চাকরির পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও পাস, অটোপাস এবং অভিজ্ঞ জনবলকে স্থায়ী না করে নতুন নিয়োগের নামে আর্থিক বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে। আর এ ধরনের অনিয়মের ফলে দীর্ঘ ১৭ বছর প্রতিষ্ঠানটিতে মেধা-শ্রম দিয়েও বৈষম্যের শিকার ডেটা এন্ট্রি অপারেটররা। আইডিইএ প্রকল্পে চুক্তির ভিত্তিতে তারা কর্মরত রয়েছেন।
তাদের অভিযোগ, সম্প্রতি দায়িত্বপ্রাপ্ত ইসির নতুন কমিশনও হাঁটছে পূর্বসূরিদের পথেই। অভিজ্ঞ ওই সব অপারেটরের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ বা তাদের দাবির প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ করছেন না। আগামী ৩১ জানুয়ারি ৪৬৮টি ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পদে লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করেছে এই কমিশন। আর পরীক্ষা আয়োজনে কমিশনকে সাত-পাঁচ বুঝিয়েছেন বিভিন্ন কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িত অসাধু কর্মকর্তারা।
ইসির আইডিইএ-২ প্রকল্প কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের নেতারা এবং বিভিন্ন সূত্র খবরের কাগজকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। অভিযোগ উঠেছে, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ১৮ হাজার ৮১৫ জনের সবাইকে কীভাবে পাস দেখানো হলো?
উল্লেখ্য, সরকারিভাবে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরুর সময় প্রকল্পে ১ হাজার ১৩০ জন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর কর্মরত ছিলেন। আর পরীক্ষায় আবেদনকারী ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জনের মধ্যে পরীক্ষা না দেওয়া সত্ত্বেও আদালতের আদেশে পাস দেখানো হয় কর্মরত ৭৪৭ অপারেটরকে। আর প্রকল্পে কর্মরত বাকিরা কর্তৃপক্ষের হুমকি-ধমকির কারণে রিটে অংশ নিতে পারেননি। একই পদে কর্মরত থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায় এসব দক্ষ কর্মী বৈষম্যের শিকার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ-বাণিজ্যের লক্ষ্যে আগারগাঁওয়ের তালতলায় অবৈধভাবে কোচিং সেন্টার, মেস ব্যবসা পরিচালনা ও শিক্ষকতা করেন। তারা অনেক আবেদনকারীকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার চুক্তিতে তাদের কাছ থেকে অগ্রিম লাখ লাখ টাকা নিয়েছেন। একই সঙ্গে কোচিং সেন্টারের কিছু ছাত্র এনে কৃত্রিম আন্দোলন করিয়ে স্থবির নিয়োগ প্রক্রিয়া সচল করতে নির্বাচন কমিশনে চাপ প্রয়োগ করেন। এই সিন্ডিকেটে জড়িত রয়েছেন ইসি সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন অন্তত ৮ থেকে ১০ কর্মকর্তা; যাদের নামে-বেনামে গাড়িসহ ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট-প্লটও পাওয়া যাবে।
ইসির আইডিইএ-২ প্রকল্পে বর্তমানে কাজ করছেন ২২ শর বেশি ডেটা এন্ট্রি অপারেটর। চাকরি সরকারি করা না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করে তারা বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আমরা অপেক্ষার প্রহর গুনছি। সরকার বলে কমিশন চাইলে হবে, কমিশন বলে আদালত চাইলে হবে, আদালত বলে দপ্তর বললেই হবে- এমন হয়রানি হতে হতে আমরা ক্লান্ত। স্থায়ীকরণের আশ্বাসে আমরা সরকারি চাকরির বয়স হারিয়েছি! এরপর কোথাও তো চাকরি পাব না। কীভাবে চলবে আমাদের পরিবার?’ এ বিষয়ে বিগত কমিশনগুলো আশার বাণী শুনিয়েছে। এবারের কমিশনও পূর্বসূরিদের পথেই হাঁটছে। আগামী ৩১ জানুয়ারি ৪৬৮টি ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পদে তারা লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করেছে। এটা আমাদের প্রতি চরম বৈষম্য ও অবিচার। আমাদের বাদ দেওয়ার অপতৎপরতা। আমাদের দেওয়া আশ্বাস পূরণ না করে নতুন কর্মী নিয়োগের যে প্রক্রিয়া চলছে; তার উদ্দেশ্য অনৈতিক নিয়োগ-বাণিজ্য। অবিলম্বে এই নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করা না হলে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কর্মরত কর্মীরা।
এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের জনবল ব্যবস্থাপনা শাখার উপসচিব খোরশেদ আলম বলেন, ‘২০১৯ সালে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু আইডিইএ প্রকল্পে চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োজিত কর্মীদের রিটের কারণে ওই নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালতের রায়ে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পদে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।’ আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় নিয়োগ কমিটির সিদ্ধান্তে লিখিত পরীক্ষার আগে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া ৭৪৭ জন কীভাবে পাস করল- প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তারা আবেদন করেন। পরে পরীক্ষা ছাড়াই তাদের সরাসরি লিখিত পরীক্ষাও অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।’ অথচ নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, ডেটা এন্ট্রি অপারেটরদের সরাসরি লিখিত পরীক্ষা হয় এবং পরবর্তী সময় মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। ইসির এই নিয়োগে আবেদনকারী ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জনের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেন ১৮ হাজার ৮১৫ জন। পরে সবাইকে লিখিত পরীক্ষার সুযোগ দিয়ে ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের প্রশাসন ও অর্থ শাখার যুগ্ম সচিব মো. মঈন উদ্দীন খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই নিয়োগ নিয়ে যা হয়েছে তা বিধিবিধানের আলোকেই হয়েছে। আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কিছুই করা হয়নি। আইডিইএ প্রকল্পের আউটসোর্সিংয়ের ডেটা এন্ট্রি অপারেটরদের বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা মানা হয়েছে। পরীক্ষায় সবাই কীভাবে পাস করল- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটার বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। এখানে নিশ্চয়ই কোনো বিষয় আছে। আমি ফাইল না দেখে কিছু বলতে পারব না। বিধির বাইরে গিয়ে কমিটি কিছু করতে পারে না। আইনের বাইরে কমিটি কিছু করতে গেলে সেটা বাতিল হয়ে যায়।’
নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, ‘নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষায় তো ফেল নেই এটা অ্যালিমিনেশন করার বিষয়। যখন অনেক পরীক্ষার্থী থাকে, তখন তাদের ধাপে ধাপে পরীক্ষা দিয়ে স্ক্রিনিং করা হয়। এখন যদি দেখি আমাদের ধারণার তুলনায় কম পরীক্ষার্থী অংশ নেন তখন আমরা সবাইকে সমান সুযোগ দেই। এখনো তো কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। আমাদের ভুল হতে পারে কিন্তু আমরা আলটিমেট নিয়োগ বিধিমালার বাইরে যেতে পারব না।’