কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীকে ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে সন্ত্রাসী নাটকের চেষ্টা, নিয়োগ বাণিজ্য, শিক্ষার্থীকে হেনস্তা ও জঙ্গি কারখানা আখ্যা দিয়ে ইসলামি মক্তব বন্ধ, জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী কর্মকাণ্ড ও আন্দোলনকারীদের বিপক্ষে নানা চক্রান্তের অভিযোগ রয়েছে সাবেক প্রক্টর ড. মাহবুবর রহমানের বিরুদ্ধে। তিনি ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, ঝিনাইদহের শৈলকূপায় ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. হারুন উর-রশীদ আসকারির গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ড. মাহবুবের মদদপুষ্ট হয়ে মাসুদ নামে এক শিক্ষার্থীকে ক্রসফায়ারের হুমকি দেয় পুলিশ। এর আগে, ২০১৮ সালের ১৯ জানুয়ারি একই স্থানে মাসুদসহ বেশকিছু শিক্ষার্থী ডাকাতের কবলে পড়েন। পরে ২৮ জানুয়ারি মাসুদসহ বাকি শিক্ষার্থীদের প্রক্টর অফিসে ডাকেন মাহবুব। প্রক্টর অফিস থেকে তাদের শৈলকুপা থানায় পাঠানো হয়।
মাসুদের ভাষ্য, থানা থেকে বাকি শিক্ষার্থীদের ছেড়ে দেওয়া হলেও তাকে ছাড়া হয়নি। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, তার কল হিস্ট্রিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শিবির সেক্রেটারি শাহজালালের কল ছিল। তাই তাকে না ছেড়ে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে ক্রসফায়ারের নাটক সাজানো হয়। এ সময় আসকারীর গাড়িবহরে হামলার পিছনে শিবিরের তৎকালীন সভাপতি হাদিউজ্জামান ও সেক্রেটারি শাহজালালের হাত ছিল বলে তার সঙ্গে জোরাজোরি করা হয়। এ সময় তিনি মিথ্যা সাক্ষী দিতে রাজি না হওয়ায় পার্শ্ববর্তী ‘চড়িয়ার বিল’ এলাকায় নিয়ে ক্রসফায়ারের হুমকি দেয় পুলিশ।
এছাড়া আওয়ামী লীগের আমলে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে ড. মাহবুবের বিরুদ্ধে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুব ও ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. রুহুল আমিনের চাকরি বাণিজ্য সংক্রান্ত একটি অডিও ফাঁস হয়। ড. মাহবুব ওই অডিওতে আব্দুল হালিম নামের এক নিয়োগপ্রার্থীকে ভাইভার পর ডেকে ব্রেইনওয়াশ করতে বলেন ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. রুহুল আমিনকে।
এই অডিওতে ড. মাহবুবকে বলতে শোনা যায়, ‘ও (হালিম) চালাকি করতেছে, এখন যদি ওর ব্রেইনওয়াশ না করে দেই তাহলে বিরাট সর্বনাশ হয়ে যাবে।’
তবে তার বিরুদ্ধে বারবার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের শিশু সন্তানদের মানসম্মত ধর্মীয় শিক্ষাদানের জন্য ২০১২ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে মক্তব চালু করা হয়। পরবর্তীতে মাহবুব ইসলামি ওই মক্তবকে জঙ্গি কারখানা আখ্যা দিয়ে কয়েক দফা পুলিশি তল্লাশি চালিয়ে বন্ধ করে দেন বলে জানান অধ্যাপক ড. আব্দুল হান্নান শেখ। তিনি মক্তবটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন।
এছাড়া ২০১৬ সালের শেষের দিকে ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদা খাতুনকে জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে প্রক্টরের কার্যালয়ে হেনস্তা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভূক্তভোগী মাহমুদা জানান, নিজেদের ধারণার উপর ভিত্তি করে প্রক্টর তার অফিসে ডেকে আমাকে জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে প্রায় ৪০ মিনিট হেনস্তা করা হয়। আমার নেকাব খুলে ছবি তোলা হয় এবং হিজাব খুলতে জোরাজুরি করা হয়। আমি হিজাব খুলতে রাজি না হওয়ায় আমার বাবাকে ফোন করে আমাকে বাসায় নিয়ে যেতে বলেন প্রক্টর।
এদিকে জুলাই গণ-অভূত্থানে ছাত্র-জনতার প্রতি হাসিনার হত্যাকাণ্ডের সময়ে তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে মিছিলের নেতৃত্ব দেন ড. মাহবুব। এই ভূমিকায় তার বিরুদ্ধে কেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তা জানতে তাকে শোকজ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমানকে ৫ বার কল দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
এদিকে ড. মাহবুবের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিচার চেয়ে রবিবার (২৪ আগস্ট) বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির। এ সময় তার বিচার ও বহিষ্কার দাবি করেন শিবিরের নেতা-কর্মীরা।
এ সময় ইবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাহমুদুল হাসান বলেন, শিক্ষার্থীদেরকে যিনি নাটক সাজিয়ে জঙ্গি সাজানোর চেষ্টা করেন এবং ক্রসফায়ারের মুখোমুখি করেন, তিনি কখনো শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় থাকার যোগ্যাতা রাখে না। ইবিতে হেন কোনো অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি। কিন্তু এখনো তিনি বহাল তবিয়তে আছেন, যা জুলাই শহিদদের প্রতি বেঈমানি। তাকে দ্রুত বিচারের আওতায় এনে বহিষ্কার করা হোক।
নিয়ামতুল্লাহ/অমিয়/