আমাদের দেশে ই-বাইকের ব্যবহার খুব একটা দেখা না গেলেও, উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে প্রতিনিয়ত এর ব্যবহার বাড়ছে। ই-বাইক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত নতুন নতুন মডেল নিয়ে আসছে। এখানে ১ হাজার ৮৯৯ থেকে ৪ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের চারটি নতুন মডেল তুলে ধরা হলো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। তবে উচ্চ দাম সব সময় মানের নিশ্চয়তা দেয় না।
ফোর্ড মুস্ট্যাং ই-বাইক
১৯৬৪ সাল থেকে আইকনিক গাড়ি হিসেবে পরিচিত মুস্ট্যাংয়ের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মতো অনেক গাড়ি প্রস্তুতকারক এখন ই-বাইক উৎপাদনে নামছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা কাজটি অন্য প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করায়। ফোর্ড তৈরি করেছে N+ বাইক, যা শুধু ফোর্ড ডিলারশিপে তিনটি ভিন্ন আকারে পাওয়া যায়।
মুস্ট্যাং ই-বাইকটি ফোর্ডের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তৈরি হয়েছে। এটি কিছুটা পুরোনো ধাঁচের, অনেকটা আগের দিনের মোটরসাইকেলের মতো। বেশির ভাগ তার গাড়ির কাঠামোর ভেতরে লুকানো থাকায় বাইকটি দেখতে বেশ পরিচ্ছন্ন মনে হয়। তবে অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমের বাইকটি ৬৮ পাউন্ড ওজনের হওয়ায় বেশ ভারী। এ ছাড়া এতে কোনো কিকস্ট্যান্ড নেই, ফলে এটি পার্ক করাও বেশ ঝামেলা সৃষ্টি করে। উঁচু টপ টিউবের কারণে ওঠানামা করতেও কিছুটা অসুবিধা হয়।
রাইডারের জন্য রয়েছে আকর্ষণীয় ফুল-কালার এলসিডি স্ক্রিন, যা মুস্ট্যাং গাড়ির স্পিডোমিটারের মতো দেখতে। তবে চলন্ত অবস্থায় ডিজিটাল সংখ্যাগুলো পড়তে কিছুটা অসুবিধা হতে পারে। এ ছাড়া রয়েছে লাল স্টার্টার বাটন, যদিও এটি তেমন কোনো কাজে দেয় না।
সামনের ও পেছনের এয়ার-স্প্রিং সাসপেনশনের কারণে শহরের রাস্তায় চলাচলের অভিজ্ঞতা বেশ ভালো। এতে রয়েছে ৭৫০ ওয়াটের হাব মোটর, ফলে এটি ২৮ মাইল প্রতি ঘণ্টায় ক্লাস ৩ গতিতে চলতে পারে। থ্রটল ছাড়া এটি ২০ মাইল প্রতি ঘণ্টায় ক্লাস ২ গতিতে চলতে পারে। ব্যাটারি চার্জ হতে সময় লাগে সাড়ে তিন ঘণ্টা।
উল্লেখযোগ্য ফিচারের মধ্যে রয়েছে টেকট্রো ফোর-পিস্টন হাইড্রোলিক ব্রেক, পিরেলি অ্যাঞ্জেল জিটি সেমি-স্লিক টায়ার, রানিং লাইট ও ইনটিগ্রেটেড রিয়ার লাইট। এতে রয়েছে শিমানোর ৯-স্পিড গিয়ার। এ ছাড়া রয়েছে ইকো, নরমাল, স্পোর্ট ও ট্র্যাক মোড। স্পোর্ট মোড থ্রি-লেভেল প্যাডেল অ্যাসিস্টের মতো অনুভূতি দেবে, যা চালানোর সময় সবচেয়ে ভালো অভিজ্ঞতা দেয়। ইকো মোডে সর্বোচ্চ পথ পাড়ি দেওয়া যাবে, যা ৬০ মাইল পর্যন্ত হতে পারে।
দাম বেশ বেশি, অতিরিক্ত ওজন ও কিকস্ট্যান্ডের অনুপস্থিতি কিছুটা অসুবিধার কারণ হতে পারে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ই-বাইক বাজারে ফোর্ড ডিজাইনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, কার্যকারিতার দিকে যথেষ্ট মনোযোগের অভাব রয়েছে।
ভিভোল্ট আলফা টু
ফোর্ড মুস্ট্যাংয়ের তুলনায় ভিভোল্ট আলফা টু সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ই-বাইক। অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমের এই ই-বাইক সস্তা, সুন্দর, হালকা ও বেশ সাদামাটা ডিজাইনের। এটির ব্যাটারি ছোট হওয়ায় ওজন মাত্র ৪৫ পাউন্ড। এতে কোনো গিয়ার শিফটও নেই, কারণ এটি একটি সিঙ্গেল-স্পিড ই-বাইক।
বাইকটিতে কোনো টার্ন সিগন্যাল নেই। এটি শুধু দুটি রঙে পাওয়া যায়, এগুলো হলো রিফ অরেঞ্জ ও ব্ল্যাক পার্ল। এতে কোনো উন্নত সাসপেনশনও নেই, স্ক্রিনটি ছোট ও সাদাকালো। তবে এতে শিমানো হাইড্রোলিক ডিস্ক ব্রেক রয়েছে, যদিও থাম্ব থ্রটল খুব একটা কার্যকর নয়।
রিফ অরেঞ্জ রঙের বাইকটি ৩৫০ ওয়াট মোটরসহ বাজারে এসেছে। এটি গেটস কার্বন বেল্ট ড্রাইভের মাধ্যমে চলতে অত্যন্ত মসৃণ অনুভূতি দেয়। লেভেল তিন প্যাডেল অ্যাসিস্টে ছোট মোটরের সত্ত্বেও পাহাড়ি পথ সহজে পাড়ি দেওয়া যায়।
এতে মাল্টিপল স্পিড না থাকায় ‘ঘোস্ট পেডেলিংয়ের’ কিছু সমস্যা হয়। তবে সামনে বড় চেইন রিং যোগ করলে সম্ভবত সেই প্রভাব কমতে পারে। তবে এটি কোনো বড় সমস্যা নয়।
তবে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো ছোট ব্যাটারির কার্যক্ষমতা। ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় মাত্র ১০ মাইল রেঞ্জ পাওয়া যায়। এ জন্য প্রতি দুইবার চালানোর পরেই এটি রিচার্জ করতে হয়। স্ট্যান্ডার্ড ৩৭৪ ওয়াট-আওয়ারের ব্যাটারি গ্রীষ্মকালে ২৫ থেকে ৪০ মাইল রেঞ্জ দিতে পারে। তবে ৪৯০ ওয়াট-আওয়ারের রেঞ্জার ব্যাটারি ব্যবহার করলে ৬০ মাইল রেঞ্জ পাওয়া যাবে। বিশেষ অফারে এটি ফ্রি দেওয়া হলেও, আলাদাভাবে কিনতে হলে ৩৯৯ ডলার খরচ করতে হবে। সামগ্রিকভাবে ভিভোল্ট চালাতে বেশ আরামদায়ক। স্বনামধন্য ব্রিটিশ গাড়ি নির্মাতা লোটাসের প্রতিষ্ঠাতা কলিন চ্যাপম্যানের মতে, ওজন ই-বাইকের সবচেয়ে বড় সমস্যা, আর ভিভোল্টের ছোট মোটর থাকলেও অতিরিক্ত ওজন বহন করতে হয় না।
লেকট্রিক এক্সপেডিশন ২.০
লেকট্রিক ব্র্যান্ডের ই-বাইক বাজারে বেশ জনপ্রিয়, বিশেষ করে এটি দাম কম ও খুব মজবুত। এই ব্র্যান্ডের ই-বাইক একক ও ডুয়াল ব্যাটারি সংস্করণে পাওয়া যায়। ডুয়াল ব্যাটারি সংস্করণের দাম ৪০০ থেকে ৬০০ ডলার বেশি হয়।
নানা আনুষঙ্গিকসহ লেকট্রিকের রেইনড্রপ ব্লু রঙের বাইকটি দুজন যাত্রী বহন করতে পারে। এতে আলাদা সিট রয়েছে। এ ছাড়া এটি মালবাহী বাইক হিসেবেও ভালো কাজ করে। এতে এক সপ্তাহের বাজার অনায়াসে বহন করা যায়।
একক রাইডারদের জন্যও এটি কার্যকর। ১ হাজার ৩১০ ওয়াটের পিক পেডেল-অ্যাসিস্ট মোটর পাহাড়ি বা সমতল পথেও শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেয়। এতে সামনের সাসপেনশন, ব্রেক লাইট ও টার্ন সিগন্যাল রয়েছে। স্ক্রিনটিও বেশ সুন্দর।
ক্লাস ৩ ক্যাটাগরির এই বাইক প্রতি ঘণ্টায় ২৮ মাইল গতিতে চলতে পারে। একক ব্যাটারিতে সর্বোচ্চ ৬০ মাইল এবং ডুয়াল ব্যাটারি সংস্করণের ১২০ মাইল রেঞ্জ পাওয়া যায়।
পেডেগো মটো
ই-বাইকের বাজারে নিত্যনতুন মডেলের আনাগোনা থাকলেও, পেডেগো মটো একেবারে ব্যতিক্রম। এটি সহজে সংযোজন করা যায়, যা ব্যবহারকারীদের জন্য স্বস্তিদায়ক। বাইকটির ডিজাইন রেট্রো-ফিউচারিস্টিক মোটরসাইকেল বা মোপেডের মতো, যা দেখতে বেশ আকর্ষণীয়।
এটির নিচু বেঞ্চ আসনটি সামঞ্জস্য করা যায় না। তবে ছয় ফুট উচ্চতার চালকও আরামের সঙ্গে বসতে পারেন। এটি মূলত ক্লাস ২ ই-বাইক, যা প্রতি ঘণ্টায় ২০ মাইল গতিতে চলতে পারে। তবে সেটিংস পরিবর্তন করে ক্লাস ৩-এ রূপান্তর করা যায়, এরপর এটি প্রতি ঘণ্টায় ২৮ মাইল গতিতে চলতে পারে।
৪৮ ভোল্টের ১৯.২ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ার ব্যাটারির সাহায্যে বাইকটি ৭৫ মাইল পর্যন্ত চলতে পারে। গতি কমিয়ে চালালে এই রেঞ্জ আরও ভালো পাওয়া যায়। তবে থ্রটল ব্যবহারের ফলে রেঞ্জ কিছুটা কমে যায়। এতে রয়েছে ৭৫০ ওয়াটের শক্তিশালী মোটর, যা দ্রুত গতিতে চলার সক্ষমতা দেয়। সামনে ও পেছনে সাসপেনশন থাকায় আরামদায়ক অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। এ ছাড়া প্রশস্ত আসনও বাড়তি সুবিধা যোগ করে।
এতে রয়েছে ব্রেক লাইট। উজ্জ্বল রঙের এলসিডি স্ক্রিনে তথ্য সহজে পড়া যায়। এটি ১০-স্পিড ড্রাইভট্রেন থাকলেও ই-বাইকের টর্ক বেশি হওয়ায় গিয়ার বদলানোর প্রয়োজনীয়তা তুলনামূলক কম হয়।
তবে বাইকটির ওজন ৮৯ পাউন্ড, যা বহন করা কঠিন হতে পারে। তবে কিকস্ট্যান্ডের সাহায্যে দাঁড় করানো যায়। দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য বেশ ভালো ও আরোহী নিয়ে সহজে চালানো যায়।