ঢাকা ১০ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ইরান যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন সিনেটে ট্রাম্পের বড় ধাক্কা নাভানা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার শেরপুরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবির টহল ঝিনাইদহে ট্রাক্টরের ধাক্কায় প্রাণ গেল ইজিবাইকের যাত্রীর অপেক্ষা ফুরোচ্ছে নেইমারের নোয়াখালীতে পিকআপ-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে ২ বন্ধু নিহত সংসদীয় কমিটি গঠনে বিলম্ব নজরদারি প্রশ্নবিদ্ধ নওগাঁ সীমান্তে ৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা গ্রুপ এল: যেভাবে নকআউটে যেতে পারে ইংল্যান্ড, ঘানা ও ক্রোয়েশিয়া নকআউটের টিকিট পেতে কার সমীকরণ কেমন? পণ্যের মান ও বৈচিত্র্যকরণে রপ্তানি বাড়বে ব্রাজিলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায় স্কটল্যান্ড বিদেশি ঋণ পরিশোধে রেকর্ড পাবনায় ১৩ মাসে ৫৯ খুন, ৭১ ধর্ষণ নদীবন্দরে সতর্কতা, দেশের ১৬ জেলায় ঝড়ের শঙ্কা সূচকের উত্থান হলেও কমেছে লেনদেন শিশু ধর্ষণের অভিযোগে কারাগারে ইমাম বদলে গেল গ্রুপ পর্বের টাইব্রেকার নিয়ম! ভাগ্য নির্ধারণ হবে যেভাবে মেম্বার থেকে এমপি, রাজনৈতিক উত্থানের গল্প শোনালেন আবদুল গফুর বরিশাল নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ: এক চেয়ারে নজর ৭ নেতার বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় নিতে চিঠি টানা জয়েও মেক্সিকোর পারফরম্যান্সে অসন্তুষ্ট কোচ আগুয়েরে যুদ্ধের পর প্রথম বিদেশ সফরে পাকিস্তানে ইরানের প্রেসিডেন্ট সিন্ডিকেটের কবলে চট্টগ্রাম বন্দর: প্রতিযোগিতা রুখতে সুপরিকল্পিত ‘খেলা’ ২৪ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ২৪ জুন: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল ছাত্রলীগের রাজনীতি করায় ছেলেকে ত্যাগের ঘোষণা বাবার পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে উ. কোরিয়া: কিম সৌন্দর্যে অনন্য গোলাপি অলকানন্দা ইবিএলের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার হুঁশিয়ারি দুদকের

হাওরের জলস্রোত

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৩, ১১:৫২ এএম
আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:২০ এএম
হাওরের জলস্রোত

পরক্ষণে নিজেকে ধমকায়- কেমন বড় জায়গা এটা? এখানে তো নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। শয়তান একটা- নিজেকে গালি দেয়। পরক্ষণে ভাবে, নিজেকে গালি দিচ্ছি কেন? হাওরে বাস করা তো আমার প্রাণের টান। এখানে বাস করে আমি তো নিজেকে ধন্য করেছি। সুখে-আনন্দে দিন কাটিয়েছি। তাহলে এখন কেন নিজেকে গালি দিচ্ছি। পরক্ষণে রাগত স্বরে বলে, আমি একটা শুয়োরের বাচ্চা। ঠিকমতো চিন্তা করতে পারি না। চিন্তার জায়গা এলোমেলো হয়ে যায়। নানাকিছু ভাবি, যার কোনো দিশা থাকে না। সঙ্গে সঙ্গে রেজাউল নিজের মাথা থাপড়ায়। মাথা থাপড়াতে থাপড়াতে দেখতে পায় পাহাড়ি পানির ঢল নেমে আসছে। এই পানির ঢলে ভেঙে যায় কোনো কোনো বাঁধ। তখন ডুবে যায় হাওরের নানা এলাকা। বিশেষ করে ধানখেত ডুবে যায়। তখন ভীষণ কষ্ট হয় সবার। হাওরজুড়ে বাস করা মানুষ চোখের জলে ভাসতে থাকে। ধান ঘরে ওঠানো যায় না। তখন খাওয়া-দাওয়ার ঝামেলা শুরু হয়। পেট ভরে ভাত খাওয়া যায় না। চারদিকে কান্নাকাটির ধ্বনিতে ছেয়ে যায় হাওর এলাকা। রেজাউলের বুক মুচড়ে ওঠে পানির ঢল দেখে। ও কাছাকাছি একটি বাঁধের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তখন সেখানে ঢলের পানি এসে পড়েনি। হঠাৎ করে দূরে তাকিয়ে দেখল একটি বাঁধ ভেঙে গেছে। হাওর এলাকার অনেক মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে বাঁধ ঠিক করার কাজ করছে। এটি এখানকার কোনো নতুন কাজ নয়। এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। রেজাউল বিপুল বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে দৌড়াতে শুরু করে। ওখানে গিয়ে ওদের সঙ্গে কাজ করবে। সবাই মিলে এমন কাজ করতে হয়। নইলে বাঁধ ঠিক করা অনেক জটিল কাজ। পাহাড়ি ঢলে ভেঙে যাওয়া বাঁধ ঠিক না করলে অনেক ক্ষতি হয়। বাস করা কষ্টকর হয়ে যায়। রেজাউল বিপুল বিস্ময়ে চারদিক তাকায়। দূরের দিকে তাকালে ঝলমল করে হাওর এলাকা। এখানে বাস করা ওর কাছে আনন্দের অনুভব। কষ্ট পেলে সেটাও দ্রুত কাটিয়ে ওঠে। ইদানীং কষ্ট পেলে ভাবে, কারও সঙ্গে প্রেম হলে এই কষ্ট আর কষ্ট হবে না। কারও সঙ্গে প্রেম হলে এই কষ্ট কাটিয়ে উঠতে পারবে। এখন প্রেমের অপেক্ষা ওকে কষ্ট দিচ্ছে। ও দৌড়াতে দৌড়াতে বাঁধের কাছে যায়। সবার সঙ্গে বাঁধ ঠিক করার কাজে লেগে পড়ে। দুই হাতে হাওরের মাটি তুলে বুকের কাছে ধরে। বুকে মাখিয়ে তারপর বাঁধের ওপর দিয়ে দেয়। 

একজন বলে, কিরে জামায় মাটি লাগালি কেন?
- জামায় লাগাইনি। বুকে লাগিয়েছি। হাওরের মাটি আমার বুকের মাটি। 
- শুধু হাওরের মাটি বুকের মাটি হবে কেন? পুরো দেশের মাটি আমাদের বুকের মাটি। 
- ঠিক বলেছেন। আপনি আমাকে দেশপ্রেমিক করে দিলেন। আর কখনো হাওরের মাটি নিয়ে এত বড় কথা বলব না।  
- বলবি, হাওরের মাটিতে আনন্দ পাই। 

রেজাউল হাসতে থাকে। প্রাণ খুলে বলে, এমন চিন্তায় আপনি আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন। 
দুই হাত ওপরে তুলে লাফায়। সবাই ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। একজন বলে, হয়েছে, আর লাফাস না। থাম, থাম। 
রেজাউল কারও দিকে না তাকিয়ে দৌড়ে বিলের ধারে চলে যায়। বিলের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে পড়ে। জোরে জোরে পা ঝাঁকিয়ে পানি আলোড়িত করে। হা-হা করে হাসতে হাসতে তালি বাজায়। কোনো দিকে না তাকিয়ে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে ওর মনে হয় আনন্দের ঢলে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছে। 

তানিমা দূর থেকে রেজাউলকে দেখে দ্রুত পায়ে হেঁটে ওর পাশে এসে দাঁড়ায়। 
- কী করছেন রেজা ভাই? 
- আকাশ আর পানির সঙ্গে খেলা করছি। 
- এটা কেমন খেলা? 
- এটা আমার মনের আনন্দের খেলা। তুমি বসো আমার পাশে। 
তানিমা ধপ করে বসে পড়ে। শাড়ি হাঁটুর কাছে উঠিয়ে পানিতে পা ডুবিয়ে দেয়। পা নাড়িয়ে পানি তোলপাড় করে। 
 রেজাউল হাসতে হাসতে বলে, বাহ্, এটা তো তোমার পানির সঙ্গে খেলা। 
- হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন রেজা ভাই। 
- না, আমাকে রেজা ভাই বলতে হবে না। রেজু বলে ডাকলে আমি খুশি হব। 
তানিমা খিলখিলিয়ে হাসে। রেজাউল ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, এটা আকাশের সঙ্গে খেলা। পানি আর আকাশ আমার বন্ধু। 
তানিমা হাসতে হাসতে বলে, আমি কী? 
- তুমি আমার ভালোবাসার স্রোত।
- আগে তো কখনো বলেননি। 
- সুযোগ পাইনি তানিমা। আজকে সুযোগ পেলাম তোমাকে ভালোবাসার কথা বলার। তুমি আমার প্রাণপ্রিয়। আজ থেকে আমার বুকে ভালোবাসার জলস্রোত বইবে। তোমাকে আমি বুকে ভরে রাখব। কখনোই বেরোতে দেব না। কথা বলা শেষ করেই তানিমার গালে চুমু দেয় রেজাউল। তানিমা ওর বুকে মাথা রাখে। রেজাউল মাথা সরিয়ে বলে, চারদিকে লোকজন হাঁটছে। 
- তাহলে আমরা উঠে যাই এখান থেকে?
- উঠে কোথায় যাব? কিছুক্ষণ বসে থাকি। তারপর যার যার ঘরে ফিরে যাব। 
- ঠিক বলেছ। এই মুহূর্ত থেকে তুমি আমার ভালোবাসার মানুষ। 
- তুমিও আমার ভালোবাসার মানুষ। আমরা দুজনে সংসার করব। সারা জীবন ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখব তোমাকে। 
- আমিও তাই করব। আমাদের ভালোবাসায় কোনো বাঁক থাকবে না। 
ঝলমলিয়ে হাসে রেজাউল। হাসতে হাসতে তানিমাকে চুমু দিয়ে চারদিকে তাকায়। দেখতে পায় হাঁটাহাঁটি করা লোকজনের কেউ কেউ ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে রেজাউল মাথা নিচু করে পানির দিকে তাকিয়ে থাকে। তানিমা ঝটপট উঠে হাঁটতে শুরু করে। রেজাউল মাথা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে, চলে যাচ্ছ? 
- হ্যাঁ, যাচ্ছি। চারদিকে লোকজন ঘুরছে। আমি লজ্জা পাচ্ছি। 
- আমার কাছে ভালোবাসার জন্য লজ্জা নেই। 
- আমার আছে। লোকের সামনে তুমি আমাকে চুমু দেবে, এটা আমি মানতে পারছি না। আর কখনো এমন ব্যবহার করবে না। 
- হ্যাঁ, ঠিক বলেছ, ঠিক বলেছ। আমার এই অন্যায়ের জন্য তোমার পায়ে মাথা ঠেকাচ্ছি। আর কখনো এমন আচরণ করব না। 
- গেলাম। পরে দেখা হবে। 

তানিমা দ্রুতপায়ে হেঁটে চলে যায়। রেজাউল চুপচাপ বসে থাকে। ওর পিছে হাঁটার চিন্তা করে না। পানিতে পা নাড়িয়ে ভালোবাসার স্বপ্নে উৎফুল্ল হয়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে তানিমা বেশ খানিকটা দূরে চলে গেছে। একটু পরে ওকে আর দেখা যাবে না। পরক্ষণে নিজের আচরণের বাড়াবাড়ির কারণে নিজের ওপর রাগ হয়। এমন খোলা প্রান্তরে চারদিকে লোকজনের মাঝে চুমু খাওয়া একটি বড় রকমের অন্যায়। এমন একটি আচরণের জন্য মন খারাপ হয়ে যায়। জোরে জোরে নিজেকে গালি দেয়- হারামজাদা-শুয়োরের বাচ্চা। পরক্ষণে হাত দিয়ে পানি উঠিয়ে চুল ভেজায়। মুখ ধুয়ে ফেলে। বুকের ভেতর দপ্দপ্ করে ওঠে চিন্তা, নিজেকে গালি দিলাম কেন? গালি দেওয়া কি উচিত ছিল। পরক্ষণে নিজেকে শাসন করে, হ্যাঁ, ছিল। কেন এমন অন্যায় কাজ করেছি? নিজের ভালোলাগা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। প্রচণ্ড মন খারাপ হয়। পানির দিকে তাকিয়ে থাকে। দেখতে পায় অনেক বালিহাঁসের ছানা। অল্পক্ষণে ছানাগুলো পাড়ে ওঠে। পাড়ে বসে থাকা দুটো মা-বালিহাঁস দ্রুত ছানাগুলোর কাছে যায়। বালিহাঁসের একটি বড় দল তৈরি হয়। রেজাউল মৃদু হেসে তাকিয়ে থাকে। ভাবে, এ এক অসাধারণ সুন্দর দৃশ্য। ছানাগুলো পাখা উড়িয়ে কখনো হাঁটে, কখনো পাখা বন্ধ করে ফেলে। হাঁটতে হাঁটতে বেশ দূরে চলে যায় বালিহাঁসের দল। হাওরে এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। রেজাউলের মা এমন হাঁসের ছানা সামনে পেলে দু-একটা ধরে ফেলে। ঘরে নিয়ে গিয়ে জবাই করে রান্না করে। সেদিন হাঁসের মাংস দিয়ে ভাত খায় না রেজাউল। লবণ আর কাঁচা মরিচ দিয়ে ভাত খেয়ে উঠে পড়ে। যাওয়ার সময় দেখতে পায় মায়ের চোখে পানি। টুপটাপ ঝরে। মা মুছে ফেলে না। হাঁসের মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে বাবা খুব খুশি হয়। সে জন্য মা সুযোগ পেলে হাঁসের ছানা ধরে। রেজাউলের মনে হয় এমন ছোট ছোট বাচ্চাকে রান্না করা উচিত না। মা কী রান্না করবে এমন চিন্তায় দিশেহারা থাকে। রান্নার জন্য কোনো কিছু না থাকলে কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে ঘর ভরে ফেলে। বাবার এমন চিন্তা নেই। মায়ের হাতে রান্নার কিছু জিনিস প্রতিদিন তুলে দেয় না। বলে না, তুমি এমন করে কাঁদবে না রেজুর মা। আমি রোজ তোমাকে রান্নার জিনিসপত্র দেব।

রেজাউল বাবার বিরুদ্ধে এমন ভাবনার মাঝে নিজেকে ভরিয়ে রাখে। নিজেকে বুঝিয়ে বলে, এটা তো সত্য। এই সত্য নিয়ে কথা বললে তা বাবার বিরুদ্ধে ইচ্ছে করে কিছু বলা হবে না। বাবাকে বাবার আচরণে সঠিক রাখা হবে। পরক্ষণে নিজেকে শাসন করে জোরে জোরে বলে, ছেলে হিসেবে বাবাকে নিয়ে এমন কথা কি বলা উচিত? না, না, সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতরে না ধ্বনি ওঠে। ও না ধ্বনি ধারণ করে কপালে হাত রেখে মাথা সামলায়। কেমন অস্বস্তিবোধ করে। এসব ভাবনার মাঝে নিজের ওপর রেগে যায়। ধীরে ধীরে নিজেকে সামলিয়ে বলে, ও নিজেও মাকে রান্নার নানা কিছু দিয়ে বলবে, মাগো আজকে রান্না অন্য রকম হোক। 

মা মৃদু হেসে বলবে, তুই যেসব জিনিস এনেছিস তা দিয়ে অন্য রকম রান্না হবে রে, বাবা। 

মুহূর্তে থমকে যায় ও। মায়ের ভাবনাচিন্তা নিজের মতো করে বলছে। মা কি ওর মতো করে বলবে। মনে মনে নিজেকে ধমকায় রেজাউল। ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারল না যে নিজের উত্তর মায়ের ওপর চাপিয়ে দিল কেন? পরমুহূর্তে নিজেকে সামলায়। ভাবে, এভাবে অনেক কিছু বুকের ভেতর তৈরি হয়। তারপর ভাবনার চাপে আলোড়ন ওঠে। এই আলোড়নের বাইরে নিজেকে উত্তোলন করা কঠিন কাজ নয়। সে জন্য এই কাজটি সহজে করে তুলে ফেলা উচিত। নিজেকে সংশোধন করা একটি জরুরি পদক্ষেপ। পায়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা কোনোভাবেই উচিত না। নিজেকে শাসন করে জোরে জোরে বলল, খবরদার, এভাবে কখনো আর এমনভাবে নিজে নষ্ট করবি না। নিজেকে নষ্ট করা বড় ধরনের অপরাধ। এভাবে এগোতে থাকলে মানুষের কাছে হেনস্তা হবি। লোকে তোকে ছন্নছাড়া পোলা হিসেবে গালাগালি করবে। 
চলবে...

বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি
বই

ছয় ঋতুর এই দেশে বর্ষাঋতু ছাড়াও যে ঝুম বৃষ্টির অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে তা এমরান কবিরের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থবৃষ্টি: মনোমুগ্ধকর খুনিনা পড়লে বোঝাই যেত না বর্ষার সময় ঝুম বৃষ্টিতে বারান্দায় বসে বই পড়লে যেমন অজান্তেই বৃষ্টির গতিময় ফোঁটা শরীরে পড়ে, শিহরণ জাগে আর নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয় মনএমরান কবিরের এই কাব্যপাঠে সে রকমই অভিজ্ঞতা হলো শব্দের মেঘেও যে বৃষ্টির ছটা থাকে তাও বুঝিয়ে দিল মেঘে গর্জন নেই তবে বর্ষণ আছে ফ্ল্যাপ থেকেই শুরু হয়েছে মেঘের ঘনঘটা, ‘তোমার ভূগোলে আসার পর/ ভেবে দেখ/ কীরূপ ছিল আমার জয়োল্লাস/ আজ ভূগোলের গোলে/ থামিয়ে রেখেছি গান/ ফেরার পথে নিয়ে যাব/ তোমার না-দেখানো-/ বৃষ্টির সোনালি আগুন/ যার জন্য অনেক আগেই আমি/ হয়েছিলাম খুন পুরো কাব্যে যেন এই শৈল্পিক খুনেরই প্রতিধ্বনি

এই বইয়ের উৎসমুখে একটি গদ্য শোভা পেয়েছে সেখানে লিখেছেন তিনি, ‘কোনো ঋতুই আমাদের কাছে পুরাতন হয়ে আসে না যতবারই আসে ততবারই যেন নতুন যেন ছন্দের সাথে ছন্দের সহবাস

কবিতায় বলেছেন তিনি, ‘বাতাস তখন আগুন আগুন,/ পলকে পলকে তার রমণীয় শিখা!’ বৃষ্টির আগে বাতাসের কাছে গ্রীষ্মের যে তীব্রতা তা কবি রমণীয় শিখার সঙ্গে তুলনা করেছেনমেঘ মেঘ গল্পকবিতাটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে  মনে ভেসে ওঠে, ‘বনের ভেতর বন, তাহার ভেতর পালকের গান, উড়ন্ত উচ্ছল তার নয়নের আসমান’–কী শৈল্পিক ছোঁয়ায় তিনি বর্ষাকে জীবন্ত করে তুলেছেন

বাংলার প্রকৃতি, বাংলার মানুষ, বাংলার বর্ষাকে তিনি যেন শব্দের ক্যামেরায় তুলে ধরেছেন এভাবে বাংলার মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাওয়া, বর্ষার বৃষ্টি গায়ে মেখে বড় হওয়া এক জলময় চিরায়ত রোমাঞ্চকর বিজ্ঞাপন হয়ে উঠেছে, ‘বৃষ্টি: মনোমুগ্ধকর খুনি কবিতাগুলো

প্রায় প্রতিটি কবিতায় বর্ষার সঙ্গে এক রহস্যের চাঁদমুখ হয়ে ধরা পড়বে একটা চরিত্রঅধ্যাপিকা কে এই অধ্যাপিকা? তিনি বইটি উৎসর্গও করেছেন সেই অধ্যাপিকাকে অথচ তাকে সুনির্দিষ্ট করা দুরূহ বর্ষায় যেমন মেঘ থাকে, ঝড় থাকে, বৃষ্টি থাকে, বন্যা থাকে, বনের ভেতর হারিয়ে যাওয়া পথ থাকে, বৃক্ষের সঙ্গে বৃষ্টির অজ্ঞাত গল্প থাকে, ঠিক তেমনি কাব্যের বর্ণনায়, শব্দে, ভাবে চরিত্র বর্ষার মতোই রহস্য-রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে! কি জলকন্যা? একি বৃষ্টিবিলাসী নারী? কি কাব্যের পূর্ণতা? নাকি প্রকৃতির রূপক? নাকি কবির মনে সদা জেগে থাকা এক সৌন্দর্যের অনুপম মুখ? আবিষ্কারের জন্য পড়তে পড়তে বই শেষ হবে, রহস্যের শেষ হবে না, ‘অধ্যাপিকা,/ আপনি তো খুউব/ সরল অঙ্কের মতো/ তুমুল বৃষ্টিবাহিকা!’ কিংবাসবাই তো ছাত্র, রোদে রোদে থাকি বিস্মিত পাঠে/ তাপে তাপে বাষ্পীয় উত্তাপে, জানতে পারিনি একা/ আপনি এমন মেঘের মতোন উচ্ছল গায়িকা/ এমন ভেজা গান, গেয়ে যান/ ভিজে যায়/ সমস্ত অববাহিকা

মিথ মৈথুনকবিতায় তিনি আরও গাঢ় রহস্যের শ্যামল বনে বৃষ্টির ফোঁটার মতো করে বলে উঠলেন, ‘তার চেয়ে, অধ্যাপিকা/ সবুজ ঘাসের পাশে হাঁটতে থাকুন ধীরে/ আর তাকিয়ে দেখুন বারবার, কী যে অপরূপ রূপ বরষার

বর্ষার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে বর্ষার জলে ভেজা ভেজা পথে চলতে থাকা এই নিগুঢ় প্রতীকী চরিত্রটি বর্ষাকে সবাই উপলব্ধি করলেও কবি এমরান কবিরের কাব্য যেন বর্ষার স্বচ্ছ আয়না; অতীত, বর্তমান, দেখা-অদেখা সব একসঙ্গে অধ্যাপিকার  প্রতিটি চরণে, শাড়ির ভাঁজে এসে পাঠক হৃদয়ে ভর করে

মাঠ-ঘাট, জলে ভরা নদী, দিঘি, কূলভাঙা নদী বেয়ে গেয়ে যাওয়া বর্ষার সুখের মাঝি, কাদাময় পথ, বৃষ্টির আলিঙ্গন, বর্ষায় অভাবি গৃহিণীর অনাহারে থাকা, জলে পাতিহাঁসের মতো অবাধ গোসল করা শিশুর দল, ঘরের কোনে নিভৃতে একাকি দুটো মনের এক শরীর হওয়ার রহস্যের খেলাসবই আছে কাব্যে

কাব্যে ছোট ছোট কবিতা থাকলেও শেষে আত্মমগ্ন বীজের প্রত্ন ধারাপাত শিরোনামীয় একটি দীর্ঘ কবিতা সন্নিবেশিত হয়েছে ৩০০ চরণেরও অধিক কবিতা পাঠককে এক অভূতপূর্ব শিল্পআস্বাদনের অভিজ্ঞতা দেবে, ‘একদম নিঃশব্দ একাকিনী/ একান্তে দাঁড়িয়ে, একান্তে শুধু/ তিনি শুদ্ধতম একাকিনী/ আঁচল কোমরে গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকেন মাঠে/ সেই সবুজ কৃষাণী

বর্ষার বিপুল, বিস্তৃত বহুমুখী চরিত্র অবদানের সঙ্গে যেমন বহুবিধ আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে তেমনি দীর্ঘ কবিতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষাণীবাংলার চিরায়ত মাতৃরূপিণী অবয়ব তিনি মমতায় সংগ্রামে, শ্রমে শ্রান্তিতে, ত্যাগে তিতিক্ষায়, ভালোবাসায় রুক্ষতায় এক-একক-অদ্বিতীয় তিনি চির বিজয়িনী ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাওয়া ইমারতের মতো হলেও বাইরে তার হাসির ছটাযেন পাকা ধান

আমরা জানি বৃষ্টি আমাদের এই অঞ্চলের কৃষি, সভ্যতা সংস্কৃতির কতটাজুড়ে রয়েছে দীর্ঘ কবিতাটিতে তা উঠে এসেছে দারুণভাবে কবিতাটিতে রয়েছে অদ্ভুত আত্মগীতি রয়েছে মায়া মোহনার কথা, নরম মাটি কৃষাণ-কৃষাণীর নরম হৃদয়ের কথা, রয়েছে ধান গানের কথা উৎপাদন আর জেগে উঠবার কথাও সবচেয়ে রয়েছে এক অপরূপ সম্ভাবনার কথা সব মিলয়ে বৃষ্টির সঙ্গে আমাদের রোমান্টিকতা আর চিরায়ত বাংলার সম্বন্ধসূত্র উঠে এসেছে যার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে আমাদের কৃষি, কৃষ্টি, সভ্যতা, সংগ্রাম, প্রেম, কাম আর আর্থ-সামাজিক অবস্থা

কৃষাণী, নাকি অধ্যাপিকাকে বড় হয়ে বর্ষার চির ছায়া হয়ে থাকবে, মেঘের কোলে রহস্য হয়ে থাকবে তা অনুভব করতে এই কাব্য পাঠের বিকল্প নেই! বর্ষা আসবে বারবার কিন্তু কাব্যিক খুনির বিচার হবে না

সৈয়দ আলী আহসান প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:২২ পিএম
প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি
আঁকা: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

আমি তখন নবম বা দশম শ্রেণির ছাত্র আমাদেরলজিং টিচারকলেজে পড়েন একদিন তিনি জানালেন তাদের কলেজে একটি অনুষ্ঠান হবে, এতে যোগ দেবেন দেশের একজন বিখ্যাত কবি আমার মন খুব চাইছে কলেজের অনুষ্ঠানে যেতে

মাথার মধ্যে লেখালেখির পোকা নিঃশব্দে ওড়াউড়ি করে কাকপক্ষীও যেন টের না পায়, গোপনে কাগজকলম নিয়ে বসি লিখি কী লিখি জানি না একজন বিখ্যাত কবিকে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা যায় নালজিং সারকে খুব করে ধরলাম সার রাজিতার সঙ্গে অনুষ্ঠানে যাব কিন্তু বাবার অনুমতি লাগবে আমার বাবা কড়া মানুষ এমনিতে কোথাও যেতে দেন না কিন্তু আমার আবদারে রজি হলেন আমার সে কী আনন্দ!

হলভর্তি লোক ছাত্রছারা তো আছেই অভিভাবক, স্থানীয় গন্যমান্য অনেকেই উপস্থিত ভাগ্য ভালো, মঞ্চের কাছাকাছি বসার জায়গা পেয়ে গেলাম অনুষ্ঠানের মধ্যমণি দেশের বিখ্যাত কবি সৈয়দ আলী আহসান মুখে চাপদাড়ি, পোশাকে পরিপাটি তিনি যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন, পুরো হল নীরব তিনি দীর্ঘ সময় বক্তৃতা করলেন কঠিন কঠিন বিষয় তার অনেক কথাই মাথায় ঢোকেনি ঢোকার কথাও নয় তার বাচনভঙ্গি খুবই আকর্ষণীয় বুঝি আর না বুঝি শুনতে ভালো লাগছে আমার মুগ্ধতাসামনাসামনি একজন কবিকে দেখছি খেয়াল করলাম, তিনি দুটি চশমা ব্যবহার করছেন একটা খুলে আর একটা পরছেন, সেটাও বদলাচ্ছেন কারণ কী! অনেক পরে জেনেছি, কাছে এবং দূরে দেখার জন্য আলাদা চশমা দরকার হয়

দীর্ঘ বক্তৃতা শেষে কবি নিজের লেখা কবিতা শোনালেন এই প্রথম মনে একটা খটকা লাগল, এটা আবার কেমন কবিতা!? পাঠ্যবইয়ে যে কবিতা পড়ি, এটা তো সেরকম না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামালএদের কবিতা পড়লে বা শুনলে মনে কেমন দোলা লাগে, এই কবির কবিতায় তেমন দোলা নেই

যাই হোক, কবিতা বুঝতে না পারলেও কবিকে ভালো লেগেছে সব থেকে বড় কথা একজন কবিকে জীবনে প্রথম সামনাসামনি দেখা! কবি সেদিন যে কবিতাটি পড়েছিলেন, নামআমার পূর্ব বাংলা

পরবর্তীত, কলেজের পাঠ্যসূচিতে সৈয়দ আলী আহসানেরআমার পূর্ব বাংলাকবিতাটি অন্তর্ভুক্ত ছিল পড়তে হয়েছে, ক্লাসে এটা নিয়ে স্যারের বক্তৃতা শুনতে হয়েছে, পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখতে হয়েছে আগে আমাদের কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতায় ছিল ছন্দমিলের কবিতা আগেই উল্লেখ করেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুফিয়া কামাল, জসীমউদ্দীনের কবিতায় চরণান্তেমিল’-এর বিষয়টি প্রথম দেখলাম চরণান্তে মিল নেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায় ক্লাসে স্যার বললেন, এটা অমিত্রাক্ষর ছন্দ শিখলাম চরণান্তের মিল ছাড়াও কবিতা হয় স্যার আরও বললেন, মাইকেলের প্রায় কবিতাই ১৪ মাত্রার চরণে লেখা ১৪ মাত্রা মানে ১৪টি অক্ষর গুনে গুনে দেখলাম, তাই তো! প্রতি চরণে ১৪টি অক্ষরই তো আছে স্যার মাত্রা পর্ব সম্বন্ধেও বললেন ১৪ অক্ষর মানে ১৪ মাত্রা এই ১৪ মাত্রার চরণ আবার দুই ভাগে বিভক্ত প্রথম ভাগে মাত্রা, পরের ভাগে মাত্রা, এই হলো ১৪ শিখলাম মাত্রা আর পর্ব

এই সামান্য জ্ঞান নিয়ে সৈয়দ আলী আহসানের  আমার পূর্ব বাংলাকবিতাটি দেখার চেষ্টা করলাম কবিতাটি এরকম

আমার পূর্ব বাংলা এক গুচ্ছ স্নিগ্ধ,

       অন্ধকারের তমাল

অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায়,

      একটি প্রগাঢ় নিকুঞ্জ

সন্ধ্যার উন্মেষের মতে

সরোবরে অতলের মতো

কালো-কেশ সঞ্চয়ের মতো

বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি

আমার পূর্ব বাংলা বর্ষার অন্ধকারে অনুরাগ

ঘুমের অলসতায় চোখ বুঁজে আসার মতো শান্তি

হৃদয় ছুঁয়ে-যাওয়া স্নিগ্ধ নীলাম্বরী

(অংশবিশেষ)

 কবিতার বিষয় দেশানুরাগ গভীর মুগ্ধ অনুভবে দেশকে দেখা গদ্য-ছন্দে লেখা অন্তমিল তো নেই-, নেই মাত্রা পর্ব-সমতা আঁটোসাঁটোভাবে কাব্যালংকার না মেনেও যে উল্লেখযোগ্য কবিতা হতে পারে, সৈয়দ আলী আহসানেরআমার পূর্ব বাংলাএর একটি উদাহরণ

 

দুই.

লেখালেখির এই জীবনে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে কারও সঙ্গে কালেভদ্রে, কারও সঙ্গে মাঝেমাঝে, কারও সঙ্গে প্রায় নিত্য দেখাসাক্ষাৎ হয় সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল মাঝেমাঝে, প্রয়োজনে কেউ কেউ যেমন করেন, বয়সের দেওয়াল তুলে অনুজদের একটু দূরেই রাখেন সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন এর বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মানুষ অনুজদের তিনি সহজ আনন্দে গ্রহণ করতেন

একবার হলো কী, আমি রেডিওতে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম শাহবাগ তখন রেডিওর প্রধান কেন্দ্র উপস্থিত হয়ে দেখি আমি যাদের সঙ্গে কবিতা পড়ব, তারা সবাই দেশের খ্যাতিমান কবি, আমি একমাত্র কবিযশঃপ্রার্থী তরুণ এক-দুজন তো তাচ্ছিল্য করল আমি মেনে নিয়েছি কারও কারও খ্যাতির অহংকার তো থাকতেই পারে রেওয়াজ অনুযায়ী অনুষ্ঠানের শেষ পর্ব পঠিত কবিতার ওপর আলোচনা অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সৈয়দ আলী আহসান সেদিন আমার লেখার মৃদু প্রশংসাই করেছিলেন

বহুমাত্রিক লেখক সৈয়দ আলী আহসানের গ্রন্থসংখ্যা অনেক শুধু সংখ্যা বিচারে নয়, বিষয়-বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ এর মধ্যে একটি বইয়ের কথা এখানে উল্লেখ করছি বইটির নামপ্রেম যেখানে সর্বস্ব উল্লেখ করার কারণ, এই বইটির আমিআঁতুড়-সাক্ষী

আমি তখন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় যুক্ত ওই কাগজে সৈয়দ আলী আহসানের আনেক লেখা ছাপা হয়েছে যখনই চেয়েছি, সৈয়দ আলী আহসান লেখা দিয়েছেন তবে লেখাটি তৈরি হতোশ্রুতিলিখনপদ্ধতিতে

প্রেম যখানে সর্বস্বএকটি সংকলন গ্রন্থ এই সংকলন গ্রন্থের প্রায় সবকটি লেখারই আমি ছিলামশ্রুতি লেখক নির্দিষ্ট সময়ে যেতাম সৈয়দ আলী আহসানের কলাবাগান এলাকার বাসায় তিনি আগে থেকেই যেন প্রস্তুত থাকতেন আমি খাতাকলম নিয়ে বসতাম তিনি চোখ বুঁজে বলতেনধীর গতি, স্পষ্ট উচ্চারণ হাতের কাছে কোনোরেফারেন্সনেই তিনি বলে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট সব তথ্যই তার মুখস্থ লেখার শেষ বাক্যটি বলে চোখ খুলতেন, বলতেন, চলবে তো? মননশীল আধুনিক কাব্যবোধ, চিত্রকলা, প্রেমানুভূতির বহুমাত্রিকতা ছিল লেখাগুলোর বিষয় ফরাসি সাহিত্যের আনুপূর্বিক খুঁটিনাটি, শিল্পকলার বাহ্যিক সৌন্দর্য অন্তর-ঐশ্বর্য তার ওইসব লেখায় বিস্তৃত চিত্রশিল্প বা ভাস্কর্য বিশ্লেষণেনারীবিষয়টি সৈয়দ আলী আহসানের লেখায় বিস্তৃত নতুন মাত্রা পেত বিশেষ করে নারীশরীরের সৌন্দর্য মাহাত্ম্য বর্ণনায় তার ভাষা-প্রাঞ্জলতায় শিল্পচেতনারূপ দ্যুতি ছড়াত

অসংকোচেই বলি, শ্রুতিলেখক হিসেবে আমি বেশ আনন্দই পেতাম

গ্রন্থকথা মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায়

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:১১ পিএম
মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায়
বই

একটি সুন্দর জাতি গঠন করতে হলে অবশ্যই বই পড়তে হবে বই মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটায় আমেরিকান কবি জেমস রাসেল বলেছেন, ‘বই হলো এমন এক মৌমাছি যা অন্যদের সুন্দর মন থেকে মধু সংগ্রহ করে পাঠকের জন্য নিয়ে আসে প্রসঙ্গে দুঃখ করে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘আমাদের দেশের লোক বই পড়েন বটে, কিন্তু পয়সা খরচ করে কিনে পড়েন না’…

আশির দশকের শেষপ্রান্তের কবি শামীম আহমদের এগারোতম কবিতার বইটি এবারের বইমেলায় এসেছে গ্রন্থে ছাপ্পান্নটি কবিতার পাঠোদ্ধার করা গেল তবে, শামীম আহমদের কবিতা স্বপ্রণোদিতভাবে একটি ভিন্ন পরিচয় নিয়ে আসে, তার কবিতা যারা নিয়মিত পড়েন তাদের কাছে সেটা উন্মোচিত হয় তার কবিতায় অসংখ্য পাশ্চাত্য প্রতীক, মিথ, চিত্রকল্প ব্যবহার হয় এবং বেশ দক্ষভাবে তবে বর্তমান আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে এই স্বাভাবিক প্রবণতার স্বল্পতা লক্ষণীয় এবং কেন যেন কবি ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে কবিতাগুলো লিখেছেন এবং বেশ সহজভাবে প্রকাশ করেছেনযেখানে শুধু বানিয়ার বাণিজ্য বিতানে/ বোধের বাণিজ্য হয় দেশাত্ববোধের মোড়কে,/ এই চটকদার বিজ্ঞাপনে/ আমি ভুলে যাই জন্মমূল মায়ের জঠরের সুতীব্র আর্তনাদ’ (আমি মাতৃভূমি: পৃ-৪৮)জংধরা জ্যোৎস্না দেখে প্রফুল্ল হওয়া নিরেট মূর্খতা/ এর চেয়ে মোমবৃক্ষের আলো নিষ্পাপ পবিত্র/ নিজকে পুড়িয়ে লীন হয়ে যায়/ আঁধারের যবনিকাপাতে’ (বর্তমান তারুণ্যের প্রতি: পৃ-৩৮) কবি universal true চাঁদের আলোকেও আজকের দেশ সমাজের অধোগতি দেখে পুরো ক্রোধে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেনরূপকের এই দেশে আমি বড্ড সন্দিহানপ্রতিকী আলখেল্লায়, দূর্যোধনের তীরের মতো/ চিকচিক করে দৃষ্টির ফলা/ কখন যে আঁচড়ে পড়ে মৃত্যুর সওদা নিয়ে কে জানে’ (সফেদ হাঙ্গর: পৃ-৪৬) চারপাশের অবক্ষয় দেখে কবি সন্দিহান কখন যে সমাজ, জনপদ কুজনের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তা কবি দিব্যদৃষ্টিতে foresee করতে পারছেন নিবেদিতপ্রাণ কবিই সমাজের এই অধঃপাত দেখতে পারেন কারণ কবি শিষ্টজন তিনি বলে ওঠেন, ‘হে বন্ধু আমার, তুমি কি দেখো নৈসর্গিক বিলাস?/ আমি সব দেখে চোখ বুজি/ নৈষ্ঠিক ঋষির মতো/ বুকের গভীরে পুঁতে রাখি আরাধনার বীজ’ (নৈষ্ঠিক ঋষি: পৃ-৪৭)ডানাভাঙা পায়রা/ হাওয়ায় খুঁজে ফেরে আঁততায়ীর মুখ.../ রোদের গায়ে কান্না, লেগেছিল রক্তের দাগ আজ মনে হয় সময়ের স্রোতে/ মিশে যাচ্ছে সব স্মৃতি’ (আঁততায়ীর মুখ: পৃ-৬২)

শামীম আহমদের কবিতার একজন নিয়মিত পাঠক হিসেবেই বলা যায়, তার কবিতায় থাকে প্রতীক, মিথ, চিত্রকল্প, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদি যা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তিনি প্রয়োগ করেন, যা অনেক বোদ্ধা কবির কাছেও ঈর্ষণীয় হয়ে দাঁড়ায় কিন্তু কাব্যের সামগ্রিক ছাপ্পান্নটি কবিতা পড়লে মনে হয় কবি চটজলদি কবিতাগুলো লিখে ফেলেছেন যার কাছে কবিতা লেখার সময় শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ, শহীদ কাদরী এসে টেবিলের চারধারে ঘিরে ধরেন, তার কাছ থেকে এত চটজলদি কবিতাগ্রন্থ পাঠক কামনা করে না এমনও হতে পারে দেশ সামাজিক পরিবেশের সাম্প্রতিক দৈনতা তাকে ক্রুদ্ধ করে তুলেছে তবুও তার কবিতা এক অনন্যতার জন্য আমাদের চিন্তাজগৎকে আচ্ছন্ন করে

সিলেটের ভাস্কর প্রকাশন মুদ্রণে রাজধানীর সেরা প্রকাশনকেও হার মানিয়েছে প্রচ্ছদ অত্যন্ত সুন্দর অঙ্কন করেছেন আল নোমান

কবিতা অনুবাদ হয় না মানুষের

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০৭ পিএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:১১ পিএম
অনুবাদ হয় না মানুষের

সব মানুষই পরিব্রাজক

পানিপথের যুদ্ধ থেকে

            বিসমিল্লাহ খাঁর সানাই পর্যন্ত

 

যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ছেড়ে

কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে

কার্তুজও জানে

            কখনো না কখনো জাগতে হবে

 

জন্মসূত্রেই মানুষ শিখেছে হানাহানি

প্রয়োগও করছে

            প্রেমে কিংবা রাষ্ট্রতন্ত্রে

 

            মানুষ কখনোই অনূদিত নয়...

কবিতা স্মৃতির ভেতর

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০১ পিএম
স্মৃতির ভেতর

যে ঢেউ ঘুমায় না সমুদ্রের মন্থর বুকে, পাশ ফিরে খোঁজে সমসূত্র-ছেঁড়া ফেরারি ঢেউ; তার মতো একাকী রাত জেগে আছি বুকের উঠোনে সুতীব্র বেদনার মাশরুম ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ে, চিতার কালো জোছনা ঝরে পড়ে নখরে নখরে

 

হরিণখোলা মুণ্ডেশ্বরীর জলে যে দেহাতি সন্ধ্যা বিসর্জন-বিসর্জন খেলে, তুমি তার মতো আমাকে বিসর্জন দিয়ে গেছ এই স্যাঁতসেঁতে শহরে কতকাল শাদা পালকের তারাদের কোন্ডর পাখিদের মতো ডানা মেলে নামতে দেখিনি শালিকদের চরাচরে

 

আহা, কী নিখুঁত পরিকল্পনা তোমার! তবুও আতপচালের গন্ধমাখা স্মৃতির ভেতর

সোনামুখী সুই দিয়ে সেলাই করে যাব ছেঁড়া ছেঁড়া মায়ার কাহন