ঢাকা ১০ আষাঢ় ১৪৩১, সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪

কাঁচি

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৪, ১২:১৩ পিএম
আপডেট: ১০ মে ২০২৪, ১২:৫০ পিএম
কাঁচি
অলংকরণ : নিয়াজ চৌধুরী তুলি

শাহজাদি বেগমের মন মোটেই ভালো নেই। শরীর ভালো না থাকলে মনও ভালো থাকে না। এক শ একটা অসুখ শরীরজুড়ে। তারপরও চলছিলেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। বরাবরের স্বাবলম্বী মানুষ। কারও সাহায্য নিতে পছন্দ করেন না। খারাপ শরীর নিয়ে চলছিলেন। কিন্তু হাতে মোটেও জোর নেই। বুড়ো হয়েছেন বলে জোর নেই, এমনটা নয়। সারা জীবনই হাতে শক্তি কম। একটা বোয়েমের মুখও তিনি খুলতে পারেন না। অন্যের হাতে সহজে যা খুলে যায় তিনি সর্বশক্তি দিয়েও তা খুলতে পারেন না। পানির বোতল, কোকের ছিপি এমনকি চিপস-চকলেটের প্যাকেটও খুলতে অন্যের সাহায্য লাগে। চাকরি জীবনে লোকজন ছিল। তারপরও বলতে চাইতেন না বলে বেশির ভাগ সময় পানি বা কোক না খেয়েই চলে আসতেন। এখন তিনি অবসরে। চাইলেই হাতের কাছে লোক পাওয়া যায় না। ভীষণ অসুবিধা হয়। হয়তো একটু আচার খেতে ইচ্ছে করল। আচারের বয়াম কিছুতেই খুলতে পারেন না। ডিম ভাজবেন, তেলের শিশির মুখ খুলতে পারেন না। কেউ এক প্যাকেট চিপস দিয়েছে, খেতে ইচ্ছে করছে। প্যাকেট খুলতে পারেন না। এটা একটা জীবন হলো! সবসময় হাতের পাশে লোকও থাকে না। আর লোক বলতে তো সেই এক মেয়ে। সকালে উঠে চাকরিতে চলে যায়, ফিরতে ফিরতে রাত। দুপুরে কাজের মেয়ে আসে। আসে বললে ভুল হবে। মাঝে মাঝে আসে ইচ্ছেমাফিক। তিন ঘরে তিন বাড়ি আর ধাপুর-ধুপুর কিছু প্লেট-গ্লাস ছুড়ে বেঁকিয়ে দিয়ে তার কাজের হিসেব বুঝিয়ে চলে যায়। হিসেব বোঝানো কথার কথা। ওর কাজের হিসেব নিতে গেলে পরদিন থেকে আসবে না। কাজেই সে চেষ্টা শাহজাদি করেন না। একা একা দুপুরের খাবার খান। আর খেতে বসলেই নানান বিপত্তি হয়। এখন তো আর আগের দিন নেই। গরম তরকারি কড়াইতে থাকে না। থাকে বক্সে বক্সে, ফ্রিজে। সেই বক্স বের করে ওভেনে গরম করতে হয়। কোনো কোনো সময় ভাত-তরকারির বক্সের ঢাকনিও খুলতে পারেন না। এমনও হয়েছে ঢাকনি খুলতে না পেরে শুধু ভাত-মরিচ-পেঁয়াজ ডলে খেয়েছেন। কিন্তু বলবেন কাকে! দোষারোপ করলে তো সময়কেই করতে হয়, আর করতে হয় শরীরকে।

ওষুধ খেতেও সমস্যা তার। পাতা থেকে ওষুধ বের করতে পারেন না বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। মনে মনে বাপ-মাকে গালিগালাজ করেন, ছেলেবেলায় ঠিকমতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে বড় করেননি বলে। সেটা করলে নিশ্চয়ই তার হাত এত কমজোর হতো না! তার ওপর আবার নাম রেখেছেন শাহজাদি। শাহজাদি না ফকিরজাদি। ফকিরজাদি তবু খাবারের সময় ভাতটুকু পায়! শাহজাদির একবারও মনে পড়ে না অন্য ভাইবোনদের কব্জির জোর ঠিকই আছে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ওপর রাগ শাহজাদির। রাগ প্রয়াত স্বামীর ওপর। দিব্বি তো আছে একা একা আজিমপুর কবরস্থানে মহাআনন্দে শুয়ে! বয়াম খোলা, প্যাকেট খোলার ঝক্কি নেই। স্বার্থপর, প্রবল স্বার্থপর! এ কেমন জীবন। হাতের কাছে ভরা কলস তৃষ্ণা মেটে না।

কব্জির শক্তি বাড়ানোর অনেক কসরত করেছেন তিনি। একজাতীয় বল টিপলে নাকি শক্তি বাড়ে। বছরের পর বছর টিপে গেছেন। বিন্দুমাত্র উপকার হয়নি। ইউটিউব দেখে ব্যায়াম শিখেছেন। নিয়মিত করেন। লাভ নেই, যা তা। বোতল-বয়াম খোলার ব্যবস্থা তিনি করতে পারেননি। চেষ্টা করেন বুয়া এলে প্রয়োজনীয় জিনিসের মুখ খুলিয়ে রাখতে। মনে থাকলে হয়। তবে ওষুধ বের করা, প্যাকেট খোলার একটা ব্যবস্থা করে নিয়েছেন তিনি। মেয়েকে বলেছেন যতটা সম্ভব বয়াম বাদ দিয়ে প্যাকেটে জিনিসপত্র আনতে। আজকাল প্রায় সব জিনিসই প্যাকেটে পাওয়া যায়। মেয়ে তাই আনে। শাহজাদি বেগম হাতের পাশের টেবিলে একটা কাঁচি রেখেছেন। ছোট্ট একটা ধাঁরালো কাঁচি। যেকোনো প্যাকেট খোলার কাজে এখন তিনি এই কাঁচি ব্যবহার করেন। তার কষ্ট এখন অনেকটা কমে গেছে।

সেই কাঁচিটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না দুই দিন ধরে। চরম বিপদে পড়েছেন তিনি। না খেতে পারছেন ওষুধ, না খুলতে পারছেন কোনো প্যাকেট। মহাবিরক্ত তিনি। মেয়েকে বলেছেন,
: কাঁচিটা খুঁজে পাচ্ছি না।
: আছে কোথাও।
: রুকসানা নিয়ে গেল নাকি?
: ও কাঁচি নিতে যাবে কেন? নিলে তো অনেক দামি জিনিসই আছে নেওয়ার। খুঁজে দেখ। পেয়ে যাবে।

খুঁজে না দেখে কি আর মেয়েকে বলেছেন শাহজাদি। মেয়ের নির্লিপ্ত উত্তরে ভীষণ বিরক্ত শাহজাদি! ও কী করে বুঝকে কী যাতনায় আছেন তিনি! রান্নাঘরে কাঁচি-ছুরি আছে। কিন্তু প্রতিটি কাজে ঘর থেকে রান্নাঘরে যাওয়া আবার রান্নাঘরে জিনিস রেখে আসা ঝামেলা। তাছাড়া প্রেসার ওঠানামা করে তার। হঠাৎ উঠতে গেল পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। শাহজাদি বেগম হতাশ!

দুপুরে খেতে বসে অনেক চেষ্টা করেও তেঁতুলের আচারের বয়ামটা খুলতে পারলেন না। আজকাল সব কিছু মুখে বিস্বাদ লাগে। ভাত না খেয়েই উঠে গেলেন। টেবিলে সাজানো অনেকগুলো আপেল। একটা আপেল নিয়ে কাটতে চেষ্টা করলেন। পারলেন না। চিবিয়ে খেতে গেলেন। দুটো দাঁত ভেঙে আছে অনেকদিন। যাই যাই করে ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয়নি। দাঁতের ডাক্তার মানে অনেকদিনের ব্যাপার। অভুক্ত অবস্থায় বিছানায় গেলেন। মেয়ের ওপর প্রচণ্ড রাগ তার। মেয়ে আর একটা কাঁচি এনে দিল না। প্রচণ্ড কান্না পেল। অভুক্ত পেটে চোখের জল ফেলতে ফেলতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখলেন, চমৎকার এক মহলের বাগানে ঘুরছেন তিনি। সে বাগানের গাছে গাছে পাকা আম, কমলা, আপেল আরও কত নাম-না জানা ফল। ক্ষুধার্ত শাহজাদি ফল খাওয়ার জন্য ছিঁড়তে গেলেন। পারলেন না। বারবার চেষ্টা করলেন। কাঁচি খুঁজলেন। নেই। প্রচণ্ড হতাশা নিয়ে গেলেন বাগানের পাশের মহলে। সেখানে নানান রকম খাবার বাক্সভর্তি। আপ্রাণ টানলেন বাক্সের ঢাকনি। খুলতে পারলেন না। প্যাকেটবোঝাই কত বাদাম, আখরোট আরও কত কী। প্যাকেট খুলতে পারলেন না। আশ্চর্য এত বড় মহল, এত খাবার, একটা ছুরি-কাঁচিও নেই! অদ্ভুত! কাঁদতে লাগলেন তিনি। কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভেঙে তীব্র ক্ষুধা অনুভব করলেন। মনে পড়ল রাতে খাওয়া হয়নি। তুফানের মতো ধেয়ে এল কান্নার বেগ! দ্বিগুণ বেগে ধেয়ে এল অভিমান। মেয়ে কেন বোঝে না মার কষ্ট! শাহজাদি ভুলে গেলেন মেয়ে বরাবর চায় সর্বক্ষণ তার পাশে একটা লোক থাকুক। দু-একবার রেখেছেও। শাহজাদি ছাড়িয়ে দিয়েছেন। সর্বক্ষণ তার চারপাশে একজন ঘুরঘুর করবে এটা তার পছন্দ না। এখন শাহজাদি কী করবে। বাড়িতে অনেক খাবার। কোনোটাই তিনি খেতে পারছেন না। রান্নাঘর থেকে ছুরি-কাঁচি এনে তিনি চানাচুরের প্যাকেট খুলতে পারেন। কিন্তু না, তিনি খুলবেন না। না খেয়ে মরে যাবেন। তার যখন কেউ নেই, তার কথা যখন কেউ ভাবে না তিনি মরেই যাবেন। মরার কথায় ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। হ্যাঁ, তিনি মরেই যাবেন। এ যন্ত্রণাময় জীবনের চেয়ে মরে যাওয়া ভালো। মরে যাওয়ার সহজ পথ আছে। প্রতি রাতে ঘুমের ওষুধ খেতে হয় তাকে। আনকোরা দু-পাতা ওষুধ আছে। সবগুলো একসঙ্গে খাবেন। তারপর চিরশান্তি!

শাহজাদি বিছানা থেকে উঠলেন। ঘুমের বড়ির পাতা দুটো বের করলেন। পানি রেডি রাখলেন। একখানা চিরকুট লিখলেন, আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। লিখে পড়লেন। ছিঁড়লেন। এ লেখা লিখলে পুলিশ বুঝে যাবে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। মেয়ের বিপদ হতে পারে। তার চেয়ে ভালো, কিছু না লেখা। সবাই মনে করবে ঘুমের ওষুধের ওভারডোজে মারা গেছেন। বাড়িটার দিকে একবার তাকালেন। দেয়ালের ছবিগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলেন। স্বামীর ছবির দিকে তাকিয়ে কান্না গলায় আটকে রইল। মেয়ের ছবিতে হাত দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। পরক্ষণে নিজেকে সামলালেন। দুর্বল হলে চলবে না। তিনি ট্যাবলেট খুলতে দিয়ে ধাক্কা খেলেন। খুলতে পারলেন না। অনেক কষ্টে ঘেমে-নেয়ে দুটো ট্যাবলেট বের করলেন। এতে কিছু হবে না। ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি! মরবেনই তিনি আজ। রান্নাঘর থেকে ছুরি এনে পাতা কেটে ওষুধ বের করবেন। ওষুধের পাতা ফেলে রেখে কাঁদতে কাঁদতে দরজা দিয়ে বের হতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। মেয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চেহারায় প্রবল দুঃশ্চিন্তা!
: মা কী হয়েছে। শরীর খারাপ নাকি? বহুক্ষণ ধরে দরজার সামনে হাঁটাহাঁটি করছি। তোমার ঘুম ভেঙে যাবে বলে ডাকিনি। আমার ভয় করছিল!
: তুই বাসায়?
: আজ ছুটি, শুক্রবার। বসো বসো। তোমাকে কেমন যেন দেখাচ্ছে। আর এই যে তোমার নতুন কাঁচি। দুটো এনেছি। একটা হারালে যাতে আরেকটা থাকে। আর এই যে তোমার পছন্দের স্ট্রবেরি। খোসা ছাড়িয়ে রেখেছি তুমি পার না তাই!
শাহজাদি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদেন।
: কাঁদছ কেন মা। সামান্য একটা কাঁচি হারিয়ে কেউ এমন কাঁদে! পাগল মা আমার
: ভাগ্যিস হারিয়েছিল!
: মানে?
: ও তুই বুঝবি না।

লেখক: কথাশিল্পী ও গবেষক

প্রিয় পুরুষ

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৪, ০৩:২৮ পিএম
আপডেট: ২৪ জুন ২০২৪, ০৩:৫৭ পিএম
প্রিয় পুরুষ
প্রতীকী ছবি

কেমন আছো জানতে চাইব না, কারণ আমি জানি তুমি আমায় ছাড়া ভালো থাকতে পারবে না। বেঁচে আছো, এতেই আমি সুখী! কতকাল হয়ে গেল তুমি মাথিন নামটাকে ছোট্ট করে আদর করে মাথু বলে ডাকো না। এই শহরে এত এত মানুষ, শুধু তুমিই নেই। এই ভিড়ের মাঝে আমার চোখজোড়া শুধু তোমাকেই খোঁজে। শুধু তুমি নেই বলেই সুখ আমার কাছে এসেও পাশ কাটিয়ে চলে যায়, তুমি কি সেই খবর রাখো? আচ্ছা তুমিও কী দূর থেকে আমাকে এমন ভেঙেচুড়ে ভালোবাস; যেমনটা আমি বাসি। জানো তোমার জন্য ভীষণ মন পোড়ে, এই মনে হয় তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়াবে আর আমি লোকলজ্জা ভুলে তোমায় জাপটে ধরব, তোমার বুকের মাঝে নিজেকে গুটিয়ে নিব। আদতে তা কখনো হবে না, কারণ এ তো কেবলই আমার কল্পনা। বাস্তবে তো তুমি কোথাও নেই। তুমি সবসময় বলতে, আমি সাহসী, আমাকে নিয়ে তোমার চিন্তা নেই। জানো, এই সাহসী মানুষটাও ভয় পায়, কখনো রাস্তা পার হতে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায় আর অসহায়ের মতো তোমায় খোঁজে। কতকাল হয়ে গেল তুমি আমার হাতের রান্না খেয়ে আমার মন রক্ষা করার জন্য মিথ্যে মিথ্যে বলো না ‘মাথু দারুণ রান্না করেছ, খুব ভাগ্য করে তোমাকে পেয়েছি’। আমি একা একা এখান থেকে ওখানে ঘুরে বেড়াই পথে, কোন প্রেমিক যুগল দেখলে মনের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে সুখের হাসি ফুটে উঠে।

পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, যারা আদর আহ্লাদ পায় না, অনাদরেই তাদের জীবন কেটে যায়; আমিও তেমনই একজন মানুষ। আমার মন খারাপ হলে বলতে পারি না, আনন্দে হলে বলতে পারি না, আমি তোমাকে ছাড়া আসলে কাউকে বলতেই চাই না। তাই সব অনুভূতিগুলো মনের কোণেই জমিয়ে রাখি। তুমি কি নিজের যত্ন নাও, নাকি এখনও আগের মতো বেখেয়ালি জীবনযাপন করো? আমাদের কি কখনো একটা লাল-নীল অভাবের সংসার হবে? যেখানে সবকিছুর অভাব থাকলেও ভালোবাসার অভাব হবে না। যে ওষ্ঠে চুম্বন লেপ্টে থাকার কথা ছিল, সে ঠোঁটে তুমি নিকোটিনের ধোয়া উড়াও! উড়াও, তবুও বেঁচে থাকো প্রিয়। এই কাল্পনিক সংসারটার ভার একা একা বইতে কষ্ট হচ্ছে। একটা বাস্তব সংসারের আক্ষেপ নিয়ে দুনিয়া ছেড়ে যদি চলে যাই, কবরের পাশে এসে দাঁড়িয়ে আমার জন্য মাগফেরাত চেও। কারণ, তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই!

সুবর্ণরেখা

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৪, ০১:০৮ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৪, ০১:০৮ পিএম
সুবর্ণরেখা

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই বাংলা উপন্যাসের সার্থক রূপায়ণ ঘটে। ইতিহাস ও রোমান্সকে তিনি উপন্যাসের বিষয়বস্তু হিসেবে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। মনস্তাত্ত্বিকতাও তার উপন্যাসে গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলা ভাষাভাষী পাঠক তার উপন্যাসের মাধ্যমে এক নতুন জগতের সন্ধান পান। যে জগৎ তাদের নিজস্ব। কিন্তু তা অচেনা ও অজানা ছিল। অথবা প্রকাশের আড়ালেই পড়েছিল। তিনিই সর্বপ্রথমে হাস্যরসকে সাহিত্যের উচ্চশ্রেণিতে উন্নীত করেন। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের সাহিত্য সম্রাট। সাহিত্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে, লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারেন, তবে অবশ্য লিখিবেন। যাঁহারা অন্য উদ্দেশ্যে লেখেন, তাঁহাদিগকে যাত্রাওয়ালা প্রভৃতি নীচ ব্যবসায়ীদিগের সঙ্গে গণ্য করা যাইতে পারে।’...

এই সপ্তাহের নতুন বই

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৪, ০১:০৬ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৪, ০১:০৬ পিএম
এই সপ্তাহের নতুন বই

বই এমনই এক দর্পণ, যা মনের ইতিহাস সঞ্চয় করে। যারা সাধারণের ঊর্ধ্বে উঠতে চায় তাদের জন্য বই পড়ার বিকল্প নেই। ভারতীয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক প্রতিভা বসু বলেছেন, ‘বই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ আত্মীয়, যার সঙ্গে কোনদিন ঝগড়া হয় না, কোনদিন মনোমালিন্য হয় না।’...

আমাদের চিন্তাচর্চার দিক্-দিগন্ত
যতীন সরকার
শ্রেণি: সাহিত্য ও সাহিত্যিক বিষয়ক প্রবন্ধ
প্রকাশনী: সৌম্য প্রকাশনী, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৪
পৃষ্ঠা: ১৬০; মূল্য: ৪৫০ টাকা

দুর্দান্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ, দুঃসাধ্য সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ থাকে যেসব গ্রন্থে, সেসবেরই পরিচিতি ‘গবেষণামূলক গ্রন্থ’ রূপে। অপণ্ডিত জনসাধারণ সেসব গ্রন্থের পাতা উল্টাতেও সাহসী হয় না, গ্রন্থাকারদেরও দূর থেকেই ভীতিমিশ্রিত ভক্তি প্রদর্শন করে। পাণ্ডিত্যের প্রতি ভীতি তো চিরকালই অপণ্ডিতদের মজ্জাগত। পণ্ডিত গ্রন্থাকারগণও ‘জনতার জঘন্য মিতালি’ মোটেই পছন্দ করেন না। আমজনতার ছোঁয়া বাঁচিয়ে তারা অবস্থান করেন পাণ্ডিত্যের খাশ কামরায়। গবেষক ও গবেষণাগ্রন্থ সম্পর্কে প্রচলিত এই ধারণাগুলো মোটেই অমূলক নয়। তবে সব ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম আছে। এমন কিছু গবেষকও আছেন যারা পাণ্ডিত্যের উঁচু মিনারে বসে থেকে জনতার প্রতি অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকান না, বরং জনতার প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই তারা গবেষণাকর্মে নিরত হন। এই গবেষণা গ্রন্থে ১১টি প্রবন্ধ রয়েছে, যা পাঠককে আকৃষ্ট করবে।...

বাংলার এবং জীবনানন্দের শালিকেরা
সৌরভ মাহমুদ
শ্রেণি: পরিবেশ ও প্রকৃতি: প্রবন্ধ ও অন্যান্য
প্রকাশনী: মাছরাঙা প্রকাশন, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৪
পৃষ্ঠা: ৯৬; মূল্য: ৩৯০ টাকা

‘শালিক শালিক শালিক/ ওরা রোদে পোড়ে ছায়ায় ঘোরে/ ওরা রৌদ্র ছায়ার মালিক’। শামসুর রাহমান ওদের রৌদ্র ছায়ার মালিক বানালেও আসলে ওরা সমগ্র রূপসী বাংলার মালিক। কোথায় শালিক নেই! ওদের বিচরণ সর্বত্র। শালিক বাংলার এক প্রধান গায়ক পাখিও। ওদের সুরেলা সংগীত বনের নিবিড়তাকে মধুময় করে তোলে। জীবনানন্দের কবিতায় সেই ব্যাকুলতা ফুটে উঠেছে বারবার। তার লেখায় অসংখ্যবার শালিকের প্রসঙ্গ এসেছে। সৌরভ মাহমুদ এ কথাগুলোই তুলে এনছেন তার ‘বাংলার এবং জীবনানন্দের শালিকেরা’ গ্রন্থে।...

হাওয়ার বকেয়া হিসাব
মোস্তাফিজ জুয়েল
শ্রেণি: কাব্যগ্রন্থ
প্রকাশনী: দেশ পাবলিকেশন্স, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৪
পৃষ্ঠা: ৬৪; মূল্য: ২০০ টাকা

‘হাওয়ার বকেয়া হিসাব’ গ্রন্থে সংকলিত কবিতাগুলোর ভাষা সহজ-সরল। সব শ্রেণির পাঠকের সঙ্গে সহজেই সংযোগ স্থাপনে সমর্থ। বিষয়বস্তু জীবনঘনিষ্ঠ, যাপিত জীবনের নির্যাস। পাঠ করলেই বোঝা যায় ভবিষ্যতের মানুষের জন্য বর্তমান সময়কে লিখে রাখা হয়েছে গদ্য ছন্দে। এই সময়ের পাঠক কবিতাগুলো পাঠের মধ্য দিয়ে বর্তমান সময়কে পুনর্মূল্যায়ন করার প্রসঙ্গ খুঁজে পেতে পারেন। ভবিষ্যতের পাঠক কবিতার রসের মধ্য দিয়ে পাবেন ইতিহাস আবিষ্কারের আনন্দ। এই সময়ের মানুষের ভাবনা, সভ্যতার বিনির্মাণ, মানুষের মন, প্রেম ও ভালোবাসা এমনকি ভাষাহীন প্রাণের কথাও ধরা হয়েছে এই কাব্যগ্রন্থে, ধরা হয়েছে বাঙালির ইতিহাস, আকাঙ্ক্ষা ও প্রাপ্তির তফাৎ।…

The Housemaid is Watching 
দ্য হাউসমেইড ইজ ওয়াচিং
ফ্রিডা ম্যাকফাডেন
প্রকাশনী: বুকাউচার, আমেরিকা    
প্রকাশকাল: ১১ জুন ২০২৪
পৃষ্ঠা: ৩৬৪; মূল্য: ৫.৯৯ ডলার

যুক্তরাষ্ট্রের কথাসাহিত্যিক ফ্রিডা ম্যাকফাডেন পেশায় একজন চিকিৎসক। ব্রেইন বিশেষজ্ঞ ম্যাকফাডেন প্রধানত সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার লিখে থাকেন। তার সব উপন্যাসই বেস্ট সেলার। তার নতুন উপন্যাসের নাম ‘দ্য হাউসমেইড ইজ ওয়াচিং’। এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মিলি হাউসমেইডের কাজ ছেড়ে দিয়ে স্বামী-সন্তান নিয়ে উপশহরের দিকে নিরিবিলি জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিবেশীদের চেনাজানার উদ্দেশে তার এক প্রতিবেশী মিসেস লোয়েলের বাড়িতে এক অনুষ্ঠানে যোগ দেয় মিলি। সেখানে এক মহিলা মিলিকে প্রতিবেশীদের সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়। মিলির মনে খটকা লাগে: এত সুন্দর একটা স্বর্গীয় জায়গাও বিপজ্জনক হতে পারে!

Swan Song
সোয়ান সং
এলিন হিল্ডারব্যান্ড
প্রকাশনী: লিটল ব্রাউন অ্যান্ড কোম্পানি, আমেরিকা    
প্রকাশকাল: ১১ জুন ২০২৪
পৃষ্ঠা: ৩৮০; মূল্য: ১৪.৯৯ ডলার

যুক্তরাষ্ট্রের কথাসাহিত্যিক এলিন হিল্ডারব্যান্ড এক সময় প্রকাশনা ও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ পর্যন্ত ৩০টির বেশি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। তার বেশির ভাগ উপন্যাসই বেস্ট সেলার। তার সাম্প্রতিক উপন্যাসের নাম ‘সোয়ান সং’। প্রধান চরিত্র এড কাপানেশের ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে এ উপন্যাসের কাহিনি। নানটাকেটের পুলিশ প্রধান হিসেবে ৩০ বছর কাজ করার পর আর কয়েক দিনের মধ্যেই অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এড। নানটাকেটে আসার পর থেকে এখানকার ক্লাবে প্রবেশের জন্য সাধ্যমতো অনেক কিছুই করার চেষ্টা করে যাচ্ছে রিচার্ডসন পরিবার। তাদের ইয়টে পার্টির আয়োজন করে রিচার্ডসন পরিবার। তখনই দেখা যায়, তাদের বাড়িটা পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এডের ব্যক্তিগত সহকারী এবং তার মেয়ের বন্ধুকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। এড এবার অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা বাতিল করে। তদন্তের কাজ নিজে করার চিন্তা করে সে।

ঘুমের নদী

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৪, ১২:৫১ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৪, ১২:৫১ পিএম
ঘুমের নদী
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

১.
শিয়রে থাকা ঘুমের নদীটার নাম চন্দনা
সে একা চুপচাপ থাকে
হিজলের রেণু, ঘ্রাণ গায়ে মাখে
কচুরি ফুলের শোভায় শোভিত হয়, মন্দ না।

ডাহুকেরা ছানা লয়ে সাঁতরে যায় এপাড় হতে
লতাগুল্মে কত পাখি বাঁধে ঘর
স্বপ্ন ফলায় রাশি রাশি কিষানির চর
নাইতে নেমে কিশোরীরা ভেলা টানে উল্টো স্রোতে।

২.
লালকোর্তা পরে মাষকলাইর খেতে শুয়ে
লাল-সবুজের পতাকা হতে চেয়েছি
রমণীর কপালের ফোঁটায় পেয়েছি
গোধূলির সূর্য আঁকা বাংলার প্রতিচ্ছবি।

পাখিদের ঘরে ফেরা, পাখা ঝাঁপটানো শেষে
ষোড়শীর কোলে আনা ছাগলের বাছুর
পথিকের মন ভেঙে চুরমাচুর
ফাগুনে আগুন লাগে বনে, ফুল গতরে মেশে।

খুন হয় কত স্বপ্ন নারঙ্গী কাঁটায়
প্রেমিক রূপে কত ন্যাকামি
আসলে কে মন খাটায়!

একাল সেকালের শীতরজনী

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৪, ১২:৪৯ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৪, ১২:৪৯ পিএম
একাল সেকালের শীতরজনী
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

গভীর শীতের রাতে ব্যালকনিতে দাঁড়ালেই 
কোনো বহুদূরবর্তী দেশ-দেশান্তর পেরিয়ে, 
ভুলে যাওয়া কবেকার কোনো প্রিয় মানুষের 
এক চিলতে নিশ্বাস মিশিয়ে, 
কুয়াশার গন্ধ গায়ে মেখে 
তিরতির করে আসে 
হৃদয় কাঁপিয়ে দেওয়া শীতল বাতাস। 
কফির মগে চুমুক দিতে হয় কাঁপুনি নিয়েই
আকাশটাও যেন মহাকাশ পরিমাণ 
অনিশ্চয়তা নিয়ে মাথার ওপর 
ঠায় দাঁড়িয়ে। 

আজ থেকে এক শ বছর আগে 
আমাদেরই অগ্রজ বংশধররা
ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে কফির কাপে 
উষ্ণতা খুঁজতে খুঁজতে এভাবেই উপভোগ
করেছিলেন শীতের রজনী। 

একইরকমভাবে আর মাত্র এক শ বছর পর 
একই অনুভূতি রচিত হবে অন্য প্রজন্মের হাতে। 
অন্য কোনো উপমায় সেজে উঠবে 
ঠিক এই রাতটাই! 

শতবর্ষ পরে নতুন প্রজন্ম, প্রকৃতি পরিবেশ ও
নতুন ভাষার আনাগোনা 
নতুন কবিতায় ভর করে
তখনও কি রবীন্দ্রনাথ নজরুল কথা কবে।
নতুন ভাষার শিশু বোল কি
আমি কি দেখতে পাব বা
শুনতে পাব?