সূর্য ডুবে গেছে, পাতার ফাঁকে আর রোদ নাই। কিচিরমিচির করে বাসায় ফিরে গেছে পাখি। ডাহুক ডাকছে জলাশয়ে। কিশোরের দল বাড়ি ফিরেছে। জল আনতে গিয়ে কলস ভাঙল দীপাঞ্জলি। মনে মনে শাশুড়ির ভয়। কি না কী বলে? মাগি বলে গালি দেবে? মাগি ডাকবে? ধুর না। এত অমানুষ হয় নাকি শাশুড়ি!
কাদা পায়ে ফিরছে হাঁস- যেন নূপুর পরা। প্যাক প্যাক প্যাক প্যাক প্যাক প্যাক। টিউবঅয়েলের পাশে শুষ্ক কলাপাতা বাতাসে মড়মড় শব্দে উড়ছে। কচি পাতাগুলো শোঁ শোঁ করছে। ফেটে গেছে যুবক-যুবতী রূপ, সব কয়টা কলাপাতার।
চারদিকে আনন্দঘন গোধূলি।
বউ এখনো বাইরে? মেয়েটা কী বেয়াদব রে? কোথাও গেলে আটকে যায়। পায়ে যেন গ্লু মাখা। উফ্! যন্ত্রণা। মনে মনে কথাগুলো বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সায়নীর মা।
বেলা ডুবে গেলে অথবা ভীষণ রাত্রিতে সায়নী বাড়ি ফিরলে কোনো দোষ নাই। কিন্তু বউ, ও মা গো! সে তো মহাবিপজ্জনক ঘটনা। এ যেন ৪৬-এর দাঙ্গা লেগে যায় ঘরে। কিন্তু এই দাঙ্গায় একপক্ষ মায়ের মুখী, অন্যপক্ষ বড্ড অসহায় অবলা নারী।
বাঙালির ঘরে শাশুড়ির মুখে মুখে তর্ক করা বা বাগবিতণ্ডা করা বেদ অবমাননা করার সমান পাপ। তবে বর্তমানে এই দৃশ্যপটের পরিবর্তন হয়েছে।
কী রে সায়নী, বেটি তো এখনো এল না, জল আনতে গেল।
দীপা? দেখো গা, রাস্তায় দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে গল্পে ডুবেছে। আমি অত জানি না, বাড়ির বাইরে ন্যাকামো আমার ভালো লাগে না। কথা শেষ করে অন্তরালে স্মিত হাসে সায়নী।
সুপর্ণার মতোন হাসি, গোলে-মালে তেলে-জলে মেশানো হাসি।
সন্ধ্যা অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে ঢুকে গেছে গ্রামগঞ্জে।
পুলিশ কনস্টেবল অপরাধী ধরে এনে যেমন অস্থির ও ছটফট অবস্থায় নিজেকে প্রকাশ করে, তেমনি এক ভাব নিয়ে সায়নীর মা বলল- যা না, একটু দেখ। মেয়েটা আবার কোথাও আটকে গেল কি না।
পারব না। একবার বলছি তো। শোনোনি?
এদিকে মাথায় এক আকাশ হতাশা নিয়ে অপরাধীর মতোন চুপসে দাঁড়িয়ে আছে দীপাঞ্জলি। এ পথে আজ কোনো পথিক নেই। নির্জন-নির্মল পরিবেশে মেয়েটা ভয় পাচ্ছে, কিন্তু এ অপ্রাকৃতিক ভয় শাশুড়ির ভয়ের কাছে তুচ্ছ মনে করে ম্লানমুখে দাঁড়িয়ে আছে সে। জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতন- ‘কোন এক বিপদের গভীর বিস্ময় আমাদের ডাকে’। দীপাঞ্জলির এখন যেন আমাকে ডাকে বিষণ্ন বিপদ, এ রকম অস্থির অবস্থা। এ যেন পাকা ধানের ওপর দিয়ে বয়ে যায় দুপুরের ক্লান্ত বাতাস। একঝাঁক দুঃখ এসে দীপাঞ্জলির বুকে ভর করে আছে। মাথায় রাশি রাশি চিন্তা।
সজল এখনো বাড়ি আসেনি, নয়তো একটু হলেও বউয়ের খবর নিত। দীপাঞ্জলি ভাবে- বেলা তো গড়াল, রাত বাকি। মানুষটার জলসেচ এখনো শেষ হয়নি? আর যদি বাড়িই ফেরে, তাহলে আমাকে খুঁজতে তার একটু ইচ্ছে হলো না?
ক্লাসের ফার্স্ট বয়ের মতো আকাশের ধ্রুবতারা সবচেয়ে আগে দৃশ্যমান হলো। তারপর আকাশে তারার সংখ্যা বাড়তে থাকে।
রুদ্র সুশান্ত
বায়েজিদ, চট্টগ্রাম
তারেক
.jpg)
.jpg)