পারিবারিকভাবে ব্যাংক কর্মকর্তা খায়রুলের সঙ্গে বিয়ে হয় নাহারের। বাসর রাতে স্বামী যখন তাকে বিয়ে ঠিক হওয়ার পরও প্রেম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করে এবং কথিত প্রেমিকের পরিচয় প্রকাশের জন্য তার ওপর চাপ প্রয়োগ করে, সে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে। দিন দিন স্বামীর সন্দেহের মাত্রা বাড়তে থাকে। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে নাহার তার অনুপস্থিতিতে গোপনে তার প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল এ অভিযোগ তুলে তাকে গালিগালাজ করে। অফিস থেকে মধ্য দুপুরে না জানিয়ে হঠাৎ করে বাড়ি ফেরে প্রেমিককে হাতেনাতে ধরবে বলে।কোনো প্রমাণ না পেলেও সন্দেহ দূর হয় না স্বামীর।
আরও কিছুদিন পেরোলে নাহারের গায়ে হাত তোলা শুরু করে সে। সন্ধ্যায় বা রাতে নাহারের শাড়ি গায়ে জড়িয়ে ঘরের বাইরে ঘোরাফেরা করে, উদ্দেশ্য- শাড়ি দেখে সেই ‘প্রেমিক’ তাকে নাহার বলে ভুল করে কাছে আসবে আর সে তাকে হাতেনাতে ধরতে পারবে। মাঝে মধ্যে সারা দিন অফিস না গিয়ে ঘরে বসে থাকে বা অফিস শেষে ফিরে রাত জেগে বসে থাকে প্রমাণের আশায়। নাহারকে কোনো পুরুষ আত্মীয় বা প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলতে দেয় না। সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানেও তাকে নিয়ে যায় না। কিন্তু এত সন্দেহ আর অবিশ্বাস সত্ত্বেও সে স্ত্রীকে ত্যাগ করতে রাজি হয় না। স্ত্রীকে এক রাতের জন্যও তার বাবার বাড়িতে রেখে আসতে নারাজ সে।
খায়রুল মূলত ভুগছিল সন্দেহ আর ভ্রান্ত বিশ্বাসে মোড়া এক ধরনের মানসিক রোগে। তার অবস্থাটি কেবল প্রেম বা বিবাহ-সম্পর্কের মধ্যে বহুল চর্চিত স্বাভাবিক ঈর্ষা বা অধিকারবোধের বাড়াবাড়ি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। খায়রুলের অবস্থাটিকে প্যাথলজিক্যাল জেলাসি, মরবিড জেলাসি, সেক্সুয়াল জেলাসি বা ডিল্যুশন অব ইনফিডেলিটি বলা হয়। জগদ্বিখ্যাত ইংরেজ লেখক, কবি ও নাট্যকার উইলিয়াম শেকসপিয়ারের অন্যতম জনপ্রিয় ট্র্যাজেডি ‘ওথেলো’-এর মূল চরিত্রের নামানুসারে এই রোগকে ‘ওথেলো সিনড্রোম’ও বলা হয়। ওথেলো নানা ঘটনায় তার স্ত্রী ডেসডিমনাকে সন্দেহ করে যে সে পরকীয়ায় জড়িত। এ বদ্ধমূল বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে সে তার স্ত্রীকে হত্যা করে। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, তার সন্দেহ অমূলক ছিল।
নারীদের তুলনায় পুরুষরা এ রোগে বেশী আক্রান্ত হন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীরা হন ভুক্তভোগী। আক্রান্ত ব্যক্তির নানা আচরণ ও কথায় এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। রোগাক্রান্ত ব্যক্তি সঙ্গী/সঙ্গিনীর বিশ্বস্ততা ও আচরণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। ফোনে কার সঙ্গে কথা বলছে তা নিয়ে বারংবার জেরা করেন। ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপস ব্যবহারে বাধা দেন অথবা পাসওয়ার্ড দাবি করেন। মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেটে মেসেজ চেক করেন বা দেখাতে বাধ্য করেন। অনেকে সঙ্গীকে গোপনে অনুসরণ করেন, আগে থেকে না বলে তার কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত হন, কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পর সঙ্গীর কাপড় ও শরীর নানাভাবে পরীক্ষা করেন পরকীয়ার প্রমাণ খুঁজতে।
সঙ্গীর স্বাভাবিক সামাজিক আচরণকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেন। অন্যের সঙ্গে মিশতে এমনকি বিপরীত লিঙ্গের কারও সঙ্গে কথা বলতেও বাধা দেন বা বলতে দেখলে সন্দেহ করেন। অনেকে সঙ্গীর গায়ে আঘাত করেন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে সঙ্গীকে হত্যাচেষ্টা বা হত্যার ঘটনা যেমন ঘটে, তেমনি আক্রান্ত ব্যক্তিরও আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তির সন্তান থাকলে সে-ও ব্যক্তি দ্বারা যে কোনো বিপদের ঝুঁকিতে থাকে।
কোনো কোনো ব্যক্তি কেবল ওথেলো সিনড্রোম বা প্যাথলজিক্যাল জেলাসিতে ভুগতে পারেন। আবার কোনো ক্ষেত্রে, সিজোফ্রেনিয়া, মাদকাসক্তি, ব্যক্তিত্ব বৈকল্য, যৌন-সমস্যা প্রভৃতির লক্ষণ হিসেবে এ সমস্যাটিকে অঙ্গাঙ্গিভাবে দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে মূল রোগের চিকিৎসা জরুরি। মূল রোগের ধরন ভেদে চিকিৎসা ওষুধ সেবন ও সাইকোথেরাপি দুভাবেই করা যায়। সন্দেহের কারণে ব্যক্তি নিজের বা সঙ্গীর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ালে কখনো কখনো তাকে হাসপাতালে ভর্তি করারও দরকার হতে পারে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, কমিউনিটি ও সোশ্যাল সাইকিয়াট্রি বিভাগ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট
/ফারজানা ফাহমি
.jpg)