স্তন ক্যানসার জয় করা একজন নারী আত্মীয়ের বাস্তবতা ফাহমিদা সুলতানার মনে গভীর দাগ কাটে। সেই নারী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত বেঁচে ফেরেন। অথচ যে চিকিৎসকের অধীনে তিনি চিকিৎসা নিয়েছিলেন, তার অন্য কোনো রোগীই এই কঠিন রোগ থেকে বাঁচেননি। এই ঘটনা ফাহমিদার চিন্তাধারায় বড় পরিবর্তন আনে। নারীদের জন্য স্তন ক্যানসার সচেতনতা এবং প্রাথমিক শনাক্তকরণের উপায় নিয়ে কিছু করার প্রবল অনুপ্রেরণা জন্ম নেয় তার মনে।
বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসার সবচেয়ে সাধারণ ক্যানসার এবং নারীমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থার (IARC) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ১৩ হাজার নারী এই রোগে আক্রান্ত হন এবং মারা যান ৭ হাজারের বেশি। অথচ নিয়মিত নিজে নিজে পরীক্ষার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই এটি আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো সচেতনতা তৈরি হয়নি এখনো। তার ওপর, নিজে নিজে পরীক্ষার যেসব সরঞ্জাম পাওয়া যায়, সেগুলো দাম তুলনামূলক বেশি এবং সহজলভ্যও নয়।
ফাহমিদা বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল এমন কিছু তৈরি করা যা সহজ, হাতের নাগালে এবং সাশ্রয়ী।’
এই লক্ষ্য থেকেই জন্ম নেয় ‘নিওস্ক্রিনিক্স’। ‘নিওস্ক্রিনিক্স’ হলো একটি উদ্ভাবনী প্রযুক্তি যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে স্তন ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তে সাহায্য করে। এই প্রকল্পটি ফাহমিদা ও তার চার সহপাঠী- এইচ এম শাদমান তাবিব, সাদাতুল ইসলাম সাদি, মো. হাসনাইন আদিল এবং পৃথু অনন মিলে তৈরি করেছেন। এরা সবাই বুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী।
দলে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিল। ফাহমিদা ছিলেন দলনেতা ও প্রজেক্ট ডিজাইনার, সাদি ব্যাকএন্ড ডেভেলপমেন্ট এবং তাবিব মেশিন লার্নিং মডেল নিয়ে কাজ করেছেন। আদিল ছিলেন ফ্রন্টএন্ড ডেভেলপার এবং পৃথু ছিলেন হার্ডওয়্যার ডেভেলপার। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন দুজন মেডিকেল শিক্ষার্থী। একজন ঢাকা মেডিকেল কলেজের জারিন তাসনিম আর অন্যজন রংপুর মেডিকেল কলেজের রিবাতুল ইসলাম। তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ছিলেন বুয়েটের সিএসই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সোহেল রহমান।
‘নিওস্ক্রিনিক্স’এর যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি স্থানীয় ‘বিজনেস আইডিয়া’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে। যদিও শুরুতে তারা বিজয়ী হতে পারেননি। তবে প্রতিটি ধাপেই তারা জ্ঞান ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ হয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় এক সময় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান তারা।
‘নিওস্ক্রিনিক্স’ দল জন হপকিন্স হেলথকেয়ার ডিজাইন কম্পিটিশনে ডিজিটাল হেলথ ট্র্যাক ২০২৫ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। প্রতিবছর আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে দ্য জনস হপকিনস সেন্টার ফর বায়োইঞ্জিনিয়ারিং ইনোভেশন অ্যান্ড ডিজাইনিং। এমআইটি, হার্ভার্ডসহ বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪০টি দলের মধ্য থেকে তারা বিজয়ী হয়। তারা ৫ হাজার ডলার পুরস্কার পান। আর এই অর্থ ভবিষ্যতে প্রকল্পের গবেষণা ও উন্নয়ন কাজে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
প্রতিযোগিতায় তাদের প্রস্তাবনা ছিল- একটি মোবাইল অ্যাপ ও পোর্টেবল ইমেজিং ডিভাইসের সমন্বয়ে তৈরি সিস্টেম, যা ব্যবহারকারীদের স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করতে সহায়তা করে। তবে এখনো এটি সাধারণ মানুষের ওপর প্রয়োগ শুরু হয়নি। এ সম্পর্কে তাবিব জানান, ‘আমাদের অ্যাপটি ধারাবাহিকভাবে উন্নত হচ্ছে। তবে নিজে নিজে পরীক্ষা করার কিট নিয়ে এখনো অনেক কাজ বাকি। আগামী দুই-তিন মাস আমরা এই কিটটির পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ তৈরিতে ব্যস্ত থাকব।’
এই কিটটি প্রস্তুত হলে তা দেশের ক্যানসার রোগীদের ওপর পরীক্ষা করা হবে। প্রাপ্ত তথ্য এআই মডেলে যুক্ত করে উন্নত করা হবে মডেলটি। এরপর পেটেন্টের জন্য আবেদন এবং বাজারজাত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে দলটি মনে করে, এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য পুরস্কারের অর্থ যথেষ্ট নয়। পেশাদার পরামর্শ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আরও অর্থায়ন প্রয়োজন পড়বে। তবে কিছু দেশীয় কোম্পানি তাদের সঙ্গে সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে। ফাহমিদা ও তার দল বিশ্বাস করেন, ‘নিওস্ক্রিনিক্স’ শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, এটি একটি সামাজিক উদ্যোগ- যার মাধ্যমে নারীরা নিজের স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতন হবেন এবং ক্যানসার শনাক্ত হলে সময়মতো ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
সদিচ্ছা, লক্ষ্য এবং কঠোর পরিশ্রম দিয়ে বিশ্বমঞ্চে যাওয়ার এই ঘটনা দেশের জন্য অসামান্য সম্মান বয়ে এনেছে এবং একই সঙ্গে, যা মেধাবী তরুণ-তরুণীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে বড় বড় চিন্তা করতে।
/রিয়াজ