ঢাকা ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পিকআপের ধাক্কায় মা-ছেলেসহ নিহত ৩ বিষাদ-বেদনার আঙুলে চুমো খাও নির্বাচনের খরা কাটল মাসুদুজ্জামানের শান্তি নিদ্রা আব্বার সেই ম্লান হাসিটা আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ পানির বোতল যে বই কেউ ছাপতে চায়নি সেই বইয়ের বুকার জয় ময়মনসিংহ মেডিকেলে হাম উপসর্গে ভর্তি আরও ১৯ শিশু বেড়েছে মুরগি, কাঁচা মরিচ-কাঁচা পেঁপের দাম বাতাসে যেন আগুনের হলকা, কষ্টে প্রাণিকুল তিন ক্যাটাগরিতে রিটেইল এশিয়া অ্যাওয়ার্ডস পেল এপেক্স ফুটওয়্যার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আবারও যাত্রীবাহী বাস পড়ল পদ্মা নদীতে চুয়াডাঙ্গায় পুত্রবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে শ্বশুর গ্রেপ্তার খুলনায় হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর ভিড় শাহরাস্তিতে ১৮ মামলার আসামি ‘সাদা আনোয়ার’ গ্রেপ্তার গোপালগঞ্জে দুই বাসের সংঘর্ষ, নিহত ২ ৬ ঘণ্টা পরে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম-সিলেটের ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক কর্মস্থলে গরমে হাঁসফাঁস শাহরাস্তিতে শিশু ধর্ষণের অভিযোগ বৃদ্ধের বিরুদ্ধে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলে আসছে ত্রৈমাসিক ব্যবস্থা গোপালপুরে ২ নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার, তদন্তে নেমেছে পুলিশ ভূঞাপুরে দুই গ্রামের সংঘর্ষে নিহত ১, মাইকিং করে ফের সংঘর্ষের ঘোষণা পর্যটন খাতে তাপের প্রভাব বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনের খসড়া অনুমোদন ইসলামী ব্যাংকের অধিকাংশ শাখায় কলমবিরতি হয়নি নাটোরে গরু আনতে গিয়ে বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু বেলকুচিতে বাসচাপায় অটোভ্যানের ৩ যাত্রী নিহত বন্ধ শিল্প ও প্রতিষ্ঠান সচল করতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ফেনীতে প্রখর রোদে দুর্ভোগে খেটে খাওয়া মানুষ বজ্রপাতে চার জেলায় নিহত ১০
Nagad desktop

অগ্নিবীণার চিরন্তন ঝংকার: নজরুল ও এক অবিনাশী মানবিক ভূগোলের অন্বেষণ

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম
অগ্নিবীণার চিরন্তন ঝংকার: নজরুল ও এক অবিনাশী মানবিক ভূগোলের অন্বেষণ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

সকালের রোদে যখন ধুলোবালি ওড়া শহরের ব্যস্ততা শুরু হয়, তখন কোথাও কি খুব গভীরে এক চিলতে উদাসীন হাওয়া বয়ে যায় না? সেই হাওয়া, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক ঝোড়ো মানুষের কথা, যিনি আজ থেকে বহু বছর আগে এই বাংলার মাটিতেই হেঁটেছিলেন মাথায় বাবরি চুল, চোখে আগ্নেয়গিরির জ্বালা আর হৃদয়ে শ্রাবণের মেঘের মতো করুণা নিয়ে। কাজী নজরুল ইসলাম। তার নামটা নিলেই মনে হয় যেন এক বন্ধ জানালা হঠাৎ করে খুলে গেল, আর ঝোড়ো বাতাস এসে লন্ডভন্ড করে দিল ঘরের সাজানো-গোছানো কৃত্রিমতাকে।

নজরুলকে কি কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়খণ্ডে আটকে রাখা সম্ভব? বিংশ শতাব্দীর সেই উত্তাল দিনগুলো যখন ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল উপমহাদেশ, তখন নজরুল এসেছিলেন এক ধূমকেতুর মতো। কিন্তু আজ, ২০২৬-এর এই অতি-আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে দাঁড়িয়েও কেন তার কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে? কেন মনে হয়, আমাদের আজকের এই তথাকথিত সভ্যতার যাবতীয় সংকটের দাওয়াই তার সেই জীর্ণ পঙ্‌ক্তিগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে? মহাকালের বিশাল ক্যানভাসে কিছু নক্ষত্র থাকেন যারা আলো দেন, কিন্তু নজরুল ছিলেন সেই দাবানল, যা জঞ্জাল পুড়িয়ে দিয়ে নতুন প্রাণের অঙ্কুরোদ্গমের ক্ষেত্র তৈরি করে।

নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির কথা ভাবলে আজও গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে। ১৯২১ সালের সেই ডিসেম্বর রাত, যখন এই যুবক কবি পেনসিল হাতে লিখে চললেন এক মহাকাব্যিক স্পর্ধা। কিন্তু এই দ্রোহ কি কেবল ব্রিটিশদের তাড়ানোর জন্য ছিল? একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, নজরুলের বিদ্রোহ ছিল মানুষের ভেতরের সেই ভীরুতা আর দাসত্ববৃত্তির বিরুদ্ধে। জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশে যখন তার ‘উবারমেনশ’ বা অতিমানব তত্ত্বের অবতারণা করেন, তিনি চেয়েছিলেন এমন এক মানুষ, যে প্রচলিত নৈতিকতার শেকল ছিঁড়ে নিজের ভাগ্য নিজে গড়বে। নজরুল যেন সেই নিৎশের তত্ত্বকেই এক পরম মরমি ও মানবিক রূপ দিলেন। নিৎশের অতিমানব অনেকটা শীতল, ক্ষমতাশালী; কিন্তু নজরুলের বিদ্রোহী সত্তাটি প্রচণ্ড আবেগী। তিনি একদিকে বলছেন, ‘আমি মেদিনী-নভ-আকাশ ছাপিয়া/ আমি নিখিল বিশ্ব-প্লাপিয়া’, আবার পরক্ষণেই বলছেন, ‘আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি বঞ্চিতের!’

এখানে শক্তির সঙ্গে করুণার এক অদ্ভুত মিশেল, এটাই নজরুলকে অনন্য করে তোলে। নজরুলের দ্রোহ কোনো অন্ধ ধ্বংস নয়। হেগেলীয় দ্বন্দ্বতত্ত্বের ভাষায় বলতে গেলে, এটি সেই ‘নেগেশান’ বা অস্বীকার, যা নতুন এক সুন্দর আগামীর পথ প্রশস্ত করে। তিনি যখন নটরাজের মতো ধ্বংসের নৃত্য নাচেন, তখন আসলে তিনি জরাগ্রস্ত সমাজটাকে নাড়িয়ে দিতে চান। বর্তমানের এই করপোরেট-শাসিত পৃথিবীতে, যেখানে মানুষ নিজের অজান্তেই যন্ত্রের দাসে পরিণত হচ্ছে, সেখানে নজরুলের এই ‘দুর্দম’ হওয়ার ডাক কি খুব বেশি প্রয়োজন ছিল না? 

নজরুলকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে। কিন্তু ‘অসাম্প্রদায়িক’ শব্দটি বড্ড বেশি শুষ্ক, বড্ড বেশি রাজনৈতিক। নজরুল যা ছিলেন, তাকে হয়তো ‘মরমি মানবতাবাদ’ বলাই ভালো। হোমি কে. ভাবা যখন ‘হাইব্রিডিটি’ বা সংকরত্বের তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করান, নজরুল তার অনেক আগেই প্রাত্যহিক জীবনে সেই সংকরত্বকে যাপন করেছেন। তিনি যখন লিখছেন- ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’, তখন তা কেবল সস্তা আবেগ ছিল না। এটি ছিল এক গভীর দার্শনিক অবস্থান।

সিমন দ্য বোভোয়ার যখন ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ লিখে বিশ্ব কাঁপিয়ে দিলেন, তার অনেক আগে এই বাংলার এক প্রান্তিক কবি নারীর অধিকার নিয়ে এমন সব কথা বলে গেছেন যা আজও সমাজের অনেক তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের কাছে হজম করা কঠিন। নজরুল লিখেছিলেন, ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ এই পঙ্‌ক্তিটি যখন তিনি লিখছেন, তখন নারী শিক্ষা বা ক্ষমতায়ন নিয়ে সমাজ মোটেও উদার ছিল না।

নজরুলের নারীবাদ কেবল অধিকারের দাবি নয়, তা ছিল নারীর অন্তর্গত ঐশ্বরিক শক্তিকে বা ‘ফেমিমাইন এনার্জি’কে স্বীকৃতি দেওয়া। তিনি নারীকে কেবল ভোগের সামগ্রী বা গৃহকোণের অলংকার হিসেবে দেখেননি। তার কাছে নারী ছিল জননী, ভগিনী এবং সর্বোপরি এক তেজস্বী সহযোদ্ধা। ফরাসি নারীবাদী চিন্তায় ‘এক্রিচার ফেমিনিন’ বা নারীর নিজস্ব বয়ান তৈরির যে কথা বলা হয়, নজরুল যেন তার কবিতায় সেই ভাষারই এক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তার ‘বারাঙ্গনা’ কবিতার মতো সাহসী উচ্চারণ বিশ্বসাহিত্যে বিরল। সমাজ যাদের ছুড়ে ফেলে দিয়েছে, নজরুল তাদের মাথায় করে রেখেছেন। তিনি জানতেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজের অর্ধেক অংশকে অন্ধকারে রাখা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো আলোই পূর্ণতা পাবে না। 

কার্ল মার্কস যখন পুঁজিবাদের শেষ দেখে ফেলেছিলেন তার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায়, নজরুল তখন সেই পুঁজিবাদের বিষদাঁত অনুভব করছিলেন বাংলার সাধারণ মানুষের চোখের জল দেখে। নজরুলের সাম্যবাদ কোনো বিদেশি আমদানি করা ফর্মুলা ছিল না, তা ছিল তার জীবন থেকে উঠে আসা এক সত্য। তিনি যখন ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় লেখেন, ‘রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে/ রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে’, তখন তিনি এক অতি-আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার ব্যবচ্ছেদ করছেন। এই কলকারখানার ধোঁয়ার আড়ালে যে মেহনতি মানুষের রক্ত ঘাম হয়ে ঝরছে, তাদের কথা বলার মতো সাহস কজনের ছিল?

উত্তর-ঔপনিবেশিক বা পোস্ট-কলোনিয়াল তাত্ত্বিকরা যে ‘সাবঅল্টার্ন’ বা নিম্নবর্গের মানুষের কণ্ঠস্বর খুঁজে পাওয়ার কথা বলেন, নজরুল সেই কণ্ঠস্বর হয়েই জন্মেছিলেন। তিনি শোষিতের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন বলেই হয়তো রাজরোষে পড়তে হয়েছে বারবার। তার সাম্যবাদ কেবল রুটি-রুজির বণ্টন নয়, বরং সম্মানের ভাগাভাগিও। আজকের এই আকাশচুম্বী অট্টালিকা আর জাঁকজমকপূর্ণ শপিং মলের নিচে যারা ধুঁকছে, যারা প্রতিদিনের অন্নের জন্য নিজেকে বিক্রি করে দিচ্ছে, তাদের জন্য নজরুল আজও সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক নেতা। তিনি শিখিয়েছিলেন, হাতুড়ি আর কাস্তে কেবল হাতিয়ার নয়, তা নতুন ইতিহাস গড়ার কলম। নজরুলের সর্বহারা ভাবনায় যে আধ্যাত্মিক স্পর্শ ছিল, তা রুশ বিপ্লবের যান্ত্রিক সাম্যবাদের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও টেকসই।

নজরুলের কথা বলতে গেলে তার সংগীতের মহাসমুদ্রকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। ৩০০০-এর বেশি গান ভাবলে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যেতে হয়। কীভাবে একজন মানুষ এত রকমের সুর নিজের ভেতরে ধারণ করতে পারেন? নজরুল ছিলেন এক নিপুণ রসায়নবিদ, যিনি ধ্রুপদী সংগীতের রাগের সঙ্গে মাটির মেঠো সুরের এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। 

একদিকে তার গজলগুলো যখন বিরহী হৃদয়ে তুফান তোলে, অন্যদিকে তার ‘কারার ঐ লৌহকবাট’ শুনলে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক আদিম নেশা জেগে ওঠে। বাংলার লোকজ সুরকে তিনি এক নতুন কৌলীন্য দান করেছিলেন। তার গানের প্রতিটি লয়, প্রতিটি তান যেন একেকটি অনুভূতির মহাকাব্য। নজরুলসংগীতের বড় সার্থকতা হলো এর গণমুখী চরিত্র। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ সবখানেই নজরুলের গান ছিল যোদ্ধাদের প্রধান জ্বালানি। আজও যখন কোনো তরুণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে, অবচেতনেই কি তার ঠোঁটে নজরুলের গানের লাইনগুলো খেলা করে না? সংগীত তাত্ত্বিকদের মতে, নজরুল প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সুরের মাঝে এমন এক সেতুবন্ধন করেছিলেন, যা আজ ২০২৬ সালেও আমাদের সংগীতে আধুনিকতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেয়।

নজরুল যখন বাংলা সাহিত্যে এলেন, তখন রবীন্দ্র-প্রভাব এতই প্রবল যে অন্য কারও পক্ষে নিজের কণ্ঠস্বর শোনানো ছিল দুঃসাধ্য কাজ। কিন্তু নজরুল কোনো নিয়ম মানার পাত্র ছিলেন না। মিখাইল বাখতিন সাহিত্যের যে ‘হেটেরোগ্লোসিয়া’ বা বহুস্বরবাদের কথা বলেছিলেন, নজরুলের ভাষায় তা একদম জীবন্ত। তিনি তৎসম শব্দের পাশে অনায়াসে বসিয়ে দিলেন আরবি, ফারসি আর তুর্কি শব্দ। ভাষার এই যে গণতান্ত্রিকীকরণ, এটাই ছিল নজরুলের ভাষাতাত্ত্বিক বিপ্লব।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, ভাষা কোনো পবিত্র জাদুঘর নয়, বরং ভাষা হলো প্রবহমান নদীর মতো। ‘খুন’, ‘ইনকিলাব’, ‘জিন্দাবাদ’ এই শব্দগুলো তার জাদুকরী স্পর্শে বাংলা ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল। তার শব্দচয়ন ছিল যেন তলোয়ারের ঝিলিক। তিনি ভাষার আভিজাত্য ভেঙে তাকে সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে মেঠোপথ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন। আজ যখন আমরা বিশ্বায়নের চাপে নিজের ভাষা ও শিকড় হারিয়ে ফেলার ভয়ে থাকি, তখন নজরুলের এই উদার ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায় যে, পরকে আপন করতে পারলেই নিজের ভাষা সমৃদ্ধ হয়।

হেনরি বার্গসঁ তার দর্শনে ‘এলান ভাইটাল’ বা প্রাণশক্তির যে প্রবাহের কথা বলেছেন, নজরুলের পুরো জীবনটাই যেন ছিল সেই শক্তির এক মূর্ত প্রকাশ। তিনি তারুণ্যের উপাসক ছিলেন। তার কাছে ‘যৌবন’ মানে কেবল বয়সের একটি সংখ্যা নয়, বরং তা হলো অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার এক মানসিক অবস্থা। 

তিনি ধ্বংসকে ভয় পেতেন না, কারণ তিনি জানতেন পুরোনোকে ধ্বংস না করলে নতুনের অভিষেক সম্ভব নয়।  জীবনের প্রতি এক অদ্ভুত টান, মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করা এটাই নজরুলকে কালোত্তীর্ণ করেছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, জীবন মানে থমকে যাওয়া নয়, জীবন মানে অবিরাম ছুটে চলা। তার কবিতায় এই ‘ভাইটালিজম’ বা জীবনীশক্তিই হলো বাঙালির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক পুঁজি।

প্রশ্ন জাগতে পারে, এত বছর পর, এই প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে নজরুলের সেই আগুন-পাখি সত্তার প্রয়োজন কী? উত্তরটা খুব সহজ। মানুষ হিসেবে আমাদের অস্তিত্বের সংকটগুলো আজও মেটেনি। থিওডর অ্যাডর্নো আউশভিৎস ট্র্যাজেডির পর কবিতা লেখা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু নজরুল যেন আমাদের দেখিয়েছিলেন যে, চরম অন্ধকারেই কবিতার মশাল সবচেয়ে বেশি জরুরি।

নজরুল কেবল একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনৈতিক কর্মী এবং সমাজসংস্কারক। তার ‘ধূমকেতু’ বা ‘লাঙল’ পত্রিকাগুলো যে আগুনের ফুলকি ছড়িয়েছিল, তা আজও যেকোনো মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য পাঠ্য। ব্রিটিশদের জেলে বসে তিনি যখন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ লিখছেন, তখন তিনি কেবল নিজের জন্য লড়ছিলেন না, তিনি লড়ছিলেন সারা বিশ্বের লাঞ্ছিত মানুষের হয়ে। তার সেই তেজ, সেই আপসহীনতা আজকের এই সুবিধাবাদী ও স্বার্থপর পৃথিবীর সামনে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কাজী নজরুল ইসলাম কোনো পাথরের মূর্তিতে বন্দি নাম নন। তিনি এক চিরকালীন স্রোত। সময় বদলায়, রাজনীতির মেরুকরণ হয়, মানচিত্রের রং পাল্টে যায়, কিন্তু মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো সাম্য, প্রেম আর স্বাধীনতা একই থেকে যায়। নজরুল সেই চিরন্তন চাহিদারই এক শব্দরূপ। তাকে পাঠ করা মানে হলো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আসল চেহারাটা দেখা।

হয়তো আজও মহাকালের কোনো এক অলিন্দ থেকে নজরুলের সেই বজ্রকণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয় ‘আমি সেইদিন হব শান্ত/ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না।’ সেই দিন কি আজও এসেছে? পৃথিবী কি শান্ত হতে পেরেছে? উত্তর হয়তো আমাদের সবারই জানা। আর ঠিক এই কারণেই নজরুল আজও আমাদের সঙ্গে আছেন, থাকবেন। যতদিন বিশ্বে কোনো এক কোনে একটি মানুষও শোষিত হবে, ততদিন নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ বাজতেই থাকবে। তিনি কোনো অতীত নন, তিনি আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যতের এক অবিনাশী ধ্রুবতারা। নজরুলের অন্বেষণ আসলে মানুষের নিজের হারানো দেবত্বকে খুঁজে পাওয়ারই এক পরম আখ্যান। তার সেই দ্রোহ, সেই প্রেম আর সেই সাম্যের গান আমাদের ধমনিতে মিশে থাকুক রক্তকণিকা হয়ে, এটুকুই প্রত্যাশা।

কবিতা বিষাদ-বেদনার আঙুলে চুমো খাও

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:১৫ এএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:১৭ এএম
বিষাদ-বেদনার আঙুলে চুমো খাও
খবরের কাগজ গ্রাফিক্স

 মিরাজ নিজের দুই ঠোঁটে চুমো খাও।
নিজকে জড়িয়ে ধরে বলো 
আই লাভ ইউ।
যে আঙুলে জমা পড়েছে বিষাদ-বেদনা 
সেই আঙুলকে আদর করো।

মিরাজ, কে তোমাকে কথা দিয়েছিল? 
কে কথা রাখেনি! 
এই সব হাওয়া-বাতাসের মন্ত্র ভুলে গিয়ে 
বুকের ভেতরে সৃষ্টি করো আদম বাগান।
যে হাত স্পর্শ করেছে অবৈধ নারীর আঙুল 
সে হাতকে কালেমা পড়িয়ে মানুষ বানাও।

মিরাজ, আদম-হাওয়া-গন্দমের ইতিহাস ভুলে যাও।
নিজেকে বিষণ্ণ বৃক্ষের মতো মনে করো না।
আজ থেকে প্রবেশ করো আঙুর ফলের বাগানে।
দুই ঠোটের মাঝখানে জমে থাকা বিষকে পরিণত করো মধুতে।
চোখের খুনপাখিকে লালনের গান শোনাও।

কবিতা শান্তি নিদ্রা

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:০৩ এএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:০৮ এএম
শান্তি নিদ্রা
খবরের কাগজ গ্রাফিক্স

ভিড়-বাট্টায় খুঁজো না আমায় একাকী শূন্যে থাকি
জোয়ারভাটায় সম্বিৎ পাই আত্মাকে দিই ফাঁকি
আত্ম গ্লানিতে পর্যুদস্ত সাম্পান ভেসে যায়
খাণ্ডব আসে জলে-রোদ্দুরে এবং লু হাওয়ায়;
বর্ষক্রমায় অভুক্ত থাকা নিয়তির কারসাজি
খেয়ালের বশে সান্ত্বনা পেতে যোদ্ধার বেশে সাজি
একাদশী আর পূর্ণিমা রাতে চন্দ্রশোভায় শুয়ে
চন্দ্রালোকের অপার মায়ায় কলঙ্ক নিই ধুয়ে
অমাবস্যায় নিরালোক রথ করে যদি হাহাকার
মুহূর্তে প্রিয় হয়ে ওঠে যতো অপার অন্ধকার।

অবহেলা-গাঙে সন্তরণের কষ্টে হারাই কূল
সন্তাপে পুড়ি আপন গহনে জমে রাজ্যের ভুল
ভুলের মাশুল নিত্যি দিচ্ছি যাচ্ছে না তবু পাপ
মুক্তির পথে জমে আছে শত কষ্টের অনুতাপ
ভুলে ভরা এই জীবন আমার ভুলের স্বপ্নে বাঁচা
সীমাবদ্ধ এ ভুবন আসলে অজেয় লৌহ খাঁচা।
বৈশাখী ঝড় তাণ্ডব হলে আসবে মুক্তি তবে
মানুষে সমতা আসে না বিশ্বে শান্তি-নিদ্রা কবে!

আব্বার সেই ম্লান হাসিটা আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১০:৪৭ এএম
আব্বার সেই ম্লান হাসিটা আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

পঞ্চদশ পর্ব

আমরা তো ভর্তি হয়েছিলাম ছেচল্লিশের দাঙ্গার পরে, আর সাতচল্লিশের আগস্টে কলকাতা ছাড়তে হলো। স্কুলের ভেতরে সাম্প্রদায়িকতা ছিল না; তবে বাইরে দাঙ্গার রেশ তখনো বিদ্যমান। ক্লাস শেষে হিন্দু-মুসলমান ছাত্র আমরা একসঙ্গেই বের হতাম। পথিমধ্যে হিন্দুপাড়া ও মুসলমানপাড়া পড়ত, সেখানে আমরা বিভক্ত হয়ে যেতাম। বঙ্গভূমি যে আর অখণ্ড থাকবে না হয়তো তারই পূর্বভাসের মোকাবিলা করতে হতো। গল্প শুনেছিলাম রায়টের সময়ে এক হিন্দু ছাত্র ভীষণ বিপদে পড়েছিল, ভুল করে মুসলমানপাড়ায় ঢুকে পড়ে; কিন্তু তাকে বাঁচিয়েছিলেন এক মাংস-বিক্রেতা, তিনি দৌড়ে ছুটে এসে বলেছিলেন, ‘স্কুলকা লাড়কা, ছোড় দো।’ আসলে ভালো মানুষের সংখ্যাই ছিল অধিক, সাম্প্রদায়িক হিংস্রতাটা সৃষ্টি করেছিল মতলববাজ লোকেরা। 

দাঙ্গার আগে কলকাতায় ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহাসিক সব মিছিল হয়েছে যাতে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায় নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ অংশ নিয়েছেন; হতাহতও হয়েছেন, একসঙ্গে। রশীদ আলী দিবসের মিছিল ছিল বিশেষভাবে স্মরণীয়। ডাক ও তার বিভাগের কর্মচারীরা তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে ধর্মঘট করেছেন কিছুদিনব্যাপী। নৌবাহিনীতে বিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এসব ঘটনা আমরা কলকাতায় আসার আগেই ঘটেছে; কিন্তু প্রভাবটা পরেও পাওয়া যাচ্ছিল। মাসব্যাপী ট্রাম ধর্মঘট ততদিন শেষ হয়েছে, কিন্তু ধর্মঘটের সময়ে ট্রাম গাড়ির সামনে কমিউনিস্ট পার্টির লাল পতাকাকে মাঝখানে রেখে কংগ্রেস ও লীগের যে তিনটি পতাকা ওঠানো হয়েছিল ধর্মঘট শেষ হওয়ার পরেও তাদের উড়তে দেখেছি। 
ভালো কথা, ট্রামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে নতুন ক্লাসের পাঠ্যবই কিনতে গিয়ে। রাজশাহীতে যেমন নিয়ম দাঁড়িয়েছিল প্রমোশনের দিন বিকেলেই সাহেববাজারের বইপাড়ায় গিয়ে বই কেনা হবে, কলকাতাতেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। আব্বার সঙ্গে ট্রামে চেপে আমরা দুভাই কলেজ স্ট্রিটে গেছি, বই কিনেছি মহানন্দে, কিন্তু ফেরার পথে ধর্মতলায় নামার সময় আমি পড়েছিলাম পিছিয়ে, নামতে যাব এমনি সময় ট্রাম দিয়েছে ছেড়ে। উঁচু গলায় আব্বা বললেন পরের স্টপেজে গিয়ে নামতে। তাই করেছিলাম এবং আব্বা শিখিয়ে দিয়েছিলেন যে নামার সময় সামনের দিকে মুখ করে নামতে হবে। সামনে চলা চাই, পেছনমুখো হলে বিপদ, চলার ওই দিকনির্দেশটা প্রতীকী অর্থেও সত্য বটে। 

ট্রামের প্রত্যেকটি স্টেশনে খবরের কাগজ পত্রপত্রিকার একটা স্টল থাকত। সেখানে বইও পাওয়া যেত। আমরা আজাদ পত্রিকা পড়তাম, মুসলমান পাঠকদের জন্য সেটাই ছিল তখনকার ধারা। আজাদ মওলানা আকরম খাঁর পত্রিকা; তিনি রক্ষণশীল; ওই পত্রিকার বিপরীতে দৈনিক ইত্তেহাদ বের হয়েছিল, সোহরাওয়ার্দী সাহেবদের মুখপাত্র হয়ে। সে পত্রিকার ছোটদের পাতা সম্পাদনা করতেন কবি আহসান হাবীব; ওই পাতায় আমি লেখা পাঠাব এমন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, সেজন্য প্রত্যেক রবিবার ট্রাম স্টেশনে গিয়ে এক কপি কিনে আনতাম। কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা স্বাধীনতা কে যেন একবার বাসায় নিয়ে এসেছিলেন। মনে আছে আব্বা মন্তব্য করেছিলেন, ‘আসল স্বাধীনতার কথা কিন্তু ওই পত্রিকাই বলে’। তবে একসঙ্গে দুটি পত্রিকার গ্রাহক হওয়ার জন্য উপযুক্ত সাংস্কৃতিক মানসিকতা ও আর্থিক সঙ্গতি কোনোটাই আমাদের তখন ছিল না। 
খিদিরপুরপাড়ায় দুটি সিনেমা হল ছিল, কোনোটিতেই একবারের অধিক সিনেমা দেখা হয়নি। তবে আসল সিনেমাপাড়া ছিল ধর্মতলাতেই। নামকরা ছিল মেট্রো ও লাইট হাউস। লাইট হাউসে ‘কিসমত’ নামে একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী চলছিল। ছবিটি হিন্দি, তবে নায়ক ছিলেন বাঙালি অশোককুমার। সে সময়ে তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা। ছবিটি একটানা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছিল। তার কারণ যে কেবল অশোককুমার ও তার বিপরীতে লীলা চিটনিসের অনবদ্য অভিনয় তা নয়, মূল কারণ ছিল একটি গান, সেটি এরকমের, ‘দূর হটো, দূর হটো সব দুনিয়াওয়ালে হিন্দুস্থান হামারা হায়’। স্বাধীনতার জাতীয়তাবাদী ওই সংগীত দর্শক টানত; অনেকেই একাধিকবার দেখেছেন, আমি অবশ্য একবারই দেখেছি, হয়তো আমার বন্ধু ও আত্মীয় মুজিবের সঙ্গে। সুভাষ বসু তখন নেই, কিন্তু মনে হতো আজাদ হিন্দ ফৌজের কণ্ঠস্বর চলচ্চিত্রের ওই গানে চলে এসেছে। 

বন্ধু মুজিবের প্রসঙ্গ আগেই এসেছে। তার বাবা, অর্থাৎ আমাদের ফুপা, বদলি হয়ে এসেছিলেন টালিগঞ্জে, কোর্ট ইন্সপেক্টর হিসেবে। তারা বাসা নিলেন আমাদের বাসার কাছেই। মুজিবও ভর্তি হলো সেন্ট বার্নাবাস স্কুলেই, এবং একই ক্লাসে। ফলে দুজনের বন্ধুত্বটা আরও গাঢ় হয়ে উঠল। সেটা অক্ষুণ্ন ছিল তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। মুজিব মারা যায় ২০১১ সালে। তার মৃত্যু আমাকে অত্যন্ত গভীরভাবে আঘাত করেছে।
কলকাতায় থাকার সময়ে আমাদের দুজনকে এক ধরনের খেলায় পেয়েছিল। সেটা হলো বাংলা অর্থসহ কতটা ইংরেজি শব্দ বলতে পারি তার প্রতিযোগিতা। মুজিবরা থাকত দোতলা বাড়ির দোতলায়; অনেকদিনই আমরা বিকেলে তাদের বাসার ছাদে হাঁটতে হাঁটতে শব্দ নিয়ে ওই প্রতিযোগিতার খেলাটা উপভোগ করেছি। বলাবাহুল্য, উপকৃতও হয়েছি। আব্বা খুব খুশি হতেন এ খেলাটা জমছে দেখে। সে সময়ে নেসফিল্ডের ইংলিশ গ্রামার ছিল অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ব্যাকরণ বই। স্কুলে পাঠ্য ছিল, আব্বা আমাকে উৎসাহিত করতেন গ্রামার বই থেকে প্রিপজিশনের ব্যবহার মুখস্ত করতে। বলতেন, কাজে দেবে। এ ব্যাপারে তার ধারণা নির্ভুল ছিল; প্রিপজিশনের ব্যবহার আমাকে তখন তো অবশ্যই, অনেক পরেও, এমনকি এখনো জ্বালাতন করে।
 
রাত করে বাসায় ফিরলে উদ্বেগের বিষয় উল্লেখ করেছি। ওই উদ্বেগ আমাকেও একদিন ভীষণ রকম কাতর করেছিল। আব্বা অফিস থেকে ফেরার পথে কোনো কোনো দিন বাজার থেকে সওদাপাতি কিনে আনতেন, তখন ফিরতে কিছুটা দেরি হতো। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত এসে গেছে তবু আব্বা বাসায় ফেরেননি। কারণ কী? তিনি কী কোনো বিপদে পড়লেন? না জেনে হিন্দুপাড়ায় গিয়ে পড়েছেন কী? রাজশাহীতে আব্বাকে দেখেছি অফিসের অন্যসব বাবুদের মতোই ধুতি পরে অফিসে যেতে। কলকাতায় এসে তিনি পোশাক বদলে ফেলেছিলেন। ঠিক পাজামা নয়, আবার ট্রাউজার্সও নয়, নাম দিয়েছিলেন প্যান্ট-পাজামা; পাজামাই তবে দুদিকে দুই পকেট; তার ওপরে শার্ট। হিন্দু না মুসলমান, একনজরে যাতে চেনা না যায় তার ব্যবস্থা। হিন্দুপাড়া দিয়ে গেলে মনে হবে হিন্দু বটে; মুসলমানপাড়া দিয়ে যাওয়ার সময় ধারণা হবে মুসলমানই তো, পাজামা পরেছে। যা হোক, রাত হয়ে যাচ্ছে আব্বা তবু ফিরছেন না, এতে আমার ভেতর ভীষণ অস্থিরতা শুরু হলো। মা কিছু বলছেন না; ব্যস্ত রয়েছেন এটা-সেটায়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনিও যে উদ্বিগ্ন সেটা আমি টের পাচ্ছি। মাকে কিছু না বলে আমি বের হয়ে পড়েছিলাম ট্রাম স্টেশনের উদ্দেশে। মা কিছু জিজ্ঞাসা করেননি, তার দশ-এগারো বছরের ছেলে আমি সন্ধ্যার পরে একাকী কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি জানতে চাননি, তবে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন কোন দিকে এবং কেন যাচ্ছি। যাচ্ছি রাস্তায় গিয়ে অপেক্ষা করতেই। আমার মায়ের সঙ্গে অনুভূতির নীরব কথোপকথন পরে আরও অনেক সময়ে ঘটেছে; কিন্তু এটাই ছিল সর্বপ্রথম। আমি ট্রাম স্টেশন পর্যন্ত চলে গেছি। দেখছি আব্বা নামেন কি না। ট্রাম আসছে, ট্রাম যাচ্ছে, আব্বার দেখা নেই। আমি ঘোরাফেরা করছি আশপাশে। এমন সময় মুজিবের হঠাৎ আবির্ভাব। সে ফিরছে তাদের বাসায়। তার মা হয়তো তাকে দোকানে পাঠিয়েছিলেন কিছু কিনতে। আমার ফুপুরা চারজনই খুব জাঁদরেল ছিলেন। আমাকে অকারণে ওইখানে দেখে পিঠে থাপ্পড় দিয়ে মুজিব বলল, ‘কী রে, এখানে কীসের ঘোরাঘুরি?’ আমি তাকে আমার উদ্বেগের বিষয়টা বলতে পারলাম না; এবং বাধ্য হলাম তার সঙ্গে বাসার দিকে রওনা হতে। আব্বা ফিরলেন আমার ফেরারও পরে। তখন সবার একই প্রশ্ন, ‘কী হয়েছিল’? অপরাধীর মতো হেসে আব্বা বললেন, ‘কলিন্স স্ট্রিটে এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা। সে তার বাসায় নিয়ে গেল। আমার ভুল হয়েছে।’ আব্বার সেই ম্লান হাসিটা অনেককাল আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। আগে কখনো তাকে অপরাধীর মতো ওভাবে হাসতে দেখিনি; পরে দেখেছি হয়তো, কিন্তু সেদিনকার মতো নয়। তিনি বুঝেছিলেন আমরা কতটা উদ্বেগের মধ্যে সময় পার করেছি। ছেচল্লিশের রায়ট কলকাতার মানুষকে অমনভাবেই সন্ত্রস্ত রাখত। আর আমি নিজে উদ্বিগ্ন বহুবার বহুভাবে হয়েছি, কিন্তু ওই প্রথমবারের মতো আর কখনো নয়।

সাতচল্লিশের অস্বাভাবিতার মধ্যেও আমরা অবশ্য স্বাভাবিক জীবনই যাপন করেছি। আমার মা বাসা তৈরি করতে পারতেন বাবুই পাখির দক্ষতায়। কলকাতার বাসায় এসে তিনি কিছুটা হতাশই হয়েছিলন; কিন্তু দমে যাননি। গুছিয়ে বসেছিলেন। আত্মীয়-স্বজন আসতেন। তিনি নিজেও যেতেন কখনো কখনো। প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠেছিল। এমনকি রাজশাহী থেকেও হায়াত আলী শেখ একবার এসে ঘুরে গেছেন।
 
আমরা দুভাইও খুশিই ছিলাম। মনে পড়ে নতুন শহরে আসার একেবারে প্রথম দিকেই গঙ্গার ধার ধরে আমরা মির্জাপুর স্ট্রিটের খোঁজে বের হয়ে পড়েছিলাম। সেখানে আব্বার চাচাতো বোনদের সবচেয়ে বড় যিনি তিনি থাকতেন। ফুপার চাকরি ছিল স্ট্রিমার কোম্পানিতে। মির্জাপুর পাড়াটা ছিল বই বাঁধাইয়ের। ছাপাখানাও ছিল কয়েকটি ছোটখাটো, তবে বই বাঁধাই ছিল বিরাট ব্যাপার। ওই কাজে মানিকগঞ্জের অনেক মানুষ তখন নিযুক্ত ছিলেন। তারা আশপাশেই বসবাস করতেন। ফুপুরা যে দোতলায় থাকতেন তার নিচতলাতেও কয়েকটি পরিবার থাকত, দেশভাগ নিশ্চয়ই এদের ভীষণ বিপদে ফেলেছিল। অচেনা শহরে সদ্য-আগত আমরা দুই কিশোর ফুপুর বাসা খুঁজে বের করে, সেখানে গিয়ে আচমকা হাজির হয়েছি দেখে তিনি যেমন খুশি হয়েছেন, তেমনি বিস্মিতও হয়েছেন আমাদের ‘সাহস’ দেখে। আমাদের কিন্তু কোনো অসুবিধা হয়নি; মির্জাপুর স্ট্রিট এবং তাদের বাসা খুঁজে পেতে। ফুপুর দুই ছেলে আমার প্রায় সমবয়সী। ওরা অবশ্য তখন বাসায় ছিল না।
 
কলকাতায় তো আমরা মোটামুটি গুছিয়ে বসেছি; দেশ স্বাধীন হবে এমনই আশা, তাতে আমাদের সুবিধা হবে এটাও নিশ্চিত। কারণ আব্বার চাকরি কলকাতার হেড অফিসে, সেখান থেকে বদলি হয়ে মফস্বলে যে যাবেন এমন শঙ্কা নেই। স্কুলের হিন্দু সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কারও কারও সঙ্গে বন্ধুত্বও গড়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে। প্রতিযোগিতার জন্যও প্রস্তুত হচ্ছি। ম্যাট্রিক শেষ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হব এ রকমের ধারণা।
 
এর মধ্যেই যেটা ছিল কল্পনারও বাইরে, তার ঘোষণা এল। দেশ ভাগ হয়ে যাবে হিন্দুস্থান-পাকিস্তানে- জুনের ৩ তারিখে রেডিওতে শোনা গেল ওই কথা। ‘স্বাধীনতার’ ওই ঘটনার বাস্তবিক ফলটা কী দাঁড়াবে সে সম্বন্ধে আমরা ছোটরা তো নয়ই, আমাদের অভিভাবকরাও কিছুই ভাবতে পারছিলেন না। তারা হতবাক হয়ে গেছিলেন। দাঙ্গা দেখেছেন, এবার না জানি কী দেখতে হবে- এই বুঝি ছিল তাদের প্রশ্ন। কে কোথায় ছিটকে পড়বেন কে জানে? 

চলবে...

যে বই কেউ ছাপতে চায়নি সেই বইয়ের বুকার জয়

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১০:৩২ এএম
যে বই কেউ ছাপতে চায়নি সেই বইয়ের বুকার জয়
পুরস্কার হাতে ইয়াং শুয়াং-জি ও লি কিং। ছবি: সংগৃহীত

নিষিদ্ধ প্রেম এবং তাইওয়ানিজ খাবারের গল্প নিয়ে লেখা উপন্যাস আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার জয় করেছে। ম্যান্ডারিন বা চীনা ভাষা থেকে অনূদিত প্রথম কোনো উপন্যাস এই পুরস্কার জয়ের গৌরব অর্জন করল।
 
তাইওয়ানের লেখিকা ইয়াং শুয়াং-জির লেখা এবং তাইওয়ান-আমেরিকান বংশোদ্ভূত লিন কিং অনূদিত ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ উপন্যাসটি ১৯৩০-এর দশকে জাপানি শাসনামলের দুই নারীর তাইওয়ানজুড়ে রন্ধনশিল্পভিত্তিক ভ্রমণের গল্প এটি। ভ্রামণিক স্মৃতিকথা হিসেবে কাল্পনিক পাদটীকাসহ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণিত বইটি ২০২০ সালে যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন অনেক পাঠকই ঐতিহাসিক গ্রন্থ মনে করে এটি পড়েছিলেন। বুকারের প্রধান বিচারক নাতাশা ব্রাউন উপন্যাসটিকে একটি মনোমুগ্ধকর ও সূক্ষ্মভাবে সাজানো অত্যন্ত চমৎকার উপন্যাস বলে আখ্যায়িত করেছেন।

‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ মূলত আওইয়ামা চিজুকো নামের কাল্পনিক জাপানি লেখিকাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, যিনি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তাইওয়ান সফরে গিয়ে ও চিজুরু নামের এক তাইওয়ানি নারী অনুবাদকের প্রেমে পড়েন। এই দুই চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে উপন্যাসটি প্রেম, সংস্কৃতি, ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো খুঁজেছে।

পুরস্কার ঘোষণার আগে ইয়াং বুকার প্রাইজ কমিটিকে বলেছিলেন, উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু ভ্রমণ এবং খাবার নিয়ে গবেষণা করা আমার জীবনকে দুটি দিক থেকে বদলে দিয়েছে। ভ্রমণের কারণে আমার সঞ্চয় কমে গেছে আর খেতে হয়েছে বলে ওজন গেছে বেড়ে। বুকার পাওয়ার আগে ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ বেশ কয়েকটি সম্মাননা অর্জন করে।

৪১ বছর বয়সী ইয়াং প্রবন্ধ, মাঙ্গা (জাপানি কমিকস) এবং ভিডিও গেমের স্ক্রিপ্ট লিখে থাকেন। এই উপন্যাসের মূল ম্যান্ডারিন সংস্করণটি ২০২১ সালে তাইওয়ানের সর্বোচ্চ সাহিত্যিক সম্মাননা ‘গোল্ডেন ট্রাইপড অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছিল। অন্যদিকে লিন কিংয়ের ইংরেজি অনুবাদের সংস্করণটি ২০২৪ সালে ‘ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফর ট্রান্সলেটেড লিটারেচার’ জয় করে।

বুকার পুরস্কার পাওয়ার আগে কিং বলেছিলেন, জাপানি শাসনামলে তাইওয়ানের মানুষের দুঃখ ও আনন্দের মধ্যে ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ যে ভারসাম্য বজায় রেখেছে তা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। তিনি তখন বলেন, ‘সময় যতই কঠিন হোক না কেন, আমি বিশ্বাস করি মানুষ সব সময় কিছুটা আনন্দের আলো এবং ভালোবাসার গভীর উৎস খুঁজে নিতে পারে।’ তিনি আরও যোগ করে বলেন, ‘কৌতুক, ভালো খাবার, সিনেমা, স্কুল, ছোটখাটো ঝগড়া এবং রোমাঞ্চ জীবনের অংশ। এসবের বিপরীতে কিছু ভাবা মানে সংস্কৃতিকে কেবল তার ক্ষত বা ট্রমার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা।’

আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার দেওয়ার সময় আয়োজকরা এক বিবৃতিতে ‘অনুবাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজের’ কথা উল্লেখ করে পুরস্কারের ৫০ হাজার পাউন্ড (৬৭ হাজার ডলার) সমপরিমাণ অর্থ লেখক এবং অনুবাদকের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়ার কথা জানান।

সাক্ষাৎকার
‘আমি আমার নিজের দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হতে রাজি নই’
১৯৩০-এর দশকে জাপানের দখলে থাকা তাইওয়ানের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসের রাজনৈতিক পটভূমি সম্পর্কে অকপটে কথা বলেন, ‘কিছু মানুষ মনে করেন শিল্প ও সাহিত্যকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা উচিত। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সাহিত্য যে মাটিতে জন্মায়, তা থেকে তাকে কখনো আলাদা করা যায় না।’

তিনি মনে করেন, ‘তাইওয়ানের মানুষ একটি পরিচয় সংকটে ভুগছে। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের চীনা মনে করে, আবার কেউ কেউ মনে করে আমরা তাইওয়ানি। তাইওয়ানের মানুষ হিসেবে আমাদের এখন নিজেদের জিজ্ঞাসা করতে হবে–আমরা কি আবার ঔপনিবেশিক শাসনে ফিরে যাব না স্বাধীন থাকব? নিজেদের মাটিতে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকার পক্ষে আমি নই।’

এই উদ্বেগগুলোই আসলে ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’-এর মূল ভিত্তি। উপন্যাসটি আওইয়ামা নামের এক নারীকে কেন্দ্র করে রচিত, যিনি একজন ‘অত্যন্ত ভোজনরসিক’ জাপানি ঔপন্যাসিক এবং সরকারি অর্থায়নে রন্ধন সম্পর্কিত সফরে তাইওয়ানে ঘুরছেন। এ সময় তার তাইওয়ানি দোভাষী চিজুরুর প্রতি তিনি গভীরভাবে আসক্ত হয়ে পড়েন। বইটির প্রতিটি অধ্যায়ের নামকরণ করা হয়েছে তাইওয়ানি সুস্বাদু খাবারের নামে–যেমন কষানো কিমা করা শূকরের মাংস, কাঁচা মাছের টুকরো, তরমুজের চা। এসব খাবার ও পানীয়র স্বাদ উপন্যাস পাঠের অদ্ভুত অনুভূতি দেয়। 

উপন্যাসটির পটভূমি ১৯৩০ দশকের, তবু তাইওয়ানের জাতীয় পরিচয় এবং উপনিবেশবাদ নিয়ে করা প্রশ্নগুলোর কারণে এটি পুরোপুরি একটা আধুনিক উপন্যাস। তাইওয়ান এখনো বিশ্বের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোর একটি। দেশটিতে আছে স্বশাসিত গণতন্ত্র, যদিও তাইওয়ানকে বেইজিং চীনের অংশ বলে দাবি করে এবং দেশটির ওপর সামরিক আগ্রাসনের হুমকি রয়ে গেছে। কিছুদিন আগে চীন সফরের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।

এটিই ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়া ইয়াংয়ের প্রথম উপন্যাস, তবে তা ইতোমধ্যে অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে। ২০২০ সালে প্রকাশের পর তাইওয়ানে দারুণ সাড়া জাগায়। এরপর ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনূদিত সাহিত্যের জন্য ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পায় এবং এখন আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার অর্জন করল, যাকে ইয়াং একটি ‘অবাস্তব বা স্বপ্নের মতো’ অর্জিত সম্মান বলে বর্ণনা করেছেন।

প্রথম প্রকাশের পর অনেকে এটিকে জাপানি ঔপনিবেশিক আমলে আবিষ্কৃত ঐতিহাসিক বই বলে মনে করেছিলেন। ইংরেজি সংস্করণে বইটির অনুবাদকের কাল্পনিক নোট এবং সম্পাদকীয় হস্তক্ষেপ এমন আবহ তৈরি করেছে, যাকে আন্তর্জাতিক বুকার বিচারক প্যানেলের প্রধান নাতাশা ব্রাউন ‘কৌতূহলোদ্দীপক মেটাফিকশনাল লেয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

অনুবাদক কিং এ প্রসঙ্গে হেসে বলেন, ‘আমি স্বীকার করছি এটি বেশ কঠিন একটি বই। কিন্তু মানুষ যেখানে বই পড়ায় একনাগাড়ে দুই মিনিটের বেশি মনোযোগ দিতে পারছেন না, সেখানে পাঠকদের এই বইয়ের পেছনে শ্রম দিতে দেখাটা সত্যিই উৎসাহব্যঞ্জক।’

উপন্যাসটির কাঠামোগত এই জটিলতা এর আবেগীয় কেন্দ্রের সঙ্গেও মিলে যায়। আওইয়ামা এবং চিজুরুর সম্পর্কটি গড়ে উঠেছে অনুবাদ এবং ভুল অনুবাদের দোলাচলের মধ্য দিয়ে। একজন উপপত্নীর তাইওয়ানি কন্যা চিজুরু নিজেকে ঔপনিবেশিক সরকারের সুরক্ষায় ভ্রমণকারী বিখ্যাত জাপানি ঔপন্যাসিক আওইয়ামার চেয়ে সামাজিকভাবে নিজেকে নিকৃষ্ট ভাবে। ইয়াং বলেন, ‘এটি ভালোবাসার গল্প, কিন্তু একই সঙ্গে এমন গল্পও যে, ভালোবাসা কীভাবে ক্ষমতার অসমতার কাছে হেরে যায়, তা দেখায়। ভালোবাসা শাসক শ্রেণি এবং দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকদের মধ্যকার পার্থক্যকে ঘুচিয়ে দিতে পারে না।’

ইয়াংয়ের মতোই ৩৩ বছর বয়সী কিং (যিনি একাধারে তাইওয়ানি ও আমেরিকান) শিল্প ও রাজনীতির এই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাষী লেখক। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে তিনি তাইওয়ানে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রতিফলন দেখতে পান, যা তাকে কেবল তাইওয়ানি সাহিত্য অনুবাদ করার প্রতিজ্ঞায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।

পুরস্কার মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘আমার নিজের এবং আমার সহ-অনুবাদকদের লক্ষ্য হলো বেশি বেশি করে তাইওয়ানের সৃষ্টিশীল কণ্ঠস্বরকে ইংরেজিতে নিয়ে আসা যাতে কেউ তাইওয়ানের সাহিত্যকে একঘেয়ে বা একক কোনো রূপের সাহিত্য মনে করে ছোট করে না দেখে। কারণ, আমাদের লেখকরা সমবেত সুরে লিখছেন না, বরং আমরা এক বৈচিত্র্যময় কোলাহল–পরস্পরবিরোধী অবাধ্য স্বরে লেখালেখি করছি, ঠিক যেমনটা কোনো সুস্থ ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের লক্ষণ হওয়া উচিত।’

তাইওয়ানকে এভাবে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ হিসেবে দেখার সেই দর্শনের মূলে রয়েছে এই উপন্যাসের ‘ক্যুইয়ার’ বা সমকামী সত্তাটি। চিজুরুর প্রতি আওইয়ামার তাই মুগ্ধতা স্বাভাবিক মনে হয়। ইয়াং নিজে নারী হয়ে আরেক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। তিনি এই উপন্যাসটিকে তাইওয়ানের বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকে বিকশিত ‘ক্যুইয়ার সাহিত্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের’ অংশ হিসেবে দেখেন। ইয়াং বলেন, ‘তবে আমি বিশেষভাবে যা নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম তা হলো নারীদের মধ্যকার সব ধরনের সম্পর্ক যাতে উঠে আসে। নারীদের মধ্যকার নিজস্ব ভালোবাসা, এসব।’

ইয়াং বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, তাইওয়ান পুরো পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে প্রগতিশীল রাষ্ট্র। সেটি এলজিবিটিকিউ অধিকার হোক কিংবা নারী অধিকার, আমরা উদাহরণ তৈরি করছি।’

‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’-এর এই সাফল্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন ইংরেজিভাষী পাঠকদের মধ্যে অনূদিত কথাসাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এর বিক্রিও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যের পাঠকরা অনূদিত কথাসাহিত্যের বইয়ের পেছনে ২ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড খরচ করেছেন, অর্থাৎ বই কিনেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। লক্ষণীয় হচ্ছে এই অনুবাদ বইয়ের সবচেয়ে বড় ক্রেতাগোষ্ঠী ছিল ২৫-৩৪ বছর বয়সের পাঠকরা।

‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হয়। কিন্তু যুক্তরাজ্যে এটি প্রকাশিত হতে আরও দুই বছর সময় লেগে যায়। কারণ, কোনো প্রকাশকই ইয়াংয়ের মতো কিংয়ের নামও বইয়ের প্রচ্ছদে দিতে রাজি ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত কিছুটা অপ্রথাগত প্রকাশক ‘অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ বইটি প্রকাশে এগিয়ে আসে। ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’সহ এই প্রকাশক টানা দ্বিতীয়বার ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কার জয়ের আনন্দ উদযাপন করছে। গত বছর এই পুরস্কার জিতেছিলেন ভারতীয় লেখক বানু মুশতাক তার ‘হার্ট ল্যাম্প’ বইটির জন্য, যা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন দীপা ভাস্তি, প্রকাশ করেছিল এই প্রকাশক।

কিংয়ের কাছে অনূদিত কথাসাহিত্যের গুরুত্ব অনেক। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘পড়ার সৌন্দর্য হলো আপনি এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছে যাচ্ছেন যা আপনার নিজের নয় এবং আপনি নতুন কিছু জানতে পারছেন; অনূদিত সাহিত্য এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যখনই আমি এই ধরনের পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকার দিকে তাকাই, নিজের অজ্ঞতা অনুভব করি আর ভাবি–‘ওহ, আমি তো জানতামই না এরকম কোনো একনায়কতন্ত্র ছিল বা আমি সেই গণহত্যা, শাসনবদল কিংবা সেই উপভাষা এবং কীভাবে তাকে দমন করা হয়েছে, সে সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। এভাবে শেখার কত কিছু যে আছে অনুবাদ থেকে!’

‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ শুধু তাইওয়ানের ইতিহাসের সঙ্গে অপরিচিত পাঠকদের সামনে এর দুয়ার খুলে দেয়নি, কিং আমাকে বলেন, এটি তরুণ তাইওয়ানি পাঠক এবং প্রবাসীদের মধ্যেও গভীরভাবে সাড়া ফেলেছে। তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই আমাকে বলেছেন, ইংরেজি ভাষার বইতে তাইওয়ানকে এভাবে চিত্রিত করা যায়, তারা সেটা প্রথমবার দেখছেন এবং এটি তাইওয়ান সম্পর্কে জানার জন্য তাদের আগ্রহকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। এটিই আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয়।’

সাক্ষাৎকার গ্রহণে: এমা লফহেগেন। সূত্র: গার্ডিয়ান

পতেঙ্গায় ১৪০০ লিটার ডিজেল জব্দ

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম
আপডেট: ০২ জুন ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম
পতেঙ্গায় ১৪০০ লিটার ডিজেল জব্দ
ছবি: খাবরের কাগজ

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে বাজারজাতকরণের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া ১ হাজার ৪০০ লিটার ডিজেল জব্দ করেছে কোস্টগার্ড।

মঙ্গলবার (২ জুন) সকালে কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার বিএন সুমন আল মুকিত বিষয়টি খবরের কাগজকে নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, সোমবার (১ জুন) সন্ধ্যায় পতেঙ্গা থানাধীন ৯নং ঘাট-সংলগ্ন এলাকায় এ অভিযান চালানো হয়।

তিনি জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোস্টগার্ড আউটপোস্ট পতেঙ্গা ওই এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান চালায়। অভিযানের সময় সন্দেহজনক দুটি ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকা তল্লাশি করে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার টাকা মূল্যের ১ হাজার ৪০০ লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়। কোস্টগার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা পালিয়ে যাওয়ায় এই ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। 

জব্দ করা ডিজেল ও নৌকা দুটি পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

চোরাচালান রোধে কোস্টগার্ডের এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়।

আজহার/