‘আমি যদি ইয়াবার গডফাদার হই, তাহলে এই মকছুদ আমারও গডফাদার।’ ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে আলোচিত এই মন্তব্য করেছিলেন কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি, যিনি কি না ইয়াবার গডফাদার হিসেবে পরিচিত। মহেশখালী-কুতুবদিয়ার ইয়াবা কারবারি মকছুদ মিয়া ওই বছর মহেশখালী পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু তখন আওয়ামী লীগের নেতারা প্রকাশ্যে তার প্রার্থিতার বিরোধিতা করেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রিপোর্টও ছিল মকছুদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তারপরও মেয়র পদে নৌকার মনোনয়ন পান মকছুদ মিয়া এবং মেয়র নির্বাচিত হন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বদি ওই মন্তব্য করেন।
জানা যায়, দলে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের পরও মকছুদ মিয়াকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিস্মিত হয়েছিলেন বদিও। ওই সময় বদির বিরুদ্ধেও সারা দেশে সমালোচনার ঝড় বইছিল। ইয়াবার কারবার করায় গণমাধ্যমের কল্যাণে তিনি তখন ‘ইয়াবা বদি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তখন মকছুদের বিষয়ে কক্সবাজার ও টেকনাফের একাধিক দলীয় সভা ও সামাজিক অনুষ্ঠান শেষে আড্ডায় নিজস্ব নেতা-কর্মীদের সামনে বদি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘সবাই আমাকে দোষ দেয়। দলও এমপি মনোনয়ন দেয়নি! অথচ, ইয়াবা কারবারি ও স্বাধীনতাবিরোধীর পুত্র মকছুদ নৌকার মনোনয়ন পায়!
কক্সবাজার ঘুরে জানা যায়, বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ সাবেক এই মেয়রকে লালন করতেন কক্সবাজার-২ আসনের সাবেক এমপি আশেক উল্লাহ রফিক। নৌকার মনোনয়নে এমপি হলেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব ছিল আশেকের। পারিবারিকভাবে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা থাকলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা ছিল না তার। তবে কক্সবাজারে নিজের একক বলয় তৈরিতে মরিয়া ছিলেন আশেক। সেই লক্ষ্যে দলীয় নেতা-কর্মীদের দূরে রেখে চিহ্নিত মাদক কারবারি মকছুদকে কাছে টানেন সাবেক এই এমপি।
আশেকের তত্ত্বাবধানে মকছুদ নৌকার মনোনয়ন পেয়ে মহেশখালী উপজেলার মেয়র হয়েছেন। বিপুল অর্থের বিনিময়ে উপজেলা আওয়ামী লীগে শীর্ষ পদের ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন আশেক। সভাপতি ও জেলার সদস্য পদটি মকছুদকে দেওয়া হয়। পর্যটননগরী কক্সবাজারে সব ধরনের মাদক সরবরাহ করতেন মকছুদ মিয়া ও তার সহযোগীরা। মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ায় প্রশাসনও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তার বিরুদ্ধে একাধিকবার প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উঠলেও অদৃশ্য কারণে তা থেমে যেত।
আওয়ামী লীগ সরকারের ‘মাদকের বিরুদ্ধে’ শুদ্ধি অভিযান চলাকালে কক্সবাজারবাসী মকছুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানালেও কোনো লাভ হয়নি। বিপুল পরিমাণ অর্থ ঘুষ দিয়ে সবাইকে ম্যানেজ করেন সাবেক এমপি আশেক। সে সময় মকছুদকে বাঁচাতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে তাকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করিয়েছেন আশেক। সরকারের তিন গোয়েন্দা সংস্থা মকছুদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার বিষয়ে রিপোর্ট দিলেও মেয়র পদের মনোনয়ন তিনিই পেয়েছেন। এর পেছনের কলকাঠি নেড়েছেন আশেক।
বিগত সরকারের সময় মহেশখালী-কুতুবদিয়ায় তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর, এলএনজি টার্মিনালসহ বেশ কিছু মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়। এই সব প্রকল্পে কাজ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে পার্সেন্টেজের নামে বিপুল টাকা চাঁদাবাজি করেন আশেক উল্লাহ রফিক। তা ছাড়া এসব প্রকল্পের কাঁচামালও সরবরাহ করতেন আশেকের সিন্ডিকেটের লোকেরা। কেউ তার কাজে বাধা দিলে মেয়র মকছুদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেন আশেক। স্থানীয়রা জানান, সব অপকর্ম ভাগেযোগে করতেন আশেক ও মকছুদ।
আশেকের অর্থের যোগানদাতা ছিলেন মকছুদ
সাবেক এমপি আশেক উল্লাহ রফিকের অর্থের যোগানদাতা ছিলেন মকছুদ। মুক্তিযোদ্ধা ও স্কুলশিক্ষকসহ একাধিক ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনায় সমালোচনার মধ্যে পড়লেও আশেকের বলয়ে থাকায় মকছুদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। এসবের বিনিময়ে মকছুদও আশেকের সব আবদার রাখতেন। সন্ধ্যা হলেই মদের আড্ডায় মগ্ন থাকতেন আশেক। আর তার জন্য দেশি-বিদেশি সব মাদকের ব্যবস্থা করতেন মকছুদ। কক্সবাজারে আশেকের সব দলীয় সভা-সমাবেশের অর্থদাতা ছিলেন মকছুদ।
দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়; দ্বাদশ নির্বাচনে আশেকের নগদ টাকা বেড়েছে একাদশ নির্বাচনের সময়ের চেয়ে সাতগুণ। নগদ টাকা বেড়েছে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৪৩ হাজার ৯১৩ টাকা। তবে তার স্ত্রীর নামে কোনো সম্পদ নেই। আছে শুধু ৩০ ভরি স্বর্ণ। তার বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন কৃষি, ব্যবসা, শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত, সংসদ সদস্য হিসেবে প্রাপ্ত সম্মানীসহ ৪৭ লাখ ৭২ হাজার ৩৩২টাকা।
একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় তার সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪ কোটি ৮৪ লাখ ৩৬ হাজার ২০৬ টাকা। পাঁচ বছর পর দ্বাদশে নির্বাচনে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬ কোটি ৭০ লাখ ৭৯ হাজার ১১৯ টাকায়। এই পাঁচ বছরে স্ত্রীর কাছে থাকা ৩০ ভরি স্বর্ণ অপরিবর্তিত থাকে।
দশম সংসদ নির্বাচনের হলফনামা অনুযায়ী, আশেকের কৃষিজমি ছিল ৩ দশমিক ৩৩ একর এবং অকৃষি জমি ছিল ৩ দশমিক ৩৯ একর। দ্বাদশ নির্বাচনে তার কৃষিজমির পরিমাণ বেড়ে হয় ১৬ দশমিক ১৩ একর এবং অকৃষি জমি আগের মতোই। দশম নির্বাচনে তিনি তার দালানের মূল্য দেখিয়েছিলেন ১৫ লাখ ৬০ হাজার। দ্বাদশ নির্বাচনে দালানের মূল্য দেখিয়েছেন ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
যেভাবে আওয়ামী লীগ নেতা হলেন মকছুদ
মকছুদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। বরং তারা আওয়ামীবিরোধী হিসেবে পরিচিত। অতি ‘চতুর’ মকছুদ নিজের পরিবারকে স্বাধীনতাবিরোধী তকমা থেকে বাঁচাতে বিপুল টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়ান। মূলত সাবেক এমপি আশেক উল্লাহর হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন মকছুদ মিয়া। আশেকের কল্যাণে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলার সদস্য পদ তার দখলে আসে। তার অবৈধ পথে উপার্জিত টাকা আওয়ামী লীগের বড় নেতাদের পেছনে ব্যয় করতেন মকছুদ। সচিবালয় ও আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে গেলে দুই হাতে টাকা বকশিশ দেওয়ার নজিরও আছে তার।
মকছুদের পারিবারিক ব্যবসা ইয়াবা
ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মকছুদের পরিবার। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা ইয়াবার ব্যবসা আরও সম্প্রসারণ করেন। আর দলীয় নেতা-কর্মীরা তার এসব অপকর্মের প্রতিবাদ করলে নিজের লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে এলাকাছাড়া করতেন তিনি। সম্ভব না হলে ইয়াবা দিয়ে পুলিশে দিতেন মকছুদ। এসব অপকর্মের সব ধরনের সমর্থন পেতেন আশেক উল্লাহ রফিকের কাছ থেকে।
পুলিশের খাতায় মকছুদের চাচাতো ভাই সালাহউদ্দিন জেলার অন্যতম শীর্ষ ইয়াবা কারবারি। তার রয়েছে মায়ানমারকেন্দ্রিক বিশাল নেটওয়ার্ক। অতীতে ইয়াবা নিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জামিনে বেরিয়ে ফের ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়েন। তার স্ত্রী জোসনাও ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এ ছাড়া মকছুদের আরেক চাচাতো ভাই পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মিশকাত সিকদারও ঢাকা থেকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন।
মকছুদের ছেলে মিরাজ উদ্দিন নিশানও ইয়াবা ব্যবসা থেকে বের হতে পারেননি। ২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানী ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের বিলাসবহুল বাড়ি থেকে ইয়াবা বিক্রির ৭ কোটি ২৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ও ২ লাখ ৭ হাজার ১০০ পিস ইয়াবাসহ সিন্ডিকেটের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। গ্রেপ্তারদের মধ্যে মেয়র মকছুদের ছেলে মিরাজ উদ্দিন নিশান ও ভায়রার ছেলে মুমিনুল আলম ছিলেন। দুই খালাতো ভাই মরণ নেশা ইয়াবার ব্যবসা চালাতেন। ইয়াবাকাণ্ডে ছেলে ধরা পড়ার সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে খবরের কাগজগুলো যাতে দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীতে পৌঁছতে না পারে সে জন্য বাজার থেকে পত্রিকাগুলো সরিয়ে ফেলেন মকছুদ।
২০২১ সালের মার্চে মহেশখালীতে মকছুদের কার্যালয়ের পাশে গোলাগুলির খবর পেলে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। কার্যালয়ের পাশে মকছুদের চাচাতো ভাই সালাহ উদ্দিনের গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে ৬ লাখ ২২ হাজার ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করে পুলিশ। ইয়াবা ব্যবসা নিয়ে মকছুদ ও তার চাচতো ভাই সালাহ উদ্দিনের বিরোধ এখনও চলমান রয়েছে।
মহেশখালীতে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মকছুদ ও তার পূর্বপুরুষদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকত। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে মহেশখালীতে চিংড়িঘেরের মালিকানা নিয়ে বিরোধের জের ধরে মেয়র মকছুদ নিজে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কক্সবাজারের বীর মুক্তিযোদ্ধা আমজাদ হোসেনের মাথায় আঘাত করেন। ভুক্তভোগী আমজাদ হোসেনের করা হত্যাচেষ্টার মামলায় মেয়র মকছুদ মিয়াকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। আশেকের ক্ষমতার প্রভাবে কারাগারে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই জামিনে ছাড়া পান মকছুদ।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে আশেক ও মকছুদ পলাতক রয়েছেন। তবে থেমে নেই তাদের অবৈধ ব্যবসা। বিভিন্ন অনুসারী ও মাদক কারবারিদের দিয়ে এসব অবৈধ ব্যবসা চলমান রয়েছে।