ধরুন, একদিন ঘুম ভেঙে শুনলেন আপনি পুরো একটা দেশের সম্রাজ্ঞী হয়ে গেছেন, তাহলে কেমন অনুভূতি হবে? এমনটাই হয়েছিল রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিন আলেক্সয়েভিনার সঙ্গে। সময়কাল ১৭৬২ সালের ২৮ জুন। এক অভ্যুত্থানে তার স্বামী রাশিয়ার জার তৃতীয় পিটার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় তিনি ওই পদে অধিষ্ঠিত হন।
সম্রাজ্ঞী হওয়ার খবর শুনে তিনি হন্তদন্ত হয়ে ছুটলেন। সেন্ট পিটার্সবার্গের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল সেদিন। বাহনে চড়ে ক্যাথরিন যখন সেন্ট পিটার্সবার্গের রাস্তা প্রদক্ষিণ করছিলেন, তখন রাস্তার দুই পাশের মানুষ তার জয়ধ্বনি দিচ্ছিল। ক্যাথরিনের স্বামী পিটার সিংহাসনে ছিলেন মাত্র ছয় মাস। সেই সময়কালে রাশিয়াজুড়ে চলছিল দাঙ্গাহাঙ্গামা, অভ্যুত্থান এবং অরাজকতা। পিটারকে ক্ষমতাচ্যুত এবং নতুন সম্রাজ্ঞীর সিংহাসনে আরোহণ তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছিল। দুরাবস্থা কাটিয়ে রাশিয়াকে বিশ্ব শক্তিতে পরিণত করার পেছনে অবদান রাখায় পরবর্তীতে তাকে ‘ক্যাথরিন দ্য গ্রেট’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
১৭২৯ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসের ২ তারিখ প্রুশিয়া কিংবা বর্তমান পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন এই সম্রাজ্ঞী। ছোটবেলা থেকেই ক্যাথরিন ছিলেন অত্যন্ত সুন্দরী ও মেধাবী। তার ব্যক্তিত্ব যে কাউকে আকৃষ্ট করত। ক্যাথরিন প্রচুর পরিমাণে সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ইতিহাস বিষয়ক বই পড়তেন। বই পড়ার খাতিরে ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের সঙ্গে তার চিঠি আদান-প্রদান হতো বলেও ধারণা ইতিহাসবিদদের।
তৎকালীন সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথ অব রাশিয়া ক্যাথরিনের সঙ্গে নিজের ভাগ্নে পিটারের বাগদানের ব্যবস্থা করেন। পিটারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের মধ্যদিয়ে ক্যাথরিন রাশিয়ার রাজপরিবারে প্রবেশ করেন। কিন্তু তাদের বৈবাহিক জীবন কখনোই সুখকর ছিল না। তাদের মতবিরোধ লেগেই থাকত। পিটার যদিও রাশিয়ার জার ছিলেন, কিন্তু ক্যাথরিনের বিরুদ্ধাচরণ করায় তিনি শেষ পর্যন্ত এক ভয়াবহ সামরিক অভ্যুত্থানের সম্মুখীন হন। পিটার শেষ পর্যন্ত সিংহাসন ছাড়তে বাধ্য হন। রাশিয়ার সামরিক বাহিনী, গির্জার ধর্মযাজক কিংবা সাধারণ মানুষ সবাই নতুন সম্রাজ্ঞী হিসেবে ক্যাথরিনকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। শুধু সিংহাসন বা মুকুট তাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ক্যাথরিন চেয়েছিলেন ইউরোপের অন্যান্য পরাশক্তি, বিশেষ করে ব্রিটেন ও ফ্রান্স তার জাতিকে যথাযথ সম্মান করুক। আর এই লক্ষ্য সামনে রেখেই তিনি শাসনকার্য চালিয়ে যেতে থাকেন।
এদিকে অভ্যুত্থান সফল হওয়ায় সেনাবাহিনী পিটারকে আটক করে রোপশা নামক গ্রামে নিয়ে যায়। সেখানে পিটারকে গ্রিগরি অরলভের ভাই গ্রিগরিভিচের হেফাজতে রাখা হয়। কিছুদিন পর সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন পিটার।
পরবর্তী তিন দশকে রাশিয়ান সামরিক বাহিনীর শক্তিসামর্থ্য আরও বাড়িয়ে তোলেন ক্যাথরিন। পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে শুরু করে দূর-দূরান্তের কয়েকটি সাম্রাজ্যে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে ইউরোপে তোলপাড় সৃষ্টি করেন রাশিয়ানরা। পূর্বদিকে পোল্যান্ডকে বিভক্ত করার পাশাপাশি লিথুয়ানিয়া এবং বেলারুশকে পরাজিত করে রাশিয়ানরা। অতঃপর দক্ষিণের অটোমানদের বিরুদ্ধাচরণ করতেও দুবার ভাবেননি ক্যাথরিন!
১৭৭০ সালের চেসমা যুদ্ধে জয়লাভ করে রাশিয়া। এই যুদ্ধে প্রায় ৯ হাজার তুর্কি যোদ্ধা নিহত হন। অন্যদিকে, মাত্র ৬০০ রাশিয়ান সেনা নিহত হন। এমন অনেক যুদ্ধে ক্যাথরিনের অনুগত সেনারা জয়লাভ করেছিল।
ক্যাথরিন নিজের নীতিতে সবসময় অটুট ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন রাশিয়াকে মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণা থেকে বের করে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে অভ্যস্ত করে তুলতে। এরই ধারাবাহিকতায় ব্রিটেনের প্রথম প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ওয়ালপোলের চিত্রকর্ম, ফ্রান্স থেকে সাংস্কৃতিক ধন-রত্ন কিনে সেন্ট পিটার্সবার্গে একটি সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা করেন ক্যাথরিন। এর দেয়ালে দেয়ালে ৩৮ হাজার বই এবং ১০ হাজার চিত্রকর্ম রাখা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, ক্যাথরিনের নির্দেশে বার্ষিক বাজেটের ১২ শতাংশ সংগ্রহশালার জন্য ব্যয় করা হতো। তার কল্যাণেই রাশিয়ার সংস্কৃতির স্বর্ণযুগের শুভসূচনা ঘটেছিল।
ক্রমশই ক্যাথরিন নিজের কর্মক্ষমতা হারাতে শুরু করেন। ১৭৯৬ সালের ১৬ নভেম্বর সেন্ট পিটার্সবার্গের উইন্টার প্যালেসে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন বলে রাজপরিবারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়।
জাহ্নবী
.jpg)