পরক্ষণে নিজেকে ধমকায়- কেমন বড় জায়গা এটা? এখানে তো নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। শয়তান একটা- নিজেকে গালি দেয়। পরক্ষণে ভাবে, নিজেকে গালি দিচ্ছি কেন? হাওরে বাস করা তো আমার প্রাণের টান। এখানে বাস করে আমি তো নিজেকে ধন্য করেছি। সুখে-আনন্দে দিন কাটিয়েছি। তাহলে এখন কেন নিজেকে গালি দিচ্ছি। পরক্ষণে রাগত স্বরে বলে, আমি একটা শুয়োরের বাচ্চা। ঠিকমতো চিন্তা করতে পারি না। চিন্তার জায়গা এলোমেলো হয়ে যায়। নানাকিছু ভাবি, যার কোনো দিশা থাকে না। সঙ্গে সঙ্গে রেজাউল নিজের মাথা থাপড়ায়। মাথা থাপড়াতে থাপড়াতে দেখতে পায় পাহাড়ি পানির ঢল নেমে আসছে। এই পানির ঢলে ভেঙে যায় কোনো কোনো বাঁধ। তখন ডুবে যায় হাওরের নানা এলাকা। বিশেষ করে ধানখেত ডুবে যায়। তখন ভীষণ কষ্ট হয় সবার। হাওরজুড়ে বাস করা মানুষ চোখের জলে ভাসতে থাকে। ধান ঘরে ওঠানো যায় না। তখন খাওয়া-দাওয়ার ঝামেলা শুরু হয়। পেট ভরে ভাত খাওয়া যায় না। চারদিকে কান্নাকাটির ধ্বনিতে ছেয়ে যায় হাওর এলাকা। রেজাউলের বুক মুচড়ে ওঠে পানির ঢল দেখে। ও কাছাকাছি একটি বাঁধের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তখন সেখানে ঢলের পানি এসে পড়েনি। হঠাৎ করে দূরে তাকিয়ে দেখল একটি বাঁধ ভেঙে গেছে। হাওর এলাকার অনেক মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে বাঁধ ঠিক করার কাজ করছে। এটি এখানকার কোনো নতুন কাজ নয়। এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। রেজাউল বিপুল বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে দৌড়াতে শুরু করে। ওখানে গিয়ে ওদের সঙ্গে কাজ করবে। সবাই মিলে এমন কাজ করতে হয়। নইলে বাঁধ ঠিক করা অনেক জটিল কাজ। পাহাড়ি ঢলে ভেঙে যাওয়া বাঁধ ঠিক না করলে অনেক ক্ষতি হয়। বাস করা কষ্টকর হয়ে যায়। রেজাউল বিপুল বিস্ময়ে চারদিক তাকায়। দূরের দিকে তাকালে ঝলমল করে হাওর এলাকা। এখানে বাস করা ওর কাছে আনন্দের অনুভব। কষ্ট পেলে সেটাও দ্রুত কাটিয়ে ওঠে। ইদানীং কষ্ট পেলে ভাবে, কারও সঙ্গে প্রেম হলে এই কষ্ট আর কষ্ট হবে না। কারও সঙ্গে প্রেম হলে এই কষ্ট কাটিয়ে উঠতে পারবে। এখন প্রেমের অপেক্ষা ওকে কষ্ট দিচ্ছে। ও দৌড়াতে দৌড়াতে বাঁধের কাছে যায়। সবার সঙ্গে বাঁধ ঠিক করার কাজে লেগে পড়ে। দুই হাতে হাওরের মাটি তুলে বুকের কাছে ধরে। বুকে মাখিয়ে তারপর বাঁধের ওপর দিয়ে দেয়।
একজন বলে, কিরে জামায় মাটি লাগালি কেন?
- জামায় লাগাইনি। বুকে লাগিয়েছি। হাওরের মাটি আমার বুকের মাটি।
- শুধু হাওরের মাটি বুকের মাটি হবে কেন? পুরো দেশের মাটি আমাদের বুকের মাটি।
- ঠিক বলেছেন। আপনি আমাকে দেশপ্রেমিক করে দিলেন। আর কখনো হাওরের মাটি নিয়ে এত বড় কথা বলব না।
- বলবি, হাওরের মাটিতে আনন্দ পাই।
রেজাউল হাসতে থাকে। প্রাণ খুলে বলে, এমন চিন্তায় আপনি আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন।
দুই হাত ওপরে তুলে লাফায়। সবাই ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। একজন বলে, হয়েছে, আর লাফাস না। থাম, থাম।
রেজাউল কারও দিকে না তাকিয়ে দৌড়ে বিলের ধারে চলে যায়। বিলের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে পড়ে। জোরে জোরে পা ঝাঁকিয়ে পানি আলোড়িত করে। হা-হা করে হাসতে হাসতে তালি বাজায়। কোনো দিকে না তাকিয়ে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে ওর মনে হয় আনন্দের ঢলে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছে।
তানিমা দূর থেকে রেজাউলকে দেখে দ্রুত পায়ে হেঁটে ওর পাশে এসে দাঁড়ায়।
- কী করছেন রেজা ভাই?
- আকাশ আর পানির সঙ্গে খেলা করছি।
- এটা কেমন খেলা?
- এটা আমার মনের আনন্দের খেলা। তুমি বসো আমার পাশে।
তানিমা ধপ করে বসে পড়ে। শাড়ি হাঁটুর কাছে উঠিয়ে পানিতে পা ডুবিয়ে দেয়। পা নাড়িয়ে পানি তোলপাড় করে।
রেজাউল হাসতে হাসতে বলে, বাহ্, এটা তো তোমার পানির সঙ্গে খেলা।
- হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন রেজা ভাই।
- না, আমাকে রেজা ভাই বলতে হবে না। রেজু বলে ডাকলে আমি খুশি হব।
তানিমা খিলখিলিয়ে হাসে। রেজাউল ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, এটা আকাশের সঙ্গে খেলা। পানি আর আকাশ আমার বন্ধু।
তানিমা হাসতে হাসতে বলে, আমি কী?
- তুমি আমার ভালোবাসার স্রোত।
- আগে তো কখনো বলেননি।
- সুযোগ পাইনি তানিমা। আজকে সুযোগ পেলাম তোমাকে ভালোবাসার কথা বলার। তুমি আমার প্রাণপ্রিয়। আজ থেকে আমার বুকে ভালোবাসার জলস্রোত বইবে। তোমাকে আমি বুকে ভরে রাখব। কখনোই বেরোতে দেব না। কথা বলা শেষ করেই তানিমার গালে চুমু দেয় রেজাউল। তানিমা ওর বুকে মাথা রাখে। রেজাউল মাথা সরিয়ে বলে, চারদিকে লোকজন হাঁটছে।
- তাহলে আমরা উঠে যাই এখান থেকে?
- উঠে কোথায় যাব? কিছুক্ষণ বসে থাকি। তারপর যার যার ঘরে ফিরে যাব।
- ঠিক বলেছ। এই মুহূর্ত থেকে তুমি আমার ভালোবাসার মানুষ।
- তুমিও আমার ভালোবাসার মানুষ। আমরা দুজনে সংসার করব। সারা জীবন ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখব তোমাকে।
- আমিও তাই করব। আমাদের ভালোবাসায় কোনো বাঁক থাকবে না।
ঝলমলিয়ে হাসে রেজাউল। হাসতে হাসতে তানিমাকে চুমু দিয়ে চারদিকে তাকায়। দেখতে পায় হাঁটাহাঁটি করা লোকজনের কেউ কেউ ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে রেজাউল মাথা নিচু করে পানির দিকে তাকিয়ে থাকে। তানিমা ঝটপট উঠে হাঁটতে শুরু করে। রেজাউল মাথা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে, চলে যাচ্ছ?
- হ্যাঁ, যাচ্ছি। চারদিকে লোকজন ঘুরছে। আমি লজ্জা পাচ্ছি।
- আমার কাছে ভালোবাসার জন্য লজ্জা নেই।
- আমার আছে। লোকের সামনে তুমি আমাকে চুমু দেবে, এটা আমি মানতে পারছি না। আর কখনো এমন ব্যবহার করবে না।
- হ্যাঁ, ঠিক বলেছ, ঠিক বলেছ। আমার এই অন্যায়ের জন্য তোমার পায়ে মাথা ঠেকাচ্ছি। আর কখনো এমন আচরণ করব না।
- গেলাম। পরে দেখা হবে।
তানিমা দ্রুতপায়ে হেঁটে চলে যায়। রেজাউল চুপচাপ বসে থাকে। ওর পিছে হাঁটার চিন্তা করে না। পানিতে পা নাড়িয়ে ভালোবাসার স্বপ্নে উৎফুল্ল হয়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে তানিমা বেশ খানিকটা দূরে চলে গেছে। একটু পরে ওকে আর দেখা যাবে না। পরক্ষণে নিজের আচরণের বাড়াবাড়ির কারণে নিজের ওপর রাগ হয়। এমন খোলা প্রান্তরে চারদিকে লোকজনের মাঝে চুমু খাওয়া একটি বড় রকমের অন্যায়। এমন একটি আচরণের জন্য মন খারাপ হয়ে যায়। জোরে জোরে নিজেকে গালি দেয়- হারামজাদা-শুয়োরের বাচ্চা। পরক্ষণে হাত দিয়ে পানি উঠিয়ে চুল ভেজায়। মুখ ধুয়ে ফেলে। বুকের ভেতর দপ্দপ্ করে ওঠে চিন্তা, নিজেকে গালি দিলাম কেন? গালি দেওয়া কি উচিত ছিল। পরক্ষণে নিজেকে শাসন করে, হ্যাঁ, ছিল। কেন এমন অন্যায় কাজ করেছি? নিজের ভালোলাগা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। প্রচণ্ড মন খারাপ হয়। পানির দিকে তাকিয়ে থাকে। দেখতে পায় অনেক বালিহাঁসের ছানা। অল্পক্ষণে ছানাগুলো পাড়ে ওঠে। পাড়ে বসে থাকা দুটো মা-বালিহাঁস দ্রুত ছানাগুলোর কাছে যায়। বালিহাঁসের একটি বড় দল তৈরি হয়। রেজাউল মৃদু হেসে তাকিয়ে থাকে। ভাবে, এ এক অসাধারণ সুন্দর দৃশ্য। ছানাগুলো পাখা উড়িয়ে কখনো হাঁটে, কখনো পাখা বন্ধ করে ফেলে। হাঁটতে হাঁটতে বেশ দূরে চলে যায় বালিহাঁসের দল। হাওরে এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। রেজাউলের মা এমন হাঁসের ছানা সামনে পেলে দু-একটা ধরে ফেলে। ঘরে নিয়ে গিয়ে জবাই করে রান্না করে। সেদিন হাঁসের মাংস দিয়ে ভাত খায় না রেজাউল। লবণ আর কাঁচা মরিচ দিয়ে ভাত খেয়ে উঠে পড়ে। যাওয়ার সময় দেখতে পায় মায়ের চোখে পানি। টুপটাপ ঝরে। মা মুছে ফেলে না। হাঁসের মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে বাবা খুব খুশি হয়। সে জন্য মা সুযোগ পেলে হাঁসের ছানা ধরে। রেজাউলের মনে হয় এমন ছোট ছোট বাচ্চাকে রান্না করা উচিত না। মা কী রান্না করবে এমন চিন্তায় দিশেহারা থাকে। রান্নার জন্য কোনো কিছু না থাকলে কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে ঘর ভরে ফেলে। বাবার এমন চিন্তা নেই। মায়ের হাতে রান্নার কিছু জিনিস প্রতিদিন তুলে দেয় না। বলে না, তুমি এমন করে কাঁদবে না রেজুর মা। আমি রোজ তোমাকে রান্নার জিনিসপত্র দেব।
রেজাউল বাবার বিরুদ্ধে এমন ভাবনার মাঝে নিজেকে ভরিয়ে রাখে। নিজেকে বুঝিয়ে বলে, এটা তো সত্য। এই সত্য নিয়ে কথা বললে তা বাবার বিরুদ্ধে ইচ্ছে করে কিছু বলা হবে না। বাবাকে বাবার আচরণে সঠিক রাখা হবে। পরক্ষণে নিজেকে শাসন করে জোরে জোরে বলে, ছেলে হিসেবে বাবাকে নিয়ে এমন কথা কি বলা উচিত? না, না, সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতরে না ধ্বনি ওঠে। ও না ধ্বনি ধারণ করে কপালে হাত রেখে মাথা সামলায়। কেমন অস্বস্তিবোধ করে। এসব ভাবনার মাঝে নিজের ওপর রেগে যায়। ধীরে ধীরে নিজেকে সামলিয়ে বলে, ও নিজেও মাকে রান্নার নানা কিছু দিয়ে বলবে, মাগো আজকে রান্না অন্য রকম হোক।
মা মৃদু হেসে বলবে, তুই যেসব জিনিস এনেছিস তা দিয়ে অন্য রকম রান্না হবে রে, বাবা।
মুহূর্তে থমকে যায় ও। মায়ের ভাবনাচিন্তা নিজের মতো করে বলছে। মা কি ওর মতো করে বলবে। মনে মনে নিজেকে ধমকায় রেজাউল। ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারল না যে নিজের উত্তর মায়ের ওপর চাপিয়ে দিল কেন? পরমুহূর্তে নিজেকে সামলায়। ভাবে, এভাবে অনেক কিছু বুকের ভেতর তৈরি হয়। তারপর ভাবনার চাপে আলোড়ন ওঠে। এই আলোড়নের বাইরে নিজেকে উত্তোলন করা কঠিন কাজ নয়। সে জন্য এই কাজটি সহজে করে তুলে ফেলা উচিত। নিজেকে সংশোধন করা একটি জরুরি পদক্ষেপ। পায়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা কোনোভাবেই উচিত না। নিজেকে শাসন করে জোরে জোরে বলল, খবরদার, এভাবে কখনো আর এমনভাবে নিজে নষ্ট করবি না। নিজেকে নষ্ট করা বড় ধরনের অপরাধ। এভাবে এগোতে থাকলে মানুষের কাছে হেনস্তা হবি। লোকে তোকে ছন্নছাড়া পোলা হিসেবে গালাগালি করবে।
চলবে...