ঢাকা ৭ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ২১ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টস জিতে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ রোবট চরিত্রে জেনা ওর্তেগা কঠিন পরাজয় সুইডেনকে আরও শক্তিশালী করবে: পটার সালাহকে ঠেকাতে চাই দলগত প্রচেষ্টা: হার্বার্ট আব্বা আমার জীবনের আদর্শ: ববিতা গৌরীপুরে রিপোর্টার্স ক্লাবের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি তৃতীয়বার মা হচ্ছেন অ্যানি হ্যাথাওয়ে সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন আর নেই অদ্ভুত ঠোঁটের রহস্যময় শুবেল রাশিয়ার ২০০০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা নিয়োগ দেবে ব্র্যাক এনজিও, সাপ্তাহিক ছুটি ২ দিন এবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন জনাব মো. ফজলুর রহমান ব্রিটিশ ভারতের পথিকৃৎ নারী চিকিৎসক ডা. যামিনী সেন আমার ‘দুই’ বাবা: রক্তের সম্পর্কে একজন, ভালোবাসায় আরেকজন জাইমা রহমানকে নিয়ে অশালীন পোস্ট, আখাউড়া থানায় অভিযোগ নারীর সফল ক্যারিয়ারের ৬ টিপস রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার তিউনিসিয়াকে উড়িয়ে নকআউটের আশা বাঁচিয়ে রাখল জাপান বদলির সাড়ে চার মাসেও দায়িত্বভার হস্তান্তরে গড়িমসি ইউএইচএফপিওর ইরাক ম্যাচের আগে ছোটখাটো পরিবর্তনের পথে ফ্রান্স শিশু গৃহকর্মীর মৃত্যু: রিমান্ডে প্রকৌশলী সবিবুর ও তার স্ত্রী নিউমার্কেটে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল, আটক ৪ শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধন চলতি বছরেই: বিমানমন্ত্রী রূপগঞ্জে আন্তর্জাতিক ইয়োগা দিবস পালিত প্রোগ্রামিং ভাষা অধ্যায়ের ১৬টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৯ম পর্ব, এইচএসসির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি জার্মানদের ওপর চটেছেন আইভরি কোস্টের কোচ নবীগঞ্জে ট্রাকচাপায় অটোচালক নিহত, সড়ক অবরোধ লন্ডনে হাসনাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে সুইজারল্যান্ডে জেডি ভ্যান্স

কর্মজীবী নারীর যত প্রতিবন্ধকতা

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৪, ০১:১২ পিএম
আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২৪, ০১:১৩ পিএম
কর্মজীবী নারীর যত প্রতিবন্ধকতা
মডেল: পরমা; ছবি: আদিব

চৌকাঠ ডিঙিয়ে নারী ঘরের বাইরে পা রেখেছেন অনেক আগেই। পুরুষের পাশাপাশি কাজ করছেন সমান তালে। কায়িক শ্রম, মেধাভিত্তিক বা কোনো চ্যালেঞ্জিং পেশা- সব ক্ষেত্রেই নারীরা নিজেদের প্রমাণ করেছেন সফলভাবে। তবুও কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রবেশের বিষয়টি এখনো চ্যালেঞ্জিং। কর্মজীবী নারীদের জন্য রয়েছে নানা সামাজিক বাধা, বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা। কর্মজীবনে নারী বলেই কারও হয়েছে খারাপ অভিজ্ঞতা। কেউ আবার উচ্চশিক্ষিত হয়েও সুযোগ পাননি নিজের দক্ষতাকে প্রকাশ করার। কর্মজীবনে প্রবেশে বাধা, প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি নিয়ে কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন তাসনিম তাজিন

‘রাতে ফেরা পছন্দ করতেন না বাড়িওয়ালা’

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক পাস করে বের হন লিয়া আক্তার। স্নাতক শেষে যুক্ত হয়েছিলেন একটি আইটি কোম্পানিতে। বাসা থেকে কর্মস্থল দূরে হওয়ায় বাসায় ফিরতে কিছুটা দেরি হতো তার। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত অভিযোগ করতেন বাসার মালিক।

লিয়া বলেন, রাত ৮টায় অফিস শেষ করে জ্যাম ঠেলে বাসায় ফিরতে ১১টা বেজে যেত। মেয়েদের এত রাতে বাড়ি ফেরা নিরাপদ নয় বলে প্রায়ই রাগ করতেন বাড়িওয়ালা। সন্ধ্যার ভেতর বাড়ি ফেরা যাবে, এমন চাকরি কেন করছে না বলেও অভিযোগ করতেন অনেক সময়। চাইলেই তো আর নিজের ইচ্ছামতো চাকরি পাওয়া যায় না। ব্যাচেলরদের জন্য যেকোনো নতুন জায়গায় বাসা নেওয়াও সহজ নয়। বর্তমানে লিয়া উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তিনি জানান, এখানে শুরু থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন পার্টটাইম কাজ করছেন। কাজ শেষে রাত ১২টার পরও বাড়ি ফিরতে অনিরাপদ বোধ হয় না। পুরুষ হোক বা নারী- কাজ শেষে রাতে ঘরে ফেরা নিয়ে কারও অভিযোগ নেই। তিনি মনে করেন, ঘরের বাইরে নারীদের নিরাপত্তা অবশ্যই প্রয়োজন। পাশাপাশি নারীদের চলাফেরার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার মানসিকতাও বদলানো প্রয়োজন। যার কোনোটিই বাংলাদেশে নেই। তাই দেশে ফিরতে তেমন আগ্রহ পান না তিনি।

‘স্বামীর বাধায় স্বপ্ন পূরণ হলো না’

সমাজে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার আশায় দন্তচিকিৎসা নিয়ে পড়েছিলেন স্বপ্না হোসেন (ছদ্ম নাম)। বিয়ের পর ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে বাধা হয়ে দাঁড়ান স্বামী। পেশা জীবনের জন্য মা-শাশুড়ির সহযোগিতা নিয়ে বাচ্চা মানুষ করতে পারবেন না, সাফ জানিয়ে দেন তিনি। কথা না মানলে বাচ্চাদের রেখে তালাক দিয়ে দেবেন বলেও হুমকি দেন স্বামী। মেয়েদের তালাক হওয়া সমাজ ভালো চোখে দেখবে না। তাই স্বামীর এমন কথার পর বাবার পরিবারও চাপ দেয় ক্যারিয়ারের চিন্তা পুরোপুরি বাদ দিতে। স্বপ্না বলেন, চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়ে সাধারণত কেউ ঘরে বসে থাকেন না। উচ্চশিক্ষিত স্বামীও তার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইচ্ছা বুঝতে পারবেন বলেই মনে করেছিলেন তিনি। কিন্তু বাস্তবতা বিপরীত। এক ছেলে ও এক মেয়ের মা স্বপ্না। সন্তানরা বড় হচ্ছে। নিজের ইচ্ছা জলাঞ্জলি দিলেও মেয়েকে দক্ষ, সাবলম্বী করতে আজীবন সমর্থন জুগিয়ে যাবেন বলে জানান তিনি। স্বপ্না মনে করেন, বিয়ের আগেই নিজের ক্যারিয়ার, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা উচিত। অনেকে বিয়ের আগে রাজি হলেও বিয়ের পর চাকরিতে বাধা দেন। নারীরা নিজের ইচ্ছার মূল্যায়ন না করলে পরে আক্ষেপ হয়। নিজেদের মতামত, ইচ্ছা ও অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়াও উচিত।

‘যৌন হেনস্তায় চাকরি ছাড়ি’

একটি সংবাদ মাধ্যম অফিসে ব্যবস্থাপনা বিভাগে চাকরি করতেন শান্তা (ছদ্ম নাম)। মালিকপক্ষের এক কর্মকর্তার আচরণ অস্বস্তিকর লাগত শুরু থেকেই। একদিন তিনি কিছু দরকারি কাগজপত্র নিয়ে তার রুমে যেতে বলেন। রুমে যাওয়ার পরই সরাসরি গায়ে হাত দিয়ে বসেন ওই ব্যক্তি। সে যাত্রায় চিৎকার ও প্রতিবাদ করে রুম থেকে বের হয়ে রক্ষা পেয়েছিলেন শান্তা। তবে পরদিনই চাকরি ছাড়তে হয়েছিল তাকে।

আমাদের দেশে কর্মস্থলে যৌন হয়রানির শিকার হলে তার জন্য রয়েছে নির্ধারিত আইনি ব্যবস্থা। কোনো আইনি সাহায্য নিয়েছিলেন কিনা- জানতে চাইলে বলেন, ক্ষমতাবান মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস করেননি। তাছাড়া, একজন নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্তার শিকার হলে অনেক সহকর্মী ওই নারীকে নিয়েই রসিকতা করেন। তাই দ্রুত চাকরি ছেড়ে বের হয়ে যান তখন। হঠাৎই চাকরি ছাড়ায় বেশ কঠিন অবস্থায় পড়েছিলেন শান্তা। পরিবারের বড় মেয়ে হিসেবে ছোট এক ভাই ও বোনের পড়ার খরচ, ঢাকায় নিজের থাকা-খাওয়ার খরচ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় সময় পার করেছেন অনেক দিন।

‘সব পেশা গ্রহণযোগ্য নয়’

উচ্চমাধ্যমিক শেষে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন জান্নাতুল মাওয়া। এ ক্ষেত্রে মাওয়ার প্রেমিকের ছিল পূর্ণ সমর্থন। বিপত্তি বাধে যখন সরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউট ছাড়া আর কোথাও সুযোগ পাননি তিনি।

বর্তমানে নার্সিং নিয়ে অধ্যয়নরত মাওয়া জানান, এখানে আসতে বাধা দিয়েছিলেন তার সঙ্গী। সঙ্গীর ভাষ্যমতে, নার্সিং পেশায় থাকা নারীদের জন্য সম্মানজনক নয়। এই পেশায় জড়িত নারীদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে সমাজ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেকোনো সাধারণ বিষয়ে পড়াশোনা করতে বলেন তাকে। মাওয়া জানান, তিনি অপারগ ছিলেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মতো সামর্থ্য তার ছিল না। তাই সম্পর্কের ইতি টানেন।

মাওয়া মনে করেন, নার্স, পুলিশ বা চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীরা যারা কাজ করেন তাদের কাজের সঙ্গে চরিত্রকে মিলিয়ে ফেলার এক অদ্ভুত প্রবণতা আছে সমাজের। এই অবান্তর ধারণার বিরোধিতা করতেই নার্সিংয়ে পড়ার জেদ আরও চেপে বসেছিল তার। এমন ধারণা একসময় পুরোপুরি বদলাবে বলে আশা রাখেন তিনি।

বহুদিন ধরে যে সমাজব্যবস্থা ঘুণে ধরা, তা সহজে বদলায় না। তবু দিনবদলের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলতে হয়। গানের একটি লাইনের মতো বলতে হয়, ‘বন্দি জীবন ঘুরে দাঁড়ালেই মুছে যাবে অবরোধ’।

জাহ্নবী

ব্রিটিশ ভারতের পথিকৃৎ নারী চিকিৎসক ডা. যামিনী সেন

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১২:৫২ পিএম
ব্রিটিশ ভারতের পথিকৃৎ নারী চিকিৎসক ডা. যামিনী সেন

বাংলার নারী জাগরণের ইতিহাসে কিছু নাম আজও যথাযথভাবে আলোচিত হয় না, অথচ তাদের অবদান যুগান্তকারী। তেমনই একজন অগ্রদূত ছিলেন ডা. যামিনী সেন। ব্রিটিশ শাসনামলে যখন নারীদের উচ্চশিক্ষা, বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অংশগ্রহণ ছিল নানা সামাজিক কুসংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের বেড়াজালে আবদ্ধ, তখন তিনি নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও সাহস দিয়ে সেই দেয়াল ভেঙে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।

ডা. যামিনী সেনের জন্ম উনিশ শতকের শেষভাগে এমন এক সময়ে, যখন মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। সমাজের প্রচলিত ধারণা ছিল, নারীর স্থান ঘরেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু তিনি সেই ধারণাকে অস্বীকার করে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নের পথ বেছে নেন। তার পরিবারের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।

কলকাতা মেডিকেল কলেজে নারীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে তখনো নানা জটিলতা ছিল। তবু যামিনী সেন চিকিৎসাশিক্ষায় নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন এবং পরবর্তী সময়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ইংল্যান্ডে যান। সে সময় একজন ভারতীয় নারী হিসেবে ব্রিটিশ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। জাতিগত বৈষম্য, ঔপনিবেশিক মানসিকতা এবং নারী হওয়ার কারণে অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতা–সবকিছুর মুখোমুখি হয়েও তিনি পিছিয়ে যাননি।

ইংল্যান্ডে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের উচ্চতর ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণ অর্জন করেন এবং ব্রিটিশ চিকিৎসাব্যবস্থার কঠোর মানদণ্ডে নিজেকে যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করেন। 

দেশে ফিরে তিনি নারীর স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাশিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সে সময় অনেক নারী পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে সংকোচবোধ করতেন। ফলে তাদের চিকিৎসা প্রায়ই অবহেলিত হতো। ডা. যামিনী সেন সেই সংকট দূর করতে আন্তরিকভাবে কাজ করেন। নারী রোগীদের প্রতি তার সহমর্মিতা, দক্ষতা এবং মানবিক আচরণ তাকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।

তিনি বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও নিজের যোগ্যতার পরিচয় দেন। চিকিৎসা পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তিনি বারবার তুলে ধরতেন। তার বিশ্বাস ছিল, সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের বাইরে রেখে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। তাই তিনি শুধু রোগ নিরাময়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি; নারীদের শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা ও আত্মনির্ভরতার গুরুত্বও তুলে ধরেছেন।

ডা. যামিনী সেনের জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হলো তার আত্মবিশ্বাস। ব্রিটিশ শাসকদের আধিপত্যপূর্ণ পরিবেশে একজন ভারতীয় নারী হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করা ছিল প্রায় অসম্ভবের মতো। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছেন, যোগ্যতা ও অধ্যবসায়ের সামনে বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা ঔপনিবেশিক পরিচয় কোনো স্থায়ী বাধা হতে পারে না। তার সাফল্য পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য নারীকে চিকিৎসাবিদ্যা ও অন্যান্য পেশায় এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছে।

ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের দুর্গে নিজের মেধার পতাকা উড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন–একজন বাঙালি নারীও বিশ্বমানের চিকিৎসক হতে পারেন, নেতৃত্ব দিতে পারেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন পথ তৈরি করতে পারেন।

/এসএল

নারীর সফল ক্যারিয়ারের ৬ টিপস

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
নারীর সফল ক্যারিয়ারের ৬ টিপস

বর্তমান বিশ্বে নারীরা শিক্ষা, প্রযুক্তি, ব্যবসা, চিকিৎসা, প্রশাসন কিংবা সৃজনশীল শিল্প–প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। তবে একটি সফল ক্যারিয়ার গড়ে তোলা শুধু মেধার ওপর নির্ভর করে না; এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, ধারাবাহিক শেখা এবং মানসিক দৃঢ়তা। কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বা ‘লেসন’ একজন নারীকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও সফল হতে সাহায্য করতে পারে।

নিজের লক্ষ্য স্পষ্ট করুন

ক্যারিয়ার কোথায় নিয়ে যেতে চান, তা আগে নিজেকেই জানতে হবে। পাঁচ বা দশ বছর পর নিজেকে কোন অবস্থানে দেখতে চান, সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। স্পষ্ট লক্ষ্য থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয় এবং কাজের প্রতি মনোযোগও বাড়ে।

শেখার অভ্যাস কখনো বন্ধ করবেন না

ডিগ্রি অর্জনের পরও শেখার প্রয়োজন শেষ হয় না। নতুন প্রযুক্তি, সফট স্কিল, ভাষা কিংবা পেশাগত দক্ষতা নিয়মিত শিখতে হবে। বর্তমান কর্মক্ষেত্রে যারা দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন, তারাই দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে থাকেন।

আত্মবিশ্বাসই সবচেয়ে বড় শক্তি

অনেক নারী নিজের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দ্বিধা বা সংকোচে পিছিয়ে যান। নিজের দক্ষতার ওপর বিশ্বাস রাখুন এবং প্রয়োজন হলে নিজের সাফল্য তুলে ধরতেও সংকোচ করবেন না। আত্মবিশ্বাস আপনাকে নতুন দায়িত্বগ্রহণ এবং নেতৃত্ব দেওয়ার সাহস জোগাবে।

সময় ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হন

কাজ, পরিবার, ব্যক্তিগত জীবন–সবকিছুর ভারসাম্য বজায় রাখতে সময় ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করুন, অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট কমান এবং প্রয়োজনে ‘না’ বলতে শিখুন।

যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করুন

ভালোভাবে কথা বলা, মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং নিজের মতামত পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করতে পারা কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। ই-মেইল লেখা থেকে শুরু করে মিটিংয়ে বক্তব্য দেওয়া–সব ক্ষেত্রেই কার্যকর যোগাযোগ আপনাকে আলাদা পরিচিতি এনে দেবে।

নেটওয়ার্ক তৈরি করুন

শুধু নিজের প্রতিষ্ঠানের ভেতর নয়, পেশাজীবী বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে পরিচিতি গড়ে তুলুন। সেমিনার, কর্মশালা, পেশাগত অনুষ্ঠান কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নতুন সুযোগ ও অভিজ্ঞতার দরজা খুলে যেতে পারে।

সফল ক্যারিয়ার মানেই শুধু বড় পদ বা উচ্চ বেতন নয়। বরং এমন একটি পেশাজীবন, যেখানে নিজের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ থাকে, কাজের প্রতি সন্তুষ্টি থাকে এবং ব্যক্তিগত মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। প্রতিটি নারীর পথ আলাদা। তাই অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের অগ্রগতির দিকে নজর দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, সফল ক্যারিয়ার একদিনে গড়ে ওঠে না। ছোট ছোট অভ্যাস, সঠিক সিদ্ধান্ত, অবিরাম শেখার মানসিকতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার সাহস–এই চারটি ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য। নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিন, দক্ষতা বাড়ান এবং প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করুন। তবেই কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

/এসএল

সংবাদ উপস্থাপক থেকে জনপ্রতিনিধি: শামীমা তন্বীর অসাধারণ অভিযাত্রা

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০১:০৫ পিএম
সংবাদ উপস্থাপক থেকে জনপ্রতিনিধি: শামীমা তন্বীর অসাধারণ অভিযাত্রা

একজন নারী যখন নিজের স্বপ্নকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার বানান, তখন তার গল্প অনুপ্রেরণার হয়ে ওঠে হাজারও মানুষের জন্য। যুক্তরাজ্যের লন্ডন বরোর লিটল ইলফোর্ড ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শামীমা নাসরিন তন্বীর পথচলা ঠিক তেমনই এক অনন্য উদাহরণ।

সংবাদ উপস্থাপক, মেডিকেল সেক্রেটারি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব–এসব পরিচয়ের পাশাপাশি এখন তিনি একজন জনপ্রতিনিধি। আর এই অর্জন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি নারীদের সম্ভাবনারও প্রতীক।

টাঙ্গাইলে জন্ম নেওয়া শামীমা নাসরিন তন্বী ছোটবেলা থেকেই মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন। তবে রাজনীতিতে আসার পরিকল্পনা আগে থেকে ছিল না। তার ভাষায়, মানুষের সেবা করার ইচ্ছাই ধীরে ধীরে তাকে এই পথে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন কমিউনিটির নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে তিনি উপলব্ধি করেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় থাকলে আরও কার্যকরভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। সেই উপলব্ধিই তাকে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সাহস জুগিয়েছে।

লন্ডনের স্থানীয় নির্বাচনে তিনি ‘নিউহ্যাম ইন্ডিপেন্ডেন্টস’ পার্টির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছেন। নতুন একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হয়েও মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারা তার কাছে বড় প্রাপ্তি। তন্বীর মতে, এই বিজয় কেবল একজন প্রার্থীর নয়, বরং স্থানীয় মানুষের পরিবর্তনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। মানুষ নতুন নেতৃত্ব ও বাস্তবসম্মত সমাধানে বিশ্বাস রেখেই তাকে নির্বাচিত করেছে।

তার এই যাত্রার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বহুমাত্রিক পরিচয়ের সফল সমন্বয়। একদিকে তিনি যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে (NHS) মেডিকেল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে জনপ্রতিনিধি হিসেবেও মানুষের সেবা করছেন। তিনি মনে করেন, দুটি ক্ষেত্রের মূল উদ্দেশ্য একই–মানুষের কল্যাণ। হাসপাতালের কাজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান, যা কাউন্সিলর হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাকে আরও সংবেদনশীল ও কার্যকর করে তোলে।

সংবাদ পাঠক ও উপস্থাপক হিসেবে সফল ক্যারিয়ার থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তন্বী বলেন–সংবাদ উপস্থাপনা তাকে মানুষের গল্প বলার সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু রাজনীতি তাকে সেই গল্পের বাস্তব সমাধানে কাজ করার সুযোগ এনে দিয়েছে। তিনি শুধু সমস্যার বর্ণনাকারী হতে চাননি; পরিবর্তনের অংশীদার হতে চেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, নারী হিসেবে পথচলায় চ্যালেঞ্জও কম ছিল না। নেতৃত্বের জায়গায় এখনো নারীদের সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রচলিত ধারণা রয়েছে। অনেক সময় নিজেকে বারবার প্রমাণ করতে হয়েছে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম ও সততা থাকলে কোনো বাধাই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তার এই বিশ্বাসই তাকে প্রতিটি ধাপে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে।

রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তন্বীর বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, রাজনীতি কোনোভাবেই শুধু পুরুষদের ক্ষেত্র নয়। সমাজের উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্ব সমানভাবে প্রয়োজন। তাই নারীদের নিজেদের সক্ষমতার ওপর আস্থা রেখে ভয় না পেয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

এই সাফল্যের পেছনে পরিবারের ভূমিকার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তন্বী। ব্যস্ত কর্মজীবনের মাঝেও পরিবারের সমর্থন তাকে মানসিক শক্তি ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি মনে করেন, পরিবারের আস্থা ছাড়া এমন বহুমাত্রিক দায়িত্ব সামলানো সম্ভব হতো না।

লন্ডনের নির্বাচনে তার বিজয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাংলাদেশ, বিশেষ করে টাঙ্গাইল এলাকায় আনন্দের ঢেউ ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করায় অনেকেই এটিকে নিজেদের গর্ব হিসেবে দেখছেন। তন্বী নিজেও এই ভালোবাসায় অভিভূত।

বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশকে তিনি নিজের শিকড় বলে মনে করেন। ভবিষ্যতে শিক্ষা, নারী নেতৃত্ব, যুব উন্নয়ন ও কমিউনিটি উন্নয়ন নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে তার। যুক্তরাজ্যে কাজের অভিজ্ঞতাকে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে চান তিনি। তার বিশ্বাস, প্রবাসে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তন্বী বলেন, প্রথম দায়িত্ব মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা। তিনি চান, তার কাজের মাধ্যমে মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আসুক। দীর্ঘমেয়াদে আরও বৃহত্তর পরিসরে জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা, এমন একটি দৃষ্টান্ত রেখে যাওয়া যাতে আগামী প্রজন্মের মেয়েরা বিশ্বাস করতে পারে—পরিশ্রম, সততা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।

শামীমা নাসরিন তন্বী; যিনি নিজের পেশাগত পরিচয়, ব্যক্তিগত স্বপ্ন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে এক সুতোয় গেঁথে প্রমাণ করেছেন–নেতৃত্বের জন্য লিঙ্গ নয়, প্রয়োজন যোগ্যতা, নিষ্ঠা ও মানুষের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা।

/এসএল

নারী থাকুক নিরাপদে...

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম
নারী থাকুক নিরাপদে...

একটি কন্যাশিশুর জন্মকে ইসলামে শুধু পারিবারিক আনন্দ নয়, বরং আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসেবে দেখা হয়েছে। হাদিসে কন্যাসন্তানকে স্নেহ, লালন-পালন ও উত্তমভাবে প্রতিপালনের মাধ্যমে জান্নাত লাভের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে মায়ের মর্যাদাকে এতটাই উচ্চে স্থান দেওয়া হয়েছে যে, জান্নাতকে মায়ের পদতলে বলা হয়েছে। বোন পরিবারের স্নেহ ও বন্ধনের প্রতীক, আর স্ত্রীকে বলা হয়েছে একে অপরের পোশাক–যিনি জীবনের নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও প্রশান্তির সঙ্গী। 

অথচ বাস্তবতার নির্মম প্রশ্ন হলো–যে সমাজ ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানবিকতার ভাষায় নারীকে এত সম্মান দেয়, সেই সমাজেই মা, বোন ও কন্যার জীবনের নিরাপত্তা আজ কোথায়?
প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুললেই চোখে পড়ে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক সহিংসতা, অ্যাসিড হামলা, অনলাইন হয়রানি কিংবা হত্যার খবর। রাজধানীর মিরপুরে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। সিলেটে মাত্র চার বছরের এক শিশুর জীবন শেষ হয়েছে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে। ঠাকুরগাঁওয়ে আরেক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে জঙ্গলে। এ ছাড়াও ২০২০ সালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে সিলেটের এমসি কলেজে সংঘটিত গণধর্ষণের মামলার বিচার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সংকট নয়; এটি একটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং আইনের শাসনের কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তোলে সবার সামনে।

অনেক সময় অপরাধের ভয়াবহতার চেয়ে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে ভুক্তভোগীর পরবর্তী অভিজ্ঞতা। একজন নির্যাতিত নারী বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো সামাজিক অপমানের মুখোমুখি হন। ধর্ষণের শিকার মেয়েটির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তার পোশাক, চলাফেরা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। পরিবারের অনেকেই ‘সম্মান’ রক্ষার নামে ঘটনাটি গোপন রাখার চেষ্টা করেন। ফলে অপরাধী বুঝে যায় যে, তার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল এবং শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সমস্যা কোথায়? 

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতার পেছনে রয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যখন অপরাধ করে দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তি না পাওয়ার নজির তৈরি হয়, তখন অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমে যায় এবং তারা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। প্রযুক্তির অপব্যবহারও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গোপন ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, সাইবার বুলিং, ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা কিংবা ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনা এখন নারীর নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ।

পারিবারিক শিক্ষার অভাবও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। অনেক পরিবারে ছেলেদের শেখানো হয় না যে নারীর সম্মতি, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মর্যাদা কী। বরং ছোটবেলা থেকেই পুরুষতান্ত্রিক কিছু ধারণা অজান্তে তাদের মধ্যে গেঁথে দেওয়া হয়, যেখানে নারীর প্রতি কর্তৃত্বকে স্বাভাবিক মনে করা হয়।

গণমাধ্যম, বিনোদন এবং সামাজিক পরিবেশও মানুষের আচরণ গঠনে ভূমিকা রাখে। যখন নারীকে শুধু ভোগ্যপণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয় বা সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে দেখানো হয়, তখন তা সমাজে নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে।

সমাধান কী?

তবে এই সংকটের সমাধান অসম্ভব নয়। প্রথমত, আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তার দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত হলে সমাজে শক্ত বার্তা যাবে। দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে একজন নারী অভিযোগ করতে গিয়ে দ্বিতীয়বার নির্যাতনের শিকার না হন। পুলিশ, হাসপাতাল ও আদালতে সংবেদনশীল সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলে-মেয়ে উভয়কেই পারস্পরিক সম্মান, মানবিকতা এবং সম্মতির গুরুত্ব শেখাতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রকৃত শিক্ষা, নৈতিক চর্চা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সমাজকে ইতিবাচকভাবে বদলে দিতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সচেতনতা বাড়ানো এবং সাইবার অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় কথা, নারীর নিরাপত্তাকে শুধু নারীর সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি পরিবারের, একটি সমাজের এবং একটি রাষ্ট্রের সম্মানের প্রশ্ন। যে সমাজ নিজের মা, বোন ও কন্যাকে নিরাপদ রাখতে পারে না, সেই সমাজের উন্নয়ন কখনোই পূর্ণতা পায় না।

/এসএল

অনলাইনে নারীরাই কেন কটূক্তির শিকার?

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ০১:৫০ পিএম
অনলাইনে নারীরাই কেন কটূক্তির শিকার?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক সময় ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের জায়গা। এখন এটি মতপ্রকাশ, পেশাগত পরিচিতি তৈরি, ব্যবসা পরিচালনা এবং সামাজিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু এই একই জায়গা নারীদের জন্য প্রায়ই অপমান, কটূক্তি ও হয়রানির ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। 

প্রশ্ন হলো, অনলাইনে নারীরা কেন এত সহজ টার্গেট? এর উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু প্রযুক্তির দিকে তাকালে হবে না; দেখতে হবে সমাজ, সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার কাঠামোকেও।

অনেকেই মনে করেন, অনলাইন হয়রানি একটি নতুন সমস্যা। বাস্তবে এটি পুরোনো বৈষম্যেরই নতুন রূপ। সমাজে নারীদের পোশাক, চলাফেরা, পেশা বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্তব্য করার যে প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেটিকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

ক্ষমতার রাজনীতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন কটূক্তি অনেক সময় ক্ষমতার রাজনীতির অংশ। সমাজে যখন নারীরা শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন, তখন কিছু মানুষ সেটিকে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত অবস্থানের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।

ফলে নারীদের চুপ করিয়ে দেওয়া, আত্মবিশ্বাস নষ্ট করা কিংবা জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি উপায় হয়ে দাঁড়ায় অনলাইন আক্রমণ। এ কারণেই নারী সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, রাজনীতিবিদ কিংবা জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতারা তুলনামূলক বেশি ঘৃণামূলক মন্তব্যের শিকার হন।

অজ্ঞাত পরিচয়ের সাহস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, অজ্ঞাত পরিচয়ে সক্রিয় থাকার সুযোগ। অনেকেই নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে কটূক্তি করেন। বাস্তব জীবনে যেটি বলার সাহস পান না, সেটিই অনলাইনে নির্দ্বিধায় লিখে ফেলেন।

মনোবিজ্ঞানীরা এটিকে ‘অনলাইন ডিসইনহিবিশন’ বলে থাকেন। অর্থাৎ পর্দার আড়ালে থাকার কারণে মানুষ নিজের আচরণের সামাজিক দায়বদ্ধতা কম অনুভব করে। ফলে সহানুভূতি কমে যায় এবং আক্রমণাত্মক আচরণ বেড়ে যায়।

অ্যালগরিদম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সাধারণত বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়া কনটেন্টকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। দুঃখজনকভাবে বিতর্ক, বিদ্বেষ ও উত্তেজনাপূর্ণ মন্তব্য অনেক সময় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বেশি সম্পৃক্ততা তৈরি করে।

ফলে একটি নারীবিদ্বেষী মন্তব্য বা অপমানজনক পোস্ট অল্প সময়ের মধ্যে হাজারও মানুষের সামনে পৌঁছে যায়। এতে শুধু একজন নারী নন, পুরো অনলাইন পরিবেশই নারীদের জন্য কম নিরাপদ হয়ে ওঠে।

অনেকের ধারণা, অনলাইনের মন্তব্যকে গুরুত্ব না দিলেই হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নিয়মিত কটূক্তি, অপমান বা হুমকির শিকার হলে উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। অনেক নারী নিজের মতামত প্রকাশ করা বন্ধ করে দেন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে সরে যান। আবার অনেকের ক্ষেত্রে এর প্রভাব কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত সম্পর্কেও পড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনলাইন হয়রানি অনেক সময় ভার্চুয়াল জগতের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতেও রূপ নিতে পারে।

পরিবর্তন কোথা থেকে শুরু হবে?

অনলাইনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে সমানভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ঘৃণামূলক বক্তব্য শনাক্ত ও অপসারণে আরও কার্যকর হতে হবে। একই সঙ্গে নারীদের জন্য অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ ও নিরাপদ করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় কথা, অনলাইনে নারীদের বিরুদ্ধে কটূক্তিকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘মজা’ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ প্রতিটি অপমানজনক মন্তব্য শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, নারীদের জনপরিসরে অংশগ্রহণের অধিকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

/এসএল