কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বৈদ্যের বাজারের পল্লব চন্দ্র রায়। তিনি প্রথমবারের মতো কার্প মাছের সঙ্গে গলদা চিংড়ি চাষ শুরু করেছেন। এটি এক নতুন উদ্যোগ। এই মিশ্র চাষে তিনি সফলতা পেয়েছেন। এতে স্থানীয় চাষিরাও চিংড়ি চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
চাষিরা জানাচ্ছেন, গলদা চিংড়ি চাষে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সহায়তা পেলে, কুড়িগ্রামের অর্থনীতি পরিবর্তন হতে পারে। স্থানীয়রা মনে করছেন, চিংড়ি চাষে জেলার কৃষকদের আয় বাড়বে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পল্লব চন্দ্র রায় ৪০ শতকের পুকুরে কার্প মাছের সঙ্গে গলদা চিংড়ি চাষ করছেন। তিনি জানান, প্রায় সাত মাস আগে ছোট আকারের ৬০০ পোনা গলদা চিংড়ি ছেড়েছিলেন। এখন চিংড়ির আকার বড় হয়েছে। ৮ থেকে ১০টি গলদা চিংড়ি এক কেজি হয়ে যাচ্ছে।
মৎস্যচাষি পল্লব চন্দ্র রায় বলেন, ‘গলদা চিংড়ি বর্তমানে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। এই মাছের দাম অনেক বেশি। তবে কার্প মাছের তুলনায় চিংড়ির দাম চারগুণ বেশি।’ পুকুরে চাষের ফলে খরচ কমে যায়। মাছের দামও সস্তা হয়। এতে সবাই চিংড়ি মাছ খেতে পারেন।
জেলার রাজারহাট ও সদর উপজেলায় বেসরকারি সংস্থা আরডিআরএস বাংলাদেশ এই প্রকল্পে সহায়তা করছে। তারা ১০ চাষিকে ৪ একর পুকুরে ৬ হাজার পোনা গলদা চিংড়ি ছেড়েছে। সংস্থাটি বলছে, এ অঞ্চলের পরিবেশ গলদা চিংড়ি চাষের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। এতে চাষিরা লাভবান হতে পারেন। উচ্চ মূল্যের মাছ স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বাইরে রপ্তানি করা সম্ভব।
চাষিরা আরও জানান, গলদা চিংড়ি চাষের খরচ কমানোর জন্য মাছের খাবারসহ পুকুর প্রস্তুতিতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। সময়মতো খাবার দেওয়া এবং সঠিক পরিচর্যা করার ফলে মাছের ওজন ভালো হয়েছে। এতে চাষিরা এক পুকুর থেকে লাখ টাকা আয় করতে পারবেন। কার্প মাছও বিক্রি করলে আরও লক্ষাধিক টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
মৎস্য সংশ্লিষ্টরা বলেন, কুড়িগ্রামে গলদা চিংড়ি চাষে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চাষিরা এখনো পূর্ণ মনোযোগ দেননি। কিন্তু গলদা চিংড়ি চাষের সফলতা দেখে চাষিরা এতে আগ্রহী হচ্ছেন। খরচ কম হলে তারা আরও বেশি চিংড়ি চাষ করবেন।
স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, গলদা চিংড়ি মাছ সুস্বাদু। বাজারে এটি বড়লোকের মাছ হিসেবে পরিচিত। তবে বাজারে চাষ শুরু হলে মাছের জোগান বাড়বে। এটি সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসবে।
বেসরকারি সংস্থা পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন ও আরডিআরএস বাংলাদেশের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো এই মিশ্র চাষের প্রকল্প চালু হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মাছের খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। এতে উৎপাদন খরচ কমে যাবে।
গলদা চিংড়ি চাষের মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। বিশেষ করে কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলে এই চাষের ফলে অর্থনীতি নতুন মাত্রা পেতে পারে। রপ্তানি করলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও সম্ভব হবে।
মৎস্যচাষিরা জানিয়েছেন, প্রথমে তারা দেশীয় মাছের সঙ্গে গলদা চিংড়ি চাষের বিষয়টি জানতেন না। তবে পল্লব চন্দ্র রায়ের পুকুরে চিংড়ি চাষ দেখে তারা অবাক হয়েছেন। আগামীতে নিজেদের পুকুরে চিংড়ি চাষ করার কথা ভাবছেন। মৎস্যচাষি স্বপ্না রাণী বলেন, ‘যদি সহায়তা পাই, আমরাও চিংড়ি চাষ করবো। গ্রামের আরও অনেক পুকুরে চিংড়ি চাষ হবে।’
আরডিআরএস বাংলাদেশের টেকনিক্যাল অফিসার মোজাম্মেল হক বলেন, ‘জেলায় কার্প মাছের সঙ্গে গলদা চিংড়ির মিশ্র চাষের জন্য আদর্শ পরিবেশ রয়েছে। এটা লাভজনক। এই নিয়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।’
জেলা মৎস্য অধিদপ্তর জানায়, কুড়িগ্রামে ২৬ হাজারের বেশি পুকুর রয়েছে। প্রায় ২১ হাজার মৎস্যচাষি আছেন। গলদা চিংড়ি চাষ এবারই প্রথম। তবে এর সম্ভাবনা অনেক। রাজারহাট উপজেলা মৎস্য অফিসার এমদাদুল হক বলেন, ‘চাষিদের উদ্বুদ্ধ করতে সরকারিভাবে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’