ফ্যাশন ডিজাইনার বাংলাদেশের তরুণ তাসমিম জোবায়ের। সম্প্রতি কান চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর ডিজাইন করা পোশাকে নজর কেড়েছেন বলিউড অভিনেত্রী উর্বশী রাউতেলা। সেইসঙ্গে এ অভিনেত্রী হলিউড জনপ্রিয় অভিনেতা লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিওর কাছ থেকে পেয়েছেন ‘কুইন অব কানস’ কমপ্লিমেন্টও।
তাসমিম জোবায়েরের ব্র্যান্ডের নাম ‘টিজেড স্টুডিও’। দক্ষিণ এশীয় লাক্সারি ফ্যাশনকে পোশাকে অভিনব কায়দায় তুলে আনছেন তিনি। এতে করে দক্ষিণ এশিয়ার লাক্সারি ফ্যাশনের গতানুগতিক ধারায় যোগ হচ্ছে নতুন মাত্রা। এ বছর প্যারিসে ২৮ অ্যাভেনিউ জঁ জরেস–এ আত্মপ্রকাশ করেছে তাসনিমের ফ্ল্যাগশিপ স্টোর।
চট্টগ্রাম থেকেই তাসমিমের যাত্রা শুরু। ডিজাইনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা খুব অল্প বয়স থেকেই। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি দার্জিলিংয়ের একটি ফ্যাশন স্কুলে ভর্তি হন। এমন সাহসী সিদ্ধান্ত তাঁর ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করে দেবে কি না, সেটা তিনি নিজেও জানতেন না।
২০১৮ সালে দুবাইয়ে প্রথম বুটিকের উদ্বোধনের মাধ্যমে শুরু হয় তাসমিম জোবায়েরের পেশাদার ডিজাইনার জীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। আর্কিটেকচারাল সিলুয়েট, নারীত্বের অদম্য উদযাপন ও সূক্ষ্ম কারিগরির অদ্ভুত সুন্দর মেলবন্ধন ঘটে তাঁর ডিজাইন করা পোশাকে। পরের বছর দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাশন উইকে তাঁর অভিষেক ঘটে। তবে তাসমিমের সাফল্য শুরু হয় ২০২২ সালে, যখন তিনি প্যারিস ফ্যাশন উইকে জায়গা করে নেন এবং ২০২৩ সালে ওয়েস্টিন প্যারিস ভ্যানদোমে নিজের সম্পূর্ণ কতুর কালেকশন উপস্থাপন করেন।
তাসমিম জোবায়েরের করা প্রথম ডিজাইন ছিল ক্রিস্টাল খচিত ওয়ান শোল্ডার স্যাটিনের ব্রাইডাল গাউন। তখনই বোঝা গিয়েছিল, তাসনিমের ডিজাইনের লক্ষ্য কেবল ফ্যাশন ক্ষেত্রে ছাপ ফেলা নয়, বরং তিনি তাঁর কাজ দিয়ে রীতিমতো ‘আইডেন্টিটি স্টেটমেন্ট’ তৈরি করতে চান।
তাসমিমের ডিজাইনের ধরনও বেশ আলাদা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সৃজনশীলতাকে গন্ডির মধ্যে বেঁধে দেওয়া অনুচিত। এতে সৃজনশীলতার নিজস্ব গতি নষ্ট হয়। এ জন্য আমি প্রথম যেটা করেছি তা হলো, সমস্যার সংজ্ঞায়ন। একবার চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হলে, সৃজনশীলতা স্বাভাবিকভাবেই গতি পায়। প্রতিভাবান এ ফ্যাশন ডিজাইনার বলেন, তাঁর লক্ষ্য কেবল সফল ডিজাইনার হওয়া নয়। তিনি চান বাংলাদেশের ফ্যাশনশিল্পের গল্পকে নতুন করে, নিজের ভাষায় বিশ্বের মানুষের কাছে বলা।
তাসমিম জানান, ফ্যাশনে তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে একজন হতে চান না। তবে রানওয়ে, ফ্যাশন শো, রেডকার্পেট ও ফ্যাশন কথোপকথনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে চান।
তাসমিমের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আত্মবিশ্বাসই তাঁকে আলাদা করে তোলে। এ বছর তাসমিমের করা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে উর্বশী রাউতেলার পোশাক। কান উৎসবে বলিউড অভিনেত্রী উর্বশী রাউতেলা তাসমিম জোবায়েরের ডিজাইন করা গাউন পরে লালগালিচায় পৌঁছালে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। কারণ, প্রথমবারের মতো একজন ভারতীয় অভিনেত্রী কোনো বাংলাদেশি ডিজাইনারের পোশাকে পরে কান উৎসবে যোগ দেন। এরপরই লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও উর্বশীকে সম্বোধন করেন ‘দ্য কুইন অব কানস’ নামে।
উর্বশীর পরা অভিজাত পোশাকটি ছিল তাসমিমের ২০২৪ সালের ফল কতুর কালেকশনের। এটি মূলত একটি রুপালি ও সাদা ক্রিস্টাল এমব্রয়ডারি করা স্কাল্পটেড সুইটহার্ট নেকলাইন গাউন। তবে এর মূল আকর্ষণ হলো তিনমাত্রার ফ্লোরাল ডিজাইন। এটি পোশাকটির নান্দনিকতাকে অনন্য মাত্রা যোগ করেছে।
৮৩ হাজার ইনস্টাগ্রাম অনুসারী থাকার পরও তাসমিমের নাম অনেকের কাছে এত দিন অজানা ছিল। তাসমিম কেবল বাংলাদেশ ও প্যারিস নয়। পৌঁছে গেছেন সারা বিশ্বে। কারণ, তাঁর ডিজাইন সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরি করে চলেছে প্রতিনিয়ত। তাঁর নকশা শুধু গ্ল্যামার নয় বরং পরিচয়, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যতের গল্পই বলে। তাসমিম জোবায়ের এখন আর কেবল একজন ডিজাইনার নন, তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের গর্ব।
/ কলি