ঢাকা ৮ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
মানিকগঞ্জে মারিয়া হত্যা মামলায় প্রধান শিক্ষকসহ গ্রেপ্তার ৮ গাজীপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের ৩৪ নেতাকর্মী আটক সাতকানিয়ায় যুবলীগ নেতা হাসান মাহমুদ গ্রেপ্তার নোয়াখালীতে আসল র‍্যাবের হাতে নকল র‍্যাব সদস্য গ্রেপ্তার সারাদেশে ভূমিকম্প অনুভূত সুরে সুরে শেষ হলো বিশ্ব সংগীত দিবসের বর্ণিল আয়োজন টাইব্রেকারে জামালপুরকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন মাগুরা প্রকৃত মুমিন নিজেকে কীভাবে সামলে নেয়? সহিংসতা এড়াতে গোপালগঞ্জেও পৌঁছেছে সেনাবাহিনী ‘মসজিদ-মাদরাসায় রাজনৈতিক সভা ও জামায়াত রাজনীতি নিষিদ্ধে সংসদে আইন পাসের দাবি’ রাম মূর্তি নির্মাণ ও হিন্দুত্ববাদী তৎপরতার প্রতিবাদে ইসলামপুরে বিক্ষোভ মিছিল নাশকতা ঠেকাতে গাজীপুরেও সেনা মোতায়েনের নির্দেশ চবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের মোটরসাইকেল শোডাউন ফরিদপুরে আ. লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সেনাবাহিনী মোতায়েন শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সে মাত্র ৫ দিনে মিলল প্রায় ১৮ লাখ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার ঈশ্বরদীতে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা আলিয়ার শুটিংয়ে একজনের মৃত্যু ফুলবাড়ীতে বাংলা মদের কারখানায় পুলিশের অভিযান সমুদ্রে জ্বালানিসম্পদ নিশ্চিত, উত্তোলনে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার: নৌপরিবহনমন্ত্রী আরমান-মুক্তির মনোনয়নপত্র জমা দিলেন বাপ্পারাজ ডিভোর্স হতে পারে স্বামী-স্ত্রীর, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে নয়: এমপি সিরাজ জেন্ডার বাজেট বাড়লেও নারীর নিরাপত্তা-ক্ষমতায়ন নিয়ে প্রশ্ন অধিকারকর্মীদের সংসদ ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল, সংসদে নোটিশ উত্থাপন জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও দুর্নীতির মূলোৎপাটন অপরিহার্য: সংস্কৃতিমন্ত্রী সিরাজগঞ্জে আ. লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল শিশুর বিকাশে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন: শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী রাজশাহীতে ছেলের লাঠির আঘাতে বাবার মৃত্যু আসন্ন আলিম পরীক্ষা নিয়ে মাদরাসা বোর্ডের নির্দেশনা নওগাঁয় চীনা পর্যটককে হেনস্তার অভিযোগে টিকটকার গ্রেপ্তার কুমিল্লা বোর্ডের ৮ কলেজে নেই এইচএসসি পরীক্ষার্থী!

ইসিতে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ-প্রক্রিয়া!

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৫, ০১:০০ পিএম
ইসিতে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ-প্রক্রিয়া!
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

চাকরির পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও পাস, অটোপাস এবং অভিজ্ঞ জনবলকে স্থায়ী না করে নতুন নিয়োগের নামে আর্থিক বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে। আর এ ধরনের অনিয়মের ফলে দীর্ঘ ১৭ বছর প্রতিষ্ঠানটিতে মেধা-শ্রম দিয়েও বৈষম্যের শিকার ডেটা এন্ট্রি অপারেটররা। আইডিইএ প্রকল্পে চুক্তির ভিত্তিতে তারা কর্মরত রয়েছেন। 

তাদের অভিযোগ, সম্প্রতি দায়িত্বপ্রাপ্ত ইসির নতুন কমিশনও হাঁটছে পূর্বসূরিদের পথেই। অভিজ্ঞ ওই সব অপারেটরের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ বা তাদের দাবির প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ করছেন না। আগামী ৩১ জানুয়ারি ৪৬৮টি ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পদে লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করেছে এই কমিশন। আর পরীক্ষা আয়োজনে কমিশনকে সাত-পাঁচ বুঝিয়েছেন বিভিন্ন কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িত অসাধু কর্মকর্তারা। 

ইসির আইডিইএ-২ প্রকল্প কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের নেতারা এবং বিভিন্ন সূত্র খবরের কাগজকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। অভিযোগ উঠেছে, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ১৮ হাজার ৮১৫ জনের সবাইকে কীভাবে পাস দেখানো হলো? 

উল্লেখ্য, সরকারিভাবে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরুর সময় প্রকল্পে ১ হাজার ১৩০ জন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর কর্মরত ছিলেন। আর পরীক্ষায় আবেদনকারী ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জনের মধ্যে পরীক্ষা না দেওয়া সত্ত্বেও আদালতের আদেশে পাস দেখানো হয় কর্মরত ৭৪৭ অপারেটরকে। আর প্রকল্পে কর্মরত বাকিরা কর্তৃপক্ষের হুমকি-ধমকির কারণে রিটে অংশ নিতে পারেননি। একই পদে কর্মরত থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায় এসব দক্ষ কর্মী বৈষম্যের শিকার।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ-বাণিজ্যের লক্ষ্যে আগারগাঁওয়ের তালতলায় অবৈধভাবে কোচিং সেন্টার, মেস ব্যবসা পরিচালনা ও শিক্ষকতা করেন। তারা অনেক আবেদনকারীকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার চুক্তিতে তাদের কাছ থেকে অগ্রিম লাখ লাখ টাকা নিয়েছেন। একই সঙ্গে কোচিং সেন্টারের কিছু ছাত্র এনে কৃত্রিম আন্দোলন করিয়ে স্থবির নিয়োগ প্রক্রিয়া সচল করতে নির্বাচন কমিশনে চাপ প্রয়োগ করেন। এই সিন্ডিকেটে জড়িত রয়েছেন ইসি সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন অন্তত ৮ থেকে ১০ কর্মকর্তা; যাদের নামে-বেনামে গাড়িসহ ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট-প্লটও পাওয়া যাবে।

ইসির আইডিইএ-২ প্রকল্পে বর্তমানে কাজ করছেন ২২ শর বেশি ডেটা এন্ট্রি অপারেটর। চাকরি সরকারি করা না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করে তারা বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আমরা অপেক্ষার প্রহর গুনছি। সরকার বলে কমিশন চাইলে হবে, কমিশন বলে আদালত চাইলে হবে, আদালত বলে দপ্তর বললেই হবে- এমন হয়রানি হতে হতে আমরা ক্লান্ত। স্থায়ীকরণের আশ্বাসে আমরা সরকারি চাকরির বয়স হারিয়েছি! এরপর কোথাও তো চাকরি পাব না। কীভাবে চলবে আমাদের পরিবার?’ এ বিষয়ে বিগত কমিশনগুলো আশার বাণী শুনিয়েছে। এবারের কমিশনও পূর্বসূরিদের পথেই হাঁটছে। আগামী ৩১ জানুয়ারি ৪৬৮টি ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পদে তারা লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করেছে। এটা আমাদের প্রতি চরম বৈষম্য ও অবিচার। আমাদের বাদ দেওয়ার অপতৎপরতা। আমাদের দেওয়া আশ্বাস পূরণ না করে নতুন কর্মী নিয়োগের যে প্রক্রিয়া চলছে; তার উদ্দেশ্য অনৈতিক নিয়োগ-বাণিজ্য। অবিলম্বে এই নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করা না হলে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কর্মরত কর্মীরা। 

এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের জনবল ব্যবস্থাপনা শাখার উপসচিব খোরশেদ আলম বলেন, ‘২০১৯ সালে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু আইডিইএ প্রকল্পে চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োজিত কর্মীদের রিটের কারণে ওই নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালতের রায়ে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পদে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।’ আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় নিয়োগ কমিটির সিদ্ধান্তে লিখিত পরীক্ষার আগে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া ৭৪৭ জন কীভাবে পাস করল- প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তারা আবেদন করেন। পরে পরীক্ষা ছাড়াই তাদের সরাসরি লিখিত পরীক্ষাও অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।’ অথচ নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, ডেটা এন্ট্রি অপারেটরদের সরাসরি লিখিত পরীক্ষা হয় এবং পরবর্তী সময় মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। ইসির এই নিয়োগে আবেদনকারী ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জনের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেন ১৮ হাজার ৮১৫ জন। পরে সবাইকে লিখিত পরীক্ষার সুযোগ দিয়ে ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

নির্বাচন কমিশনের প্রশাসন ও অর্থ শাখার যুগ্ম সচিব মো. মঈন উদ্দীন খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই নিয়োগ নিয়ে যা হয়েছে তা বিধিবিধানের আলোকেই হয়েছে। আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কিছুই করা হয়নি। আইডিইএ প্রকল্পের আউটসোর্সিংয়ের ডেটা এন্ট্রি অপারেটরদের বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা মানা হয়েছে। পরীক্ষায় সবাই কীভাবে পাস করল- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটার বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। এখানে নিশ্চয়ই কোনো বিষয় আছে। আমি ফাইল না দেখে কিছু বলতে পারব না। বিধির বাইরে গিয়ে কমিটি কিছু করতে পারে না। আইনের বাইরে কমিটি কিছু করতে গেলে সেটা বাতিল হয়ে যায়।’

নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, ‘নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষায় তো ফেল নেই এটা অ্যালিমিনেশন করার বিষয়। যখন অনেক পরীক্ষার্থী থাকে, তখন তাদের ধাপে ধাপে পরীক্ষা দিয়ে স্ক্রিনিং করা হয়। এখন যদি দেখি আমাদের ধারণার তুলনায় কম পরীক্ষার্থী অংশ নেন তখন আমরা সবাইকে সমান সুযোগ দেই। এখনো তো কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। আমাদের ভুল হতে পারে কিন্তু আমরা আলটিমেট নিয়োগ বিধিমালার বাইরে যেতে পারব না।’

হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুর পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ১০:৩৩ এএম
হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুর পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

২৩ বছরেও পূর্ণতা পায়নি চামড়া শিল্পনগরী স্থানান্তর প্রক্রিয়া। ২০০৩ সালে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে এই শিল্পটি স্থানান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়। তারপর নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সাভারের হেমায়েতপুরে এই শিল্পটি স্থানান্তর করার কাজ শেষ হয় ২০২১ সালে। তবে আজও সেই শিল্পনগরী অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কেনা গাড়িগুলো পাঁচ বছর পরও পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়নি।

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ১৫৫টি চামড়া প্রক্রিয়াকরণ কারখানাকে পরিবেশসম্মত স্থানে স্থানান্তরের কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০০৫ সালে। কিন্তু ১০ বার সংশোধন করে সময় বাড়িয়ে তা শেষ করা হয়েছে ২০২১ সালের জুনে। সময় বেশি লেগেছে সাড়ে ১৫ বছর।

‘চামড়া শিল্পনগরী’ স্থানান্তরে প্রাথামিকভাবে খরচ নির্ধারণ করা হয় ১৭৬ কোটি টাকা। পরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ৯৩৮ কোটি টাকা। চামড়াশিল্প থেকে নির্গত বর্জ্য পরিশোধনের জন্য একটি কমন ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা সিইটিপি স্থাপনসহ সব কিছু করা হয়েছে সাভার ও কেরানীগঞ্জ উপজেলার ৬০০ বিঘা জমিতে।

তার পরও পরিবেশগত সনদ পাচ্ছেন না ট্যানারি শিল্পমালিকরা। বিক্রেতারা পাচ্ছেন না চামড়ার দাম। হেমায়েতপুর ট্যানারিশিল্প এলাকা থেকে নির্গত বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে পড়ছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে। 

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ট্যানারি শিল্পনগরী প্রকল্পটি প্রণয়ন ‘আগাগোড়া’ ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তাই একবার নয়, দুবার নয়, ১০ বার প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়েছে। প্রকল্প খরচও ১৭৬ কোটি থেকে বেড়ে ৯৩৮ কোটি টাকায় ঠেকেছে, বেড়েছে ৪৩৪ শতাংশ। সময় বেড়েছে ৬১৬ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ করে ৬০০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ৩২ কোটি টাকায় ২ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার জমি উন্নয়ন, ৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা খরচ করে ৫ তলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ৪৭৭ কোটি টাকা খরচ করে এসটিপিসহ কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ করা হয়েছে ৫১ বিঘা জমিতে। চারটি মডিউলসংবলিত এই সিইটিপি নির্মাণে একবার প্রকল্পটি সংশোধন করে ৩ বছর সময় বাড়ানো হয়।

তবে নির্মাণ সত্ত্বেও তা কার্যকর করা হয়নি। প্রকল্পটির কাজের গতি ছিল খুবই ধীর। শিল্পনগরীর অগ্নিনির্বাপন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ১১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা খরচ করে নির্মাণ করা হয় সীমানা প্রাচীরসহ ফায়ার স্টেশন। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সাড়ে ১২ লাখ টাকায় পুলিশ স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রায় ৬ কোটি টাকা, শিল্পনগরীর বর্জ্যপানি দ্রুত নিষ্কাশনে প্রায় ৩ কোটি টাকা খরচ করে ড্রেন নির্মাণ করা হয়। ২৭ কোটি টাকা খরচ করে পানি সরবরাহ পাইপলাইন, প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার বিদ্যুৎ লাইন, ১ কোটি ২৯ লাখ টাকার সড়ক বাতি, ৮ কোটি টাকা খরচ করে ডাম্পিং ইয়ার্ড, ২টি গভীর নলকূপ, ৮টি সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। এভাবে শতভাগ কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে ৯৩৮ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্ক ব্যয়ের পরও সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়নি প্রকল্পটি।

সাবেক প্রকল্প পরিচালক ব্যবহার করছেন জিপ গাড়ি

প্রতিবেদন সূত্রে (আইএমইডি) জানা গেছে, হেমায়েতপুরের হরিণধরায় চামড়া শিল্পনগরীর শতভাগ অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর হয়নি। রক্ষণাবেক্ষণেও সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে সিইটিপির কার্যক্ষমতা, ড্রেনেজব্যবস্থা ও বর্জ্যব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায়নি। স্থাপিত সিইটিপির ধারণক্ষমতা দিনে মাত্র ২৫ হাজার ঘনমিটার, যা বর্তমানে উৎপন্ন বর্জ্যপানির পরিমাণের তুলনায় অনেক কম। ফলে সিইটিপি প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে না। এদিকে কঠিন বর্জ্য অন্য কোনো শিল্পের উপজাত হিসেবে ব্যবহার না হওয়ায় খোলা জমিতে জমা করে রাখা হচ্ছে, এর ফলে ঘটছে গুরুতর পরিবেশ দূষণ।

শিল্পনগরীতে ১৬২টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে সেগুলোর সব কটিতে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়নি। প্রকল্পের জন্য ২টি জিপ গাড়ি ও ৩টি মাইক্রোবাস কেনা হয়। প্রকল্প শেষ হওয়ার ৫ বছর পরও তা পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়নি। সাবেক প্রকল্প পরিচালক যতীন্দ্র নাথ পাল একটি জিপ গাড়ি ব্যবহার করছেন। একটি মাইক্রোবাস সাভার বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরীতে ব্যবহার হচ্ছে। প্রকল্পটি ৫ বছর আগে শেষ হলেও এখনো ৪৭টি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি।

এলডব্লিউজির সনদ না পাওয়ার কারণ

শিল্পনগরীতে নির্মিত সিইটিপি প্রয়োজনের তুলনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ট্যানারির সংখ্যা ও বর্জ্যের পরিমাণের তুলনায় এর কার্যকারিকতা ও অপারেশনাল দক্ষতা পর্যাপ্ত নয়। এর ফলে নিরবচ্ছিন্নভাবে বর্জ্য পরিশোধন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আবার অনেক ট্যানারির নিজস্ব ইটিপি নেই। প্রকল্প শেষ হলেও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি আজ পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশও পূর্ণাঙ্গ পরিবেশসম্মত হয়নি বলে মতপ্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

অপরদিকে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদের জন্য উপযুক্ত হতে কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড, বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড, টোটাল ডিজলভড সলিডস (টিডিএস) মান বজায় রাখা আবশ্যক। কিন্তু এসব কিছু পূরণ হচ্ছে না। 

উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও রপ্তানি কমেছে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্যানারির মালিকদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫২ শতাংশ স্নাতক পাস। সাভারে নতুন প্লটে পরিকল্পিত ট্যানারি স্থানান্তরের পর কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। তবে রপ্তানি সক্ষমতা কমে গেছে। শিল্পনগরীতে এখনো ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু হয়নি। ফলে বিদেশি ক্রেতা ও স্থানীয় উদ্যোক্তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন না।

অবকাঠামো উন্নত হলেও শ্রমিকরা এখনো বঞ্চিত

৪৯ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন, চামড়া শিল্পনগরীর কর্মপরিবেশ কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবে ২ শতাংশ জানান, পরিস্থিতি প্রায় একই রকম আছে। ৭০ শতাংশ শ্রমিক জানান, আগের তুলনায় পরিচ্ছন্নতা কর্মকাণ্ড বেড়েছে। কাজের সময় দুর্ঘটনা অর্ধেক কমেছে। তবে অবকাঠামো উন্নত হওয়ার ৬ বছর পরও ২৮ শতাংশ শ্রমিক জানান, কারখানা থেকে তাদের কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়া হয় না।

ট্যানারি কারখানায় কাজ করার সময় রাসায়নিকের গন্ধ ও বর্জ্যের সমস্যা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। আগে ৫৯ শতাংশ শ্রমিক ত্বকের রোগ, চুলকানি ও অ্যালার্জি সমস্যায় ভুগলেও সাভার ট্যানারিতে এখন ভুগছেন ৩৬ শতাংশ। ৯৪ শতাংশ শ্রমিক জানান, কারখানায় কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা মেডিকেল সুবিধা নেই। কাজের সময় দুর্ঘটনায় ক্ষতি হলেও ৪০ শতাংশ শ্রমিক জানান, ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় না।

চামড়া শিল্পনগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাঈয়ানের কাছে জানতে চাইলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়েছি বছরখানেক হলো। প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৫ বছর আগে। কাজেই সেই সময়ের ঘটনা বলা সম্ভব না।’

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় পর বাস্তবায়িত হলেও এর ফল পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবেশের অবনতির কারণে এলডব্লিউজির সনদ পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পরও চামড়ার দাম পাওয়া যাচ্ছে না। রপ্তানি কমে যাচ্ছে।

বুড়িগঙ্গার মতোই ধলেশ্বরী নদী দূষণ হচ্ছে। তাই রপ্তানির বাজার ধরতে এটাকে পরিবেশবান্ধব করতে হবে। কীভাবে করতে হবে, সরকারকে সেটা ভাবতে হবে। আইএমইডির মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো প্রকল্প দীর্ঘ না হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে।’

মালেশিয়ায় শ্রমবাজার খোলার আশা আছে জটিলতাও

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৯:১১ এএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ১০:০৮ এএম
মালেশিয়ায় শ্রমবাজার খোলার আশা আছে জটিলতাও
ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই দিনের সফরে গতকাল রবিবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে পৌঁছেছেন। সেখানে আজ তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রথমে একান্ত এবং পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠকে উভয় দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হওয়ার কথা থাকলেও মূল টার্গেট থাকবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার ঘোষণা। যদিও প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে তার সম্ভাবনা কম। 

এই সফরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ফের মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু এ রকম ঘোষণা আসার ক্ষেত্রে দুই দেশেই রয়েছে অনেক জটিল ও গভীর সমস্যা। কাজেই এই সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানও করতে হবে যৌথভাবে। কারণ মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশের সরকারের ভেতরে ও বাইরের সিন্ডিকেট যেমন দায়ী, তেমনি মালয়েশিয়ার সরকারের ভেতরের ও বাইরের সিন্ডিকেটও সমানভাবে দায়ী।

এ ক্ষেত্রে একটি মজার বিষয় হচ্ছে, এই সিন্ডিকেট নির্মূলে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে জোরালো কোনো উদ্যোগও নিতে দেখা যায়নি। সিন্ডিকেট নির্মূল ও দুর্নীতি রোধে দুই দেশের যৌথ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, কিন্তু সে উদ্যোগটি অনুপস্থিত। ফলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাংলাদেশে মামলা খেয়ে মালয়েশিয়া বা অন্য দেশে অবস্থান করলেও যৌথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আবার সিন্ডিকেটের সঙ্গে মালয়েশিয়ার নাগরিক যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে এই শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ কতটা স্থায়ী হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। তবুও আশা, এই সফরে ইতিবাচক কিছু একটা হবে। 

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর খবরের কাগজকে জানান, মালয়েশিয়ার এই শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট প্রথা উভয় দেশের সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শুধু বহুরূপী প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়। এর বিরুদ্ধে সরকারি পর্যায়ে শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। না দেশে, না মালয়েশিয়ায়। সিন্ডিকেটের দুর্নীতিবাজরা নানা ভিসায় গিয়ে সে দেশে অবস্থান করলেও উভয় সরকার যৌথ পদক্ষেপ নেয়নি।

দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে এবং যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের মিটিংয়ে সংকট নিয়ে ভাসা ভাসা আলোচনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ আজও দেখা যায়নি। কাজেই দুর্নীতিবাজদের নির্মূল না করতে পারলে যেনতেনভাবে এই শ্রমবাজারটি খুললেও ফের বন্ধ হয়ে যাবে। এই শ্রমবাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শক্ত পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট ফের তৈরি হবে এবং বাজারটি বন্ধ হয়ে যাবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নানা কারণে এই শ্রমবাজার প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে। শ্রমিক নিয়োগে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ব্যয়, ভিসা জটিলতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়ম নিয়ে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যে মামলা আছে, সেগুলো প্রত্যাহারসহ বহু বিতর্ক রয়েছে এখানে। এই শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতারণার হাজারও ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শ্রম সংস্থাগুলোর চাপে আছে মালয়েশিয়া সরকার।’

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব চাপ উত্তরণে উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে শ্রমবাজারটি খোলার ক্ষেত্রে আরও দেরি হতে পারে। তবে আজ দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠক থেকে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, শ্রমিক নিয়োগে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি, তাই নতুন করে এ বিষয়ে কোনো চুক্তি হবে না। কিন্তু সফরে শ্রমবাজার পুনরায় পুরোপুরি সচল করা, নতুন কর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধতা দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের প্রায় আট লাখ কর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে তিন লাখ রয়েছেন অনিয়মিত। এদের বৈধকরণের বিষয়টিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তোলা হবে। যদিও এর আগে বিভিন্ন সময় বিদেশি কর্মীদের বৈধকরণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে দেশটি বিদেশি কর্মীদের যতবারই বৈধকরণ করেছে, ততবারই নতুন করে ট্যুরিস্ট ভিসায় বা নদীপথে অবৈধ উপায়ে বিদেশি কর্মীরা ঢুকে পড়ে অধিক সংখ্যায় অবৈধ হয়েছেন। এ কারণে ফের আনুষ্ঠানিক বৈধকরণের ঘোষণা দেবে কি না, সেটি সময় বলে দেবে।

এদিকে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার নেতারা মালয়েশিয়া সফরের আগে সিন্ডিকেট বন্ধে প্রধানমন্ত্রীকে একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। সংগঠনের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফকরুল ইসলাম জানান, অতীতের সিন্ডিকেট ব্যবস্থার কারণে মালয়েশিয়ায় কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

শত শত বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দুর্নীতি, অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বারবার সংকট ও বন্ধের মুখে পড়েছে। তিনি শ্রমবাজারটি সিন্ডিকেটমুক্ত করতে সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, নেপালসহ ১৪টি দেশ সিন্ডিকেটমুক্ত উপায়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠায়। নেপালেও সিন্ডিকেট করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু সে দেশের সরকার সেটি হতে দেয়নি। তাই শুধু বাংলাদেশি কর্মী পাঠাতেই কেন সিন্ডিকেট থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সফর-পরবর্তী বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সফরে অনেক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হলেও তার বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশিত ছিল না। তাই এবার শুধু চুক্তি নয়, বরং এফটিএ চূড়ান্তকরণ, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা, বিনিয়োগ সহজীকরণ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানি বাজার, নতুন বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার এই সময়ে এই সফরকে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কৌশল ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। 

বর্তমানে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ। দেশটির বিনিয়োগ রয়েছে জ্বালানি, অবকাঠামো, পরিবহন, লজিস্টিকস এবং শিল্প খাতে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমি-কন্ডাক্টর, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, লজিস্টিকস, বন্দর উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং উৎপাদনশীল শিল্পে নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আসতে পারে। বাংলাদেশের ২০ কোটির বিশাল বাজার, তরুণ কর্মশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

এ ছাড়া এই সফর আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে। কারণ মালয়েশিয়া আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানের অন্যতম সদস্যরাষ্ট্র। বাংলাদেশও আসিয়ানের সদস্য হতে চায়, এ জন্য দেশটির সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়াতেও রয়েছে দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। বাংলাদেশে আছে ১৩ লাখ। এসব রোহিঙ্গা মায়ানমারে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার মাধ্যমে আসিয়ানকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ আছে। এ নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনাও হবে বলে কূটনীতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। 

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুতদের নতুন চাকরি মিলছে না

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৮:০২ এএম
ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুতদের নতুন চাকরি মিলছে না
ইসলামী ব্যাংক

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে অধিকাংশের নতুন করে চাকরি পাওয়ার বয়স চলে গেছে। কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরির বয়স থাকলেও তারা কোথাও সহজে চাকরি পাচ্ছেন না। ইসলামী ব্যাংক থেকে ছাঁটাইয়ের বিষয়টি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে। যে কারণে অনেক দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা নতুন করে চাকরি পাচ্ছেন না। 

  • অধিকাংশের চাকরির বয়স চলে গেছে
  • যাদের বয়স আছে তাদের জন্য ‘টার্মিনেটেড’ শব্দটি নতুন চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে
  • পরিবারগুলোতে আর্থিক অনটন, দাম্পত্য কলহ, মানসিক বিষণ্ণতা এবং সামাজিক মর্যাদাহানির এক ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে কয়েক দফায় ব্যাপক জনবল ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটে। যথাযথ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ঢালাওভাবে চাকরিচ্যুত করার কারণে কর্মকর্তাদের জীবনে এক চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। অনেকের বয়স বেশি হওয়ায় যেমন নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ মিলছে না, তেমনই সামাজিক অপবাদ ও ‘ট্যাগিং’য়ের কারণে অন্য কোথাও দাঁড়ানোর পথ বন্ধ হয়ে গেছে। একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য জানা গেছে। 

‎একাধিক চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের এখনো চাকরির বয়স রয়েছে তারাও চরম বিপাকে আছেন। কোথাও আবেদন করে সাড়া পাচ্ছেন না। তাদের আবেদনপত্রের সঙ্গে যখন চাকরিচ্যুতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়, তখন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। এখানে তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এ কারণে অনেক দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা নতুন করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেও সাড়া পাচ্ছেন না। 

ভুক্তভোগীরা জানান, আকস্মিক এই ছাঁটাইয়ে শুধু তাদের রুটি-রুজির পথ বন্ধ হয়েছে তা নয়, বরং বয়সজনিত সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে তাদের পরিবারগুলোতে আর্থিক অনটন, কলহ, মানসিক বিষণ্ণতা এবং সামাজিক মর্যাদাহানির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

তারা জানান, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের পেশাগত জীবনে একবার কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার ঘটনা পরবর্তী সময়ে তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাংকটি প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে টার্মিনেট করেছে। কিন্তু টার্মিনেশন লেটারে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করেনি, যা তাদের পরবর্তী চাকরি পেতে বড় ধরনের জটিলতায় ফেলে দিয়েছে। এ কারণে ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরি হারানো কিছুসংখ্যক ব্যক্তির এখনো চাকরির বয়স থাকা সত্ত্বেও তারা নতুন করে চাকরি পাচ্ছেন না। যখনই নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান জানে আবেদনকারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তখন তারা সন্দেহের চোখে দেখে।

‎ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত সিনিয়র অফিসার সৈয়দ মোহাম্মদ ফখরুল আবেদীন (৩৪) খবরের কাগজকে বলেন, “পরীক্ষা দিয়ে মেধার জোরে চাকরি পেয়েছিলাম, অথচ আজ চোরের অপবাদ নিয়ে সমাজে মুখ লুকাতে হচ্ছে। ‎২০১৭ সালের পর নিয়োগ পেয়েছি বলেই ধরে নেওয়া হলো আমি কোনো এক বিশেষ গ্রুপের লোক। অথচ আমি শতভাগ নিয়ম মেনে, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করে চাকরিতে ঢুকেছিলাম। বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে আমার সংসার। বয়স ৩৪ বছর হয়ে গেছে, এই বয়সে নতুন কোনো ব্যাংক বা করপোরেট প্রতিষ্ঠান আর আমাকে ইন্টারভিউতেই ডাকছে না। অনেকে তো মুখ ফুটে বলেই দেয়–‘আপনারা তো অমুক আমলের লোক, আপনাদের চাকরি দিলে আমাদের রিস্ক।’ ধারদেনা করে দিন চলছে, নিজের সম্মানটুকু হারিয়ে এখন পুরোপুরি সামাজিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছি।”

আরেক ভুক্তভোগী মো. নওশাদ জামান (৩৯) জানান, পরিবারে যে ব্যক্তি একসময় প্রধান ছিল, সে আজ সবার বোঝা। তিনি বলেন, “ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে দীর্ঘ ৭ বছর ৯ মাস সততার সঙ্গে পার করার পর এভাবে বিদায় নিতে হবে কখনো ভাবিনি। ৫ আগস্টের পর এক কলমের খোঁচায় আমাদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হলো। বয়স ৩৮ হওয়ায় নতুন চাকরির বাজারে আমি সম্পূর্ণ ‘অনুপযুক্ত’। সমাজ ও আত্মীয়স্বজন এমনভাবে তাকায় যেন আমরা কোনো অপরাধ করে ব্যাংক থেকে বিতাড়িত হয়েছি। নিজের জমানো টাকা যা ছিল তা-ও শেষ। পারিবারিক মূল্যবোধ ও সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের সন্তানদের স্কুলের বেতন দিতে পারছি না, এর চেয়ে বড় মানসিক নির্যাতন আর কী হতে পারে?”

চাকরিচ্যুত আরেক কর্মকর্তা জোনায়েদ মো. কামরুল হাকিম (৩৮) বলেন, ‘ব্যাংকের টার্গেট পূরণ করতে দিন-রাত এক করেছি, বিনিময়ে পেলাম বিনা নোটিশে ছাঁটাই। ‎বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ, এমবিএর ভালো রেজাল্ট নিয়ে বের হয়ে ব্যাংকে ঢুকেছিলাম। গত বছরও দিন-রাত এক করে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছি। অথচ আমাদের অপরাধ আমরা নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের বাসিন্দা এবং নির্দিষ্ট একটি সময়ে চাকরিতে ঢুকেছি। চাকরি হারিয়ে এখন ছোটখাটো ব্যবসা বা অন্য কিছু করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেখানেও ‘ব্যাংক থেকে বিতাড়িত’ তকমাটা পিছু ছাড়ছে না। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ একঘরে হয়ে পড়েছি। এই বয়সে এসে নতুন করে জীবন শুরু করার কোনো পথ খোলা নেই।’

‎সাদিব সাব্বির (৩৬) নামে আরেক চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা বলেন, “যে হাত একসময় মানুষকে সাহায্য করত, সেই হাত এখন ধার নেওয়ার জন্য পাততে হয়। ‎বয়স ৩৬ বছর। ব্যাংকিং সেক্টরে আর রি-এন্ট্রি নেওয়ার কোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ আমার নেই। হোম লোন ও পার্সোনাল লোনের কিস্তি শোধ করার জন্য এখন ব্যাংক থেকে প্রতিনিয়ত নোটিশ আসছে। যে সমাজ আমাকে একজন সফল ব্যাংকার হিসেবে সম্মান করত, সেই সমাজ এখন আমাকে এড়িয়ে চলে। বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধের খরচ চালাতে পারছি না। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর থেকে পরিবারে আমার অবস্থান এখন একজন ‘ব্যর্থ’ মানুষের মতো। এই তীব্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবমাননা সহ্য করে বেঁচে থাকা প্রতিদিনের এক জীবন্ত যুদ্ধ।”

ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় কারাবন্দি এক ম্যাজিস্ট্রেট

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৮:৪৩ এএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৯:১৬ এএম
ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় কারাবন্দি এক ম্যাজিস্ট্রেট
সাইফুল ইসলাম। ছবি: খবরের কাগজ

একসময় যিনি মাঠ প্রশাসনে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হয়ে মানুষের বিরোধ মীমাংসা করতেন, আজ নিয়তির নির্মম পরিহাসে তিনিই বন্দি চার দেয়ালের অন্ধকারে। একটি স্বাক্ষর কীভাবে একজন মানুষের সাজানো জীবনকে ওলট-পালট করে দিতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ ৩৭তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলাম।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে নরসিংদীর এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপে করা একটি স্বাক্ষরই আজ তাকে দাঁড় করিয়েছে আসামির কাঠগড়ায়। গত প্রায় ১৪ মাস ধরে তিনি কারাগারে। অথচ প্রত্যক্ষদর্শী ও সহকর্মীদের দাবি, ঘটনার সময় তিনি দুর্ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। কারাগারে যখন তিনি ন্যায়বিচারের প্রহর গুনছেন, তখন বাইরে তার চার বছরের অবুঝ সন্তান আর স্ত্রী পার করছেন চরম অনিশ্চয়তা ও একাকিত্বের এক বুকফাটা আর্তনাদ।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নরসিংদী। ১৭ জুলাই জেলখানা মোড়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য তাকে পাঠানো হয়েছিল বলে আইনজীবীর মাধ্যমে দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছেন সাইফুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, সেখানে কিছু সময় অবস্থান করার পর পরিস্থিতির অবনতি হলে অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ফিরে আসেন।

সাইফুল ইসলামের দাবি, আন্দোলন ও গণবিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করায় পরদিন ১৮ জুলাই তিনি আর জেলখানা মোড়ে যাননি। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তিনি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও সার্কিট হাউস এলাকায় অবস্থান করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন তিনি কোনো পুলিশি অভিযানে অংশ নেননি এবং কোনো বাহিনীকে নির্দেশও দেননি। কিন্তু ঘটনার কয়েক দিন পর একটি স্বাক্ষরই তার জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয়।

জবানবন্দিতে এই কর্মকর্তা জানান, ২২ জুলাই রাতে তাকে পুলিশের এমসিসি ফরমে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। তিনি প্রথমে আপত্তি জানান। কারণ তার দাবি অনুযায়ী, তিনি সংশ্লিষ্ট সময় পুলিশের সঙ্গে কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। কিন্তু পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ ও চাপের মুখে তাকে স্বাক্ষর করতে হয়। এই এমসিসি ফরম নিয়েই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

এমসিসি বা বিপি ফরম নং-১০ মূলত পুলিশের দায়িত্ব পালনের একটি রেকর্ড। কোন ফোর্স কোথায় মোতায়েন ছিল, কখন দায়িত্ব শুরু ও শেষ করেছে, এসব তথ্য সেখানে লিপিবদ্ধ থাকে। এটি গুলিবর্ষণের আদেশ দেওয়ার কোনো আইনগত ফরম নয়। আইন অনুযায়ী, জনতা নিয়ন্ত্রণে গুলিবর্ষণের প্রয়োজন হলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নির্দেশ দিতে হয়।

সাইফুল ইসলামের পক্ষে দাবি করা হচ্ছে, ঘটনার দিন তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেওয়ার সুযোগও তার ছিল না। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের অবস্থান, সহকর্মীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সেদিনের তথ্য যাচাই করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেন তার তদন্ত প্রতিবেদনে নরসিংদীর ঘটনায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং এতে বিভিন্ন ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। সেই প্রতিবেদনে সাইফুল ইসলামের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তবে মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৮ জুলাই নরসিংদী জেলখানা মোড়ে গুলিবর্ষণের ঘটনায় নিহত কিশোর তাহমিদ ভূঁইয়ার বাবা রফিকুল ইসলাম যে অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করেন, সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলামের নাম উল্লেখ নেই।                     

২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর দাখিল করা ওই অভিযোগে ঘটনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলেও পরবর্তী সময়ে তদন্ত প্রতিবেদনে সাইফুল ইসলামের নাম অভিযুক্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বিষয়টি সামনে আসার পর তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং প্রাথমিক অভিযোগপত্রে তার নাম না থাকার বিষয়টি নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আলভী সরকার খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্পটে ছিলাম। তাহমিদ (১৪) ছিল আমাদের বিক্ষোভ মিছিলের কিছু আগে। সে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে ঢিল ছুড়তে ছুড়তে বেশ সামনের দিকে চলে গিয়েছিল। পুলিশ গুলি শুরু করলে সরাসরি তার বুকে লাগে। সেখানেই লুটিয়ে পরে তাহমিদ।’ পুলিশ দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে গুলি করেছে? বা সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ছিল কি না? খবরের কাগজের এমন প্রশ্নের জবাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই মুখ্য সংগঠক বলেন, ‘না, সেখানে এই নামের কোনো ম্যাজিস্ট্রেট দেখিনি। সেখানে আন্দোলন দমন করার জন্য ৭ থেকে ৮ জন পুলিশ ছিল। তারাই গুলি করেছে এবং সেখানেই তাহমিদ নিহত হয়েছে।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ হাকিম বলেন, সারা দেশের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ১৭ জুলাই রাতে স্থানীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে ১৮ জুলাই বেলা ৩টা থেকে নরসিংদী জেলখানা মোড়ে ব্লকেড কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এদিন কর্মসূচি পালন স্থলের আশপাশে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট ছিল না। 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র মুনিয়া রহমান মনিকা বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী কর্মসূচি পালনের লক্ষ্যে সে সময় আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম এবং আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। আন্দোলনের একপর্যায়ে তাহমিদ নিহত হয়েছে। সে সময় সেখানে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের সঙ্গে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিল বলে আমরা দেখিনি।’ 

নরসিংদী জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক ও বর্তমানে চট্টগ্রামের উপ-ভূমি সংস্কার কমিশনের কমিশনার (উপসচিব) পদে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তা ড. বদিউল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঘটনার দিন (১৮ জুলাই) আমি দেশে ছিলাম না। ১৯ তারিখ ভারত থেকে দেশে ফিরে আসি। তাই এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।’ সাইফুল ইসলামকে ২২ জুলাই এমসিসিতে স্বাক্ষরের জন্য ডিসি হিসেবে চাপ প্রয়োগ করেছেন–এমন অভিযোগের বিষয়ে ডিসি বলেন, ‘আমি যেহেতু ঘটনা সম্পর্কে জানি না, তাই কোনো কর্মকর্তাকে স্বাক্ষরের চাপ দেওয়ার প্রশ্ন আসে না।’

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (শিল্পকলা শাখা) ও নরসিংদী জেলার সাবেক ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক (১৮ জুলাই) মৌসুমী সরকার রাখী খবরের কাগজকে বলেন, ‘তৎকালীন সদর উপজেলার সাবেক এসি ল্যান্ড ও ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ঘটনার সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় অথবা সার্কিট হাউসে ছিলেন বলে শুনেছি। কারণ ঘটনার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ কর্মসূচি এতটাই তীব্র ছিল, নিরাপত্তার কারণে সেখানে ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিত থাকার মতো পরিবেশ ছিল না। জেলার অধিকাংশ ম্যাজিস্ট্রেট সে সময় ডিসি কার্যালয় অথবা সার্কিট হাউসে ছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলামের সঙ্গে ডিসি কার্যালয়ে আমার একাধিকবার দেখা হয়েছে।’

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকেই আরেকটি বাস্তবতার কথা বলছেন। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ বা সমর্থক হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা প্রশাসনিক ও আইনি চাপের মুখে পড়েছিলেন। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, সাইফুল ইসলামের ঘটনাটিও নিরপেক্ষভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় খাল খননের পর ভরাট করে গাড়ির গ‍্যারেজ, কার গরজে?

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৪:৩০ পিএম
খাল খননের পর ভরাট করে গাড়ির গ‍্যারেজ, কার গরজে?
‘শহিদ রুদ্রসেন লেক’ ভরাট করে এভাবেই নির্মাণ করা হচ্ছে গাড়ির গ্যারেজ। ছবিটি মঙ্গলবার তোলা। ইনসেটে খননের পর খাল। ছবি: খবরের কাগজ

দেশজুড়ে যখন খাল খনন ও জলাধার সংরক্ষণের উদ্যোগ জোরদার হচ্ছে, তখন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। ক্যাম্পাসে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে খনন করা একটি খাল ভরাট করে সেখানে গাড়ির গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে।

খালটি দৃষ্টিনন্দন জলাধার রূপে দৃশ্যমান হওয়ার পর প্রথমে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সাস্ট লেক’। পরে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে নিহত শাবিপ্রবির একমাত্র শিক্ষার্থী শহিদ রুদ্র সেনের স্মরণে এর নামকরণ করা হয় ‘শহিদ রুদ্র সেন লেক’। কিন্তু বর্তমানে গ্যারেজ নির্মাণের কারণে লেকটির অস্তিত্বই প্রায় মুছে যেতে বসেছে। ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হওয়া লেকটি এখন আর চিহ্নিত করার মতো অবস্থায় নেই। গ্যারেজ করার মতো জায়গা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর প্রশ্ন, একটি কার্যকর জলাধার ভরাট করে গাড়ির গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে কার গরজে?

লেক সৃষ্টি যেভাবে

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টিপাতের সময় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো। এ সমস্যা প্রাকৃতিকভাবে মোকাবিলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রথমে খাল খননের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে সেই খালকে কেন্দ্র করে একটি লেক নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ছিল লেক, লেকপাড়ে ওয়াকওয়ে এবং মাঝখানের একটি টিলায় পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তোলার পরিকল্পনা।

এ বিষয়ে ২০২৪ সালের ৭ মে ‘শাবিপ্রবিতে হবে পাখির অভয়ারণ্য’ শিরোনামে খবরের কাগজে সচিত্র একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে ২০২৫ সালের ২ জুন ‘শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে জলাবদ্ধতা: খাল খননেই মিলল সুফল’ শিরোনামে ফলোআপ প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। 

২০২৫ সালের ৩ জুলাই লেকটির উদ্বোধনকালে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী এটিকে ‘রুদ্র সেন লেক’ হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু সেই ঘোষণার এক বছরের মধ্যেই লেকটি ভরাটের মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে গাড়ির গ্যারেজ। লেকটি এখন গায়েব প্রায়।

কার গরজে গ্যারেজ?

সরেজমিনে দেখা গেছে, গ্যারেজ নির্মাণের জন্য লেকের বড় একটি অংশ ভরাট করা হয়েছে। নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। তবে তাদের অভিযোগ, প্রশাসন সে প্রতিবাদ আমলে নেয়নি। শিক্ষার্থী ও পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলছেন, যে লেক নির্মাণে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, এখন সেই লেকই অর্থ ব্যয় করে ভরাট করা হচ্ছে। তাদের মতে, এটি পরিকল্পনার সমন্বয়হীনতার স্পষ্ট উদাহরণ। মাত্র ২২টি গাড়ির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাধার ও ক্যাম্পাসের নান্দনিকতা নষ্ট করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অবিচারের শামিল।

গাড়ির গ্যারেজ তৈরিতে গরজ ছিল কার? এ প্রশ্নে অনুসন্ধানে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্যারেজের পাশেই প্রায় শতাধিক গাড়ি রাখার মতো খালি জায়গা রয়েছে। গ্যারেজটি সেখানে স্থানান্তর করা হলে লেক রক্ষা পেত এবং খালি জায়গারও যথাযথ ব্যবহার হতো। কিন্তু বর্তমান স্থানে নির্মাণকাজ চলতে থাকলে পেছনের খালি জায়গায় যাওয়ার পথ স্থায়ীভাবে বাধাগ্রস্ত হবে এবং জায়গাটি ভবিষ্যতে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়বে। মাত্র ২২টি গাড়ি রাখার জন্য সাত কোটি টাকা ব্যয় কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-২’ এর আওতায় লেক ভরাট করে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলের একটি দোতলা গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। গ্যারেজ নির্মাণের জন্য পাশের টিলার কিছু অংশও কাটা হয়েছে। নির্মাণাধীন গ্যারেজটিতে মাত্র ২২টি গাড়ি রাখা যাবে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলে বর্তমানে ৪২টি যানবাহন রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। এ ছাড়া নতুন নির্মিত গ্যারেজটিতে বড় যানবাহন প্রবেশের জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও নেই। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত গ্যারেজটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন পূরণে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া

বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান আশিক বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাসে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম প্রধান সৌন্দর্য হলো লেকটি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সেই লেক ভরাট করে গ্যারেজ নির্মাণ করা হচ্ছে! এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করবে। আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই, তবে প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন উন্নয়ন আমরা চাই না। প্রশাসনের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ–অবিলম্বে লেক ভরাটের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বন্ধ করুন এবং ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষা করুন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রিন এক্সপ্লোর সোসাইটি’র সভাপতি জাহ্নবী দত্ত বলেন, ‘বর্তমানে যে লেকটি শহিদ রুদ্র সেন লেক বা ‘সাস্ট লেক’ নামে পরিচিত, সেটির যখন পরিকল্পনা ও নির্মাণ কাজ শুরু হয়, তখন এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার কাছেই বেশ প্রশংসার বিষয় ছিল। লেকটি ছিল একাধারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যবর্ধনের উপাদান, পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার একটি কার্যকর মাধ্যম। কিন্তু এখন যে ভরাটের কাজ চলছে, এটি সত্যিই দুঃখজনক। এখানে আমাদের উচিত প্রকৃতিকে না সরিয়ে মানবসৃষ্ট কাঠামোর বিকল্প উপায় ভাবা। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে চেষ্টা করব, এর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করা যায় কি-না।’

কর্তৃপক্ষ কী বলে

যোগাযোগ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. জয়নাল ইসলাম চৌধুরী দাবি করেন ২০১৯ সালের জুলাইয়ে যখন ডিপিপি অনুমোদন হয়, তখন এই লেকটা ছিল না। গ্যারেজ নির্মাণের গরজ সম্পর্কে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘যখন এই লেক খনন করা হয় তখন আমরা বাধা দিয়েছিলাম। কারণ ডিপিপিতে গ্যারেজের জন্য এই স্থানটা উল্লেখিত। এটা ছিল প্লেইন ল্যান্ড।  এখানে লেক কখনোই ছিল না। ডিপিপিতে যেটা আছে সেটা হলো একনেকে পাস করা প্রধানমন্ত্রী থেকে অ্যাপ্রোভড। এখানে কেন লেক করা হলো সেটা প্রকৌশল দপ্তরকে জানানোই হয়নি। কারণ আমরা করব না আগেই না করে দিয়েছিলাম। লেক খননের কাজে প্রকৌশল দপ্তরের কোনো অংশগ্রহণই ছিল না। কারণ শুরু থেকেই বলা হয়েছিল যে, এটা ডিপিপির অন্তর্ভুক্ত গ্যারেজের জায়গা।’

লেক যেহেতু খনন করা হয়ে গেছে এবং শিক্ষার্থীরাও এখানে গ্যারেজ করার বিরুদ্ধে দাবি জানিয়েছিলেন, তবু বিকল্প জায়গায় গ্যারেজ স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে চিফ ইঞ্জিনিয়ার জয়নাল বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যখন দাবি জানাল, তখন আমরা টিলার পেছনে গ্যারেজ করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু ওই সময় ভিসি স্যার (সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী) আমাদের জানান যে ভিসি বাংলোর আশপাশে এ ধরনের কোনো স্থাপনা করবেন না। যেখানে আছে সেখানেই করেন। এখন যেখানে আছে সেখানে তো লেক। তখন আমরা টিলার কাছ ঘেঁষে লেকের ঢালের কিছু অংশ ভরাট করে রিটেইনিং ওয়াল দিয়ে দিই, যাতে লেকের বাকি অংশের কোনো ক্ষতি না হয়।’

গ্যারেজ নির্মাণের সিদ্ধান্তের দায় সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরীর ওপর বর্তান চিফ ইঞ্জিনিয়ার। তবে এ বিষয়ে সাবেক উপাচার্যের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একদিকে লেক নির্মাণে ব্যয়, অন্যদিকে সেই লেক ভরাট করে নতুন ব্যয়—এই দ্বৈত আর্থিক ব্যয়ে রয়েছে অর্থের নয়ছয় ও অপচয়। এ নিয়ে তখনকার প্রশাসনের দায়িত্বশীল কেউ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

জানতে চাইলে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল ইসলাম বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস দেন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয় ঈদের ছুটির কারণে বন্ধ ছিল। শিগগিরই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে এখানে গ্যারেজ নির্মাণের কারণ ও প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’