নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃতি বরাবরই মানুষের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। বিশেষ করে যেখানে দুই নদীর মিলন ঘটে, সেখানে যেন প্রকৃতির সৌন্দর্য আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়। এমনই এক মনোমুগ্ধকর স্থান কুষ্টিয়ার পদ্মা-গড়াই মোহনা। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা এই স্থানে সম্প্রতি সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্মরণীয় এক ভ্রমণের আয়োজন করে বৃহত্তর ফরিদপুর ছাত্রকল্যাণ সমিতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি), কুষ্টিয়া। বৃহত্তর ফরিদপুর ছাত্রকল্যাণ সমিতি একটি আঞ্চলিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ফরিদপুর অঞ্চলের— ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলার শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে ফরিদপুর অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি, নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ ও প্রবীণ শিক্ষার্থীদের বিদায়, পারস্পরিক সহায়তা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত ছাত্রসমাজ গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে।
গত ২৯ জানুয়ারি ভ্রমণের দিন নির্ধারণ করা হয়। সেদিন শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকে জড়ো হতে শুরু করেন। বাসে যাত্রা শুরু হয়। বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে বাসটি কুষ্টিয়া শহরের মজমপুর এলাকায় পৌঁছায়। সেখান থেকে এবং ক্যাম্পাস থেকে আসা শিক্ষার্থীরা ইজিবাইকে করে হরিপুর ব্রিজের দিকে রওনা দেন। অন্যদিকে শহরে অবস্থানরত কয়েকজন সদস্য বিকেলে ৩টা ৩০ মিনিটের মধ্যেই হরিপুর ব্রিজের নিচে অবস্থিত ট্রলারঘাটে পৌঁছে যান। বিকেল ৪টা ১০ মিনিটের দিকে ধীরে ধীরে সবাই হরিপুর ব্রিজের নিচের ট্রলারঘাটে একত্রিত হন। সবাই একত্রিত হওয়ার পর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উদ্যোগে একটি তুলনামূলক বড় ট্রলার ভাড়া করা হয়। ট্রলারে উঠেই সবার চোখে ধরা পড়ে গড়াই নদীর ওপর নির্মিত হরিপুর ব্রিজ এবং তার পেছনে বিস্তৃত সীমাহীন আকাশ। দৃশ্যটি ছিল অপার শান্তি ও সৌন্দর্যে ভরপুর। মাঝি নৌকা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীপথের যাত্রা শুরু হয় এবং নদীর বুকে ভেসে ওঠে এক ভিন্ন রকম অনুভূতি। গড়াই নদীর স্বচ্ছ পানির ওপর দিয়ে চলতে থাকা ট্রলারে কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে নদী ও আকাশের মেলবন্ধনের দৃশ্য উপভোগ করছিল। গল্প, হাসি আর প্রাণবন্ত আড্ডার ফাঁকে ক্যামেরাবন্দি হতে থাকে মুহূর্তগুলো। গ্রুপ ছবি, সিঙ্গেল ছবি— সব মিলিয়ে স্মৃতির অ্যালবাম সমৃদ্ধ হতে থাকে।
প্রায় আধাঘণ্টার নৌভ্রমণের পর ট্রলার পৌঁছে যায় পদ্মা-গড়াই মোহনায়। এটি পদ্মা ও গড়াই নদীর মিলনস্থল। কুষ্টিয়া জেলা ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন বহু দর্শনার্থী এই স্থানটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন।
ট্রলারঘাটে ভিড়লে একে একে সবাই নেমে আসে নদীর বালুময় তীরে। সবার নামা শেষ হলে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে শুরু হয় প্রাণবন্ত গল্প-আড্ডা। এর পর সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তোলা হয় গ্রুপ ছবি। পদ্মা-গড়াই মোহনার পটভূমিতে ফরিদপুর অঞ্চলের ইবিয়ানদের এই ছবি যেন ভবিষ্যতের জন্য এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে রইল। নির্ধারিত সময়জুড়ে সবাই পদ্মা ও গড়াই নদীর সংযোগস্থলের কিনারা ধরে হেঁটে বেড়ান। নদীর স্বচ্ছ পানির ওপর পড়া সূর্যের আলো প্রকৃতিকে এক অনন্য রূপে সাজিয়ে তোলে। সেই দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয় প্রতিটি হৃদয়। বইয়ের পাতায় দেখা সৌন্দর্যের চেয়েও যেন বাস্তবের এই রূপ বহুগুণ বেশি মনোমুগ্ধকর। দুই নদীর মিলন শুধু একটি ভৌগোলিক দৃশ্য নয়, এটি যেন মানুষকে ভাবতে শেখায়— প্রকৃতি যেখানে মিলেমিশে থাকে, সেখানে মানুষের মধ্যে এত ভেদাভেদ কেন? পদ্মা-গড়াই মোহনার নীরবতা, প্রশান্তি ও বিশালতা সবাইকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও আত্মমগ্ন করে তোলে।