ঢাকা ৭ বৈশাখ ১৪৩১, শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

ধারাবাহিক শ্রেষ্ঠ রাঁধুনি পুরস্কার

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৪, ১১:৫৯ এএম
শ্রেষ্ঠ রাঁধুনি পুরস্কার

সূর্য অস্ত গিয়েছিল অনেক আগে। অস্তমিত সূর্যের শেষ রশ্মি পশ্চিমের আকাশে ছোপ ছোপ রক্তের মতো আটকে ছিল। আর আটকে ছিল একটি ভুখারি কাকের চোখ এক কাকচক্ষু কুমারীর চোখে।

সারা দিন অন্ন জোটেনি কাকের। ডানাভাঙা বলে উড়তে পারে না। মেয়েটি একমুঠো খুঁদকুড়ো দিলেই বাঁচোয়া। কিন্তু দিন গিয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে দিকে দিকে। কখন জুটবে খাবার, জানে না সে।

সাঁঝের আঁধারে জীর্ণ ঘরের দাওয়ায় বসে ছিল রুকু। একাকী। সন্ধ্যা-আঁধারে ঢেকে গেছে চারদিক। নিজেও সে ক্ষুধার্ত। সেই দুপুরে বাবা গেছে। বাপ-বেটিতে সকালের বাসি পান্তা খেয়েছে। আর কিছু পেটে পড়েনি সারা দিন। অপেক্ষা, কখন আসবে বাবা দিনের ইনকাম দিয়ে চাল-ডাল নিয়ে।

ঘরের চাল ঘেঁষে বড় হওয়া চালতার ডালে প্রতিদিনের লেজঝোলা পাখিটি এসে বসেছে। তার হলুদ পাখায় জমা সন্ধ্যার শিশির মুক্তোর মতো ঝরে ঝরে পড়ছে। কিন্তু মুখরা পাখিটির ঠোঁটে গান নেই। যেন-বা কোনো এক অজানিত অনুভব এ জীর্ণ অঙ্গনে উপস্থিত প্রতিটি প্রাণীর কণ্ঠ চিরদিনের মতো স্তব্ধ করে দিয়েছে। 

রুকুর পা উঠতে চাইছে না। তার পরও উঠল। সন্ধ্যা বলে কথা। প্রথমে বারান্দার টিমটিমে লাইট জ্বালাল সে, তারপর রেকাবিতে ঢাকা বিলিম্বি ভেজানো চালের পানি ছাড়িয়ে দিল। বাবাকে বারবার বলে দিয়েছে তার বহুদিন ধরে চর্চা করা বিলিম্বি ধোয়া চালে মাষকলাই, মাওয়া আর জায়ফল দিয়ে খিচুড়ি রাঁধবে আজ। এসব আনতে বাবার মনে থাকে কি না কে জানে। চাল কেনাই যেখানে অনেক কিছু। 

কলেজপড়ুয়া একরত্তি মেয়ের কোনো আবদারই পূরণ করতে পারেন না হাসান আলী। লোকে তাঁকে কখনো কবি আবার কখনো পটুয়া ডাকে। কারণ তিনি পথচলতি মানুষের হাতে পট আঁকেন আর তার নিচে থাকে মনের মাধুরী মেশানো কবিতার লাইন। তাঁর রোজগার বলতে এইটাই। এখন অবশ্য টিয়া গণক হারাধন মল্লিক আর মসজিদের ক্যানভাসার হালিম শাহ্-এর সঙ্গে জুটি হয়েছে তাঁর। কিন্তু তিনজন মিলেও আক্রার বাজারে জুতসই ইনকাম করতে পারেণ না। আদর্শ স্কুলের মোড়ে দিন শেষে তিন বন্ধুর চোখের রেখা অস্তায়মান দিনের মতো আঁধারে ঢাকা পড়ে। সেখানে তারারা ঝিলিক মারে না কোনোদিন। কখনো চলন্ত গাড়ির আলোয় চোখের পানি চমকে ওঠে কেবল।

মায়ের দোয়া পরিবহন আসার সঙ্গে সঙ্গে মাইকে ঝড় তোলে হালিম শাহ্- 
ইয়া মুসলমান, 
বোবার মতো চেয়ে থাকবে জিন ও ইনসান
যেদিন বন্ধ হবে জবান
শুধুমাত্র কথা বলবে সদকায়ে দান।
ইয়া মুসলমান। 
কবি হাসান আলীর কবিতার জোরে কখনো দু-একজন যাত্রী এক টাকা কী দুই টাকা ছুড়ে দেয়। বাস চলে গেলে হালিম শাহ্ চুক্তি অনুযায়ী মানুষের দানের মসজিদের প্রাপ্য অংশ দানবাক্সে ঢুকিয়ে রাখে। বাকি অংশ তিন বন্ধুতে দিন শেষে ভাগ করে নেয়। অন্য দুজনের ইনকামও একই। কিন্তু তিনজনের যৌথ প্রচেষ্টায় কখনো পকেটের কোনা ভরে না কারও। কোনোদিন। 

স্টেশন-লাগোয়া আল ফালাহ জামে মসজিদ। নাম গালভরা হলেও বাস্তবে কোনো এক অজ্ঞাত মানুষের করে দেওয়া ছোট্ট এক টিনশেড আর মুসল্লি কুল্লে কয়েকজন। অবশ্য গঞ্জের আজিজিয়া ফয়েজিয়া মাদরাসা থেকে একজন ইমাম আসেন নামাজ পড়ানোর জন্য। পাঞ্জেগানা মসজিদ বলে কথা। সেই ইমামের হাদিয়া আর মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই ক্যানভাসার হালিম শাহ্ টাকা তোলেন কবি হাসান আলীর বানানো করুণ ছন্দে। সেই ছন্দ রচনা করতে গিয়ে কবির কাব্যপ্রতিভা কতটুকু বিকশিত হয়েছে বলা মুশকিল, বলা মুশকিল হালিম শাহের গায়কি কি নতুন সুর বিভঙ্গে তরঙ্গিত হয়েছে। তবে অর্থপ্রাপ্তি আর যশোপ্রাপ্তি যা-ই হোক, বিদ্যৎসমাজে অপাঙক্তেয় সেই কবিতা তিন বন্ধুকে বন্ধনের এক অনাবিল পঙক্তিতে এনে বসিয়েছে।

যখন দিনের আলো মরে আসে, তিন বন্ধুতে মসজিদের সামনের ঘাসে ছাওয়া রোয়াকে গিয়ে বসে। সেখানে তিন স্বল্পশিক্ষিত মানুষের বিদ্যার গণ্ডি পেরিয়ে ঐতিহাসিক, জটিল বিষয়সমূহ উঠে আসে। কখনো হারাধন মল্লিক কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অভিমন্যুর অনৈতিক হত্যার বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন। কখনো কারবালার যুদ্ধের করুণ কাহিনি বলতে গিয়ে হালিম শাহর দুই চোখ লোনাজলে ভরে ওঠে। হালিম শাহ্ ভাবতে থাকেন অভিমন্যুর মতো ট্র্যাজিক ঘটনা নিয়ে কেন বাংলা সাহিত্যে কেউ মহাকাব্য রচনা করল না। 

এ সময় দ্রুতগামী পরিবহনের সন্ধ্যার বাস এলে হালিম শাহ্ দ্রুত মাইকে সুর তুলতে থাকেন। বাস চলে গেলে আবারও জমিয়ে আড্ডা বসে। মহাবীর আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ থেকে বিজ্ঞানী নিউটনের মাথায় আপেল পতন কোনো কিছু বাদ যায় না। কখনো দিলদার হোটেলের সৌজন্যে চা এবং বাসি শিঙাড়া জোটে। সেই শিঙাড়া নিজের মেয়ের জন্য কখন হাসান আলীর পাঞ্জাবির পকেটে চালান হয়, দুই বন্ধু দেখেও না দেখার ভান করতে থাকে।

রাত্রিকালীন কয়টা বাস আসবে যাত্রীরাই-বা কেমন সব তিন বন্ধুর মুখস্থ। সমবায় সাতরঙ নং-১ থেকে নং-৭, ইছাখালী পরিবহন এক ও দুই, মায়ের দোয়া পরিবহন আর পারাপার সার্ভিস-এ কয়টা বাস এখনো বাকি আছে। 

একেবারে গভীর রাতে চট্টগ্রাম থেকে সিনেমার শেষ শো ভাঙা যাত্রীদের নিয়ে আসবে সুন্নাত পরিবহন। নাম আর যাত্রীর বৈপরীত্য দেখে তিন বন্ধু কখনো হাসে না। কারণ এ বাসের যাত্রীরাই সবচেয়ে দিল দরিয়া। অবশ্য একাকী মেয়েকে বাড়িতে রেখে কবি হাসান আলী এ বাসের যাত্রীদের দেখতে অত রাত কখনো থাকেন না।

ফিরতি পথে হাসান আলী চাল-ডাল কেনেন। পীতাম্বর শাহের দোকান অতিক্রমকালে মেয়ের বিলিম্বি দেওয়া টক-ঝাল খিচুড়ি রান্নার জন্য মাওয়া আর জায়ফল কেনার কথা মনে পড়ে। কিন্তু পকেট হাতড়ে অবশিষ্ট দুটি মাত্র টাকা খুঁজে পান। অগত্যা দোকানে না ঢুকে বাড়ির দিকে পথ চলতে থাকেন।

চলবে...

শনিবার রাতে

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৩২ পিএম
শনিবার রাতে
অলংকার: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

আগের চাইতে এখন অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে ফাতেমার। আগের মতো আর অন্ধকারাচ্ছন্ন বস্তিতে থাকতে হচ্ছে না। এখন দুই রুমের আধাপাকা টিনশেডের ঘর, নিচটা সিমেন্টের। ঘরলাগোয়া একটা টিনের ঘের দেওয়া জায়গা আছে গোসলটোসল করার জন্য। কিছুটা দূরে বারোয়ারি একটা জলের কল আর পায়খানা আছে। আশপাশের পনেরো-বিশটা ঘরের মানুষের জন্য চলে যায়। তেমন অসুবিধা হয় না। তাছাড়া সামনের গলির মাথায়ও একটা জলের কল আছে, সেখানেও যায় অনেকে।

আগে যেখানে থাকত ফাতেমা, সেটা ছিল ছোটলোকদের বস্তি। নানা কিসিমের চোর-ছ্যাচ্চোর, নেশাখোর আর হারামিদের আস্তানা। ফাতেমা তাদের ঝুপড়ি ঘরের মধ্যে সারাক্ষণ ভয়ে তটস্থ থাকত। স্বামী শহীদকেও দু-একবার বলেছে সে তার ভয়ের কথা। কিন্তু অটোচালক শহীদ সারা দিন আর বেশ রাত পর্যন্ত অটো চালানোর ধকল শেষ করে ফাতেমার কথার অত গুরুত্ব দিতে পারত না। দু-একদিন কিছু ঝগড়াঝাটি করে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছিল ফাতেমাও। ক্লান্ত স্বামীকে আর বিরক্ত করতে চায়নি।

কিন্তু হঠাৎ একদিন শহীদ রাতে ফিরে নিজেই বস্তির এই ঘর ছেড়ে অন্য এক জায়গায় যাওয়ার কথা বলে। আর চার-পাঁচ দিন পরেই ভাসানটেকের এই আধাবস্তির একেবারে শেষ দিকের একটা ঘরে এসে ওঠে।

এখানে আসার পরে একদিন রাতে ফাতেমাকে কাছে টেনে নিয়ে শহীদ বলে, অহন ঠিক আছে তো। অহন কি আর ভয় লাগে? দু’বার প্রশ্ন করার পর ফাতেমা মৃদুস্বরে উত্তর দেয়: না।

এ ব্যবস্থায় ফাতেমা যে খুশি হয়েছে সেটা পরিষ্কার বুঝতে পারে শহীদ। ফাতেমাও খুশিমনে এখানকার পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে থাকে। ইতোমধ্যে মাসখানেক যেতে না যেতেই পাশের ঘরের রোকেয়ার সঙ্গেও আলাপ পরিচয় করে ফেলেছে। রোকেয়ার বছর পাঁচেকের ছেলে জামাল, সারাক্ষণ দুষ্টুমি করে। ফাতেমা তাকেও বেশ বশ করে ফেলেছে। এখন সে প্রায় সময়ই ঘুরঘুর করে ফাতেমার চারপাশে। সারা দিন শহীদকে কাছে পায় না ফাতেমা। পায় শুধু রাতে। কিন্তু তখনো খুব বেশি কথা হয় না, শহীদ এত ক্লান্ত থাকে যে শুয়েই প্রায় রাতে ঘুমিয়ে পড়ে। মাঝেমধ্যে দু-একদিন যদিও শহীদ তার শরীরের চাহিদা মেটাতে কাছে টেনে নেয়। কিন্তু ফাতেমার প্রস্তুতির আগেই যেন দ্রুত কাজ শেষ করে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে। এতে ফাতেমা আনন্দের চাইতে কষ্ট পায় বেশি। কিছুদিন থেকে ফাতেমা লক্ষ্য করছে শহীদের মধ্যে কিছুটা যেন পরিবর্তন এসেছে। মেজাজটাও একটু চড়েছে। ধীরস্থির ভাবটাও অনেকটা কমে গেছে।

গতরাতে বিছানায় শুতে এসেই শহীদের মুখ থেকে মদের নাকি অন্য কিছুর একটা ঝাঁঝালো গন্ধ পেয়ে চমকে ওঠে ফাতেমা। পরে মুখ ফিরিয়ে বলে, তুমি আইজ কী খাইয়া আইছো, কও দেহি-

ফাতেমার কথাটা যেন শুনতেই পায়নি এমন ভাব করে অনেকটা জোর করেই ফাতেমার শরীরটাকে কাছে টেনে নিতে চায় শহীদ। দুই হাতে জোর খাটায়।

উঁহু, আগে কও, কী খাইছ- ফাতেমা শহীদের হাতটাকে তার বুকের ওপর থেকে ঠেলে সরিয়ে দেয়। শহীদ একটু থমকায়। তারপর কিছুটা রাগের সঙ্গেই বলে ওঠে, এসব ফাও কথা কওয়ার আর সময় পাও না!

না, আগে কও- ফাতেমার কণ্ঠেও কিছুটা জেদের আভাস ফোটে। এরকম তো আগে ছিল না-
এই তো গ্যাঞ্জাম কর- শহীদ এবার রীতিমতো রেগে যায়, মাইয়ামানুষ চুপচাপ থাকবা। বেশি জানোনের দরকার নাই-

ফাতোমা অবাক হয়। কিছুটা লেখাপড়া জানা ফাতেমা ভালোমন্দটা মোটামুটি বুঝতে পারে। কেন যেন তার মনে হতে থাকে শহীদ খারাপ লাইনে ঢুকেছে, খারাপ মানুষের সঙ্গে মিশে নেশা ধরেছে। তাছাড়া কিছুদিন ধরে সে দেখছে শহীদের হাতে বেশ টাকা আসছে যেন কোথা থেকে। আগে এমন ছিল না। ফাতেমা কষ্ট বুঝতে পারে, এসব টাকাই ওর মাথাটা গরম করে তুলছে। ফাতেমা অস্ফুটস্বরে বলতে থাকে- বুঝতে পারছি, হঠাৎ অ্যাতো ক্ষ্যাপছ ক্যান-

মানে, কী কইতে চাও তুমি, শহীদের ভ্রু কুঁচকে তাকানোটা ফাতেমা অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারে না।
কওয়ার আর কী আছে, সত্য কতা কইলেই তো দোষ-
সত্য কতাটা কী? শহীদ পাশ ফিরে সরাসরি তাকায় ফাতেমার দিকে। একটু থামে, তারপর বলে, হোন, একটা কতা কই, বেশি চালাকি আমার সহ্য অয় না।...
সোজা কতা, মাইয়া মানুষ মাইয়া মানুষের মতো থাকবা, বেশি বাড়বা না- তাইলে খবর আছে- রাগে অন্য পাশে ফেরে শহীদ। একটু পরে ঘুমিয়ে পড়ে।

স্বভাবতই একটু রগচটা শহীদ, এটা জানে ফাতেমা। কিন্তু আজকের রাতের ব্যবহারটা এবং কথা বলার ধরন দেখে রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে ওঠে। পারতপক্ষে ওর সঙ্গে এমন ব্যবহারের কোনো কারণই খুঁজে পায় না ফাতেমা। যদিও মনের মধ্যে একটা দুর্বলতা বাসা বেঁধেই আছে। বিয়ের পর প্রায় পাঁচ বছর হয়ে এল, এখনো কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নি ফাতেমার। চেষ্টার ক্রুটি নেই, তারপরও হয়নি। কেন হয়নি সেটা বোঝার ক্ষমতা ফাতেমার নেই, বলতে পারে কোনো ডাক্তার। কিন্তু তার কাছে কখনো যাওয়া হয়নি। সবাই ধরে নিয়েছে ফাতেমার কোনো শারীরিক সমস্যার কারণেই এটা ঘটেছে। এ ব্যাপারটা নিয়ে শহীদ যে খুব কিছু বলেছে, তেমনটা না হলেও ফাতেমার মনের মধ্যে যখন তখন কাঁটার মতো খচ খচ করে বিধতে থাকে এই অক্ষমতার বিষয়টা।

সময়টা আসলে ভালো যাচ্ছে না ফাতেমার। এসব ঝামেলার মধ্যে আরেকটা উৎপাত জুটেছে। এই ঘরের মালিকের কে এক আত্মীয় মনির মিয়া এখানে সাত-আটটা ঘরের ভাড়া নিতে আসে। একদিন দেখেই ফাতেমার দিকে সে অন্য রকমভাবে তাকাতে শুরু করেছে। একদিন এসে সে জেনে গেছে সপ্তাহের শুধু শুক্রবার ছাড়া শহীদ অন্য দিনগুলোতে দিনের বেলা ঘরে থাকে না। সেজন্য তাকে শুক্রবার আসতে বলেছিল ফাতেমা। কিন্তু সে অহেতুকভাবে এলো বুধবার। তারপর ভাবী ডেকে নানা ধানাইপানাই গল্পজুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ফাতেমা অন্য কাজের কথা বলে তাকে কিছুক্ষণ পরেই বিদায় করে দেয়। তবে ফাতেমা বুঝতে পারে এবারেই শেষ হলো না। আবার আসবে এই উৎপাত। গায়ের রংটা একটু চাপা হলেও আটসাঁট বাঁধনে টানটান লম্বাটে শরীর ফাতেমার। চোখেও একটু টানা ভাব আছে। একটু ভালো করে দেখলেই ঘোর লাগে। বাচ্চাটাচ্চা না হওয়ার জন্য এতদিনেও বুক আর শরীরের ভাঁজ ঢিলে হয়নি কোথাও।

এই শরীরটাই এখন তার শত্রু হয়ে উঠেছে। ফাতেমা ভেবেছিল রাতে মনির মিয়ার কথাটা বলবে শহীদকে। কিন্তু তা আর হলো না। শুরু করার আগেই ঝামেলা বেঁধে গেল। এরপর আর সহজে ঘুম এল না ফাতেমার। শুয়ে শুয়ে ঘরের পেছনে বেশ কিছুটা দূরের ঝিলের পাড়ের ব্যাঙের ডাক শুনতে লাগল। সন্ধ্যার পরে বেশ বৃষ্টি হয়েছে। সেই বৃষ্টিতে চারদিক থেকে মজে যাওয়া ঝিলটার পাড়ের ঝোপঝাড় আর ছোট ছোট গাছপালার ভেতরে ব্যাঙ আর নানারকম পোকামাকড়ের বসতি গড়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে হচ্ছে মশার বংশবিস্তার। আশপাশে এখনো কিছু খোলা জমি পড়ে আছে, তাতে আবর্জনার স্তূপ। পুব আর দক্ষিণ দিকে বেশ কতগুলো বড় বড় বিল্ডিং উঠেছে। এদিকটা তার পেছনে বলে ও দিকের মানুষের এটা চোখে পড়ে না। ঝিলটা এখন একটা বড় নালার অবয়ব নিয়ে এঁকেবেঁকে কিছু দূর দিয়ে ফাতেমাদের সামনের রাস্তাটা ঘেঁষে পশ্চিম দিকে চলে গেছে। রাস্তাটা যেখানে বাঁক নিয়েছে তারপর আর কিছু দেখা যায় না। বাঁকের পরেই বিশাল বিল্ডিং উঠছে একটা। দিনরাত কাজ চলছে সেখানে। নানা রকম শব্দ পাওয়া যায় সর্বক্ষণ। পাঁচতলা পর্যন্ত ওঠা বিল্ডিংটার ইটকাঠের ফাঁকে ফাঁকে সারা দিন মানুষের চলমান চেহারা দেখা যায় দূর থেকে। সন্ধ্যার দিকে কাজ বন্ধ হলেই সব অন্ধকারে ডুবে থাকে।

এর মধ্যে মাত্র দুই দিন গেছে, তিন দিনের দিন শেষ বিকেলের আলো ফুরাতেই মনির এসে হাজির। এই ভয়টাই করছিল ফাতেমা। তার শরীরের নেশায় পেয়েছে মনিরকে, এটা বুঝতে আর সময় লাগেনি ফাতেমার। ভাবী ভাবী ডাকতে ডাকতে সে আজও একেবারে ঘরের ভেতরে ঢোকার মুখেই পাশের বাসার রোকেয়া ভাবীর কাছে জরুরি কাজ আছে বলে একরকম জোর করেই পালিয়ে বাঁচে ফাতেমা। কিন্তু সে বুঝতে পারে কাল পরশু আবার আসবে মনির। বুকের ভেতরের ভয়টা যেন বিপর্যস্ত করে দেয় ফাতেমাকে।

বেশ রাত করে ফেরে আজকাল শহীদ। এত কী কাজ কে জানে! আগে এত রাত হতো না। মেজাজও বেশ ঠান্ডা থাকত, এখন প্রায় সময়ই মেজাজ গরম থাকে, আর চুপচাপ কী যেন ভাবনাচিন্তায় ডুবে থাকে। ডাকলেও তেমনভাবে সাড়া পাওয়া যায় না। তবু আজ রাতে শোয়ার আগেই ফাতেমা শহীদের কাছে মনিরের ব্যাপারটা বলে ফেলল। চুপচাপ সবটা শুনে শহীদ কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করল। তারপর তাকাল ফাতেমার দিকে, মনির কখন আহে?
ঠিক নাই, ফাতেমা বলে, আমার খুব ডর লাগে-

মনিররে চিনি আমি, এহানেই দেখছি দুই দিন, রাস্তার মোড়ের রশিদ সাইবের লগে গোলমাল করছিল একেবারেই হারে হারামজাদা, হেই দিন কিছু কই নাই-
একটু থামে শহীদ। তারপর আস্তে করে বলে, তোর আবার সায় নাই তো, ফাতু-
ফাতেমা অবাক চোখে তাকায় শহীদের দিকে। বলে, এই চিনছ তুমি আমারে! হায় আল্লাহ-
শহীদ ফাতেমাকে কাছে টেনে নেয়। শুয়ে পাশ ফিরতে ফিরতে বলে, চিন্তা করিস না, দাওয়াই আছে, সুতার মতো সোজা অইয়া যাইব-

শহীদের কথা শুনে বুকের ভেতরের ভয়টা একটু যেন চাপা পড়ে। নিজেকে বিনা বাধায় সপে দেয় শহীদের বুকের নিচে।
সকালে শহীদ কাজে বেরোবার আগে শুধু বলে, এরপর যেদিন আইবে, বলবা, দুই দিন পরে যেন রাইত ১১টার পরে আহে, বুঝছ?
কী কও তুমি! ভয় পেয়ে যায় ফাতেমা, তারপর আমি কী করুম!

তোমার কিছু করন লাগব না, দ্যাখবা আহে কি না, দরজা আটকাইয়া ঘরের মধ্যে থাকবা। দরজা খোলবা না। ফাতেমা শহীদের কথাবার্তার কোনো আগামাথা পায় না। তার ভয়টা অন্য জায়গায়, যদি একবার তাকে বাগে পায় মনির মিয়া তাহলে কী হবে সেটা ভাবতেও বারবার শিউরে ওঠে ফাতেমা। মনির ওকে হাতে পেলে তো ছিঁড়েখুড়ে খেয়ে ফেলবে রাক্ষসের মতো। তবু মৃদু প্রতিবাদ করেও শেষাবধি রাজি হয় সে-

দেখা যাক, কী হয় শেষ পর্যন্ত। এই উৎপাত শেষ হওয়া দরকার। এক দিন দুই দিন যায়, তিন দিনের দিন সেই শেষ বিকেলেই আবার যথারীতি হাজির হয় মনির। আজ পালায় না ফাতেমা। দুরুদুরু বুক নিয়ে সে দরজা খোলে। দরজার ওপাশে মনির দাঁড়ায়। মুখে হাসি ঝুলিয়ে ফাতেমাকে দেখেই বলে ওঠে, ভালো আছ নি ভাবি?

দুই হাতে খোলা দরজাজুড়ে দাঁড়ানো ফাতেমা মৃদু স্বরে বলে, কী ব্যাপার, বলেন-
এট্টু বইস্যাই না হয় কতা কই, মনির ঘরে ঢুকতে চায়, খাড়াইয়া কি সব কতা কওন যায়-
আইজ না, আরেকদিন আইয়েন, আস্তে করে বলে ফাতেমা। আইজ কাম আছে অহন, বওয়ার সোমায় নাই- আরেক দিন না হয় কতা হইব-

এট্টু সময় দেও ভাবি, তোমার লগে তো কতাই হইল না, খালি আই আর যাই-। মনির হাল ছাড়ে না। তুমি না- 
না, ভাইজান, আইজ না, আপনে, আইজ তো বুধবার, একটু থেমে ফাতেমা তারপর আস্তে করে বলে, আপনে শনিবার রাইতে আইয়েন, মনির তাকিয়ে থাকে ফাতেমার দিকে। একটু পরে বলে, আপনে কইছেন?
ফাতেমা মাথা নাড়ে।
কখন আমু?
রাইতে, ১১টার পর-

থমকে দাঁড়ায় মনির। কী ভেবে কিছুক্ষণ পরে বলে, ঠিকাছে, তুমি যহন কইছ। মনির চলে যায়।
মনির চলে যাওয়ার পর দরজা বন্ধ করে খাটের ওপর বসে পড়ে, দম ছাড়ে ফাতেমা। এতক্ষণ যেন দম বন্ধ করে ছিল। বুকের ভেতরের দুপদুপ শব্দ পরিষ্কার শুনতে পায় কানের ভেতরে। রাতে শহীদ ফিরলে তাকে বিস্তারিত জানায় ফাতেমা। শহীদ খুব মনোযোগসহকারে শোনে ফাতেমার কথা। শেষে একসময় অস্ফুটস্বরে শুধু বলে, শনিবার রাইত ১১টা!
গভীর রাতে শহীদের স্বগতোক্তির মতো কথাটা ভীতিকর হয়ে কানে বাজে ফাতেমার। বুকের ভেতরের দুপদুপ শব্দটা আবার যেন পরিষ্কার শুনতে পায়।

পরের দিন সারাটা সকাল কোনো কাজে মন বসাতে পারে না ফাতেমা। শহীদ কাজে চলে যাওয়ার পরে একটা ভয়ের আবহ এসে ঘিরে ধরে তাকে। কাউকে কিছু বলতেও পারে না। কমবেশি ভয়ের মধ্যেই সময় চলে যায়। আসে শনিবার। ভেতরে ভেতরে আরও অস্থির হয়ে ওঠে ফাতেমা।
শহীদ সকালে কাজে যাওয়ার আগে ফাতেমা সামনে এসে দাঁড়ায়।
কি ভয় পাইলানি? শহীদের কথা শুনে যেন চমকে ওঠে ফাতেমা, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
সব ঠিক অইয়া যাইব- চিন্তা কইর না-
শহীদের কথা শুনে কিছুই বোঝে না ফাতেমা। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

সন্ধ্যার পরে রাত যত বাড়তে থাকে ফাতেমার উৎকণ্ঠাও বাড়তে থাকে। যত ভয়ংকর সব ঘটনা কল্পনায় ভর করে মনের মধ্যে এসে ধাক্কা দেয়। এর মধ্যে আবার সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয়েছে টিপ টিপ বৃষ্টি। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন বৃষ্টিও বাড়তে থাকে, ঝিলের ওদিক থেকে ব্যাঙের ডাক শোনা যাচ্ছে শুধু। ঘরের মধ্যে একা ফাতেমা। শুধু ভাবছে কখন আসবে শহীদ। শহীদ না এলে কী করবে ফাতেমা! মনির এসে পড়লে কোথায় যাবে, কীভাবে পালাবে!

এসব ভাবতেই উত্তেজনা আর ভয়ে একেবারে অস্থির হয়ে ওঠে। এক সময় ঘরের আলোটা নিভিয়ে দেয়। জানালাটা বন্ধ বিকেল থেকে। দরজাটা তো আগে থেকেই বন্ধ আছে। তবু আবার গিয়ে দেখে ঠিকভাবে বন্ধ আছে কি না সব। ফাতেমাকে যেন বাতিকে পেয়েছে।

বেশ জোরে বাতাস বইছে। বৃষ্টিও চলছে। সামনের গলিটায় এতক্ষণে পানি জমে গেছে। শহীদের তো এতক্ষণে চলে আসার কথা। ফাতেমা জানে, মনির ঠিকই আসবে। বৃষ্টি বাদলে শয়তানদের আরও সুবিধা হয়। 

এর মধ্যে হঠাৎ মনে হলো, আসলে বোকা সে, তার উচিত ছিল সন্ধ্যার পরপরই রোকেয়া ভাবীর কাছে চলে যাওয়া। শহীদ ফিরলে পরে সে ঘরে ফিরতে পারত। কেন যে সে শহীদের কথার ওপর ভরসা করে ঘরেই বসে রইল! কিন্তু এখন তো কোনো পথই নেই। বুকের ভেতর থেকে ভয়ের আবহ যেন কান্না হয়ে ফিরে এল এবার ফাতেমার চোখ ছাপিয়ে।

বাতাসের চাপে দরজা জানালায় একটু শব্দ উঠলেই বারবার চমকে উঠতে লাগল ফাতেমা। খাটের এক কোনোয় অন্ধকারে ভয়ের কাঁথা জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে নিশ্চল বসে থাকে সে।

মাথা ঝুঁকে একটা বালিশ খামচে ধরে ওইভাবে চোখবন্ধ করে কতক্ষণ বসেছিল ফাতেমা বলতে পারবে না। 
হঠাৎ ঘোর কাটল দরজা ধাক্কানোর শব্দে। বাইরে এখন আর বৃষ্টি নেই। ধরমড়িয়ে উঠে বসে ফাতেমা। বুকের ভেতরে শ্বাসটা যেন আটকে আছে। ঠিক শুনল তো শব্দটা! ভ্রু কুঁচকে খাট থেকে পা নামিয়ে সোজা তাকিয়ে থাকে সে দরজার দিকে। রাত ক’টা বাজে, কে জানে! ১১টা কি বেজে গেছে! 

এবারে শব্দটা আরেকটু জোরে হয়। কেউ কি ডাকছে তার নাম ধরে! কেউ এসেছে দরজার সামনে! শহীদ না কি মনির! শহীদের কথা মনে হতেই একটু যেন সাহস বাড়ে। মাটিতে পা রেখে উঠে দাঁড়ায়, তারপর আস্তে আস্তে যায় দরজার কাছে। অন্ধকারের মধ্যে ভয়ে আলো জ্বালার কথা মনেই আসে না।

দরজায় আবার শব্দ হয়। এবার কান পাতে ফাতেমা। চারদিকে ব্যাঙ আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়াও হঠাৎ শহীদের চাপা কণ্ঠ শুনতে পায়- ফাতেমা, ফাতু কপাট খোল-
কেডা! ভয়ার্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করে ফাতেমা।
আরে আমি, কপাট খোল- ফাতু-
অন্ধকারের মধ্যেই দরজা খুলে একপাশে সরে দাঁড়ায় ফাতেমা। তুই কই? বলতে বলতে শহীদ অন্ধকারের মধ্যে হাত বাড়ায় ফাতেমার দিকে, লাইট নাই! থাউক, লাইটের দরকার নাই। ছায়ামূর্তির মতো ভেতরে ঢুকলে শহীদকে ধরে ফাতেমা কেঁদে ফ্যালে। অ্যাতো দেরি করলা ক্যান-
ভয় নাই। এই তো আমি- শহীদ জড়িয়ে ধরে ফাতেমাকে।
কয়ডা বাজে? ভয়ে ভয়ে জানতে চায় ফাতেমা।
আড়াইটার বেশি। এট্টু দেরি হইল কাজকাম সাইরা... মনির আইছিল?
না।
আর আইব না, ওপারে চইল্যা গ্যাছে-

শহীদের এই ভাষাটার অর্থ জানে ফাতেমা। অন্ধকারের মধ্যে ফাতেমার শিরদাড়া বেয়ে ভয়ের একটা শীতল অনুভূতি নিচের দিকে নেমে যেতে থাকে।

এ সপ্তাহের নতুন বই

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:২৪ পিএম
এ সপ্তাহের নতুন বই

ভালোমানের বই পড়া মানে গত শতাব্দীর সেরা মানুষদের সঙ্গে কথা বলা। হতে পারে, আপনি এমন একটি বই পড়লেন, যা আপনার পুরো জীবন বদলে গেল। এ প্রসঙ্গে ফরাসি সাহিত্যিক ভিক্টর হুগো বলেছেন, ‘পড়তে শেখা মানে আগুন জ্বালানো, বানান করা প্রতিটি শব্দাংশ একটি স্ফূলিঙ্গ।’…

বাংলা কথাসাহিত্য ভিন্নমাত্রা
শান্তনু কায়সার
শ্রেণি: সাহিত্য ও সাহিত্যিক বিষয়ক প্রবন্ধ
প্রকাশনী: ঐতিহ্য, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৪
পৃষ্ঠা: ২১৬; মূল্য: ৫০০ টাকা

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ বাংলা কথাসাহিত্যের বিশাল উত্তরাধিকারকে তাদের রচনায় ধারণ করেছেন। বজ্রে যে বাঁশি বাজে তার তো সহজ গান করবার উপায় নেই। মৃত্তিকায় পা রেখে তারা দেখেছেন, সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোকে ধারণ ও বহন করেও তা বৈশ্বিক পটভূমিকে স্পর্শ করেছে। কথাসাহিত্য বস্তুজগতের সব উপাদানের সঙ্গে তার আবেগ ও মননকে ঋদ্ধ করে। কথাবস্তু তো কাহিনিমাত্র নয়, সে তো ইতিহাস, নৃতত্ত্ব এবং বিচিত্র মানবিক সম্পর্কের রসায়নও বটে। সময় ও নিসর্গ তার দুই আশ্চর্য চরিত্র। আর শান্তনু কায়সার তার বইয়ে তাদের ওই ভিন্নমাত্রাকে অনুভব ও বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন। তার ভাষা বিষয়ানুগ, কিন্তু জীবনের প্রতি আস্থা ও সৌন্দর্য নান্দনিক।...


কবিতার চিত্রকল্প
সরকার আমিন
শ্রেণি: সাহিত্য ও সাহিত্যিক বিষয়ক প্রবন্ধ
প্রকাশনী: পাঠক সমাবেশ, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৪
পৃষ্ঠা: ২৪৮; মূল্য: ৬৯৫ টাকা

কী আছে এই বইয়ে? আছে চিত্রকল্প বিষয়ক অনুসন্ধান। কবিতার দেহ ও আত্মার বিশ্লেষণ। প্রায় সবাই স্বীকার করেন চিত্রকল্প কবিতার প্রাণ। সাধারণ শিক্ষার্থী ও পাঠক, বিশেষ করে তরুণ কবি যারা কবিতা লেখেন, বইটি পড়ে উপকৃত হবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা। কবি কথা বলেন শব্দ দিয়ে ছবি এঁকে। কবির শব্দ-তুলিতে আকা ছবিই চিত্রকল্প। কবির আনন্দ, বেদনা, ভাবনা, পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা, পঠন- সবকিছুই তার কবিতায় দ্রবীভূত হয়। কবির সংবেদনের গভীরতার স্তরে লুকিয়ে থাকে অভিজ্ঞতার নির্যাস ও সৃষ্টিশীল অভীন্সা। এই অভিজ্ঞতা ও অভীন্সা যখন অসাধারণ শব্দচিত্রের মাধ্যমে কবিতায় বহুমাত্রিক বোধ উৎপন্ন করতে সক্ষম হয় তখনই তাকে চিত্রকর বলে অভিহিত করা হয়।...


অন্য হাসান আজিজুল হক
মাসউদ আহমাদ
শ্রেণি: সাক্ষাৎকার
প্রকাশনী: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৩
পৃষ্ঠা: ১০২; মূল্য: ৩০০ টাকা

সমগ্র বাংলা কথাসাহিত্যের বিচারে হাসান আজিজুল হক এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং বিরলদৃষ্ট প্রতিভা। তার ‘আত্মজা ও একটি কবরী গাছ’-এর মতো ছোটগল্প আর আগুনপাখির মতো উপন্যাস তাকে বাংলা সাহিত্যে অবিস্মরণীয় করে রাখবে। তরুণ গল্পকার ও ঔপন্যাসিক মাসউদ আহমাদ হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে কিছু নিবিড় সময় কাটিয়েছেন। সে সময় তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তার কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও স্মৃতিধর্মী রচনা। এই প্রথম এগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলো। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন কালপর্বের সৃষ্টিসম্ভারের মূল্যায়ন 
|যেমন বইটিতে আছে, তেমনি আছে সমকালীন 
সাহিত্যের সদস্যা নিয়ে পর্যবেক্ষণও। আছে লেখকের জীবনস্মৃতি ও নিজের লেখা 
নিয়ে অন্তরঙ্গ আলাপ।...


James 
জেমস
পার্সিভাল এভারেট    
প্রকাশক: ডাবলডে, নিউইয়র্ক
প্রকাশকাল: ১৯ মার্চ ২০২৪  
পৃষ্ঠা: ৩২০; মূল্য: ১৪.৯৯ ডলার

সাহিত্যের ডাকসাইটে অধ্যাপক এবং বহুলপ্রজ লেখক পার্সিভাল এভারেট। প্রধানত সিরিয়াস লেখার কারণে তার বই অপেক্ষাকৃত কম মাত্রার বেস্ট সেলার হয়ে থাকে। তবে তার নতুন উপন্যাস ‘জেমস’ সে দিক থেকে ভিন্ন। তিনি পাঠক নন্দিত উপন্যাসই লিখেছেন এবার। বন্দি জিমের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা কাহিনি তৈরি হয়েছে মূলত মার্ক টোয়েনের ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব হাকলবেরি ফিন’ অবলম্বনে। খুব কঠিন তবে ঘন আনন্দে ভরা এই উপন্যাসের কাহিনিতে প্রধান চরিত্র শুনতে পায় তার স্ত্রী এবং কন্যার কাছ থেকে তাকে চিরতরে বিক্রি করে দেওয়া হবে নিউ অরলিন্সের এক মালিকের কাছে। তখনই সে সিদ্ধান্ত নেয়, নিকটতম জ্যাকসন আইল্যান্ডে পালিয়ে যাবে। ওখানে পালিয়ে থেকেই নতুন পরিকল্পনা ঠিক করবে। বোদ্ধা মহলের মতামত হলো, আমেরিকার সাহিত্যের একটা মাইলফলক হতে যাচ্ছে এভারেটের এই নতুন উপন্যাস।


How to Solve Your Own Murder
হাউ টু সলভ ইওর ওন মার্ডার
ক্রিস্টেন পেরিন
প্রকাশক: ডাটন, যুক্তরাষ্ট্র 
প্রকাশকাল: ২৬ মার্চ ২০২৪
পৃষ্ঠা: ৩৬৮; মূল্য: ১৪.৯৯ ডলার

আমেরিকার তরুণ বেস্ট সেলার কথাসাহিত্যিক ক্রিস্টেন পেরিনের নতুন উপন্যাস ‘হাউ টু সলভ ইওর ওন মার্ডার’ মূলক একটা রহস্যোপন্যাস। আগে থেকে জানা নিজের খুনের রহস্য খুঁজেই ষাট বছর পার হয়ে যায় ফ্রান্সেস অ্যাডামসের। কিশোরীবেলায় ঘনিষ্ঠ দুই বান্ধবীর সঙ্গে এক গ্রাম্য মেলায় বেড়ানোর সময় এক গণকের কাছ থেকে ফ্রান্সেস এক ভয়াবহ ভবিষ্যৎ জানতে পারে: একদিন সে খুন হবে। জীবনে যারাই তার আশপাশে আসে তাদের সবাইকে সে সন্দেহ করে। ফলে কেউ তার কথা বিশ্বাস করে না। বরং অন্যদের কাছে তার মূল্য কমেই যায়। তারপরও সে সতর্কতার বিষয়ে আপস করে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গণকের কথাই সত্য প্রমাণিত হয়। ফ্রান্সেস তার গ্রামের বাড়িতে খুন হয়। এবার তার খুনের রহস্য উন্মোচন করার দায়িত্ব পড়ে তারই চতুর্থ প্রজন্মের সদস্য অ্যানি অ্যাডামসের ওপর। তবে অ্যানির মনে ভয় কাজ করে: রহস্যের জট খুলতে গিয়ে প্রমাতামহের মতো অবস্থায় না পড়তে হয়।

অক্ষম দ্রোহ

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:১১ পিএম
অক্ষম দ্রোহ

নীল ঘাসফুলে জমিয়ে রাখি
কিছু অব্যক্ত অভিমান
অক্ষরহীন বেদনা;
ধূপাগ্নি যাতনায় 
হৃদয়ের চোখে জমা হয় নোনা কষ্ট 
বিষণ্ণ নদীতে ভেসে যায় 
মায়াময় পৃথিবী আমার! 

শূন্যতার অদৃশ্য গিরিখাদে
তবু হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে ফিরি স্বপ্ন
তুমুল বেগবান কিছু স্বপ্ন;
আদিগন্ত আকাঙ্ক্ষায়
অক্ষম দ্রোহে
বোধের দেয়ালে এঁকে রাখি
সূর্যোদয়ের ছবি।

এখন অনেক কিছু নিতে পারি না

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০৯ পিএম
এখন অনেক কিছু নিতে পারি না

এখন অনেক কিছু নিতে পারি না। 
বন্ধুত্ব ভেঙে পড়ে, যেন কাচের জানালা,
ঢিল মেরেছে পাড়ার অলৌকিক ছেলে! 

ধরা মাছ ছেড়ে দিই জলে, অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে জেলে! 

যেতে চাইলে বলি যাব, না যেতে চাইলে নানা রহস্যে মেলে দিই রুমাল!
রুমাল কবুতর হয়ে উড়ে যায় মল্লিকাদের বাড়ি! 

অকারণে হাত নাড়ি, ট্রেন ছেড়ে দেবার প্রাক্কালে! 

এখন অনেক কিছু নিতে পারি না। 
মনে হয় কেউ চাইনিজ কুড়াল হাতে দাঁড়িয়ে আছে জাতিসংঘে, 
চারপাশে পড়ে আছে প্রচুর মহিষের কাটা মস্তক!
আমি হেঁটে চলে যাই নদীনির কাছে। 
বসে থাকি অর্ধঅন্ধকারে
নির্ভুল প্রকৃতি ছাড়া আর কোনো উদ্ধারক্রেন নাই

নারীমঙ্গল

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০৭ পিএম
নারীমঙ্গল

ভালোবাসা চাইলে নাইমা আসো জীর্ণ কুঁড়েঘরে
যদি প্রেম চাও ফকফকা জ্যোৎস্নায় ডুব দাও
পুরুষের কলবে নাকি সিল মেরে দিছে খোদাতালা
পুরুষ নিয়ত ঘোরে বিত্তের পেছনে; জানে না সে
পৃথিবীতে নারীই প্রথম ভালোবাসার খোয়াব বুনেছে
নারীই নিয়েছে প্রথম গন্ধমের স্বাদ
নারীহীন কোনো পৃথিবীর কথা ভাবতে পারে তুমি?
আগুনে ডরাই না আমি, ভীত নই সমুদ্র-তুফানে
নক্ষত্রের সমান দীপ্তিময় আমি, মেঘের সহোদরা
হাউসের পুরুষ ভাবে যন্ত্ররমন্ত্রর দিয়ে সব
সে সকলে নেবে। আমার ছতর লইয়া এত চিন্তা ক্যান
আমারে দেইখ্যা নাকি কত সাধু পুরুষের ধ্যান ভেঙে গেছে
শুনেছি কত বুজর্গ হয়েছে দিওয়ানা
সুচরিতা ছাড়া গৌতমও পায় নাই বোধি লাভ।
মহাপ্লাবনে যবে সব লয় হয়ে গেলে
জোড়া জোড়া প্রাণী নূহের নৌকায় লইল ঠাঁই
নৌকা ভেসে যায়, চাঁদ ভেসে যায়, ভেসে যায় সবুজ প্রকৃতি
পুরুষের মন তবুও গলে না। কী সুন্দর চান্দ উঠছে 
দেখো পুবের আকাশজুড়ে ছড়াচ্ছে চান্দের আলো 
আমার ছতর আমি কতটুকু ঢাকুম, কতটা খোলা রাখুম
সেসব লইয়া এত চিন্তা কেন তোমার? যদি নিজেকে
সামাল দিবার না পারো, দুই চক্ষে লোহার বেড়া দাও
নারীর গর্ভে জন্ম লইছো তুমি, কোনো নারী জন্মে নাই তোমার উদরে।