রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সম্প্রতি সাইবার বুলিং বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। রাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে-বেনামে গড়ে ওঠা গ্রুপ ও পেইজগুলোতে এটি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নারী শিক্ষার্থীদের দেরিতে হলে ফেরা নিয়ে প্রাধ্যক্ষের নোটিশকে ঘিরে আলোচনায় এসছে সান্ধ্য আইন। সার্বিকভাবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভূক্তভোগীরা।
গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সান্ধ্য আইন কার্যকর নেই বলে মন্তব্য করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব। কিন্তু খোজঁ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ সালে প্রাধ্যক্ষ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সান্ধ্য আইন কার্যকর আছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সুত্রে জানা যায়, দেরিতে হলে ফেরায় গত ১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই-৩৬ হলের ৯১ ছাত্রীকে অফিসে তলব করে নোটিশ দেয় প্রাধ্যক্ষ ড. লাভলী নাহার। ওইদিন রাতেই নোটিশের ছবি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসলে সমালোচনার মুখে পরদিন সকালে নোটিশ প্রত্যাহার করে হল প্রশাসন।
‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ নামক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৫ হাজার শিক্ষার্থীর প্রাইভেট ফেসবুক গ্রুপে হলের নোটিশ সংক্রান্ত একটি পোস্টে ওই ৯১ ছাত্রী নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন হল শাখা ছাত্রদলের এক নেতা। ওই মন্তব্যের স্ক্রীণশর্ট নিয়ে আবারও সমালোচনা তৈরি হয়। হলের মেয়েদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করায় বুধবার মধ্যরাতে হলের সামনে বিক্ষোভ করে জুলাই-৩৬ হলের শিক্ষার্থীরা। পরে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) এবং ওই হলের প্রাধ্যক্ষ সেখানে উপস্থিত হয়ে অশালীন মন্তব্যকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা হলে ফিরে যায়। পরদিন ওই নেতাকে আজীবন বহিষ্কার করে শাখা ছাত্রদল।
এদিকে গত ৩১ আগস্ট প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীদের ভোটার তালিকায় অর্ন্তভুক্তির দাবিতে রাকসুর কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে আন্দোলন করে শাখা ছাত্রদল। সেখানে শিক্ষার্থী-শিবির-ছাত্রদল হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার ভিডিও বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের বেশ কয়েকটি গ্রুপ ও পেইজে ছড়িয়ে পড়লে ভিডিওতে থাকা শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিন বিশ্বাস এশা ও সহ-সভাপতি জান্নাতুন নাঈম তুহিনাকে নিয়ে বিভিন্ন অশ্রাব্য মন্তব্য করা হয়।
জুলাই-৩৬ হলের ঘটনা সামনে আসলে বুলিংয়ের শিকার হওয়া এই নেত্রীরা তাদের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে জাহিন বিশ্বাস এষা খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি নারীদের সাইবার বুলিং রোধে পদক্ষেপ নিতে। সর্বশেষ জুলাই-৩৬ হলের নারী বোনরা সেদিন প্রতিবাদ করেছে আমি এটাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্ত বিভিন্ন সময় আমিও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হই কিন্তু আমাদের বেলায় আর কেউ প্রতিবাদ করে না। আমার মনে হয় নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা সমন্বয়হীনতা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামনে রাকসু কেন্দ্র করে যখন আমাদের প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রুপগুলোর সহায়তা নিতে হবে তখন বুলিংয়ের পরিমাণটা আরও বৃদ্ধি পাবে। আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আহ্বান জানাই, রাকসু সামনে রেখে যে সাইবার সেল গঠন করা হয়েছে সেটা কার্যকর করা হোক। তা-না হলে নারীরা রাকসু থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে।’
সাইবার বুলিং রোধে কমিটি গঠন
রাকসু নির্বাচনে সাইবার বুলিং রোধে কমিটি গঠন করেছে রাকসু নির্বাচন কমিশন। গত ৩০ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. একরামুল হামিদকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের এ কমিটি গঠর করা হয়।
এদিকে বুলিং রোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে গড়ে ওঠা বেশ কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপ এবং পেইজের তথ্য চেয়ে নোটিশ দিয়েছে প্রক্টর দপ্তর। বৃহস্পতিবার প্রক্টও অধ্যাপক মাহবুবর রহমান স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ‘ইউনিভার্সিটি অফ রাজশাহী’ এবং ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়’ কী-ওর্য়াড সংবলিত ফেসবুক গ্রুপ, আইডি, পেইজ ইত্যাদিও এডমিন, মডারেটরদের তথ্য জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, নোটিশ দেওয়ার পর অনেকেই তথ্য দিচ্ছে। আমরা সেগুলো সংগ্রহ করছি। আর সাইবার বুলিং রোধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চাইলে ভূক্তভোগী লিখিত অভিযোগ দিলে সেক্ষেত্রে আমাদের কাজ করতে সহজ হবে। তাছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে করতে হলে কোনো কাজই হবে না।
কমিটির কাজের বিষয়ে অধ্যাপক মো. একরামুল হামিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইবার বুলিং সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা নেই। কমিটির পর আমরা অনলাইনে একবার মিটিং করেছি। বিস্তরাতি কাজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গ্রুপ ও পেইজের এডমিনদের তথ্য প্রয়োজন, এ বিষয়ে প্রক্টর দপ্তর কাজ করছে। তবে সাইবরা বুলিং রোধে আমাদের সচেতনা আসল বিষয়। অনেকে ফেক আইডি, ভিপিএন ব্যবহার কওে আইডি চালায় সেক্ষেত্রে এই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা অসম্ভব।’
সান্ধ্য আইনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক ড. শারমিন হামিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্য আইন আছে। ২০২৩ সালে প্রাধ্যক্ষ পরিষদের একটি সিদ্ধান্তে বলা আছে শীতকালে রাত আটটা এবং গ্রীস্মকাল রাত ১০টার মধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থীদের হলে ফিরতে হবে। এরপর ২০২৩ সালে আবারও এই আইন নিয়ে আলোচনা হয়। সেসময় উভয় ঋতুতেই রাত ৯টার মধ্যে নারী শিক্ষার্থীদের হলে ফেরার কথা বলা হয়েছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এই বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। তবে সাম্প্রতিক বিষয়কে সামনে রেখে আমরা আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
এসএন/