শেষ পর্যন্ত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নসংক্রান্ত গণভোট অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এই ঘোষণা দেন। তবে তার ঘোষণায় গণভোটের যে প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাকে জটিল ও অবাস্তব বলছেন বিশিষ্টজনেরা।
এ ছাড়া এতে ভোটারের গোপনীয়তার অধিকারও ক্ষুণ্ন হবে বলে মনে করেন তারা। কারণ অনেক ভোটার নিরক্ষর। এসব প্রশ্ন জানতে তাদের অন্যের সহায়তা নিতে হবে। অন্যকে দিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে। তা ছাড়া হাতে জাতীয় নির্বাচনের ব্যালট থাকার কারণে ভোটার কোন মার্কায় ভোট দিয়েছেন, অন্য কেউ তা দেখার ঝুঁকিও তৈরি হবে বলে সতর্ক করেন তারা।
বিশিষ্টজনেরা বলছেন, গণভোটে উল্লেখ করা চারটি প্রশ্নে একজন ভোটারের একই জবাব থাকবে, এই নিশ্চয়তা তো দেওয়া যায় না। কিন্তু ভোটারদের বাধ্য করা হবে, এই চার প্রশ্নের জবাব একই শব্দে (হ্যাঁ/না) দিতে।
তারা বলছেন, গণভোট হয়, ওমুককে রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনি মানেন কি না? - এ ধরনের সহজ-সরল প্রশ্নের ‘না’ অথবা ‘হ্যাঁ’ জবাব দেওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা যে প্রক্রিয়ার কথা বললেন, এটি খুবই জটিল, অবাস্তব ও অস্বাভাবিক।
চারটি বিষয়ে গণভোট প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘এটি বাস্তবতা-বর্জিত একটি ব্যাপার। এটি বিসিএসের এমসিকিউ প্রশ্ন হিসেবে ভালো হয়েছে। তবে গণভোটের জন্য একটি অবাস্তব বিষয়। বিশ্বের কোথাও গণপরিষদ নির্বাচনে এভাবে চারটি প্রশ্ন করা হয়েছে কি না আমার জানা নেই।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, প্রধান উপদেষ্টা যে প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন, এতেই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি ভেস্তে চলে গেছে। কারণ এই চারটি বিষয়ের মধ্যে দুটিতে তো বিএনপির মতো একটি বড় দলের আপত্তি আছে। তার মানে বিএনপি যখন তাদের ভোটারদের ‘না’ ভোট দিতে বলবে, তাতে তো পুরো গণভোটের ফলাফল আন্দাজ করাই যায়। আসলে এই প্রক্রিয়াটি একটি অবাস্তব প্রক্রিয়া।
গণভোটের দিন চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে জনগণ মতামত জানাবেন- প্রধান উপদেষ্টার উল্লেখ করা এই প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘অনেকে তো পড়তেই জানেন না। যদি এটি ভোটকেন্দ্রের ভেতরে কাউকে দিয়ে পড়াতে হয়, তখন তো ভোটারের গোপনীয়তার অধিকারই ক্ষুণ্ন হবে। এসব করে জুলাই জাতীয় সনদের ভালো বিষয়গুলোও নষ্ট করা হবে।’
ভালো ভালো বিষয়ের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যেমন: প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে। এটি কার্যকর হলে সংসদ সদস্যরা দুটি বিষয় বাদে আর সব বিষয়েই দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়েও ভোট দিতে পারতেন। তারপর যেমন: ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হওয়ার বিষয়টিও ভালো প্রস্তাব। অন্তর্বর্তী সরকারের ‘মনটা ক্লিয়ার থাকলে’ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হতো এবং এসব ভালো ভালো বিষয় সংবিধানে যুক্ত হতো। এখন এতকিছু একসঙ্গে জুড়িয়ে দেওয়ায় মনে হয়, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হোক এটা অন্তর্বর্তী সরকারই চায় না!
তিনি বলেন, যেমন একজন ভোটার যদি কোন কোন প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’, আর কোন কোন প্রশ্নে ‘না’ বোধ করেন, তিনি কী করবেন? তাকে তো সবটা মিলেই একটা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে হবে!
আইনজীবী শাহদীন মালিকও বলেন, এতে সরাসরি ভোটারের গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ন হবে। তারা তো পড়ে-বুঝে ভোট দিতে পারবেন না, কারণ এতগুলো বিষয় বুঝতে হবে। সব মিলিয়ে গণভোটে মনে হয় ১০ শতাংশ ভোটও পড়বে না। ব্যালট পেপার খালি জমা দিয়ে দেবেন বেশির ভাগ ভোটার।