বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) পদোন্নতির দাবিতে শিক্ষকদের শাটডাউন কর্মসূচি চলছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষক আন্দোলনের কারণে বন্ধ রয়েছে ক্লাসসহ সব ধরনের পরীক্ষা। এ ছাড়া প্রশাসনিক দপ্তরগুলোতে ঝোলানো হয় তালা। কার্যত আন্দোলনের কারণে বন্ধ রয়েছে ববির অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম।
এ অবস্থায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ও গোপন নথি ফাঁসের ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত থাকা এসব নথি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে শিক্ষক মহলে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ, উদ্বেগ ও অবিশ্বাস।
এসব সমস্যার সমাধানে আলোচনার জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার ববি ক্যাম্পাসে যান বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারসহ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা। তবে তাদের সঙ্গে শিক্ষকরা আলোচনায় বসেননি। এ কারণে একই দিন দুপুরের দিকে ববির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলমের নির্দেশে রেজিস্ট্রার ও অর্থসহ বিভিন্ন দপ্তরের তালা ভেঙে ফেলা হয়।
এদিকে শিক্ষকদের শাটডাউন কর্মসূচির কারণে এ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ৪৬টি পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। এ কারণে সেশনজট চরম আকার ধারণ করার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় বরিশালের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা চলমান সংকট দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
আন্দোলনরত শিক্ষকদের অভিযোগ, গত বুধবার উপাচার্যের সঙ্গে কয়েকটি ছাত্রসংগঠন, সাংবাদিক সংগঠন ও বিভিন্ন সক্রিয় সংগঠনের প্রতিনিধিদের বৈঠকের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের গোপন নথি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। পাশাপাশি আন্দোলনরত শিক্ষকদের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনুসারী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
তাদের দাবি, চলমান আন্দোলন ভিন্ন খাতে নিতে এবং শিক্ষকদের চাপে ফেলতেই পরিকল্পিতভাবে গোপনীয় নথি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে আন্দোলনরত শিক্ষকরা বলেন, চলমান ‘কমপ্লিট শাটডাউন’-এর কারণে রেজিস্ট্রার দপ্তরসহ অধিকাংশ কার্যালয় বন্ধ ছিল। এ অবস্থায় গোপন নথি বাইরে এল কীভাবে? গোপনীয় সব নথি ভিসি এবং তার দপ্তরে সংরক্ষিত থাকে। তার নির্দেশ ছাড়া এই নথি প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, ‘আমরা এক বছর আগে পদোন্নতির জন্য কাগজ জমা দিয়েছি। ওই নথিগুলো একান্তই গোপনীয়। এসব নথি উপাচার্য ও তার দপ্তর ছাড়া অন্য কারও হাতে যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু চলমান আন্দোলনের মধ্যে সেগুলো প্রকাশ্যে চলে এসেছে। এটি শুধু অনৈতিক নয়, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তারও লঙ্ঘন। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।’
আরেক শিক্ষক বলেন, বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের অক্টোবরেও ৮০টি গোপনীয় নথি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময় উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আন্দোলনের সম্মুখসারির শিক্ষক ও জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মো. হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, শিক্ষকেরা তাদের ন্যায্য দাবির পক্ষে আন্দোলন করছেন। আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে বাস্তবতাকে আড়াল করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান আন্দোলনেও নানা মত ও আদর্শের শিক্ষক রয়েছেন। এই আন্দোলনে বিএনপি, জামায়াত, বামধারা কিংবা আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন মতাদর্শের শিক্ষক যুক্ত আছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা শিক্ষকদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ট্যাগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন, সেটি তাদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। আমরা মনে করি, এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থের আন্দোলন নয়। বরং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মান-মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাভাবিকতা রক্ষার প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত।’
আন্দোলনকারী শিক্ষক ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. ধীমান কুমার বলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর ধরে ন্যায্য পদোন্নতির জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়েই আমরা ক্লাস–পরীক্ষা বন্ধের মতো কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ না আসায় কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হয়েছি।’
মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আবদুল কাইয়ুম বলেন, শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে আমাদের ‘পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে’। এ কারণে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মো. জাহিদ হোসেন বলেন, দাবি আদায়ে আন্দোলন-সংগ্রাম প্রতিটি মানুষের নাগরিক অধিকার। তবে শিক্ষকদের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ তুলে শিক্ষকদের পদোন্নতি আটকে দেওয়া হলে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট নিরসনে দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তা না হলে চলমান আন্দোলন আরও জটিল রূপ নিতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন।’
এসব বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ বলেন, ২৪ জন অধ্যাপকের মধ্যে ১২ জনের পদ রয়েছে। বাকিদের পদ সৃষ্টি হয়নি। বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে–এতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সবাইকে যুক্ত থাকতে হবে। ১২ জন শিক্ষকের পদোন্নতির জন্য পুরো বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকতে পারে না। শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে এ ধরনের আন্দোলনও সমীচীন নয়।