শর্ত অনুযায়ী চাকরিতে আবেদন করার যোগ্যতা না থাকলেও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দাপটের সঙ্গে শিক্ষকতা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে মো. ইউসুফ নামে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এই শিক্ষক এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৩.৫০ ও এইচএসসিতে পেয়েছেন ৩.০৪। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে তোলপাড় চলছে।
নিয়োগের বিষয়ে পত্রিকায় দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ ছিল, অবশ্যই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় যেকোনো একটিতে জিপিএ-৪ (এ) পেতে হবে এবং স্নাতকে প্রথম শ্রেণি (ন্যূনতম ৩.৫) থাকতে হবে। আবেদন করার শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার পরও নিয়োগ কমিটি কীভাবে মো. ইউসুফকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল, আর তিনি পাঁচ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে শিক্ষকতা করছেন- এমন প্রশ্ন তুলে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোলাম রব্বানী।
তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর আবেদন জানিয়েছেন তিনি। বেরোবির রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী আলমগীর চৌধুরী লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগে জানা গেছে, ২০১১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে (বর্তমান নাম ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ) প্রভাষক/সহকারী অধ্যাপক পদে একজনকে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী প্ল্যানিং কমিটি গঠন না করেই শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির শর্তাবলির আলোকে আবেদনকারীদের যোগ্যতা যেন যাচাই-বাছাই না করা হয়, সে জন্যই প্ল্যানিং কমিটি গঠন করা হয়নি। এই বিভাগে শুধুমাত্র একটি পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলেও বাছাই বোর্ড তিন প্রার্থীকে স্থায়ীভাবে নিয়োগের সুপারিশ করে, যা বেআইনি। শুধু তা-ই নয়, বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী মো. ইউসুফের যোগ্যতা পূরণ না হলেও তাকে ভাইভা কার্ড ইস্যু করা হয়। নিয়োগ বাছাই বোর্ডে ছিলেন বেরোবির তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল জলিল মিয়াসহ পাঁচজন। বাছাই বোর্ডের সদস্যরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেও মো. ইউসুফকে তারা নিয়োগের সুপারিশ করেন।
মো. ইউসুফ এসএসসিতে জিপিএ ৩.৫০, এইচএসসিতে ৩.০৪ পেয়েছেন। এসএসসিতে গণিতে সি এবং এইচএসসিতে ইংরেজিতে ডি পাওয়া এই ব্যক্তি স্নাতকে দ্বিতীয় শ্রেণি পেয়েছেন। আবেদনকারীদের মধ্যে অনেক যোগ্য প্রার্থী থাকলেও বাছাই বোর্ড সুপারিশ করেনি। শুধু তা-ই নয়, কৌশলে নিয়োগ বাছাই বোর্ড বেরোবি আইনের ২৯ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করে একটি প্রভাষক পদে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও দুজন ও অধ্যাপক পদে একজনসহ তিনজনকে নিয়োগ করার সুপারিশ করে, যা বাস্তবসম্মত ছিল না। অভিযোগে আরও বলা হয়, ইতিহাস বিভাগে একটি স্থায়ী পদের কথা উল্লেখ থাকলেও তিনজনকে নিয়োগ করার সুপারিশ করা ছিল নজিরবিহীন। মজার বিষয় হলো, নিয়োগদানের সুপারিশের সব লেখা টাইপ করা থাকলেও প্রভাষক পদে ‘এক’ শব্দটি কলম দিয়ে কেটে ‘তিন’ লিখে দেওয়া হয়, যা অনভিপ্রেত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এ বিষয়ে অভিযোগকারী বেরোবির ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোলাম রব্বানী বলেন, ‘বেরোবির মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন অযোগ্য ব্যক্তিকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়াটা সমাজের জন্য লজ্জার। যে ব্যক্তি এসএসসি-এইচএসসির একটিতেও জিপিএ ৪ পাননি। শুধু তা-ই নয়, এসএসসিতে গণিতে সি, এইচএসসিতে ইংরেজিতে ডি পান- তার শিক্ষকতা করার কোনো অধিকার নেই। তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠদানের নামে প্রতারণা করছেন।’ তিনি অবিলম্বে তার নিয়োগ বাতিল এবং শিক্ষকতার দায়িত্ব থেকে সরানোর আবেদন করেছেন বলে জানান।
এ বিষয়ে মো. ইউসুফ দাবি করেন, “নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি শর্তাবলির ‘ঘ’তে বলা হয়েছে, ‘কোনো পরীক্ষায় বি গ্রেডের নিচে অথবা তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণি গ্রহণযোগ্য হবে না।’ এই অনুযায়ী আমি আবেদনের যোগ্য। সে জন্যই আমাকে বাছাই বোর্ড সুপারিশ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে গ নম্বর শর্তে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার যেকোনো একটিতে ন্যূনতম ‘A’ (৫.০০ পয়েন্টভিত্তিক গ্রেড সিস্টেমে সিজিপিএ/জিপিএ ন্যূনতম ৪.০) থাকতে হবে- এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এটা সার্কুলারের দুর্বলতা। এর দায় আমার নয়।”
মো. ইউসুফ সৈয়দপুর গভর্নমেন্ট বোর্ড হাইস্কুল থেকে ২০০১ সালে এসএসসি ও সৈয়দপুর গভর্নমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০০৩ সালে এইচএসসি পাস করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার কোনো গবেষণাপত্র নেই। তবে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. ওয়াজেদ ইনস্টিটিউটে (এখনো অনুমোদন পায়নি) এমফিল করার জন্য ভর্তি আছেন। যদিও এর কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি।