পৃথিবীর পাখিজগৎ যেন এক আশ্চর্য রঙের রাজ্য যেখানে প্রতিটি ডানায়, প্রতিটি পালকে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির অজস্র গল্প। কারও সৌন্দর্য চোখে মুগ্ধতা আনে, কারও মনে বিস্ময় জাগায়। কিন্তু কিছু পাখি আছে যারা একই সঙ্গে সৌন্দর্য শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার প্রতীক। তেমনই এক অসাধারণ পাখি হলো সেক্রেটারি বার্ড (Secretary Bird)। আফ্রিকার তপ্ত প্রান্তরে রাজকীয় ভঙ্গিতে পাখিটির হাঁটা এক জীবন্ত বিস্ময়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Sagittarius Serpentarius, যার অর্থ ‘সাপ-বিধ্বংসী ধনুর্ধর’ আর সত্যিই নামের মতোই এটি প্রকৃতির এক অদ্বিতীয় শিকারি।
আফ্রিকার তৃণভূমিতে তাদের রাজত্ব: সেক্রেটারি বার্ড একমাত্র শিকারি পাখি যে আকাশে নয়, মাটিতে রাজত্ব করে। এর আবাস আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে বিশেষত দক্ষিণ আফ্রিকা, বতসোয়ানা, নামিবিয়া, কেনিয়া, তানজানিয়া, ইথিওপিয়া ও উগান্ডার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে। এরা ঘন বনভূমি এড়িয়ে চলে কারণ তারা শিকার দেখে ধরতে চায় দূর থেকে। খোলা সাভানা ও আধা মরুভূমি অঞ্চলের উষ্ণতা আর নীরবতাই তাদের উপযুক্ত পরিবেশ। ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এরা পা মেলে বের হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে মাটিতে হাঁটাহাঁটি করে শিকারের খোঁজে এক দিনে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারে। এমন দৃশ্য আফ্রিকার প্রান্তরে প্রায়ই দেখা যায়- একটি উঁচু পা ওয়ালা ধূসর পাখি, রাজকীয় ভঙ্গিতে এগিয়ে চলেছে অসীম দিগন্তের দিকে।
দেহগঠন: সৌন্দর্যের সঙ্গে শক্তির মিশেল প্রাপ্তবয়স্ক একটি সেক্রেটারি বার্ডের উচ্চতা ১.২ থেকে ১.৩ মিটার পর্যন্ত, আর ডানার বিস্তার দুই মিটার, যা তাকে করে তোলে পাখিজগতের অন্যতম লম্বা সদস্য। শরীরের রং ধূসর, লেজের প্রান্ত কালচে, চোখের চারপাশে কমলা বা লালচে ত্বক, যা তার দৃষ্টিকে করে তীক্ষ্ণ ও ভয়ংকর।
সবচেয়ে নজরকাড়া হলো মাথার পেছনের কালো পালকের ঝুঁটি। তবে তার আসল শক্তি লুকিয়ে আছে দীর্ঘ ও শক্তিশালী পায়ে। প্রতি পায়ে চারটি আঙুল যার নিচের দিকটি খসখসে ও মজবুত। এই পায়ের আঘাতেই মৃত্যু আসে সবচেয়ে ভয়ংকর সাপেরও।
শিকারি চরিত্র ও খাদ্যাভ্যাস: সেক্রেটারি বার্ড প্রকৃতির এক অনন্য শিকারি। এর প্রধান খাবার হলো সাপ, কিন্তু তা ছাড়াও এটি ইঁদুর, টিকটিকি, ব্যাঙ, ঘাসফড়িং, ছোট পাখি এমনকি কমবয়সী খরগোশও খায়। এরা সাধারণত সকাল ও বিকেলে শিকার করে। তাদের চোখ এত তীক্ষ্ণ যে, দূরত্বে নড়াচড়া করা কোনো প্রাণীও সহজে চোখ এড়াতে পারে না। প্রথমে এটি শিকারকে তাড়িয়ে বিভ্রান্ত করে তারপর বজ্রগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে দ্রুত ও ধারাবাহিক আঘাত করে। একেকটি আঘাতের শক্তি প্রায় ১৯৫ নিউটন, যা সাপের মাথা মুহূর্তে থ্যাঁতলে দিতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলেন, সেক্রেটারি বার্ড এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়েই মরণ আঘাত হানতে পারে। এই কারণেই আফ্রিকার লোককথায় একে বলা হয় সাপের মৃত্যুদূত (Messenger of Death to Serpents)।
পরিবার ও প্রজনন: সেক্রেটারি বার্ড একগামী; অর্থাৎ একবার জুটি বাঁধলে তারা সারা জীবন একসঙ্গে থাকে। প্রজনন মৌসুমে পুরুষ পাখি আকাশে ঘূর্ণি তৈরি করে ডানার প্রদর্শনী করে স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করে।
তারা অ্যাকাশিয়া বা বাবলা জাতীয় উঁচু গাছে বাসা তৈরি করে। একটি বাসার ব্যাস প্রায় ১১.৫ মিটার এবং উচ্চতা ৫ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। স্ত্রী পাখি সাধারণত ২ থেকে ৩টি ডিম পাড়ে। ডিমে তা দেওয়া, খাদ্য জোগানো এবং ছানা লালন সব কাজেই স্ত্রী ও পুরুষ সমানভাবে অংশ নেয়। ডিম ফোটার পর ছানাগুলো প্রাথমিকভাবে দুর্বল থাকে, কিন্তু ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। প্রায় ৮০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে তারা উড়তে শেখে এবং শিকার অনুশীলন শুরু করে।
পরিবেশে গুরুত্ব ও সংরক্ষণের প্রয়োজন: প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় সেক্রেটারি বার্ডের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা সাপ ইঁদুর ও ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে কৃষিজমির ফসল রক্ষা করে। এজন্য অনেক আফ্রিকান গ্রামে একে ‘ফসলের রক্ষক’ বলা হয়। কিন্তু আজ এই পাখি বিপদের মুখে।
বনভূমি নিধন, কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক বিষের ব্যবহার, বিদ্যুৎ তারে সংঘর্ষ এবং শিকারজনিত কারণে এর সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ ২০২০ সালে সেক্রেটারি বার্ডকে বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে ঘোষণা করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় এখন বিশেষ সংরক্ষণ কেন্দ্র তৈরি হয়েছে যেমন- Kgalagadi Transfrontier Park ও Kruger National Park যেখানে এই পাখিদের প্রজনন ও নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা হচ্ছে।
তারেক/
.jpg)
.jpg)