মানস সংগঠক সত্যজিৎ রায় । খবরের কাগজ
ঢাকা ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

মানস সংগঠক সত্যজিৎ রায়

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ১১:৩১ এএম
মানস সংগঠক সত্যজিৎ রায়
আঁকা: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

সত্যজিৎ রায় লেখক। ছোটদের, বড়দের সবার। পাশাপাশি তিনি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, শিল্পনির্দেশক এবং সংগীত পরিচালক। প্রাবন্ধিক, চিত্রকর ও চিত্রগ্রাহক। বহুমুখী প্রতিভার এই মানুষ জন্মগ্রহণ করেন কলকাতায়। তার পূর্বপুরুষের নিবাস ছিল বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কাটিয়াদি উপজেলায় মসুয়া গ্রামে। তখন অবশ্য জেলা ছিল ময়মনসিংহ। সেই ব্রিটিশ শাসনামলে। তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯২১ সালের ২ মে এবং পরলোকগমন করেন ২৩ এপ্রিল ১৯৯২। বাবা প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ও ননসেন্স ছড়ার জনক সুকুমার রায়। মা সংগীতশিল্পী সুপ্রভা রায় আর পিতামহ খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী।

সত্যজিৎ রায় তার সমগ্র কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯২ সালে অস্কার পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি ভারতরত্ন এবং পদ্মভূষণসহ সব মর্যাদাপূর্ণ ভারতীয় পুরস্কার লাভ করেছেন। তার ডাকনাম ছিল মানিক।

সত্যজিৎ রায় অন্যান্য সব পরিচয় ছাপিয়ে মূর্ত হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক হয়ে। তার চলচ্চিত্রে সামাজিক বাস্তবতা ও রাজনীতি এসেছে স্পষ্টভাবে। যা মানুষকে অধিকার সচেতন করে তোলে আর নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখায়। 

সত্যজিৎ রায় পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে বানানো ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তি পায় ১৯৫৫ সালে। ১৯৫৬ সালে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘পথের পাঁচালী’ বেস্ট হিউম্যান ডক্যুমেন্ট পুরস্কার লাভ করে। অনেকেই মনে করেন সত্যজিৎ রায়ের এই চলচ্চিত্র ভারতীয় চলচ্চিত্রের বাঁক বদলে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ‘পথের পাঁচালী’ যেমন সময়ের দলিল তেমনি আটপৌরে নিত্যজীবনের এক নগ্ন অথচ শৈল্পিক উপস্থাপন। লেখক আর্থার সি. ক্লার্ক এই চলচ্চিত্র সম্পর্কে বলেছেন, পথের পাঁচালী পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এবং হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া ছবিগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই ছবির কিছু দৃশ্য এতই হৃদয়বিদারক যে, আমি সেগুলো আর কখনো দেখিনি।

১৯৪৩-৪৪ সালের দুর্ভিক্ষপীড়িত বৃহত্তর বাংলার পটভূমিতে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাস থেকে ১৯৭৩ সালে সত্যজিৎ রায় তৈরি করেন ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার সেনাবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহ করতে থাকে। তখন বাংলার গ্রামে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দেয়। সেই দুর্ভিক্ষে ৫০ লাখ মানুষ মারা যায়। দুর্ভিক্ষ কীভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে প্রভাবিত করেছে সেই ছবি তুলে এনে সত্যজিৎ রায় ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রে দেখিয়েছেন যুদ্ধ কেমন করে মানবতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। 

সত্যজিৎ রায়ের যে চলচ্চিত্র রাজনৈতিক দৃষ্টিতে কালজয়ী হয়ে আছে তা হলো ‘হীরক রাজার দেশে’। তিনি এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন ১৯৮০ সালে। সত্যজিৎ রায় দেখিয়েছেন শিল্প, রাজনীতি আর মানস সংগঠনে সমাজ সচেতনতা একে অন্যের সঙ্গে মিশে একত্রে চলতে পারে। ‘হীরক রাজার দেশে’ চলচ্চিত্রে দৃঢ় গলায় উচ্চারিত হয়েছে, অনাচার করো যদি রাজা তবে ছাড়ো গদি। যারা তার ধামাধারী, তাদের বিপদ ভারি। এই চলচ্চিত্র যখন বানানো হয় তখন ক্ষমতায় ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস সরকার। দেশে জরুরি আইন ঘোষণা করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে মানুষকে জাগাতে, প্রতিবাদী করে তুলতে ‘হীরক রাজার দেশে’ অনন্য অবদান রেখেছে। তিনি চলচ্চিত্রে শোষিত-অবহেলিত কৃষকের কথা নিয়ে এসেছেন। কৃষিপ্রধান দেশে কৃষকরা অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। সেখানে হীরকের রাজা যন্তরমন্তর ঘরে কৃষককে ঢুকিয়ে তার মগজধোলাই করে। তাকে শেখানো হয় মন্ত্র, বাকি রাখা খাজনা, মোটে ভালো কাজ না। ভরপেট নাও খাই, রাজকর দেওয়া চাই। যায় যদি যাক প্রাণ হীরকের রাজা ভগবান। এ এক কঠিন সমাজ বাস্তবতা। যা রাষ্ট্রের জনগণকে নিষ্পেষণের বীভৎস চিত্র হয়ে আছে। যা এখনো প্রাসঙ্গিক।

নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের ‘এনিমি অব দ্য পিপল’ নাটক অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় ১৯৯০ সালে তৈরি করেন চলচ্চিত্র ‘গণশত্রু’। সেখানে দেখা যায় ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র। রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, অসার রাজনীতি, আমলাতান্ত্রিকতা, দুর্নীতি এবং সমাজের নৈতিকতার অবক্ষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এই ‘গণশত্রু’ চলচ্চিত্রে।  

এবার আসি সাহিত্যে। সত্যজিৎ রায় বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয় দুই চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। তার একটি হলো ফেলুদা এবং অন্যটি বিজ্ঞানী প্রফেসর শঙ্কু। ফেলুদার আসল নাম প্রদোষ চন্দ্র মিত্র। তিনি একজন শখের গোয়েন্দা। তুখোড় ক্ষুরধার বুদ্ধির গোয়েন্দা ফেলুদা আমাদের সামনে উন্মোচন করে চলেন একের পর এক রহস্য। বাদশাহী আংটি, সোনার কেল্লা, কৈলাসে কেলেঙ্কারি, রয়েল বেঙ্গল রহস্য, জয় বাবা ফেলুনাথ- এরকম অনেক কাহিনি। পাগলাটে বিজ্ঞানী প্রফেসর শঙ্কু আমাদের নিয়ে যান বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির জগতে। গল্পগুলো প্রফেসর শঙ্কুর কাণ্ডকারখানা, মহাসংকটে শঙ্কু, শঙ্কু একাই একশ ইত্যাদি। এই দুই চরিত্র ছাড়াও আরেকজন আছেন। তিনি হলেন তারিণীখুড়ো। একজন চিরকুমার বৃদ্ধ, যিনি নিজের জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে গল্প বলতে ভালোবাসেন। এই তিন চরিত্রের পাশাপাশি সত্যজিৎ রায় বেশকিছু ছোটগল্পও লিখেছেন। যেমন ফটিকচাঁদ, সুজন হরবোলা ইত্যাদি।

সত্যজিৎ রায়ের লেখালেখির বৃহৎ অংশজুড়ে আছে শিশু-কিশোর। সত্যজিৎ রায়ের সাহিত্য শিশু-কিশোরদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশে যথেষ্ট প্রভাব রেখেছে। কোনো বিষয়ের প্রতি আগ্রহ ও কৌতূহল শিশু-কিশোরদের বুদ্ধিমত্তা ও মানস সংগঠনে প্রবল ভূমিকা রাখে। তারা যুক্তি দিয়ে কোনো কিছু বিচার করতে, ধাঁধা ও অঙ্কের খেলা খেলতে, সমস্যার সমাধান করতে পছন্দ করে এবং আনন্দ পায়। তাতে তাদের মানসিক বিকাশ সম্পূর্ণ হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায় অগ্রগণ্য। তিনি আগামী প্রজন্মের ভিত তৈরি করতে, শিশু-কিশোরদের মানস সংগঠনে বিশেষ অবদান রেখেছেন।
সত্যজিৎ রায়ের লেখা ফেলুদার বিভিন্ন কাহিনিতে সমস্যা সমাধানের সূত্র হিসেবে সাংকেতিক পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। এই সাংকেতিক সমস্যা ও তার সমাধানের ভেতর দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটে থাকে। 

যেমন সত্যজিৎ রায়ের লেখা ‘রয়েল বেঙ্গল রহস্য’ শুরু হয়েছে সংকেত দিয়ে। সেখানে লেখা আছে,
মুড়ো হয় বুড়ো গাছ,
হাত গোন ভাত পাঁচ
দিক পাও ঠিক ঠিক  জবাবে।
ফাল্গুন তাল জোড়
দুই মাঝে ভুঁই ফোঁড় 
সন্ধানে ধন্দায় নবাবে।

এই সংকেতের অর্থ থেকে খুঁজে পাওয়া যাবে গুপ্তধন। যেখানে মুড়ো হয় বুড়ো গাছ মানে গাছটি প্রাচীন (বুড়ো গাছ)। ‘হয়’ মানে ঘোড়া আবার ঘোড়া মানে অশ্ব। মুড়ো হচ্ছে গোড়া। বুড়ো গাছের গোড়া হলো অশ্ব। অর্থাৎ অশ্বথগাছ।

হাত গোন ভাত পাঁচ। ভাত মানে অন্ন। তাতে পাঁচ যোগ করলে হয় পঞ্চান্ন। অর্থাৎ গাছের গোড়া থেকে পঞ্চান্ন হাত দূরে। 
দিক পাও ঠিক ঠিক জবাবে। জবাবের শব্দার্থ হলো উত্তর অর্থাৎ উত্তর দিকে।

ফাল্গুন তাল জোড়। ফাল্গুন হলো অর্জুনের আরেক নাম। আর অর্জুন শুধু পঞ্চপাণ্ডবের একজন নয়, অর্জুন গাছও বটে। 
ফাল্গুন তাল জোড়, দুই মাঝে ভুঁই ফোঁড়। একটা অর্জুনগাছ আর জোড়া তালগাছের মাঝখানে জমি খুঁড়তে হবে। 
সন্ধানে ধন্দায় নবাবে। যার সন্ধান মিললে নবাবদের চোখও ধাঁধিয়ে যাবে।

এই সাংকেতিক ধাঁধা যেমন মজার তেমনি তাতে আছে যুক্তি আর বুদ্ধির সমন্বয়। যুক্তি আর বুদ্ধি ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পুরো কাহিনিজুড়ে আছে রহস্য, রোমাঞ্চ, যুক্তি-বুদ্ধি আর কল্পনা শক্তির প্রয়োগ। এই চর্চা পাঠকের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সহায়ক। তাই সত্যজিৎ রায়ের লেখা বেশি বেশি পড়া সবার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

২৩ এপ্রিল সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুদিন। এ দিনের স্মরণে তার প্রতি রইল আমাদের হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা।

এ সপ্তাহের নতুন বই

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ০১:০৩ পিএম
এ সপ্তাহের নতুন বই
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

জ্ঞানসমুদ্রে পিপাশা নিবারণের অন্যতম  হাতিয়ার হলো বই। একটি ভালো বই মানুষের জানাশোনার পরিসরকেই বিস্তৃত  করে না বরং বাস্তব জীবনে এর প্রতিফলন ঘটিয়ে জীবনকে বদলে দিতে পারে। কবি ও ছড়াকার রেদোয়ান মাসুদ বলেছেন, ‘বই হচ্ছে জোনাকি পোকার মতো, চারদিকে অন্ধকার অথচ নিজে জ্বলে থাকে।’...

সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রত্যাশা 
যতীন সরকার
শ্রেণি: সাহিত্য ও সাহিত্যিক বিষয়ক প্রবন্ধ
প্রকাশনী: কথাপ্রকাশ, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৪ 
পৃষ্ঠা: ১৫০; মূল্য: ৪০০ টাকা 

যতীন সরকার এ যুগের শীর্ষস্থানীয় চিন্তাবিদ। অর্ধশতাব্দীরও অধিককাল ধরে তার শানিত লেখনী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন পাঠককে সমৃদ্ধ করে এসেছে। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের কীর্তিমান এই প্রাবন্ধিকের চিন্তাচর্চার পরিসর সুদূরবিস্তৃত। সংস্কৃতি, সমাজ, সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে তার ক্ষুরধার বিশ্লেষণ পাঠকের সামনে নতুন ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রত্যাশা তার গভীর মননচর্চার উজ্জ্বল দীপ্তিতে ভাস্বর। এই চিন্তানায়ক দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে কোনো সংকটমুক্তির পূর্বশর্ত সাংস্কৃতিক জাগরণ। তিনি শুধু সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রত্যাশা করেননি, সে লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত উপায় নির্দেশ করেছেন। রুচির অবক্ষয়ের এ যুগে চিন্তাউদ্দীপক ও প্রসাদগুণসম্পন্ন প্রবন্ধ দুর্লভ হয়ে উঠেছে। শক্তিমান প্রাবন্ধিক যতীন সরকারের প্রবন্ধসম্ভার বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

লোনা মাটির ফসল 
মৃত্যুঞ্জয় রায় 
শ্রেণি: ফসল ও শাকসবজি চাষ
প্রকাশনী: অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৪ 
পৃষ্ঠা: ২৪০; মূল্য: ৬০০ টাকা 

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, এ কথা আমরা সবাই জানি। সমুদ্রের পানি বেড়ে যাওয়ায় তা উপকূলীয় অঞ্চলের নদী-খাল দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে। সমুদ্রের পানি লবণাক্ত। তাই সেসব পানি ও জোয়ারের পানি এসব অঞ্চলের মাটিকে প্লাবিত করার ফলে মাটি দিন দিন অধিক লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর, কৃষি ও পরিবেশের ওপর। লোনা মাটিতে ফসল চাষ করতে হলে আগে লোনা মাটি ও লবণাক্ততার কারণ সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি কোনোভাবেই কাম্য নয়। কেন লবণাক্ততা বাড়ছে তা জানলে লবণাক্ততা কমানোর কিছু ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এই গ্রন্থে লোনা মাটি ও লবণাক্ততা সম্পর্কে সাধারণ ধারণা দেওয়া হয়েছে, সে মাটির ব্যবস্থাপনা কী হবে, কী কী ফসল চাষ কীভাবে করা যাবে সেসব বিষয়ে আলোচনা আছে এ গ্রন্থে।...

জীব-জন্তু 
সুকুমার রায়
শ্রেণি: প্রাণী ও জীবজগৎ (বয়স ৪-৮)
প্রকাশনী: গ্রন্থিক প্রকাশন, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৪ 
পৃষ্ঠা: ১০৮; মূল্য: ৩৩০ টাকা 

গরিলা থাকে আফ্রিকার জঙ্গলে। গাছের ডালপালার ছায়ায় সে জঙ্গল দিনদুপুরেও অন্ধকার হয়ে থাকে, সেখানে ভালো করে বাতাস চলে না, জীবজন্তুর সাড়াশব্দ নেই। পাখির গান হয়তো কচিৎ কখনো শোনা যায়। তারই মধ্যে গাছের ডালে বা গাছের তলায় লতাপাতার মাচা বেঁধে গরিলা ফলমূল খেয়ে দিন কাটায়। সে দেশের লোকে পারতপক্ষে সে জঙ্গলে ঢোকে না- কারণ গরিলার মেজাজের তো ঠিক নেই, সে যদি একবার ক্ষেপে দাঁড়ায়, তবে বাঘ ভালুক হাতি তার কাছে কেউই লাগে না। বড় বড় শিকারি, সিংহ বা গন্ডার ধরা যাদের ব্যবসা, তারা পর্যন্ত গরিলার নাম শুনলে এগোতে চায় না। পৃথিবীতে প্রায় সবরকম জানোয়ারকেই মানুষ ধরে খাঁচায় পুরে চিড়িয়াখানায় আটকাতে পেরেছে- কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো বড় গরিলাকে মানুষ ধরতে পারেনি। মাঝে দু-একটা গরিলার ছানা ধরা পড়েছে, কিন্তু তার কোনোটাই বেশি দিন বাঁচেনি।...

সুন্দর মনের সর্বনাশে 
আদিল মাহমুদ 
শ্রেণি: কাব্যগ্রন্থ
প্রকাশনী: নালন্দা, ঢাকা
প্রকাশকাল: একুশে বইমেলা ২০২৪ 
পৃষ্ঠা: ৬৪; মূল্য: ২০০ টাকা 

এই কাব্যগ্রন্থের প্রত্যেকটি কবিতা তাসবি দানার মতো এক সুতোয় গাঁথা। কাছাকাছি সময়ে লেখা। এজন্য কবিতাগুলোর আর আলাদাভাবে নাম দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি কবি। তবে বৃষ্টি বা নদীর বয়ে যাওয়া পানির মতো একের পর এক কবিতা মিল রেখে সাজানো। এখানে আছে আপন আল্পনার আঁকা একটি কাল্পনিক প্রেমের অভ্যর্থনা, আলাপ, পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা এবং তার শেষ পরিণতির উপাখ্যান। প্রেমের অন্তরঙ্গ রূপ এঁকেছেন তিনি নিবিড় সূক্ষ্মতায়। প্রেমানুরাগী মনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়লে, এমনটাই দেখতে পাবেন কবিতাগুলোর সর্বাঙ্গে।

The Garden
দ্য গার্ডেন
ক্লেয়ার বিমস
প্রকাশক: ডাবলডে, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র    
প্রকাশকাল: ৯ এপ্রিল ২০২৪  
পৃষ্ঠা: ৩০৪; মূল্য: ২২.৭৫ ডলার 

আমেরিকার তরুণ কথাসাহিত্যিক ক্লেয়ার বিমস এ মাসেই প্রকাশ করেছেন তার নতুন উপন্যাস ‘দ্য গার্ডেন’। এ উপন্যাসের কাহিনিতে বলা হয়েছে, প্রধান চরিত্র ইরিন উইলার্ডের চারবার গর্ভপাত হয়েছে। পঞ্চমবারের মতো গর্ভধারণ করার পর তার স্বামীর সঙ্গে যায় বার্কশায়ারের এক চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে। চিকিৎসক দম্পতি তাদের বাড়িতেই চালায় ডক্টরস হল নামের হাসপাতাল। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যায় ইরিন। এখানে আসার পর তার মনে পড়ে যায় অনেকদিন আগে ভুলে যাওয়া এক বাগানের কথা। অন্যদিকে ইরিনের জটিল অবস্থা সারানোর ব্যাপারে চিকিৎসক দম্পতির একাধিক চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। ইরিন বুঝতে পারে, ওই বাগানের নিজস্ব শক্তিই তার শারীরিক অবস্থার উন্নতির পথে অন্তরায়। হাসপাতালের অন্যান্য রোগীর সঙ্গে পরামর্শ করে ইরিন সিদ্ধান্ত নেয়, তারা সবাই মিলে বাগানের অশুভ শক্তির প্রভাব তাদের ওপর থেকে দূর করে ফেলবে।

পাপেট

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১২:৩৩ পিএম
পাপেট
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

নাতালীর বিদায়ের সময় বাবা যখন নাতালীর হাত সাইফের হাতের মধ্যে দিয়ে বলতে লাগলেন, বাবা আমাদের অতি আদরের নাতালীকে এতদিন আমরা খাইয়ে-পরিয়ে শিক্ষাদীক্ষায় বড়ো করেছি। আজ থেকে ওর ভরণ-পোষণের সব দায়িত্ব তোমার কাঁধে তুলে দিলাম। প্রাণভরে দোয়া করি তোমরা সুখী হও। বিপদে-আপদে একে অন্যের পাশে থেকো। স্রষ্টা তোমাদের মঙ্গল করুন। বাবা খুব বেশি কথা বলতে পারলেন না। বাবা নাতালী আর সাইফের হাত ছেড়ে দিয়ে চোখের জল মুছতে লাগলেন। এই ফাঁকে নাতালী এক ঝটকায় সাইফের হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। সাইফের মধ্যে ভাবোদয় হয়, নাতালী কী লজ্জা পেয়ে হাত সরিয়ে নিল! নাতালীর অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে সাইফের চোখে। এত অস্থির হয়ে উঠছে কেন নাতালী? সাইফ গাড়িতে ওঠে। নাতালীর মামা একরকম জোর করেই নাতালীকে গাড়িতে সাইফের পাশে বাসিয়ে দেয়। বরের গাড়ি চলতে থাকে। নিরাপদ দূরুত্বে সরে বসে নাতালী। বর-কনের গাড়িতে ড্রাইভার ছাড়া অন্য কেউ নেই। সাইফ নাতালীর সান্নিধ্য পেতে চায়। কথা বলতে চায়। পেছনে বরযাত্রীদের গাড়ি। শহরের উপকণ্ঠে নাতালীদের বাড়ি। সেখান থেকে সাইফদের বাড়ির দূরত্ব পাঁচ-ছয় কিলোমিটার হবে। পাকা রাস্তা। শান্ত নিবিড় রাস্তার দুই পাশে বৃক্ষাদি দাঁড়িয়ে আছে ছবির মতো। রাস্তার দুই পাশে বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ দেখা যায়। দিগন্তের কাছে নত হয়ে আছে সুনীল আকাশ। উত্তর দিকে নিঃসঙ্গ একটা রেলস্টেশন। স্টেশনের পাশে কৃঞ্চচূড়া গাছের নিচে ছোট্ট একটা বাজার। বাজারে মানুষের আনাগোনা। নাতালী কথা বলছে না দেখে নাতালীর দিকে আর না তাকিয়ে গাড়ির জনালা দিয়ে প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্য উপভোগ করছিল সাইফ। বেলা ডুবুডুবু করছে। গরম যেন কমছেই না। এসি ছেড়ে দিয়েছে ড্রাইভার। তারপরও ঘামছে নাতালী। ঘামছে সাইফ। নাতালীর মাথাটা ভারী হয়ে ওঠে। সাইফ কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করে নাতালীর সাথে। নাতালী সেই-যে মুখ নিচু করে বসে আছে আর মুখ উপরে তুলছে না। সাইফের দিকে মিঠা নয়নে একনজর দৃষ্টি দেবে তাও দিচ্ছে না। সাইফ ভাবে, এ কেমন মেয়েরে বাবা, বিয়ের ফুল ফোটা থেকে শুরু করে স্বামীর সান্নিধ্য পাওয়া পর্যন্ত মেয়েদের মধ্যে যে এক ধরনের অবেগ-অনুভূতি কাজ করে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না! দুই বছর চাকরি করার পর বিয়ে করলাম। ত্রিশের কোঠায় বয়স। শুনেছিলাম সবুরে মেওয়া ফলে, এখন দেখছি মাকাল ফলতে শুরু করেছে। কোথাও কী ভুল হয়ে গেল! কী সব ছাইভস্ম ভাবছি!

গাড়ি চলছে। সাইফ আবারও নাতালীর গা ঘেষে বসার চেষ্টা করে। হাতটা নিজের হাতের মধ্যে টেনে নেয়। নাতালী তীর্যক নয়নে সাইফের দিকে নেত্রপাত করে। কর্কশ স্বরে বলে, হাত ছেড়ে দিয়ে সরে বসেন। আমার খুব খারাপ লাগছে। কালবিলম্ব না করে দ্রুতই হাত ছেড়ে দিয়ে সরে বসে সাইফ। সাইফ ভাবে, যে গরম পড়ছে তাতে খারাপ তো লাগতেই পারে। তারপরও ভাবনারা পিছু ছাড়ে না সাইফের। নতুন বউ বলে কথা! গলার স্বরটা একটু নিচু করেও তো বলতে পারত কথাটা। বেশ উঁচু গলায় কত সহজেই বলে ফেলল, হাত ছেড়ে দেন। ড্রাইভার কী শুনে ফেলেছে নাতালীর কথা?

সাইফের ভাবনার রেশ কাটতে না কাটতেই নাতালীকে নিয়ে বরযাত্রীরা মহা ধুমধামে নিশাপুরে সাইফদের বাড়িতে এসে উপস্থিত হলো। নতুন বউ দেখার জন্য গ্রামের নারী-পুরুষ উপচে পড়ে বাড়িতে। প্রাইভেটকার থেকে নামানো হলো বর-কনেকে। শরবত ও মিষ্টি খাইয়ে ছেলে ও ছেলের বউকে বরণ করে নিল সাইফের মা। এসব আয়োজন নাতালী আড়চোখে দেখে। মৃদু হাসে। উৎসুখ চোখজোড়া কী যেন খুঁজে ফেরে। ঈদের পর থেকেই প্রচণ্ড দাবদাহে অস্থির জনজীবন। নাতালীর মুখ ঘেমে বাজে একটা অবস্থা হয়েছে। মেকআপ করা মুখে কোথাও সাদা কোথাও ভেজা কাদার মতো লেপটে আছে বিউটিশিয়ানের পালিশ করা কালারফুল পাউডার। সাইফের মা শাড়ির আঁচল দিয়ে আলতো করে নাতালীর মুখের ঘাম, ভেজা পাউডার মুছে দিল। সাইফের মা-বাবা দুজনই স্কুলশিক্ষক। মা সাইফ আর নাতালীকে বুকের সঙ্গে আগলে নিয়ে একতলা বাড়ির বারান্দায় পাশাপাশি রাখা দুটো চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন নতুন বউ দেখে যাচ্ছে। এ ওর কাছে বলাবলি করছে, দেখো দেখো সাইফের বউ কি সুন্দর! ডাগর ডাগর চোখ। উঁচু নাক। গোলগাল মুখ। না মোটা না পাতলা। বাহ্ বাহ্, দুজনকে খুব মানিয়েছে!

প্রতিবেশী-স্বজনদের মুখে প্রশংসার কথা শুনে সাইফের মা কোমল কণ্ঠে বলেন, তোমরা আমার সাইফ আর বউমার জন্য দোয়া করো আল্লাহ যেন ওদের সংসারজীবন সুখে-শান্তিতে ভরিয়ে দেন। মায়ের এমন স্নিগ্ধ আবেগময় কথা শুনে সাইফের মনটা উতলা হয়। তার মনজুড়ে যেন বিষণ্ন সন্ধ্যা নামে।

ভানু সারা দিন তেজ দেখিয়ে ডুব মেরেছে। জোনাকজ্বলা রাত আসে সবুজ কলার পাতায়। বারান্দায় বসে আছে দুজন। স্ট্যান্ড ফ্যানের বাতাসও গরম। এভাবে বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না সাইফের। মন ভালো নেই তার। সারা পথ নতুন বউ একটি কথাও বলেনি। কেবলই নিঝুম অস্থিরতা। বিয়ে বাড়ির ঝারবাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। 

বাড়িতে প্রতিবেশীদের বিচরণ কমে এসেছে। সাইফের চাচাতো ভাবীরা নাতালীকে নিয়ে ঘরে যায়। বিয়ের শাড়ি পাল্টিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাতালী ভাবীদের সঙ্গে কথা বলে। সাইফও উঠে পোশাক পরিবর্তন করে হাত-মুখে পানি দেয়। সাইফের বড় চাচার বড় ছেলের বউ স্থানীয় একটি কলেজের বাংলার লেকচারার। ভীষণ মিশুক। অল্প সময়ে মানুষকে আপন করে নেয়। নাতালীর পাশে বসে সে মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলে। নাতালীকে সে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সে বলে, তোমার ভাগ্যটা খুব ভালো নাতালী, সাইফের মতো সৎ, স্মার্ট, ভদ্র, বিনয়ী, করিৎকর্মা বর তোমার কপালে জুটেছে। 

ভাবীর কথা শুনে নাতালী চোখ দুটো বড় বড় করে বলল, তাই! আমার তো কোনো গুণই নেই, তাহলে কেমন করে থাকব আপনার গুণধর দেবরের সঙ্গে!

কে বলেছে তোমার গুণ নেই, তোমার ঠোঁটের যে স্নিগ্ধ হাসি, সেটি দিয়েই তো তুমি সাইফের মাথা খারাপ করে দেবে। কথা বলেতে গেলে দুই গালে টোল পড়ে। এতে যে তোমাকে আরও বেশি মোহনীয় দেখায়, তা কি তুমি জানো?

এসব তো আমার জানার কথা নয়। যে আমাকে ভালোবাসবে সে জানলেই হবে।

তুমি তো সুন্দর করে কথা সাজিয়ে উত্তর করতে পার। শুনেছি তুমি মেধাবী মেয়ে।

আমার মতো বোকা মেয়ে এই ধরাধামে আর একটিও আছে বলে আমার মনে হয় না। বই পড়ে খাতায় লিখে ভালো রেজাল্ট করা এক বিষয় আর জীবনকে সাজিয়ে-গুছিয়ে চলা অন্য এক বিষয়। জীবনকে সাজাতে পারলাম না। গার্ডিয়ানের হঠকারী সিদ্ধান্তের বলী হয়ে আপনাদের বাড়িতে এলাম। কেন এলাম, কী করব, এখন কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।

মধুময় শুভদিনে এমন করে হতাশার কথা বলছ কেন?

আপনাকে আমি ম্যামই বলি। ম্যাম, মানুষের জীবনে অনেক গল্প থাকে, কিন্তু আমার জীবনের গল্পটা একটু অন্যরকম।
তোমার জীবনের অন্যরকম গল্পটা শুনতে পারি-

আপনাকে বলা যাবে না ম্যাম। কষ্ট পাবেন। সাইফ সাহেবকে সব বলব।
সাইফ কষ্ট পাবে না?
জানি না ম্যাম। তারপরও তাকেই বলতে হবে। 

সাঈফের বড় ভাবী নাতালীর কথা শুনে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। ভাবোদয় হয়, একটা সুবোধ ছেলের ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে! চোখের বর্ষায় ভিজল ভাবীর মায়াবী মুখের চারপাশ। দিন শেষে ক্লান্তির মধ্যে যে ভালোলাগাটুকু ছিল তাও মুহূর্তে উড়ে যায়। অবস্বাদে ভরে ওঠে মন। তাহলে কী সাইফের এতদিনের লালিত স্বপ্নগুলো সজনে পাতার মতো ঝরে যাবে!

বিয়ে বাড়ির হইচই থেমে গেছে। ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছুঁইছুঁই করছে। একবুক হতাশা নিয়ে ভাবী নাতালীকে বাসর ঘরের খাটে বসিয়ে দিলেন। সাইফকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে নিঃশব্দে বের হয়ে গেলেন।

ভাবী উঠোনে নেমে গেলে সাইফ বাসর ঘরের দরোজায় সিটকিনি লাগিয়ে খাটের দিকে এগিয়ে আসে। আবহমানকাল ধরে বাঙালি মেয়েরা খাট থেকে নেমে বরের পা ছুঁয়ে সালাম করে। নাতালী এসব করল না। সাইফ খাটের কিনারে বসতেই নাতালী নড়ে উঠল। সাইফ ভাবে, আনন্দময় দ্বিধা নিশ্চয় নাতালীর মধ্যে কাজ করছে। ঘেমে ভিজে গেছে নাতালীর শরীর। মাথায় ঘোমটা নেই। সাইফ অনেক কথা বলতে চায়। নাতালী আগের মতোই নীরব। সাইফ কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। কেউ যদি কথা না বলে তাকে তো বোঝাও মুশকিল। সাইফ বিরক্ত হয়ে বলল, কথা বলবেন না, ঠিক আছে আপনি ঘুমান আমি অন্য রুমে গিয়ে ঘুমাই। সাইফ ছিটকিনি খুলছিল। নাতালী ডাকল, দাঁড়ান-

সাইফ বলল, আমি তো সেই কখন থেকে দাঁড়িয়েই আছি।
ওই সোফাটায় বসুন।

সাইফ শান্ত ছেলের মতো একবুক আশা নিয়ে বসে। তার বুকটার মধ্যে বাকবাকুম রব ওঠে। এতক্ষণে বিবির মুখে কথা ফুটল!

নাতালী সাইফের মুখের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, আমি আপনাকে কয়েকটি কথা বলব, শুনবেন?
অবশ্যই শুনব। বউয়ের কথা কেউ না শুনে পারে!

আমি তো আপনার বউ হইনি আর আপনি বউ বানিয়ে ফেললেন-
বরের সঙ্গে ফাজলামো করছেন, তিন শর্তে কবুল বলে বিয়ে করেছেন আর বলছেন বউ হননি। বাসর ঘরে বসে নাটক করছেন। বাসর ঘরে এসব কথা মানায়? আমার জীবনকে জীবন বলে মনে হচ্ছে না! আমি কি পাপেট?

নাতালী দেখল সাইফ রেগে যাচ্ছে। কথাগুলো এখনই বলতে হবে। কোনোরকম রাখঢাক না করে নাতালী বলল, আমি একটি ছেলেকে ভালোবাসি। তাকেই বিয়ে করব। আত্মহত্যা করব না বিধায় বাবা-মায়ের চাপে আপনার ঘরে ভুল করে চলে এলাম। ক্ষমা করবেন। আপনার অনেক ক্ষতি আমি করে ফেললাম। যার মাসুল আপনাকে অনেক দিন ধরে দেওয়া লাগবে। ক্ষমা করবেন। ওই যে আপনি বললেন, আমি তিন শর্তে কবুল বলেছি। আসলে আমি কবুল বলিনি।

রাগতস্বরে সাইফ বলল, তবে কী বলেছেন?
আবুল বলেছি আবুল। আ আস্তে বলেছি আর বুল জোরে বলেছি, তিনবারই বলেছি আবুল আবুল আবুল-
শেষ পর্যন্ত সত্যি সত্যি আপনি আমাকে পাপেট বানিয়ে ছাড়লেন! আপনার কাছে আমি পাপেট! আমার এতদিনের স্বপ্ন-সাধ-আহ্লাদ, ভালোবাসা এক নিমেষেই ধুলিসাৎ করে দিলেন। শেষবারের মতো নাতালীর মুখের দিকে তাকিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো হাসতে হাসতে বাসর ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল সাইফ।

ভাবী এতক্ষণ না ঘুমানোর দলে ছিলেন। সাইফের পাগলা হাসির শব্দে দরোজা খুলে বাইরে বেরোতেই সাইফকে দরোজার সামনে দঁড়িয়ে হাসতে দেখেন। হতভাগা সাইফকে ভাবী কী বলে সান্ত্বনা দেবেন?
কেউ কারও সঙ্গে কথা বলতে পারল না।

পশ্চিম আকাশে কালবোশেখির ঝোড়ো মেঘ। গুড়ুম গুড়ুম শব্দ করে মেঘ ডাকছে। অবিরাম ডেকেই চলেছে।

পাখি

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১২:২৪ পিএম
পাখি
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

ডানা আছে বলেই উড়তে হবে নাকি 
                                       পাখি

এই যে পাতার সংসারে 
সবুজের ভেতর সুখ ডেকে ওঠে
সুরেলা সুরে,
খরকুটোর গল্পটা নীড়ের রন্ধ্রে ছড়িয়ে
সুগঠিত হয় রোদ-ছায়ার ফ্রেমে। 
হাওয়ার তালে জ্যোৎস্না দোলে
নদীর পাললিক অবয়বে। 

অফুরন্ত নীলের বিস্তৃত বুকে
যেখানে আকাশ নিজেই নোঙর ফেলে
বসতি গড়তে চেয়ে
নক্ষত্র জড়ো করে পাঁজরে,
রংধনুটা রঙের প্রতি বাঁকে
উড়াল রাখে ভিন্ন কারুকাজে। 

চোখের কোণে জমা মায়ার গোধূলি 
বিকেলের দিগন্ত থেকে কোন অংশে 
কম কী?

ডানা আছে বলেই উড়তে হবে নাকি 
                                         পাখি।

একগুচ্ছ খয়েরি খঞ্জনা

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১২:১৯ পিএম
একগুচ্ছ খয়েরি খঞ্জনা
অলকরণ: নাজমুল আলম মাসুম
বিলেতি গাবের মতো মখমলে মোড়া
একগুচ্ছ খয়েরি খঞ্জনা
আমার প্রত্যাবর্তনে নিত্যদিন ফিরে আসে-
শৈশবের স্মৃতিধন্য অর্জুন ছায়ায়।
 
ওদের কণ্ঠে চঞ্চল উচ্ছ্বাস উল্লাস!
বিমূর্ত চিত্রকলার মতো সুবাসিত গান-
মায়াবতী সুরধারা যেন জলতরঙ্গের!
আমাকে নন্দিত করে ঋদ্ধ করে-
প্রেমময় খুনসুটি।
 
কার্পেটের মতো বোনা সবুক উঠোনে
পাখিগণ খুঁটে খায় নিজস্ব আহার
দিনান্তে নাচের মুদ্রা পায়ে উড়ে যায়
মেহগনি বুনো অন্ধকারে…
 
ওরা কোথা থেকে আসে, ফের 
কোথা চলে যায়-
একগুচ্ছ খয়েরি খঞ্জনা?

আজি হতে সহস্র বর্ষ পরে

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১২:১৭ পিএম
আজি হতে সহস্র বর্ষ পরে
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

কবিসভা পথ হারাইয়াছে। সহস্র বছর ধরিয়া তাহারা পথ খুঁজিতেছে। ইতিমধ্যে কাফেলা দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইয়াছে। বড় অস্থির, তাই তাহাদের কণ্ঠের পারদ ক্রমাগত বাড়িয়া চলিয়াছে।

কত বিচিত্র সব কবি! একজন বলিলেন, আমি সম্মুখে এক মহাপর্বতের অস্তিত্ব অনুভব করিতেছি- যাহা আকাশ ভেদ করিয়া নীরবে দণ্ডায়মান। অন্যজন (যিনি নিরন্তর নিজেকে দেখিয়া এবং নিজ কণ্ঠসুধা পান করিয়া তাহাতে সমাধিস্থ হইয়া থাকেন) বলিলেন- জনাব, আপনার চোখের সমস্যা রহিয়াছে। যাহা দেখিতেছেন তাহা টিলারও যোগ্য নহে!

‘আমরা তো চতুর্দিকে কেবল অভ্রভেদী পর্বতই দেখিতেছি! স্নিগ্ধ, মৌন।’ -হাহাকার করিয়া উঠিলেন বিপন্ন কবিসভা। ‘তবে কি আমরা পথ হারাইয়াছি?’ সমাধিস্থ কবি গর্জন করিয়া উঠিলেন, যতসব মূর্খের দল! আমাকে অনুসরণ করুন। আমিই পৃথিবীর সর্বশেষ কবি ও পণ্ডিত! 

পর্বত হাসে। দিবসের প্রথম আলো তাঁহাকে সশ্রদ্ধ প্রণতি জানায়। টাইগার হিলের কনকনে ঠান্ডায় জমে যেতে যেতে অলৌকিক সেই আলোর আরতি দেখেন সহস্র বর্ষ পরের কোনো এক কবি।