মধ্য বয়স নারীদের জীবনে এক নতুন সূচনা। যেখানে তারা নিজের শক্তি, স্বাধীনতা ও স্বপ্নকে পুনরায় আবিষ্কার করে জীবনের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেন। তাই ‘মিডলাইফ গ্লো-আপ’ বা মধ্য বয়সের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এবারের আয়োজন। লিখেছেন এস লুপিন
মধ্য বয়সকে অনেক সময় সংকট বা হতাশার সময় হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা বলছে, এটি আসলে এক নতুন আত্মজাগরণের সময়। মধ্য বয়স নারীদের জন্য জীবনের দ্বিতীয় বসন্ত। যেখানে তারা নিজের ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও স্বপ্নকে নতুন করে আবিষ্কার করেন।
এটি এমন একটি সময়, যখন তারা অতীতের চাপ থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের জন্য জীবনকে আরও অর্থবহ করে তোলেন। তাই মধ্য বয়স শুধু বয়সের একটা সংখ্যা নয়, বরং নারীদের জেগে ওঠার, নিজেদের প্রকাশ করার এবং নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের সময়।
মধ্য বয়সের সংকট বা ‘মিডলাইফ ক্রাইসিস’ এটি এক সময় শুধু নেতিবাচক ধারণাই ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক নতুন সূচনা। যা নিজেকে পুনরায় আবিষ্কারের সময়। বিশেষ করে নারীদের জন্য মধ্য বয়স কেবল সংকট নয়, বরং শক্তি ও সম্ভাবনার এক জাগরণের সময়। যাদের জীবনকে ধীরে ধীরে ‘জীবনের দ্বিতীয় বসন্ত’ হিসেবে দেখা শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাদের জাগরণের গল্প আজ অনেক নারীই ব্যক্তিগত ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বর্ণনা করছেন। এ সময় নারীরা শুধু নিজেদের জন্য চিন্তা করতে শুরু করেন। নিজের ইচ্ছের প্রতি যত্নশীল হন। কাজেই মধ্য বয়স শুধু বয়সের একটি ধাপ নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ও জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মধ্য বয়সের সময় যে বিপর্যয়ের কথা আগে প্রচলিত ছিল, তা আজ অনেকটাই ‘মিডলাইফ বুস্ট’ বা শক্তি পুনরুদ্ধারের পর্যায়ে রূপান্তরিত হয়েছে। নারীরা জীবনের অগণিত বাধা ও সীমাবদ্ধতা পার হয়ে এ বয়সে নিজেদের মধ্যে এক অনন্য ক্ষমতা আবিষ্কার করেন। তাদের মনে হয়, এটি এমন এক সময় যখন তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকেন এবং নিজেদের জীবনের দায়িত্ব নিতে পারেন।
‘সাইকোলজি টুডে’র একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে, মধ্য বয়সকে সংকট নয়, বরং নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত হিসেবে দেখলে নারীরা অনেক বেশি পরিতৃপ্তি অনুভব করেন। পুরোনো ভয়, অস্থিরতা ও চিন্তাগুলো ধীরে ধীরে দূর হয়ে যায় এবং আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে।
মধ্য বয়স নারীদের জন্য পুরোনো দায়িত্ব ও দায়িত্বের বাইরে নতুন কিছু করার সুযোগ এনে দেয়। এ সময় অনেক নারী নতুন কিছু শেখেন, ক্যারিয়ার পরিবর্তন করেন অথবা এমন কাজ করেন, যা তাদের দীর্ঘদিনের ইচ্ছে ছিল। যেমন- কেউ হয়তো নতুন ব্যবসা শুরু করেন, কেউ লেখালেখি বা আর্টের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
এ ছাড়া, ‘মিডলাইফ গ্লো-আপ’ বা মধ্য বয়সের উজ্জ্বলতা একটি নতুন ধারণা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নারীরা এ সময়ে নিজেদের স্বাস্থ্য ও চেহারায় বেশি যত্নবান হন। নিজেকে পরিবর্তন করেন। যেমন- চুলের রঙ বদলানো বা ট্রেন্ড অনুসরণ করা। এটি তাদের মনোবল বাড়ায় এবং তাদের নিজেকে আবার নতুনভাবে ভালোবাসতে সাহায্য করে।
মধ্য বয়স মানেই অনেক ক্ষেত্রে শরীর ও মনোরোগের কিছু পরিবর্তন আসা। তবে আজকের নারীরা এই পরিবর্তনগুলোকে সমস্যা নয়, একটি প্রাকৃতিক পর্যায় হিসেবে দেখছেন। স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং শারীরিক-মানসিক সুস্থতার জন্য বিভিন্ন পন্থা অনুসরণ করছেন। যেমন- যোগব্যায়াম, ধ্যান, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস।
এ ছাড়া, বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সহায়তায় তারা মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। নিজের জন্য সময় বের করা, নিজের কথা বলা এবং সঠিক পরামর্শ নেওয়া তাদের শক্তি বাড়িয়ে তোলে।
গণমাধ্যম ও লেখালেখির মাধ্যমে মধ্য বয়সের নারীদের নতুন সম্ভাবনা ও সফলতার গল্প বেশি সামনে আসছে। এই পরিবর্তন নারীদের নিজের স্বপ্ন ও ইচ্ছাপূরণে আরও উৎসাহিত করছে। সমাজও এখন তাদের মূল্যায়ন করা শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, অনেক নারীর আত্মজীবনী ও ব্লগে দেখা যায়, কীভাবে তারা মধ্য বয়সে জীবনে নতুন লক্ষ্য স্থির করেছেন এবং সেই লক্ষ্যে এগিয়ে গেছেন। এ ধরনের গল্প সামাজিক মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।

মধ্য বয়স নারীদের জীবনে নতুন করে গড়ে ওঠা, নিজেকে পুনরুদ্ধার এবং সম্ভাবনার জায়গা তৈরি করা— এই ভাবনার খোঁজে কথা হলো ‘চলো যাই ট্যুরস লিমিটেড’-এর ফাউন্ডার অ্যান্ড সিওও সাফিয়া শামার সঙ্গে।
তিনি বলেন, ‘আমার কাছে গ্লো-আপটা কোনো নির্দিষ্ট বয়সের বিষয় না। ভেতর থেকে যদি কেউ গ্লো করে, সেটা ২০ বছরেও করবে। আর না করলে ২০ বছরেই বুড়িয়ে যাবে। মনকে প্রফুল্ল রাখা, সুস্থ থাকা— এ জিনিসগুলোই আসল গ্লো।’ তা ছাড়া শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা গ্লো-আপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলেও মনে করেন তিনি।
পরবর্তী পর্যায়ে যখন জানতে চাওয়া হয়, মধ্য বয়সে এসে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার ভাবনা তিনি কীভাবে দেখেন, তখন সাফিয়া বলেন, ‘আমি সব সময় নিজেকে পরিবর্তনের কথা ভাবি। সেটা ৩০ বছর বয়সেও করেছি, এখন ৫০-এ এসেও করছি। এই বয়সে নিজেকে যত্নে রাখা, নিজের ইচ্ছাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া আমার কাছে খুব জরুরি। নিজের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য আমি নিয়মিত জিম করি, যোগব্যায়াম করি, সকালের হাঁটাহাঁটিতে অংশ নেই এবং বন্ধুদের সঙ্গে দেশ-বিদেশে ঘুরতে যাই।’
নিজের জন্য সময় বের করার প্রসঙ্গে সাফিয়ার ব্যাখ্যা, ‘আমি জানি কী কী করলে আমি হ্যাপি থাকব। ফলে আমি তা-ই করি। এমনকি আমার আশপাশের যারা ভালো ভাইব দেয় না, তাদের থেকেও নিজেকে দূরে রাখি।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা বলে সময় নেই— এই কথাটা আমার কাছে অজুহাত মনে হয়। ইচ্ছা থাকলে সময় বের করাই যায়। আমি নিজে একজন ব্যবসায়ী, আমার ব্যবসার পরিসরও ছোট নয়। তার পরও নিজের জন্য সময় বের করি। জিম করি, গান শুনি, মুভি দেখি, ভ্রমণে যাই। কেননা নিজের যত্ন নেওয়া জরুরি।’

সমাজ কীভাবে দেখছে একজন মধ্য বয়সী নারীকে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে— এ প্রশ্নে সাফিয়া বলেন, ‘আমি একজন সিঙ্গেল মাদার। সমাজ সবসময়ই আমার দিকে একটু কড়া চোখে তাকায়। এখনো তাই করে। কিন্তু আমি এসব গায়ে মাখি না। মানুষ তো কথা বলবেই, সেটাই তাদের কাজ। আমার সন্তানদের কাছে যদি সবকিছু ঠিক থাকে, তা হলে আমি ঠিক আছি।
সমাজের এসব কথা আমাকে থামাতে পারেনি।’ তিনি জানান, শরীরচর্চা বা ঘন ঘন ভ্রমণ নিয়ে অনেকে কটাক্ষ করলেও পরে তারাই বুঝেছে শারীরিক কিংবা মানসিক সুস্থতার জন্য এগুলো অত্যাবশ্যক।
তিনি আরও যুক্ত করেন, ‘আমি একজন স্বাধীন নারী। কারও ক্ষতি করছি না। তাই সমাজের চোখে না তাকিয়ে নিজের ভালোটা দেখা উচিত।’
সবশেষে যখন প্রশ্ন করা হয়, নারীরা কি মধ্য বয়সে এসে সংকটে থাকেন নাকি সম্ভাবনায়— তখন সাফিয়া স্পষ্টভাবে বলেন, ‘মধ্য বয়সী নারীরা কোনো সংকটে নেই, তারা সম্ভাবনা। আমি এখন ৫০, ভাবি আরও ৩০ বছর প্রোডাক্টিভ থাকব। সমাজ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে, এখন আমার দেওয়ার সময় এসেছে। তাই সুস্থ থাকা জরুরি, নিজের যত্ন নেওয়া জরুরি। আমি বিশ্বাস করি— প্রত্যেক নারীই সমাজের জন্য একটি সম্ভাবনা।’
সুতরাং মধ্য বয়স নারীদের জন্য আর কোনো চাপের সময় নয়। বরং এটি এক নতুন উত্থানের সময়। এ সময়ে তারা জীবনকে নতুন দৃষ্টিতে দেখেন, নিজের চাওয়া-পাওয়া ও স্বপ্নকে গুরুত্ব দেন। সমাজের পুরোনো ধ্যানধারণা ভেঙে তারা প্রমাণ করছেন নারীর বিকাশের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। ক্যারিয়ার, স্বাস্থ্য, সম্পর্ক কিংবা নিজের পরিচয়— সবখানেই তারা সাহসী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। মধ্য বয়স তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। তাই এ সময়কে সংকট নয়, দেখতে হবে নতুন করে বাঁচার, জেগে ওঠার এক অসাধারণ সুযোগ হিসেবে এবং এ জাগরণ আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণা।
তথ্যসূত্র: ডেইলি মেইল ইউকে, সাইকোলজি টুডে, ওমেন্স হেলথ ম্যাগাজিন, লিটমাগ
.jpg)