জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফেরদৌসী খাতুন যেন নামেই শিক্ষক। বেতন-ভাতা তুললেও ছয় বছর ধরে ক্লাস নেন না। নিয়োগও পেয়েছেন অনিয়ম করে। শিক্ষকদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শিক্ষার্থীদেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে ড. ফেরদৌসী খাতুন বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। তিনি ২০১২ সালের ১৮ নভেম্বর প্রভাষক পদে যোগ দেন। সেই বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, প্রভাষক এবং সহকারী অধ্যাপক উভয় পদেই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রার্থীদের যেকোনো একটিতে প্রথম শ্রেণি থাকতে হবে। কিন্তু ড. ফেরদৌসী খাতুনের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে উভয়টিতেই দ্বিতীয় শ্রেণি ছিল।
সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য প্রভাষক পদে দুই বছর চাকরি করার কথা থাকলেও তিনি ২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পদোন্নতি পান। অর্থাৎ প্রভাষক পদে চাকরি স্থায়ী না করেই সহকারী অধ্যাপক হন।
বিভাগে যত অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ইউনিট কমিটির সদস্য ও বিভাগীয় সভাপতিদের সঙ্গে ফেরদৌসী খাতুন অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও এর কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। এরপর ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ইউনিট-১ (বিজ্ঞান শাখা)-এর ভর্তি পরীক্ষা চলার সময় প্রশ্ন নিয়ে বের হয়ে যান এবং শিক্ষকদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। এ ব্যাপারে অভিযোগ দেওয়া হলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং তাকে ভর্তি পরীক্ষার কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়।
এ ছাড়া বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. পারভীন আক্তার জেমি ২০২১ সালের ২১ নভেম্বর তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও নানা ধরনের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেন ফেরদৌসী খাতুনের বিরুদ্ধে। বাংলা বিভাগের শিক্ষকরাও তার এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে অভিযোগ দেন। ১০ দিনের মধ্যে ড. ফেরদৌসীর লিখিত জবাব দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
বিভাগের একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি ঠিকমতো ক্লাস নেন না। ক্লাসে অপ্রাসঙ্গিক কথা বলেন। মিডটার্মের উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করেন না। সেমিস্টার পরীক্ষাতেও মার্কস দেন নিজের ইচ্ছামতো। ক্লাস কিংবা পরীক্ষার হলে শিক্ষকদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। কাজ করতে আগ্রহ দেখান না। সব শিক্ষকের রুমে গিয়ে ক্ষমতার দম্ভ দেখান।
তার এসব কর্মকাণ্ডে বাংলা বিভাগের শিক্ষকরা ২০২১ সালের ২০ ডিসেম্বর তাকে বিভাগ থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং তার সঙ্গে অ্যাকাডেমিক কাজে অংশ নিতে অসম্মতি জানান। শিক্ষকরা তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি স্থাপনের দাবি জানান।
ফেরদৌসী খাতুনের অনিয়মের বিষয়ে বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস বলেন, ‘একবার তিনি আমার ও আরেকজন শিক্ষকের সঙ্গে ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়েছেন। ওই ঘটনায় আমরা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সরকার আলী আককাস বলেন, ‘এটা অনেক দিন আগের কথা। তিনি আগে যে কলেজে পড়াতেন (সম্ভবত হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ) সেই কলেজে ভর্তি পরীক্ষার ডিউটি চান। আমরা দিতে না চাইলে তিনি খারাপ আচরণ করেন। এরপর আমরা সবাই ডিন মিলে তার বিরুদ্ধে উপাচার্য বরাবর অভিযোগ দিই।’
এ বিষয়ে বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সেলিম মোজাহার খবরের কাগজকে বলেন, ‘তিনি অনেক দিন বিভাগে পড়ান না। অ্যাকাডেমিক কাজ সবার সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হয়। তবে তার সঙ্গে বিভাগের অন্যদের কাজ করতে অসুবিধা হয়। পরীক্ষায় ডিউটি কিংবা পরীক্ষা কমিটির সদস্য, সব জায়গায় তার সঙ্গে কাজ করতে অসুবিধা হয়। তিনি সবার সঙ্গেই খারাপ আচরণ করেন।’
এ বিষয়ে ফেরদৌসী খাতুনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে খবরের কাগজ প্রতিবেদকের পরিচয় পাওয়ার পর ভুল নাম্বার বলে ফোন কেটে দেন। এরপর একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং ফোনে খুদেবার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি। এরপর সরাসরি সাক্ষাৎ করলে তিনি এ প্রতিবেদকের ওপর চড়াও হন এবং অকথ্য ভাষা ব্যবহার করেন।
ক্লাস না নিয়েও বেতন নেওয়ার বিষয়ে জবি রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মো. শেখ গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘তার বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগ আমরা তদন্ত করছি।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. রেজাউল করিম বলেন, ‘তোমরা যেটা ধরেছ সেটা ঠিকই। তার সবকিছুতেই সমস্যা। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চলমান আছে।’
ফেরদৌসী খাতুনের নিয়োগের সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তাকে ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করে খবরের কাগজ প্রতিবেদককে তার অফিসে গিয়ে কথা বলতে বলেন।
জবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক বলেন, ‘একটি শিক্ষিত সমাজে শিক্ষক ও সাংবাদিক- উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। কারও সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ বা হুমকি-ধমকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিপন্থি। সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। যদি কোনো শিক্ষক অনভিপ্রেত আচরণ করে থাকেন, অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। সবাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম রক্ষায় সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।’