তাসমানিয়ার ইতিহাসে একটি নাম বারবার ফিরে আসে; উইলিয়াম ল্যানি, যাকে বেশির ভাগই চিনে ‘কিং বিলি’ নামে। তিনি কোনো যুদ্ধে নিহত হননি, কিন্তু তার গোটা জাতিগোষ্ঠিকেই প্রায় মুছে ফেলা হয়েছিল পৃথিবীর মানচিত্র থেকে। মৃত্যুর পরও শান্তিতে ঘুমাতে দেওয়া হয়নি তাকে। তার দেহ নিয়ে চলেছিল গবেষণা, আর তাকে সমাহিত করতে লেগেছিল দীর্ঘ ১২২ বছর। এর আগে তার শরীর, মাথার খুলি আর অস্থিগুলো পৃথিবীর নানা জায়গার গবেষণাগার ও মিউজিয়ামের অন্ধকারাচ্ছন্ন আলমারিতে ছড়িয়ে ছিল।
১৮৩০ সালে জন্ম নেওয়া উইলিয়াম ল্যানি ছিলেন তাসমানিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আদিবাসী গোত্র তার্কিনেনের সন্তান। তখন তাসমানিয়া ছিল ইউরোপীয় উপনিবেশের আক্রমণে ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমি দখল হয়ে যাচ্ছিল, তাদের সংস্কৃতি, ভাষা, বিশ্বাস সবকিছু ধীরে ধীরে বিলীন হচ্ছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা দ্বীপটিকে ‘সভ্যতার পরীক্ষাগার’ বানাতে চেয়েছিল, কিন্তু আসল উদ্দেশ্য ছিল এক ভয়ংকর নিধনযজ্ঞের আয়োজন। হাজার বছরের পুরোনো জাতিগোষ্ঠী একে একে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, আর শেষদিকে ল্যানিকে বলা হতে থাকে তাসমানিয়ার ‘শেষ পূর্ণ রক্তের’ আদিবাসী পুরুষ। কারণ, তার রক্তে ছিল না কোনো ইউরোপীয় মিশ্রণ।
জীবনের শুরুতেই তাকে পরিবারসহ ধরে নিয়ে যাওয়া হয় উইবেলেনিয়া নামের এক এলাকায়, যেখানে ইউরোপীয়রা আদিবাসীদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখত। সেখানে বেঁচে থাকা ছিল এক অনন্ত বন্দিদশা। যুবক বয়সে ল্যানি পালিয়ে গিয়ে সমুদ্রে কাজ নেন। হোয়েলিং ও সিলিংয়ের নৌকায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন, দূরের জগতে খুঁজে পেতেন কিছুটা মুক্তির স্বাদ। কিন্তু তার ভাগ্যে স্বাধীনতা ছিল না, ছিল ইতিহাসের শেষ পৃষ্ঠা হয়ে ওঠা!
১৮৬৯ সালের মার্চ মাসে ল্যানি মারা যান। বয়স তখন চল্লিশের কোঠায়। মৃত্যুর পর স্থানীয়ভাবে তাকে সমাহিত করা হয়। কিন্তু শুরু হয় আরেক অমানবিক প্রতিযোগিতা। তাসমানিয়ার রয়্যাল সোসাইটি ও স্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসকরা দাবি করে, এই দেহ নাকি তাদের বৈজ্ঞানিক সম্পত্তি। রাতে তার কবর ভেঙে কেউ মাথার খুলি কেটে নেয়, কেউ অঙ্গচ্ছেদ করে রাখে ‘গবেষণার জন্য’। মৃত্যুর পর তার দেহ হয়েছিল এক ঔপনিবেশিক লুণ্ঠনের শিকার।
এরপরের ঘটনাগুলো আরও নির্মম। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার হাড়, খুলির অংশ, এমনকি ত্বকের নমুনা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। কিছু অংশ মিউজিয়ামে প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়, কিছু অংশ গবেষণাগারে বছরের পর বছর সংরক্ষিত থাকে।
তাসমানিয়ার আদিবাসীরা দীর্ঘকাল ধরে লড়াই চালিয়ে যান তার দেহের অবশিষ্ট অংশ ফিরিয়ে আনার জন্য। অবশেষে ১৯৯১ সালে, অর্থাৎ মৃত্যুর ১২২ বছর পর, উইলিয়াম ল্যানির দেহাংশ ফিরিয়ে আনা হয় তাসমানিয়ায়। সেই মাটিতেই তাকে সমাহিত করা হয়, যেখান থেকে মুছে দেওয়া হয়েছিল তার পুরো জাতিকে।
ইতিহাসের নির্মমতার সাক্ষ্য বহনকারী ‘কিং বিলি’র গল্পটি আজও বেঁচে আছে এক জাতির যন্ত্রণাদায়ক সংগ্রামের প্রতীক হয়ে।
তারেক/
.jpg)
.jpg)