প্রায় ২০ বছর আগে একসঙ্গে পথচলা শুরু নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার লালচাঁদ ওরফে সোহাগ ও খুনের প্রধান আসামি মহিনের। পুরান ঢাকায় ভাঙারিপণ্য ও চোরাই কেবল ব্যবসার সিন্ডিকেট গড়েন এই দুই বন্ধু। মাঝে একাধিকবার রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হলেও প্রশাসন ও স্থানীয় নেতাদের ম্যানেজ করে ভালোই দাপটের সঙ্গে চলছিল তাদের কারবার। তবে মাস দুয়েক আগে ব্যবসার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়ান তারা। ভাঙারি দোকানে পাল্টাপাল্টি হামলা-গুলি ও শেষ পর্যন্ত সেটি গড়ায় প্রকাশ্যে নৃশংস-বীভৎস হত্যাকাণ্ডে। সেই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশ। কেন এমন বীভৎস হত্যাকাণ্ড, তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে ওঠে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। রাজনৈতিক দলগুলোও একে অপরকে দোষারোপ করছে।
এদিকে সোমবার (১৪ জুলাই) সোহাগ হত্যা মামলায় সজীব ব্যাপারী ও মো. রাজীব নামে দুই আসামির পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
তারা সম্পর্কে আপন ভাই। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুম মিয়ার আদালত রিমান্ডের এ আদেশ দেন। অন্যদিকে সোহাগ হত্যা মামলায় আসামিদের পক্ষে মামলা পরিচালনা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ঢাকা বার ইউনিট। এমন কি অন্য আইনজীবীদেরও আসামিদের পক্ষে না দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
সোমবার স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেন, সোহাগ ও মহিন একই সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে চলাচল করতেন। তবে এলাকায় আধিপত্য ও প্রভাব ধরে রাখতে মহিন মিটফোর্ড এলাকায় গোপন টর্চার সেল তৈরি করেছিলেন। কথামতো কেউ কাজ না করলে তাকে ধরে নিয়ে সেখানে নির্যাতন করা হতো। সেখানে এলাকার অনেকেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী জানান, মহিন যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচিত। মহিনের ছত্রচ্ছায়ায় কিছু সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও ভাড়াটে খুনির বেশ দাপট ছিল এলাকায়। বিশেষ করে গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মহিন ও সোহাগ সিন্ডিকেটের বেশ দাপট দেখেন স্থানীয়রা।
পুরান ঢাকার বাসিন্দা শাহজাহান কবির লিটন খবরের কাগজকে জানান, চায়নাপট্টি ও রজনী বোস লেনকে ভাঙারি ব্যবসার সদর দপ্তর বললেও ভুল হবে না। এখানে সারা দেশ থেকে আসে নানা ভাঙারিপণ্য (তামা, পিতল, দস্তা, সীসা, প্লাস্টিকের পণ্য)। এই ব্যবসার আড়ালে চলে চোরাই কেবল (তার)সহ নানা অবৈধ অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের ব্যবসা। চোরাই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই এখানে গড়ে ওঠে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। মূলত ওই সিন্ডিকেটে আধিপত্য বিস্তার ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে গত ৯ জুলাই সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, সোহাগ হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এলাকাজুড়ে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে সন্ত্রাসীরা। এ ছাড়া এলাকায় সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে।
সোহাগ-মহিনের ২০ বছরের সিন্ডিকেট
স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুরান ঢাকার এই এলাকায় পলাশ নামে একজন ভাঙারি ব্যবসায়ী ছিলেন। নিহত সোহাগ ওই পলাশের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। পলাশ আওয়ামী লীগের আমলে রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় প্রশাসনের লোকদের ম্যানেজ করে ব্যবসা করতেন। পলাশের সঙ্গে কাজ করার সময় মহিনের ও সোহাগের মধ্যে ভালো বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর একসঙ্গে তারা যুবদলের কর্মসূচিতে যেতেন। ৫ আগস্টের পর পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণে নেন মহিন ও সোহাগ।
প্রথমে ৩০ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি সুমন, সাধারণ সম্পাদক কালু, সদস্যসচিব বরকতুল্লাহ মাসুদ, চকবাজার থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব অপু দাস, ৩০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি সজীব, সোহাগ ও মহিন মিলে ৭ থেকে ৮ জন মিলে পানির ব্যবসার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই পানির সিন্ডিকেট চালানোর একপর্যায়ে সোহাগ, মহিন ও অপু দাস মিলে আলাদা গ্রুপ গড়ে তোলেন। অপু দাস থানার পদধারী নেতা। মহিন ৩০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি।
এর পর মহিন অপু ও সোহাগকে অবৈধ তারের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরামর্শ দেন। মহিন ও অপু মূলত সোহাগকে ওই ব্যবসা ও সিন্ডিকেট পরিচালনার দায়িত্ব দেন। কিছুদিন যাওয়ার পর তারা ব্যবসার ভাগবাঁটোয়ারার কথা বলেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দেন-দরবার শুরু হয়। প্রথম কয়েক মাস সোহাগ মহিন ও অপুকে ব্যবসার লাভের কিছু অংশ দেন। এর মধ্যে পাশের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সারোয়ার হোসেন টিটুও (সাবেক সদস্য চকবাজার থানা যুবদল) ব্যবসার লাভের অংশ চান। সবাই মিলে সোহাগকে এই সিন্ডিকেটের দায়িত্ব দেন। সিদ্ধান্ত হয় সবাই টাকার ভাগ পাবেন। কিছুদিন সবাই এই ব্যবসা থেকে টাকা-পয়সা পেলেও পরে সোহাগ টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেন।
এতে বিরোধ বাড়তে থাকে। এর মধ্যে অপু ও মহিনের সঙ্গে সোহাগের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। মহিন ও সোহাগের দুটি আলাদা গ্রুপ গড়ে ওঠে।
গত ৫ জুলাই মহিন তার গোটা গ্যাং নিয়ে এলাকায় মিছিল করে সোহাগের চায়নাপট্টির অফিসে তালা লাগিয়ে দেন। ৭ জুলাই সোহাগ ২০ থেকে ২৫ জন লোক নিয়ে তালা ভেঙে অফিসে ঢোকেন। এই দিন সন্ধ্যায় রজনী বোস লেনের মুখে মহিন-অপু গ্রুপ ও সোহাগ গ্রুপের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এখানে ৪ থেকে ৫ রাউন্ড গুলিও চলে। দুই পক্ষই ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ সময় সোহাগ বলেন, ‘ব্যবসায় কাউকে ভাগ দেব না, যা ইচ্ছা করিস।’ পরে ৯ জুলাই তাদের হাতে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হন সোহাগ।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সোহাগ হত্যাকাণ্ডে মোট ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৬ জন রিমান্ডে রয়েছে। বাকিদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
ডিসি তালেবুর রহমান আরও বলেন, ‘এই হত্যার সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও গ্রেপ্তারকৃতদের বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া পুরান ঢাকার ওই এলাকায় চোরাই ব্যবসার সিন্ডিকেট দমন, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের ধরতে পুলিশ কাজ করছে। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। এ ছাড়া মবসহ প্রকাশ্যে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে কাজ করছে পুলিশ।’
আসামি পক্ষে দাঁড়াবে না জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম
গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে ফোরামের আহ্বায়ক মো. খোরশেদ আলম বলেন, অনতিবিলম্বে সব আসামির দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম ঢাকা বার ইউনিটের কোনো সদস্য সোহাগ হত্যা মামলায় আসামি পক্ষে মামলা পরিচালনা করবেন না বলেও জানান।
তিনি বলেন, ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নামে অশ্লীল স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। আমরা মনে করি, ফ্যাসিবাদী শক্তির দোসর এবং অদৃশ্য শক্তি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কোনোরকম তদন্ত, অনুসন্ধান ছাড়াই চাঁদাবাজির মতো এক ঘৃণ্য অপবাদ আরোপ করে বিএনপিকে দোষারোপ করা হচ্ছে।’
গত ৯ জুলাই সন্ধ্যার আগে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটসংলগ্ন রজনী বোস লেনে পাকা রাস্তার ওপর সংঘবদ্ধভাবে ভাঙারি ব্যবসায়ী ও যুবদলকর্মী লালচাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯) এলোপাতাড়ি পাথর দিয়ে আঘাত করে ও কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সোহাগ হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তাদের মধ্যে ভিডিও ফুটেজ ও নানা তথ্য বিশ্লেষণ করে ১১ জনকে শনাক্ত করেছেন তারা।