। এসব অভিযোগ মাথা পেতে নিয়ে চোরাই চিনি প্রসঙ্গে নিজ দলের তৎপরতার কথা খোলামেলাভাবে বলেছেন। খবরের কাগজকে দেওয়া তার বয়ানমতে, সিলেটে ‘চোরাই চিনির সঙ্গে বাঘা বাঘা লিডার জড়িত!’

ভারতের আসামঘেঁষা জনপদ সিলেটের সীমান্ত উপজেলা বিয়ানীবাজার। সেখানকার চিনি-কাহিনি এখন মানুষের মুখে মুখে। নিলাম ডাকের চিনি লুটে ছাত্রলীগ জড়িত থাকার বিষয়টি খবরের কাগজ প্রথম উন্মোচন করে। এরপর ছাত্রলীগের দুই নেতার ফোনালাপ প্রকাশ ও পরবর্তী পর্যায়ে স্থানীয় ছাত্রলীগের দুটি কমিটি কেন্দ্র থেকে বিলুপ্তির ঘটনায় বিয়ানীবাজারের বিষয়টি এখন সিলেট অঞ্চলে বহুল আলোচিত একটি বিষয়। এ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনও সরগরম।

জানা গেছে, অন্তর্দলীয় কোন্দলের কারণে প্রায় ৩৩ বছর ধরে বিয়ানীবাজার উপজেলা ও পৌরসভায় ছাত্রলীগের কোনো কমিটি ছিল না। গত ১১ মার্চ কেন্দ্র থেকে অনুমোদন নিয়ে উপজেলা ও পৌর কমিটি ঘোষণা করেছিল জেলা ছাত্রলীগ। মাত্র তিন মাসের মাথায় কমিটি বিলুপ্তির কারণ হিসেবে চিনি লুটের ঘটনাটি আরও আলোচিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে ছাত্রলীগের কমিটি হওয়ার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের যেসব নেতা ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে একজন আবুল কাশেম পল্লব। চিনি লুটের ফোনালাপকারী উপজেলা ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক তাহমিদের গ্রুপটি ছিল পল্লবের অনুসারী। 

 

রাজনৈতিকভাবে সিলেটজুড়ে আলোচনায় এখন সরকারদলীয় উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কাশেম পল্লব। নিজের গড়া ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত হওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ। কোনো রাখঢাক না করেই চোরাই চিনির আদ্যোপান্ত নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। গত ১৪ জুন পল্লবের সঙ্গে যোগাযোগ করলে চিনি লুটের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি খবরের কাগজের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে সম্মত হন। তার অনুমতি নিয়ে ফোনে রেকর্ড করা হয় তার বলা সব কথা। মোট ১৩ মিনিট তিনি এ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। 

বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম পল্লব বলেন, ‘এই চিনির সঙ্গে অনেক মানুষ জড়িত। ছাত্রলীগ কেউ আমার না। ছাত্রলীগ সবার। এই জিনিসগুলো আমরা জানিও না কী হইছে। আমি ঘটনা শুনেছি তিন দিন পর। ওসি সাহেব আমাকে বলছেন চিনি কেলেঙ্কারি একটি হয়েছে বিয়ানীবাজারে। শ্রীধরা গ্রামে চিনি প্রথম আসছে। খাঁচারপাড়া আসার পর সাগরসহ যে পেরেছে, সেই চিনি নিয়েছে। এতভাবে চিনিটা বণ্টন হয়েছে, এখন এগুলো্ বের করা মুশকিল হয়ে গেছে। পরে চিনির মালিক বদরুল আসে আমার কাছে। সে বলল তার ৪০০ বস্তা চিনি। যেকোনো উপায়ে চিনিগুলা উদ্ধার করা লাগব। তখন আমি ওসিকে জিজ্ঞেস করি, আপনি বলেন এর সঙ্গে জড়িত কারা। তখন ওসি আমাদের দলীয় কিছু ছেলের নাম বলেন। এই নামগুলো শোনার পর আমি তাদের প্রেশার দিই যেকোনোভাবেই হোক তার চিনি ফেরত দিতে।’

বিয়ানীবাজার উপজেলা সীমান্তঘেঁষা হলেও বেশির ভাগ মানুষ প্রবাসী। যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে আছেন এ উপজেলার মানুষজন। বিয়ানীবাজারের এক পাশে ভারতের আসাম রাজ্যের সীমান্ত। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কাশেম পল্লব জানান, বিয়ানীবাজারে আসা চোরাই চিনির উৎস সীমান্তপথ ছাড়াও মাথিউরা এবং প্রতিবেশী উপজেলা বড়লেখা ও জুড়ী। তিনি বলেন, ‘চিনি লুটের পর তখন তাদের বক্তব্য শুনে বুঝলাম কেউ ১০ বস্তা, কেউ ৫ বস্তা, কেউ দুই বস্তা নিয়েছে। এর মধ্যে চৌকস কিছু ছেলে ছিল, যারা এই চিনির সুবিধা দীর্ঘদিন থেকে পেয়ে আসছে। এই যে কিছু চক্র আছে, এরা বিভিন্ন জায়গা থেকে চিনি হরিলুট করেছে। তারা সঙ্গে পিকআপ দিয়ে কিছু চিনি সিলেট পাঠিয়েছে। কিছু বড়লেখা, জুড়ী, মাথিউরা পাঠিয়েছে। যখন আমরা দু-চারজন মানুষের নাম পেয়েছি, তখন তাদের প্রেশার দিয়েছি চিনিগুলো ফেরত দেওয়ার জন্য। এরপর আমি ওসি সাহেবকে নিয়ে ৮০ বস্তা চিনি উদ্ধার করে দিয়েছি।’

লুট করা চিনির মালিক ব্যবসায়ীকেও দায়ী করেন পল্লব। তিনি বলেন, ‘এই চিনির মেইন হোতা বদরুলের কাছ থেকে আমি জানতে চাই- এই চিনি রহস্যের কথা। তখন চিনির মালিক কিছু নাম বলেন। সেই নামগুলো শুনে আমার মাথা গরম হয়ে যায়। দেখি চোরাই চিনির সঙ্গে জড়িত বাঘা বাঘা লিডার। তখন আমি বদরুলকে জিজ্ঞেস করি তোমার চিনির সঙ্গে এমন কেন হলো। তার বক্তব্য হলো যে এক গাড়ি চিনি কিনি নিলাম থেকে। এই বৈধ চিনির সঙ্গে সে আরও ১০ গাড়ি অবৈধ চিনি বিক্রি করে। এই বদরুলের সঙ্গে জড়িত আছে আরও অন্তত ৩০ জন। এরা সবাই চাঁদা নেয়। এই অবৈধ চিনির সঙ্গে বর্ডার গার্ড (বিজিবি) জড়িত, পুলিশ প্রশাসন জড়িত, অনেক এমপি জড়িত, জেলার নেতারা জড়িত, অনেক ব্যবসায়ী জড়িত, ছাত্রলীগ জড়িত। চিনির একটি চক্র তৈরি করেছে। কিন্তু এর মূল হোতা বিয়ানীবাজারের ছেলেরা না। আমাদের দলের কিছু মানুষ নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য এই ঘটনাটিকে অতিরঞ্জিত করেছে।’

লুট করা চিনির মালিকের সঙ্গে তার একটি ফোনালাপও ফাঁস হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আবুল কাশের পল্লব বলেন, ‘আমি ফোনে বদরুলের (নিলাম ডাকে কেনা চিনির মালিক, ব্যবসায়ী) গালি দিয়েছি। ... বাচ্চারে (অশ্লীল) আমি গালি দিয়েছি সে কি এটা ভাইরাল করছে নি? ওটার ভাইরালে শুনতে পারবেন ওরে কী গালি দিয়েছি। আমি গালি দিয়েছি, কারণ তার অবৈধ চিনি বৈধ করার জন্য নিলামে চিনি কেনে। তার কারণে এই চোরাই চিনি বিয়ানীবাজারে প্রবেশ করে। তাই তারে গালি দিয়েছি।’ 

উল্লেখ্য, বিয়ানীবাজারে সরকারি নিলাম ডাকের ‘২৪ লাখ টাকার চিনি’ লুট করে ছাত্রলীগ। এ ঘটনায় চিনির মালিক ব্যবসায়ীদের একজন মো. নজরুল হোসেন ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও সাত-আটজনকে আসামি করে বিয়ানীবাজার থানায় মামলা করেন। মামলার দুই আসামি গ্রেপ্তার করে চিনি উদ্ধার অভিযানে নামে পুলিশ। লুট হওয়া ৪০০ বস্তা চিনির মধ্যে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৮০ বস্তা চিনি উদ্ধার করে পুলিশ। পৃথক স্থান থেকে চিনি ছিনিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত পিকআপ ভ্যানটিও জব্দ করা হয়।

লুটের চিনি ভাগাভাগি নিয়ে বিয়ানীবাজার উপজেলা ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সহসভাপতি সফিউল্লাহ সাগরের সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক তাহমিদের মোবাইল ফোনে কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ খবরের কাগজের হাতে আসে। শুক্রবার দুই নেতার ফোনালাপ, ‘ছাত্রলীগের লুটের চিনি, পিঁপড়ার মতো ভাগাভাগি!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন খবরের কাগজে ছাপা সংস্করণ ও অনলাইনে প্রকাশ হয়। এর আগে খবরের কাগজের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ফোনালাপের অডিও প্রকাশ করা হয়। 

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানায়, ফোনালাপের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে তদন্ত করা হয়। এর মধ্যে জেলা পুলিশের অপরাধ শাখার প্রতিবেদনে খবরের কাগজে প্রকাশিত সব কটি প্রতিবেদনই সত্য বলে জানানো হলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ কমিটি বাতিল ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে।

সিলেট অঞ্চলের সীমান্তপথে চিনি চোরাচালান বেড়ে যাওয়ায় এবং দেশি চিনির ব্যবসা প্রায় ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হওয়ায় খবরের কাগজে ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর সূত্র ধরে গত ৬ জুন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ১৪ ট্রাক চোরাই চিনি জব্দ করে। ৭ জুন খবরের কাগজে ‘অচেনা এমপির লোক কারা?’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ-সংক্রান্ত সরেজমিন ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও ডিজিটাল মাধ্যমে ভিডিও স্টোরি প্রকাশ হয়। এ নিয়ে সব মহলে চাঞ্চল্য তৈরি হলে বিয়ানীবাজারে গত ৮ জুন ঘটে সরকারি নিলাম ডাকে বিক্রি হওয়া ৪০০ বস্তা চিনি লুটের ঘটনা। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রের মাধ্যমে স্থানীয় ছাত্রলীগ জড়িত থাকার তথ্য খবরের কাগজ প্রথম প্রকাশ করে। বিয়ানীবাজারে চিনি লুট ইস্যুতে একটানা চার দিন ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশের পর সর্বশেষ গত শুক্রবার প্রকাশ হয় চাঞ্চল্যকর ফোনালাপ নিয়ে প্রতিবেদনটি। খবরের কাগজে ‘ছাত্রলীগের লুট করা চিনি, পিঁপড়ার মতো ভাগাভাগি!’ শিরোনামে প্রতিবেদন ও ফোনালাপের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গত শুক্রবার দিনভর সিলেটজুড়ে এ আলোচনার মধ্যে বিকেলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কমিটি বাতিলের ঘোষণা আসে।

কমিটি নিয়ে বিএনপিতে প্রতিক্রিয়া

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৪, ০৯:৫০ এএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৪, ০৯:৫০ এএম
কমিটি নিয়ে বিএনপিতে প্রতিক্রিয়া
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

জোরেশোরে ঘর গোছানোর কাজ শুরু করেছে বিএনপি। দলকে শক্তিশালী করতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা। বিগত আন্দোলনের ব্যর্থতায় একের পর এক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হচ্ছে। আবার ধারাবাহিকভাবে পুনর্গঠনও চলছে।

এই প্রক্রিয়ায় শনিবার (১৫ জুন) কেন্দ্রীয় বিএনপিতে বড় রদবদল, আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটি পুনর্গঠন ও ছাত্রদলের কমিটির আকার বাড়ানো হয়েছে। এই পর্যায়ে এসে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতেও একাধিক সদস্য যুক্ত হতে পারেন। যেখানে দলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল নোমান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, রুহুল কবির রিজভী ও শামসুজ্জামান দুদুর নাম শোনা যাচ্ছে। তবে মেজর (অব.) হাফিজকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানও করা হতে পারে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই পদে ছিলেন।

এদিকে গত দুই দিনে ঘোষিত একাধিক কমিটি নিয়ে দলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলছে। ভালো বা সিনিয়র পদ পাওয়া নেতারা মনে করছেন, তারা আরও গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। আবার তালিকায়  জুনিয়র বা বাদ পড়া নেতারা বলছেন তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। তবে এমন পরিস্থিতির পরও আগামী কয়েক দিনে আরও বেশ কয়েকটি কমিটি পুনর্গঠনের ঘোষণা আসতে পারে। 

জানা গেছে, বারবার আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়া থেকে যেকোনো মূল্যে বেরিয়ে আসার ভাবনা থেকেই টপ টু বটম নেতৃত্বে পরিবর্তন, পরীক্ষিতদের জায়গা করে দেওয়া আর নিষ্ক্রিয়দের পদাবনতি চলছে। এটি অব্যাহত থাকবে সারা দেশে সব পর্যায়ের কমিটিতে। ফলে মূল দল ছাড়াও সব অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনে গতি আনতে বড় বড় পদধারী হয়েও ব্যর্থদের ব্যাপারে ছাড় দিতে নারাজ দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। এ জন্য পর্যায়ক্রমে আরও কমিটি ভেঙে দিয়ে সর্বশেষ আন্দোলনে রাজপথে থাকা নেতাদের সামনে আনা হবে।
 
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল মাহমুদ টুকু খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি বিদেশে আছি। বিস্তারিত আমার জানা নেই।’ 

দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘কেউ পদ পেয়ে খুশি হবে, কেউ না পেয়ে কষ্ট পাবে।  কাঙ্ক্ষিত পদ না পেয়ে মনে কষ্ট পাবে- এটা স্বাভাবিক বিষয়। কমিটি পুনর্গঠন রুটিন ওয়ার্ক। তবে আমরা সবাইকে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছি।’

তিনি বলেন, ‘যাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে তাদের ভালো কাজ, দলের প্রতি ডেডিকেশন ও যোগ্যতা দেখেই সমন্বয় করা হচ্ছে, তাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যারাও এখন পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বাদ পড়ছেন তাদেরও ভবিষ্যতে মূল্যায়ন করা হবে।

এদিকে কেন্দ্রীয় বিএনপির বিভিন্ন পদে রদবদল, আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটি পুনর্গঠন ও ছাত্রদলের কমিটি গঠনের পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। চেয়ারপারসনস ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজরি কমিটিতে রাখা হয়নি ইকবাল মাহমুদ টুকু ও ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে। যা নিয়ে দলের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। একজন নেতা বলেন, যতটুকু জেনেছি তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করায় এবং সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় তাকে রাখা হয়নি। তবে অন্য একজন নেতা বলেন, বিএনপির রাজনীতির কারণেই তো টুকু সাজা পেয়েছেন। এমনকি দেশেও আসতে পারছেন না। ফলে তাকে বাদ দেওয়া ঠিক হয়নি। 

অন্যদিকে ব্যারিস্টার রুমিনকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে রাখা হতে পারে। তবে দলের তিন পোড় খাওয়া নেতা সদ্য সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের নামের ওপরে জহিরউদ্দিন স্বপনকে স্থান দেওয়ায় দলের মধ্যেই সমালোচনা তৈরি হয়েছে। জহিরউদ্দিন স্বপন ও শামা ওবায়েদ সবচেয়ে বেশি মূল্যায়িত হয়েছেন বলে মতপ্রকাশ করেন বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতা। তাদের মতে, তৃণমূল থেকে যুগ্ম মহাসচিব হতে ওই নেতাদের অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় দলে স্বপনের অবদান প্রশ্নবিদ্ধ বলে অনেকে মনে করেন। কারণ স্বপন ‘সংস্কারপন্থিদের’ নেতৃত্ব স্থানীয় পর্যায়ের একজন ছিলেন। 

মাঠের রাজনীতিতে কার্যকর কয়েকজন নেতাকে উপদেষ্টার মতো পদে নেওয়া হয়েছে, যা সঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি বলে মনে করছেন অনেকে। রাজশাহীতে সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ শাহীন শওকত খালেকের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ থাকার পরও সাংগঠনিক সম্পাদক করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাধিক নেতা। অনেক জাতীয় নেতার সন্তানরাও গুরুত্বপূর্ণ পদ পেলেও বঞ্চিত হয়েছেন স্থায়ী কমিটির প্রবীণ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে ড. খন্দকার মারুফ হোসেন। তাকে কোনো পদে রাখা হয়নি।  

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সদ্য সাবেক যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘দলের একজন কর্মী হিসেবে আমি কাজ করে গেছি, কর্মী হিসেবে আগামী দিনেও আমি কাজ চালিয়ে যাব। দলের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমার কোনো মন্তব্য নেই।’

বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা খবরের কাগজকে বলেন, যারা পদ পাননি তারা তো হতাশ হয়েছেনই, যারা পদোন্নতি পেয়েছেন ক্ষেত্রবিশেষে তারাও অখুশি। কারণ কোথাও কোথাও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, শ্রম ও দলের প্রতি অবদান মাথায় না রেখে বরং অপেক্ষাকৃত জুনিয়রকে ওপরে রাখা হয়েছে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দলকে পুনর্গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হলেই একটা গোষ্ঠী নিজেদের ম্যান ‘সেট’ করতে তৎপর হয়ে ওঠেন। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। এবারের এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় হাওয়া ভবনসংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী একাধিক নেতা, দপ্তরঘেঁষা একটি অংশ প্রভাব রেখেছে।