চতুর্দশ পর্ব
দেশবরেণ্য লেখক, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বাংলাদেশের একজন অভিভাবক, বাঙালির বাতিঘর এই শিক্ষাগুরু সবার স্যার। শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি যেমন অনন্য অবদান রেখেছেন, তেমনি সাহিত্য সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তিনি অসামান্য ভূমিকা রাখছেন। সেই ছোটবেলায় তার লেখালেখিতে হাতে খড়ি। ৮৯ বছর বয়সেও তিনি নিয়মিতই লিখছেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, অবসর গ্রহণের পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। চব্বিশ বছর ধরে সাহিত্য-সংস্কৃতির ত্রৈমাসিক ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকাটি সম্পাদনা করছেন। এক শ বাইশ গ্রন্থের রচয়িতা। লেখালেখির জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
রাজশাহীতে আত্মীয়স্বজন বলতে একটি মাত্র পরিবারই ছিল। স্থানীয় নয়, আমাদের বিক্রমপুরেরই, এবং মায়ের দিক থেকে সম্পর্কিতও বটে। আনওয়ারুল হক চৌধুরী ছিলেন পুলিশের ইন্সপেক্টর; সস্ত্রীক তিনি থাকতেন ওই শহরেই। তার মেজোভাই আজহারুল হক চৌধুরী তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকোনমিক্স পড়েন, থাকতেন ফজলুল হক হলে। ছুটিতে একবার বড় ভাইয়ের বাসায় এসেছিলেন বেড়াতে। তার কাছেই দেখেছিলাম ফজলুল হক হলের ছাত্র সংসদের বার্ষিকীর একটি কপি; আমার আগ্রহ দেখে যেটি তিনি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। বুঝি বা না বুঝি পত্রিকাটি আমার খুব ভালো লেগেছিল। কৌভূহল জেগেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন সম্পর্কে। রাজশাহীতে আনওয়ারুল হক চৌধুরীরা ছাড়া অন্য অনেকের সঙ্গে জানাশোনা থাকলেও আত্মীয় বলতে কেউ ছিলেন না; আনওয়ার ভাইদেরও স্বামী-স্ত্রী দুজনের সংসার; তাদের কোনো সন্তান তখনো জন্মগ্রহণ করেনি। কিন্তু বাংলার রাজধানী কলকাতা শহর ছিল আত্মীয়স্বজনে ঠাসা। যে বিক্রমপুরকে বিক্রমপুরে পাওয়া যায়নি, কী আশ্চর্য, সেটি উপস্থিত ওই কলকাতায়। সেটা ছিল মস্ত বড় এক প্রাপ্তি। তাছাড়া গড়ের মাঠ, গঙ্গা নদী, এসপ্ল্যানেড, ধর্মতলা, অনেক সিনেমা হল, চিড়িয়াখানা, এসব তো ছিলই।
খিদিরপুরে আমাদের বসবাসের রাস্তার নাম ছিল ওয়াটগঞ্জ স্ট্রিট। ওয়াট হয়তো ওয়াটারের অপভ্রংশ, কেননা রাস্তাটি ছিল গঙ্গা নদীর একটি স্টিমার ঘাটের পাশেই। সে কারণে আশপাশে পূর্ববঙ্গের বেশ কিছু নৌ-কর্মচারী বসবাস করতেন। ওই রাস্তাতেই যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের পৈতৃক গৃহ ছিল সেটা জেনেছি অনেক দিন পরে, মাত্র কয়েক বছর আগে, যখন আমরা তিন ভাই কলকাতায় গিয়েছিলাম বইমেলা উপলক্ষে এবং স্বভাবতই অনুসন্ধানে বের হয়েছিলাম আমাদের পুরোনো বাসস্থানের। তখনই দেখলাম ওয়াটগঞ্জ স্ট্রিটের নতুন নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্ট্রিট। মধুসূদন দত্ত ইংরেজি ভাষার কবি হতে গিয়ে বাংলা ভাষার প্রধান কবিদের একজন হয়ে উঠেছিলেন। তাদের বসবাসের ওয়াটগঞ্জ স্ট্রিটেও দেখলাম চরিত্র বদলে পুরোপুরি বাঙালিপাড়া হয়ে গেছে। আমাদের সময়ে ওখানে উর্দু (হিন্দুস্থানী) ভাষীরাও ছিলেন, এবার মনে হলো সবাই বাংলাভাষী। শুধু তাই নয়, বড় একটি বাড়ির সামনের প্রশস্ত আঙিনায় দেখলাম কয়েকজনে একটি মঞ্চ তৈরির কাজে ব্যস্ত। আমরা তাদের কাছে আমাদের পুরাতন বসবাসের বাড়িটি কোন দিকে হতে পারে জিজ্ঞাসা করায় তারা কৌতূহলী হলেন আমাদের পরিচয় জানতে। বাংলাদেশ থেকে এসেছি এবং এক সময়ে ওই রাস্তায় আমাদের আবাস ছিল জেনে তারা খুবই প্রীত হলেন, এবং জানালেন যে, ওই বাড়িটি ছিল কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সেটিতে এখন একটি গ্রন্থাগার স্থাপন করা হয়েছে, পরিচালনা করে স্থানীয় একটি সমিতি, তাদেরই উদ্যোগে রবিবারের ওই সন্ধ্যায় নাটক মঞ্চস্থ হবে, যার জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একাধিক কণ্ঠে তারা জানালেন যে, কেবল হেমচন্দ্র ও মধুসূদন নয়, বাংলা মহাকাব্যের অপর এক রচয়িতা রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাস করতেন ওই এলাকাতেই। বোঝা গেল তিন মহাকবির প্রতিবেশী হওয়ার কারণে তারা বেশ গর্বিত। ভদ্রলোকেরা আমাদের নাটক দেখার এবং পাঠাগারটি ঘুরে দেখে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সে আমন্ত্রণ অত্যন্ত আন্তরিক ছিল। আমরা আমাদের পরিচিত পুরোনো এলাকাটা দেখলাম; রাস্তার নাম বদলেছে, কিন্তু বস্তুগত উন্নতি তেমন ঘটেনি। তার কারণ হয়তো সেটি বাঙালিদের পাড়া। আমাদের হাতে সময় ছিল না, তাই ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিতে হয়েছিল। কিন্তু তাদের একজন দেখলাম সাইকেলে চেপে আমাদের ভাড়া করা ট্যাক্সির আগে আগে গিয়ে যে জায়গাটাতে আমরা একসময়ে থাকতাম সেটা দেখিয়ে দিতে উদ্যোগী হয়েছেন। কেবল তাই নয়, বইমেলায় পরের দিন আমার লেখা জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি বইটির কলকাতা সংস্করণের মোড়ক উন্মোচনের অনুষ্ঠানে দেখলাম তিনি এসেছেন। খুব ভালো লাগল। কলকাতা যে এখন আর বাঙালিদের শহর নেই, সেটা জানতাম, কিন্তু পাড়ায়-মহল্লায় বাঙালি সংস্কৃতির চর্চার চেষ্টা যে আছে তার পরিচয় পেয়ে আমরা অত্যন্ত উৎসাহিত বোধ করেছিলাম। সেবার আমরা যে তিন ভাই বইমেলার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম; তাদের দুজন এখন আর নেই। আমার ছোট মেয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) শিক্ষকতা করে, সেও সঙ্গে ছিল; এবং ছিলেন নতুন দিগন্ত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মযহারুল ইসলাম বাবলা। ব্যবস্থাপক তিনিই। কবি হাসান ফখরী তখন কলকাতায়, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনিও এসেছিলেন।
কলকাতায় ছেচল্লিশে আমরা যখন আসি ততদিনে আমাদের ছোট মামা ম্যাট্রিক পাস করে চাকরি নিয়েছেন। তিনি তো আমাদের পরিবারেরই অংশ ছিলেন, এবার আরও ঘনিষ্ঠ হলেন। আব্বার চাচাতো বোনদের বড় দুজন তখন কলকাতায় থাকেন। বড় বোনের বাসা মির্জাপুর এলাকায়, তার দুই ছেলে আমাদের প্রায় সমবয়সী; মেজো বোনের স্বামী কলকাতা পুলিশে কাজ করেন, তার ছেলে মুজিব আর আমি একই ক্লাসে পড়ি; তারাও বাসা নিয়েছিলেন ওয়াটগঞ্জ স্ট্রিটের কাছেই। ওয়াটগঞ্জ থানার ওসি থাকতেন থানা-ভবনের দোতলায়; তিনিও আমাদের বিক্রমপুরেরই লোক, আব্বার চেনা। সম্পর্কে আব্বার ভাগ্নে দন্ত্যচিকিৎসক ডা. সারোয়ার; তার সার্জারি তখন খিদিরপুর এলাকাতেই। সার্জারিতে রোগীর কোনো অভাব ঘটত না। এদেরই এক ভাই এসপ্ল্যানেড এলাকায় টেইলরিং শপ খুলেছেন; নিজে তিনি মাপজোক নিয়ে কাপড়ে নকশা করে দেন, কাপড় কাটা, সেলাই করা ইত্যাদি কাজ করেন অন্য কারিগররা। তাকে দেখা যায় জ্যাকেট ও প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় দোকানের সামনের এক টেবিলের অপর পাশে দাঁড়িয়ে কাপড়ের ওপর মার্কার দিয়ে নকশা এঁকে দিচ্ছেন, অঙ্কন শিল্পীর মতো করে। তার দোকানের নাম স্টাইল ক্র্যাফট। গ্রাহকরা সবাই উচ্চবিত্ত। আমার মায়ের নিকটাত্মীয়দের একটি পরিবার থাকেন কলিন্স স্ট্রিটের কাছে মার্কুইস লেনে; উত্তরাধিকার সূত্রে ওটি তাদের বসতবাড়ি। এতসব আত্মীয়দের সঙ্গে গ্রামে বা রাজশাহীতে দেখাসাক্ষাৎ হওয়া সম্ভব ছিল না; কলকাতা আমাদের জন্য অসম্ভবকে সম্ভব করে দিয়েছিল। মোটকথা, কলকাতা যেমন হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের, তেমনি আমরা যারা পূর্ববঙ্গীয় তাদেরও। নোয়াখালীর বেশ কিছু লোক থাকতেন খিদিরপুরে। তারা জাহাজ কোম্পানির কর্মী ছিলেন। পথেঘাটে, দোকানপাটে এদের উপস্থিতি টের পাওয়া যেত। বাঙাল ঘটির পৃথকীকরণটা তখন আর কার্যকর নয়।
বড় বাসা ছেড়ে ছোট একটিতে বসবাস শুরু করে আমার মা প্রথমে কিছুটা অসন্তুষ্টই ছিলেন। কিন্তু আত্মীয়স্বজনের আনাগোনায় অচিরেই তিনি সন্তোষ প্রকাশ করছেন, দেখা গেল। পাশেই থাকতেন হাজি সাহেবের পরিবার। বাড়িটা ছিল ওয়াক্ফ সম্পত্তি, হাজি সাহেব দেখাশোনা করতেন। ওরা ছিলেন কলকাতাওয়ালা, কিন্তু ওই পরিবারের সঙ্গেও আমার মায়ের আসা-যাওয়ার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
আর বাড়ির দোতলায় যে দুটি পরিবার থাকত তারা তো কাছের মানুষেই পরিণত হয়েছিলেন। নরসিংদীর যিনি, দুই ভাইয়ের বড়জন, তিনি আব্বার সহকর্মীও ছিলেন, অফিসে। বস্তুত তারা দুজনে মিলেই বাড়িটা খুঁজে বের করেছিলেন। দেশভাগের পরে ঢাকায় এসে দুই পরিবারে যোগাযোগ ছিল। তৃতীয় পরিবারটির সঙ্গে যে আমার মায়ের সখ্য ছিল তার সাক্ষ্য পাওয়া গিয়েছিল অনেক বছর পরের এক ঘটনায়। তা দশ-বারো বছর আগের ব্যাপার হবে। টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে আমাকে দেখে তিন নম্বর পরিবারের একসময়ের-প্রধান মহিলার কেন জানি মনে হয়েছিল আমাকে তিনি আমার বালককালে দেখছেন। তার মেয়েকে তিনি বলেছিলেন খোঁজ করতে যে আমরা এক সময়ে খিদিরপুরে থাকতাম কি না। মেয়ের স্বামী ছিলেন খ্যাতনামা চারুশিল্পী, আমার পরিচিত; মহিলার পক্ষে আমাকে খুঁজে বের করা তাই কঠিন হয়নি। কথাটা আমার মাকে জানানোয় তিনি উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন দেখা করতে। কিন্তু তখন নিজে তিনি অসুস্থ, আর যিনি দেখা করতে চেয়েছিলেন সেই পূর্বপরিচিতাও চলাফেরা করতে পারেন না, তাই দেখা হয়নি। এর অল্প কয়েকদিন পরেই অবশ্য আমার মা মারা যান। তখনকার দিনে সম্পর্কগুলো ছিল এরকমেরই। উল্লেখ্য যে, কলকাতায় আমাদের বসবাস ছিল মাত্র সাত মাসের।
আব্বা তো মিশনারিদের স্কুলকেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে ধারণা করতেন। রাজশাহীতে পাননি; কলকাতায় এসে পেয়ে গেলেন। তাই সেখানেই আমাকে ও আমার মেজো ভাইকে দিলেন ভর্তি করে। আমাকে ক্লাস এইটে, মেজো ভাইকে ক্লাস সিক্সে। স্কুলের নাম সেন্ট বার্নাবাস হাই স্কুল। পুরোনো স্কুল, এখনো আছে; সেবার যখন কলকাতায় যাই, ঘুরে দেখে এসেছি। স্কুলের দালানকোঠায় কোনো উন্নতি দেখলাম না। বরং আগের তুলনায় কিছুটা যেন ম্রিয়মাণ। কারণ ওই একই; বাঙালিপাড়ায় অবস্থান। এপাশে খিদিরপুর, ওপারে টালিগঞ্জ। আমাদের সময়ে বালিগঞ্জ থেকেও ছাত্র আসত, এখন মনে হয় আসে না। হেড মাস্টারের সঙ্গে কথা হলো। তিনি পুরোপুরি বাংলাভাষী। ক্যাথলিক মিশনারিদের স্কুল। আমাদের সময়ে রাজশাহীতে যেমন ছিল, কলকাতার স্কুলেও তেমনি, অধিকাংশ ছাত্রই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। শিক্ষকদের মধ্যে মুসলমান সম্প্রদায়ের কেউ ছিলেন বলে মনে হয় না। হেড মাস্টার ছিলেন জাঁদরেল, তবে গোষ্ঠবিহারী মজুমদারের মতো স্থির নন; বেশ চঞ্চল। বাঙালিই, কিন্তু কথা বলতেন ইংরেজিতে। খ্রিষ্টান মিশনারিদের পোশাক পরতেন। পাঠ্যসূচি সব স্কুলে ছিল একই রকমের। সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ডের মনোনীত পাঠ্যবই-ই পড়তে হতো, যেমন পড়তাম রাজশাহীতে। তবে নতুন স্কুলে ঐচ্ছিক বিষয়ের মধ্যে ছিল বাইবেল-পাঠ।
চলবে...