রেজাউদ্দিন স্টালিনের এই তিনটি কবিতা- ‘নিরন্নদের ব্যালাড’, ‘নৃতত্ত্ব’ এবং ‘বাড়ি ফেরা’- রুশ ফরমালিজমের আলোকে পাঠ করলে দেখা যায়, এখানে ভাষার নির্মাণ, শব্দের বুনন, বস্তুর চিত্রকল্প এবং ফর্মের বিশেষ গঠন মূল আলোচনার কেন্দ্রে আসে। রুশ ফরমালিজম মূলত ‘ফর্ম’ বা গঠনকে অগ্রাধিকার দেয়; সাহিত্যকে ইতিহাস, রাজনীতি বা নৈতিকতার বাহন হিসেবে নয়, বরং ভাষার শিল্পরূপ হিসেবে বিশ্লেষণ করে। এরা অপরিচিতকরণকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়- অর্থাৎ পরিচিত বাস্তবতাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে তার প্রচল অর্থ হারিয়ে গিয়ে নতুন অর্থের জোগান দেয় এবং অপ্রত্যাশিত শৈল্পিক আঘাতের সৃষ্টি করে।
নিরন্নদের ব্যালাড
এই কবিতায় মূল ফোকাস ভাষার মিতব্যয়ীতা এবং চিত্রময় গঠন। ‘গ্রীষ্মে যারা দগ্ধ আর ভাদ্রে ক্ষয়ে যাওয়া’- শুধু ঋতুচক্রের বর্ণনা নয়, এখানে একটি সামাজিক শ্রেণির জীবনচিত্রকে প্রকৃতির দহন ও ক্ষয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে। ‘স্বপ্ন থেকে শেকলে মুদ্রিত’- এ লাইনটি দারুণ এক অপরিচিতকরণ; স্বপ্নকে সাধারণত মুক্তির প্রতীক বলা হয়, অথচ এখানে স্বপ্ন শিকলবন্দি। ধ্বনির পুনরাবৃত্তি, ‘শুকিয়ে যাওয়া পাতার পলে পলে/ সবুজ খুঁজে ফিরছে’, কাব্যের সংগীতধর্মিতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। রুশ ফরমালিজমের দৃষ্টিতে এ কবিতা দারিদ্র্যকে সামাজিক প্রতিবাদের পরিবর্তে শব্দ ও চিত্রের শিল্প-প্রতীক করে তোলে- এখানে বাস্তবের কষ্ট ভাষার নন্দনে রূপান্তরিত।
নৃতত্ত্ব
এ কবিতার গঠন প্রায় এক এপিক কোলাজ- বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানুষের শ্রম, শহরের মফঃসল, প্রযুক্তি- সব একসঙ্গে মিশেছে। ‘নৌকার নিতম্বজুড়ে বৈঠার শিহরিত শিশ্নের উত্থান’- এ ধরনের সাহসী দেহরূপক চিত্রকে রুশ ফরমালিজমে বা অপরিচিতকরণের সেরা উদাহরণ বলা যায়। শব্দের ঝাঁকুনি পাঠককে চেনা বাংলা নতুন চোখে দেখতে বাধ্য করে। কবিতায় সময়ের স্তরগুলো ‘প্রদ্বীপের জায়গায় নিয়ন সাইন’, ‘পিয়নের পদ খাওয়া কম্পিউটার’ একে অপরের ওপর চাপা পড়েছে- এটি ফরমালিস্ট দৃষ্টিতে টেক্সচারের ঘনত্ব তৈরি করে। সামাজিক-ঐতিহাসিক অভিস্রবন থাকলেও কবির লক্ষ্য ইতিহাসের ব্যাখ্যা নয়, বরং ভাষা দিয়ে এক বহুমাত্রিক বাংলাদেশের দৃশ্য-শব্দমালার নির্মাণ।
[নোট: অভিস্রবন অর্ধভেদ্য পর্দা যা শুধুমাত্র দ্রাবক অণু যেমন পানি, অণুগুলোর চলচল করতে দেয়, কিন্তু দ্রবীভূত পদাথের অণুগুলোর চলাচলকে বাধা দেয়।]
বাড়ি ফেরা
প্রথম দুটি কবিতার তুলনায় এটি অনেক বেশি ন্যারেটিভ ও নাটকীয়। চিত্রপ্রদর্শনী, দর্শকের চোখ, শিরোনামের দ্ব্যর্থ- সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের মেটা-আখ্যান। ‘অনেকগুলো পথ ছবির ভেতর থেকে বেরিয়ে/ নানা দিকে চলে যাচ্ছে’- এ দৃশ্যের মধ্যেই শিল্পের উন্মুক্ততা ও অনন্ত পথের সংকেত। শেষের দিকে যুবকের উপলব্ধি- ‘রেল লাইন পার হয়ে ঐ লোকটার কখনো বাড়ি ফেরা হয়নি’- বাস্তব ও ক্যানভাসের সীমারেখাকে মুছে দেয়। রুশ ফরমালিজমের চোখে এখানে সবচেয়ে বড় কাজ শিল্পের ভেতরের শিল্পকে দৃশ্যমান করা, অর্থাৎ ভাষা ও দৃশ্যের খেলা পাঠককে অবাক করে দেয়।
এ তিনটি কবিতাকে একত্রে দেখলে বোঝা যায়, স্টালিনের কাব্যজগৎ মানুষের দারিদ্র্য, ইতিহাস ও শিল্পের সম্পর্ককে রাজনীতির ভাষায় নয়, ফর্ম ও নন্দনের ভাষায় ধরতে চায়। ‘নিরন্নদের ব্যালাড’-এর ক্ষয়ে যাওয়া দেহ, ‘নৃতত্ত্ব’-এর অশ্বত্থের ডালপালা বা মফঃসলের ট্রেন, আর ‘বাড়ি ফেরা’-র রেললাইন- সবখানেই পথ, গমন ও প্রত্যাবর্তনের মোটিফ এগুলো চিত্রকল্পের ধারাবাহিকতার কাজ। ভাষার বুনন: দীর্ঘ বাক্য, অসম্পূর্ণ ক্লজ, হঠাৎ শরীরী বা প্রযুক্তিগত শব্দ- এগুলো পরিচিত অভিজ্ঞতাকে অচেনা করে। অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ একসঙ্গে উপস্থিত; ইতিহাস কোনো ক্রমবিন্যাসে নয়, বরং একটি জীবন্ত টেক্সচার যা কালগত স্তরায়নের ধারাকে বিভাসিত করে। রুশ ফরমালিজম মূলত নন্দনকেই অগ্রাধিকার দিলেও এখানে অস্তিত্ববাদী সংকেতও অগ্রাহ্য করা যায় না। ‘নিরন্নদের ব্যালাড’-এর ক্ষুধার্ত মানুষের স্বপ্নহীনতা, ‘নৃতত্ত্ব’-এর ইতিহাস-প্রযুক্তির জটিলতা এবং ‘বাড়ি ফেরা’ চিরস্থায়ী ‘না ফেরা’- সবই মানুষের অনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ ও আত্মপরিচয়ের শূন্যতার দিকে ইঙ্গিত করে। হাইডেগারের বা ক্যামুর ধারণা এখানে অদৃশ্যভাবে প্রবাহিত। কিন্তু স্টালিন দার্শনিক বয়ান দেন না; তিনি শব্দের মাধ্যমে সেই শূন্যতাকে অনুভব করাতে চান।
কবিতাগুলোতে ভাষার ধ্বনি-চিত্র-গঠনকে এক বহুমাত্রিক নন্দনিকতা দেয়, আর তার শক্তি উৎস এরকম চিত্রের সাহসিকতা বনাম দেহরূপক, প্রযুক্তির মিশ্রণ, ধ্বনির ছন্দহীনতা বনাম অন্তর্লীন সংগীত। অপরিচিতকরণের তীক্ষ্ণতা, যা পাঠককে নতুন দৃষ্টিতে বাস্তবকে চিনতে পথ দেখায়। তার নন্দন এখানে শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং ভাষার শৈল্পিক ধাক্কা, চেতনা জাগানো রাজনীতি।
রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতায় দারিদ্র্য, ইতিহাস ও প্রযুক্তি একত্রে একটি শৈল্পিক ফর্মে ধরা পড়ে। ‘নিরন্নদের ব্যালাড’ ক্ষুধার্ত জীবনের ব্যথাকে ধ্বনি ও চিত্রের ভেতর মুদ্রিত করে; ‘নৃতত্ত্ব’ বাংলার কালচক্রকে ভাষার ঝাঁকুনিতে নতুন করে নির্মাণ করে; আর ‘বাড়ি ফেরা’ শিল্প ও বাস্তবের সীমা ভেঙে অমোঘ ‘না ফেরা’র অভিজ্ঞতা তৈরি করে। রুশ ফরমালিজমের চোখে এ কবিতাগুলোর আসল শক্তি তাদের গঠনগত অভিনবত্ব- যেখানে শব্দ, চিত্রকল্প ও সময়ের মিথস্ক্রিয়া পাঠককে পরিচিত বাস্তবতাকে অচেনা চোখে দেখতে বাধ্য করে। দারিদ্র্যের দীর্ঘশ্বাস বা ইতিহাসের ক্ষয় এখানে সামাজিক স্লোগান নয়, বরং ভাষার নন্দন মানুষের অস্তিত্বের গভীর প্রশ্ন।
এ তিনটি কবিতায় কবির মনস্তত্ত্ব, ব্যক্তিগত অনুভূতি, চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাব্যপ্রয়াসের ফর্ম, ভাষা, নন্দনের প্রয়োগ চমৎকার। এবং একটি যেন অপরটিকে পরিপূরকতা দেয়। রুশ ফরমালিজমের আলোকে দুটিকে আলাদা করে দেখা যায়- কারণ তত্ত্বটি মূলত ফর্মকে অগ্রাধিকার দিলেও কবির মনের ঝোঁককে পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না। সাদৃশ্যগুলো মন ও ফর্মের একাত্মতার মধ্যে আর তা হলো বাস্তবের বেদনা, ভাষার ধাক্কা ‘নিরন্নদের ব্যালাড’-এ কবির করুণাবোধ স্পষ্ট- ক্ষুধার্ত মানুষের প্রতি মমতা ও সামাজিক ক্ষোভ। এ মমতা তাকে ভাষার ভিতরে ছন্দহীন অথচ ধ্বনিময় চিত্রকল্প গড়তে উদ্বুদ্ধ করেছে। কবির বেদনা ভাষাকে ধারালো করেছে।