ইতিহাস বলতে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধুলোবালিমাখা কোনো প্রাচীন পুঁথি, জরাজীর্ণ অট্টালিকা কিংবা কোনো এক প্রচণ্ড প্রতাপশালী রাজা-বাদশাহর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কাহিনি। আমরা মনে করি ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় বন্দি এক মৃত বিষয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এবং জেনেটিক্স আমাদের এক সম্পূর্ণ নতুন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ইতিহাস শুধু ধ্বংসাবশেষের ইট-পাথরে নয়, ইতিহাস বয়ে চলে আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে, রক্তস্রোতে—নীরবে এবং অদৃশ্যভাবে।
মানুষের কোষের ভেতরে থাকা জিনের বর্ণমালার মাধ্যমেই লেখা থাকে তার পূর্বপুরুষের গৌরবোজ্জ্বল বা নাটকীয় যাত্রাপথ। আর সেই জেনেটিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং রোমাঞ্চকর এক অধ্যায়ের নাম—চেঙ্গিস খান। ১২০০ শতাব্দীতে যিনি ঘোড়ার পিঠে চড়ে অর্ধেক পৃথিবী কাঁপিয়েছিলেন, তার অস্তিত্ব আজ কেবল ইতিহাসের পাতায় বা মঙ্গোলিয়ার স্তেপ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বর্তমান বিশ্বের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের ডিএনএতে তিনি আজও সমানভাবে জীবন্ত।
ড. তাতিয়ানা জুরজালের যুগান্তকারী গবেষণা
ইতিহাসের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের এই মেলবন্ধন ঘটেছিল ২০০৩ সালে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জেনেটিক সাময়িকী ‘American Journal of Human Genetics’-এ একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়, যা পুরো বিশ্বের বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছিল। এই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন বিখ্যাত জেনেটিক বিজ্ঞানী ড. তাতিয়ানা জুরজাল। তিনি এবং তার একদল গবেষক এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার পুরুষের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেন এবং সেগুলো নিয়ে দীর্ঘ সময় ল্যাবরেটরিতে কাজ করেন।
গবেষণার মূল হাতিয়ার ছিল Y-ক্রোমোজোম। জীববিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, এই ক্রোমোজোম শুধু বাবা থেকে ছেলের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এটি শত শত বছর ধরে প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। X-ক্রোমোজোমের মতো এটি মিশ্রিত হয়ে যায় না। ফলে হাজার বছর আগের কোনো এক আদিপিতার সন্ধান পাওয়ার বা বংশধারা নির্ণয় করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো এই Y-ক্রোমোজোম বিশ্লেষণ।
এক জিনে কোটি মানুষ
ড. জুরজাল এবং তার গবেষক দল যখন সংগৃহীত নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করতে শুরু করলেন, তখন তারা এক অভাবনীয় তথ্যের মুখোমুখি হলেন। তারা দেখলেন-
মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের প্রায় ৮ শতাংশ পুরুষের মধ্যে একটি বিশেষ এবং অভিন্ন জেনেটিক চিহ্ন (Genetic Marker) বিদ্যমান। এই নির্দিষ্ট জেনেটিক প্যাটার্নটি বিশ্বের অন্য কোনো অঞ্চলের মানুষের মধ্যে প্রায় দেখাই যায় না। বর্তমান বিশ্বের প্রতি ২০০ জন পুরুষের মধ্যে একজন এই নির্দিষ্ট জিনের বাহক।
গাণিতিক হিসাবে এই সংখ্যাটি বের করার পর বিজ্ঞানীরা স্তব্ধ হয়ে যান। দেখা যায়, পৃথিবীতে প্রায় ১৬ কোটি মানুষ বর্তমানে একই পৈতৃক উত্তরাধিকার বহন করছেন। মানব ইতিহাসের পাতায় একজন মাত্র সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে এত বিশাল সংখ্যক মানুষের জন্ম নেওয়ার ঘটনা বিরলতম একটি ঘটনা। বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ জেনেটিক ধারাকে ‘স্টার ক্লাস্টার’ (Star-cluster) হ্যাপলোগ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সূত্র যখন মঙ্গোল সাম্রাজ্য ও তিমুচিন
জেনেটিক বিজ্ঞানীরা যখন এই বিশেষ জিনের সময়কাল বা ‘অরিজিন’ নির্ণয় করতে বসলেন, তখন দেখা গেল এর উৎপত্তিকাল আনুমানিক ৮০০ থেকে ১০০০ বছর আগে। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, এই সময়কালটি মঙ্গোল সাম্রাজ্যের উত্থানের সময়ের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। গবেষক ও ইতিহাসবিদরা এখন প্রায় সবাই একমত যে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর আদিপিতা স্বয়ং মঙ্গোল অধিপতি চেঙ্গিস খান অথবা তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কোনো পুরুষ পূর্বপুরুষ (যেমন তার দাদা বা পিতা)।
১১৬২ সালের দিকে জন্ম নেওয়া তিমুচিন, যিনি পরবর্তীতে ‘চেঙ্গিস খান’ বা ‘বিশ্ব অধিপতি’ নাম ধারণ করেন, তিনি প্রশান্ত মহাসাগর থেকে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। আর সেই ভৌগোলিক বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল তার বংশগত জৈবিক চিহ্ন।
কেন এই অভাবনীয় সংখ্যা?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, মাত্র এক হাজার বছরেরও কম সময়ে একজন ব্যক্তির পক্ষে কীভাবে ১৬ কোটি বংশধর রেখে যাওয়া সম্ভব? সমাজবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান এখানে একত্রে কাজ করে। চেঙ্গিস খান শুধু একজন দক্ষ সেনাপতি বা রণকৌশলী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক বিশাল বংশের মূল স্থপতি। তার বংশধারা অবিশ্বাস্য গতিতে ছড়িয়ে পড়ার কারণগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট-
প্রথমত, মঙ্গোলদের রাজনৈতিক কাঠামো ছিল এমন যে, রাজবংশের পুরুষরা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে চরম প্রভাবশালী ছিলেন। দ্বিতীয়ত, চেঙ্গিস খানের ছিল শত শত স্ত্রী ও উপপত্নী। তার জয়ের প্রতিটি অভিযানের পর পরাজিত পক্ষ থেকে রাজকন্যা বা নারীদের গ্রহণ করার প্রথা মঙ্গোলদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। শুধু চেঙ্গিস খানই নন, তার পুত্র ও পৌত্ররাও বিশাল বিশাল অঞ্চল শাসন করতেন এবং তাদেরও ছিল বিশাল পরিবার। আবার, ইতিহাস থেকে জানা যায়, চেঙ্গিস খানের জ্যেষ্ঠ পুত্র জোচির একাই ছিল প্রায় ৪০ জন পুত্র। এই ৪০ জন পুত্রের প্রত্যেকেই আবার বিশাল জনগোষ্ঠীর রাজা বা নেতা ছিলেন এবং তাদেরও ছিল অসংখ্য সন্তান।
বিজ্ঞানীরা এই অনন্য প্রক্রিয়াটিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন— ‘Reproductive success through social dominance’ নামে। অর্থাৎ, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে একটি নির্দিষ্ট জিনের অভাবনীয় দ্রুত বিস্তার। সাধারণ মানুষের যেখানে দুই-তিনজন সন্তান হতো, সেখানে এই শাসক বংশের একেকজন পুরুষের শতাধিক সন্তান থাকাটা অস্বাভাবিক ছিল না। এভাবেই কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এই জিনের বাহক সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়।
তারেক/
.jpg)
.jpg)