জার্মানির সামরিক বাহিনী বেশ কয়েক যুগের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ থেকে শুরু করে দুটো বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে এই প্রভাবশালী দেশের সেনারা। জার্মানির সামরিক শক্তির ঐতিহাসিক বিবর্তন, বর্তমান সক্ষমতা, দেশটির পরমাণুনীতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিস্তারিত নিয়ে এই লেখা।
ইতিহাসের পাতায় জার্মানির সামরিক শক্তি
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষাংশে ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জার্মানির সামরিক শক্তি ইউরোপের ত্রাস ছিল। দেশটির প্রুশান সাম্রাজ্যের কাইজার দ্বিতীয় উইলহেমের আমলে শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও তৎপর নৌবাহিনীর কল্যাণে জার্মানির সামরিক শক্তি সমীহের জায়গা দখল করে নেয়।
এদিকে কঠোর সামরিক নীতি ও আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির কারণে প্রথম যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটানোয় জার্মানিকে দায়ী করেন বিশ্লেষকরা।
তবে ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে দেশটির সামরিক খাতকে নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে বিরোধী রাষ্ট্রের জোট।
১৯৩০-এর দশকে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি বাহিনী গঠনের মাধ্যমে গোপনে অস্ত্রের বহর শক্তিশালী করে বার্লিন। এর ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছায়া পড়ে পৃথিবীতে।
এই যুদ্ধের পর জার্মানির সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি দেশটিও বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৫৫ সালে দ্য ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি (ওয়েস্ট জার্মানি) বুন্দেসওয়ের নামে সামরিক বাহিনী গঠন করে। অন্যদিকে জার্মান ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক (ইস্ট জার্মানি) গঠন করে সোভিয়েত ঘরানার ন্যাশনাল পিপলস আর্মি।

১৯৯০ সালে জার্মানি পুনরায় একত্রিত হওয়ার পর ন্যাশনাল পিপলস আর্মি ভেঙে বুন্দেসওয়েরের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আধুনিক পৃথিবীতে জার্মানির সামরিক সক্ষমতা
বর্তমানে জার্মানির সামরিক বাহিনী স্বয়ংসম্পূর্ণ। গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইন্ডেক্সের তথ্যমতে, ১৪৫টি দেশের মধ্যে জার্মানির অবস্থান ১৯। দেশটির সামরিক বাহিনীতে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার সামরিক সদস্য সরাসরি কর্মরত। সাম্প্রতিক বিশ্বের নিরাপত্তা হুমকি ও পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোর দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের কথা বিবেচনা করে এই সংখ্যা দুই লাখ ৩০ হাজারে পরিণত করতে চায় বার্লিন।
সামরিক গঠন
● সেনাবাহিনী: জার্মানি সেনাবাহিনীর রয়েছে শক্তিশালী লেপার্ড-টু ট্যাংক। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই ট্যাংক দারুণ কার্যকর। এ ছাড়া ‘পুমা সাঁজোয়া যান’ ও অত্যাধুনিক অস্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা জাহির করেছে দেশটি।
● নৌবাহিনী (মেরিন): জার্মানির নৌবাহিনী আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন ও সাপোর্ট ভেসেলের মাধ্যমে আটলান্টিক মহাসাগরে কর্তৃত্ব কায়েম করেছে। জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে জার্মান নৌবাহিনীর বিশেষ খ্যাতি রয়েছে।
● বিমান বাহিনী: বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্রবহরসংবলিত বিমানবাহিনীগুলোর তালিকা করা হলে জার্মানির নাম শুরুর দিকেই থাকবে। ইউরোফাইটার টাইফুন, মাল্টিরোল ফাইটারস্ টর্নেডো এয়ারক্রাফটের মাধ্যমে আকাশপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে জার্মান বিমানবাহিনী। এ ছাড়া প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও হামলার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এই খাতের আধুনিকায়নে মনোযোগ দিয়েছে দেশটি।

প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় ও আধুনিকায়ন
ন্যাটো সম্প্রতি জোটের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোকে বাজেটের অন্তত দুই শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়। এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বার্লিন সরকার। এই প্রচেষ্টায় দেশের সামরিক বাহিনীতে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ইউরো ব্যায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আধুনিক অস্ত্রসরঞ্জাম মজুদের পাশাপাশি সংকটাপন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা অভিযানে জার্মানির সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন সামরিক অভিযানের পাশাপাশি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়মিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বাস্তবায়নে ভূমিকা পালন করে দেশটি।
জার্মানির পরমাণুনীতি
পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি (এনপিটি) স্বাক্ষরের কারণে বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র সংরক্ষণে জার্মানি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় রয়েছে। তবে ন্যাটোর সদস্য হিসেবে জোটে পারমাণবিক কার্যক্রমে দেশটি সহায়তা করে।

এরই প্রেক্ষিতে দেশটির সার্বভৌম অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু ঘাঁটি রয়েছে। তবে দেশে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু ঘাঁটি থাকায় পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিতর্কের সম্মুখীন হচ্ছে দেশটির প্রশাসন।
সমালোচনা সত্ত্বেও ন্যাটোর পরমাণু কার্যক্রমে জার্মানির পূর্ণ সহায়তা থাকবে বলে জানিয়েছে বার্লিন প্রশাসন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও কৌশলগত বাধা
বর্তামানে জার্মানির সামরিক বাহিনী বেশ কিছু বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে জটিল কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব, সাইবারস্পেসে নিরাপত্তার অভাব ও প্রতিরক্ষা বাস্তবায়নে জলবায়ু-সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির মতো বেশ কিছু সমস্যা ভোগাচ্ছে জার্মানিকে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে জোট গঠন করছে দেশটি।
প্রতিরক্ষা খাতে উদ্ভাবন
সম্প্রতি জার্মানির সরকার প্রতিরক্ষা খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি ও অস্ত্রের বহর শক্তিশালী করায় মনোযোগ দিয়েছে। দেশেই আধুনিক অস্ত্র তৈরি মাধ্যমে ব্যয় কমিয়ে আরও উন্নতি প্রযুক্তি উদ্ভাবনে অর্থ বরাদ্দ দিতে পারছে বার্লিন সরকার।
এ ছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, সামরিক খাতে দক্ষ জনশক্তি নিয়োগের পাশাপাশি ইউরোপীয় জোটের সহায়তায় প্রতিরক্ষা খাতে ব্যাপক উন্নতির দিকেই যাচ্ছে দেশটির সামরিক বাহিনী।

ইউরোপের সহায়তা
ইউরোপের সহায়তা হারাতে চাইবে না জার্মানি। প্রতিরক্ষা খাতে ইউরোপীয় সম্পৃক্ততার মাধ্যমে দেশটি মহাদেশীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতেও স্থিতাবস্থা কায়েম করবে বার্লিন।
প্রতিরক্ষা নীতিতে জনগণের অসন্তোষ
প্রতিরক্ষা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে দেশে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেওয়ায় বিতর্কের মুখে পড়েছে জার্মানি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জন-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রত্যাশার বোঝাপড়া বার্লিন সফলভাবে করতে পারে কি না- এর ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যতে দেশটির প্রতিরক্ষানীতি কোন দিকে যাবে।
ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যার দাগ গায়ে লেগে থাকা জার্মানির সামরিক বাহিনী সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে ঈর্ষণীয় উন্নতি করেছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে দেশটির প্রতিরক্ষা খাত সাফল্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: আইরিস ফ্রান্স, ক্লিন এনার্জি ওয়ার, গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইন্ডেক্স, রয়টার্স
নাইমুর/অমিয়/