কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের এই জয়যাত্রার যুগে আমরা প্রতিনিয়ত অবাক হচ্ছি নতুন সব উদ্ভাবনে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠের মতো প্রযুক্তির এই উৎকর্ষ আমাদের সামনে এক নতুন আপদ নিয়ে হাজির হয়েছে, যার নাম ‘ডিপফেক’। প্রযুক্তির কারসাজিতে একজনের ভিডিওতে অন্য কারও মুখ বসিয়ে দেওয়া কিংবা হুবহু কণ্ঠস্বর নকল করার এই প্রক্রিয়াটি এখন সাইবার জগতের অন্যতম বড় আতঙ্ক। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম যারা দিনের বড় একটি সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাটায়, তাদের জন্য এটি একটি অদৃশ্য ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনার একটি সাধারণ ছবি বা ছোট একটি ভিডিও ক্লিপ ব্যবহার করে তৈরি হতে পারে বিভ্রান্তিকর কোনো কনটেন্ট, যা মুহূর্তেই আপনার সম্মান ও সামাজিক অবস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাই প্রযুক্তির এই যুগে কেবল ব্যবহারকারী নয়, বরং সচেতন ব্যবহারকারী হওয়া এখন সময়ের দাবি।
ডিপফেক আসলে কী?
ডিপফেক শব্দটি এসেছে ‘ডিপ লার্নিং’ এবং ‘ফেক’–এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে। এটি মূলত এআইয়ের এমন একটি প্রযুক্তি যা ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির ছবি, ভিডিও বা কণ্ঠস্বরকে কৃত্রিমভাবে অন্য কোনো প্রেক্ষাপটে বসিয়ে দেওয়া হয়। এখন আর নিখুঁত এডিটিং করার জন্য বড় কোনো স্টুডিও বা বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হয় না; সাধারণ স্মার্টফোন অ্যাপ দিয়েই যে কেউ কারও চেহারা বদলে দিতে পারে। অনেক সময় মজার ছলে শুরু হওয়া এই কাজগুলো যখন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো বা কাউকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য ব্যবহৃত হয়, তখন তা ভয়ংকর রূপ নেয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তথ্যের নিরাপত্তা
আমরা জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এখন ফেসবুকে বা ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করতে পছন্দ করি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আপনার আপলোড করা প্রতিটি উচ্চমানের ছবি ডিপফেক তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। সাইবার অপরাধীরা সাধারণত পাবলিক প্রোফাইল থেকে ছবি সংগ্রহ করে এ ধরনের অপকর্ম করে থাকে। তাই প্রোফাইল লক রাখা, অপরিচিত কাউকে বন্ধু তালিকায় যুক্ত না করা এবং স্পর্শকাতর ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার ক্ষেত্রে সচেতন থাকা জরুরি। আপনার অনলাইন উপস্থিতি যত বেশি নিয়ন্ত্রিত হবে, আপনি ততটাই নিরাপদ থাকবেন।
ভয়েস ক্লোনিং ও আর্থিক প্রতারণা
ডিপফেক কেবল ভিডিওতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন অডিও বা কণ্ঠস্বরের ক্ষেত্রেও সমানভাবে সক্রিয়। এআই ব্যবহার করে আপনার কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করে আপনার পরিচিত জন বা পরিবারের কাছে বিপদে পড়ার নাটক সাজিয়ে টাকা চাওয়া হতে পারে। একে বলা হয় ‘ভয়েস স্ক্যাম’। হুট করে ফোনে কারও কণ্ঠস্বর শুনেই আবেগপ্রবণ হয়ে টাকা পাঠিয়ে দেবেন না। সন্দেহ হলে ভিন্ন কোনো উপায়ে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হোন যে ব্যক্তিটি সত্যিই তিনি কি না। প্রযুক্তির এই মারপ্যাঁচে মানুষের আবেগ এখন সাইবার অপরাধীদের বড় হাতিয়ার।
ডিপফেক চেনার উপায়
প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, আসল-নকল চেনা তত কঠিন হচ্ছে। তবুও কিছু বিষয়ের দিকে নজর দিলে ডিপফেক শনাক্ত করা সম্ভব। ভিডিওতে থাকা ব্যক্তির চোখের পলক কি স্বাভাবিকভাবে পড়ছে? তার ঠোঁট নাড়ানোর সঙ্গে কথার সামঞ্জস্য আছে কি না, কিংবা গলার চামড়া বা কানের পাশের ছায়াগুলো কি ঝাপসা দেখায়? এই সূক্ষ্ম অসঙ্গতিগুলোই বলে দেয় ভিডিওটি কৃত্রিমভাবে তৈরি। এ ছাড়া ইন্টারনেটে কোনো চাঞ্চল্যকর ভিডিও দেখলেই তা বিশ্বাস না করে নির্ভরযোগ্য সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত।
সাইবার বুলিং ও মানসিক প্রভাব
ডিপফেকের মাধ্যমে কারও বিকৃত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া সাইবার বুলিংয়ের একটি চরম পর্যায়। এটি ভুক্তভোগীর ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। অনেক তরুণ-তরুণী এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। মনে রাখতে হবে, আপনি যদি এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হন, তবে এটি আপনার দোষ নয়। অপরাধী হলো সেই ব্যক্তি যে প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে। এ ক্ষেত্রে লজ্জিত না হয়ে বা ভয় না পেয়ে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং পরিবারের বড়দের জানানো উচিত।
আইনি সুরক্ষা ও সচেতনতা
বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সাইবার নিরাপত্তা আইনে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ডিপফেক বা সাইবার অপরাধের শিকার হলে বিটিআরসি (BTRC) কিংবা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ জানানোর সুযোগ আছে। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার বা ‘এথিক্যাল ইউজ’ সম্পর্কে জানাও জরুরি। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে স্রেফ মজা করার জন্যও কারও ছবি বিকৃত করা যে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তা তরুণদের বুঝতে হবে।
সবশেষে, প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কিন্তু একে বুঝতে হবে। এআই বা ডিপফেকের মতো প্রযুক্তির যুগে আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ বা ডিজিটাল জ্ঞান। ইন্টারনেটে কোনো কিছু দেখার পর হুট করে উত্তেজিত না হওয়া, শেয়ার করার আগে সত্যতা যাচাই করা এবং নিজের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হলো একজন সচেতন তরুণের বৈশিষ্ট্য। তারুণ্য মানেই অদম্য শক্তি আর অজানাকে জানার আগ্রহ। সেই শক্তিকে আমরা যদি সাইবার নিরাপত্তার শিক্ষায় কাজে লাগাই, তবেই একটি নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। মনে রাখবেন, আপনার সচেতনতাই আপনার এবং আপনার চারপাশের মানুষের শ্রেষ্ঠ সুরক্ষা।

