মানুষের মনের গহিন কোণ আর মহাবিশ্বের বিশালতা যখন এক বিন্দুতে মেশে, তখন জন্ম নেয় সার্থক সাহিত্য। সমকালীন পাঠকদের পছন্দের তালিকায় এখন কেবল নিছক গল্প নয়, বরং স্থান করে নিচ্ছে মানবিক জীবনবোধ, মনস্তত্ত্ব ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতো সিরিয়াস সব বিষয়। এর সঙ্গে চিরায়ত প্রেমের কবিতা তো আছেই। জীবনের জটিল সমীকরণ আর মহাজাগতিক বিস্ময়কে যারা শব্দে খুঁজে পেতে চান, তাদের জন্য সৃজনশীল প্রকাশনার বিচিত্র সম্ভার রয়েছে এবারের বইমেলায়।
প্রয়াত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ছোটগল্পের পাঠক নেহায়েত কম নয়। গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে বইমেলায় এসেছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাতেমা তুজ জোহরা। সিলেটের একটি বেসরকারি পাঠাগারের নিয়মিত এই সদস্য তিনি। মেলায় এসে প্রথমেই ঢুঁ দেন পাঠক সমাবেশের স্টলে। প্রথমেই হাতে তুলে নেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মনোগ্রাহী ছোটগল্প সংকলন ‘অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প’। বইটির ফ্ল্যাপে বলা হয়েছে, এই গ্রন্থের গল্পগুলো জীবনের আলো-অন্ধকারের দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেছে। গল্পগুলোতে সমাজের নির্যাতন, প্রেমের জটিলতা, রহস্য, স্বপ্ন ও বাস্তবের মিশ্রণ দেখা যাবে। বই পরিচিতি পেয়ে ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, ‘স্যারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়নি কখনো। বেশ কয়েকটি সাহিত্যসভায় স্যারের লেকচার শুনেছিলাম। এরপর থেকে স্যারের লেখা পড়তে শুরু করেছি। তার গল্পগুলো জীবনের অন্য এক মানে হাজির করেছে।’
অনন্যা এনেছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাস ‘এক্সোপ্ল্যানেট’। বইটি তরুণ পাঠককে নিয়ে যায় রহস্যময় গ্রহগুলোর এক বিস্ময়কর জগতে। কোনো গ্রহ শান্ত, কোমল জলময়। কিছু গ্রহ বায়ুমণ্ডলহীন, অতি উত্তপ্ত পাথুরে সে গ্রহ নরকের মতো জ্বলে উঠছে। এমন গ্রহের কথাও আছে, যা একাধিক নক্ষত্রকে ঘিরে ঘূর্ণায়মান, আবার কিছু গ্রহ নিঃসঙ্গভাবে মহাশূন্যে ঘুরছে।
মহাবিশ্বের বিস্ময়কর বৈচিত্র্য নিয়ে রচিত বইটি নিয়ে বইমেলায় আসা কিশোর ও তরুণ পাঠকদের মধ্যে এক অভিনব উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। শুক্রবার সকালে বইটির জন্য অনন্যার স্টলে ভিড় জমে। অনেকে হাতে বই নিয়ে মহাকাশের রহস্যময় জগতে প্রবেশের আগ্রহ প্রকাশ করছিল। আজিমপুর থেকে আসা নাজিফা আনজুম রাইসা বলেন, ‘এই বই পড়ে মনে হচ্ছে, আমরা সত্যিই এক্সোপ্ল্যানেটগুলোর মধ্যে ভ্রমণ করছি। বিশাল গ্যাসীয় গ্রহ, নিঃসঙ্গ পাথরের গ্রহ–সবকিছুই এত জীবন্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে কল্পনার খোরাক মিলছে।’
ছুটির দিনের দুপুরে বিদ্যাপ্রকাশের স্টলে এসেছিলেন কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল। এ প্রকাশনী থেকে তার লেখা ‘হৃৎপিণ্ডে অশরীরী রক্তস্রোত’–উপন্যাসটি বের হয়েছে। মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি ল্যাবের বাস্তব পরিবেশকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই উপন্যাসে বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব ও অজানা অতিপ্রাকৃত শক্তির এক টানটান থ্রিলারধর্মী কাহিনি গড়ে উঠেছে।
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে এসেছে দীপু মাহমুদের শিশুতোষ গল্প সংকলন ‘শিশুদের মায়ার রাজ্যে ভ্রমণ’। গল্পগুলো খুদে পাঠককে নিয়ে যাবে এক অদ্ভুত জগতে; যেখানে গল্পগুলোতে মিলেমিশে আছে প্রকৃতি, প্রাণী এবং মানবিক ভালোবাসা।
এই প্রকাশনী থেকে এসেছে কিযী তাহনিনের গল্পের বই ‘মসলার কৌটা’। গল্পের নায়ক মাখন; সূচনাতেই উঠে আসে তার বোকা চোখের নিরবী ভঙ্গিমা। বইয়ের রূপকধর্মী ভাষা পাঠককে নিয়ে যায় দূরের এক মফস্বলে যেখানে প্রতিটি চরিত্র অনুভূতি, ব্যথা এবং ভালোবাসা বাস্তবতার মধ্যে ভাসতে থাকে।
এ বছর বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত ইসরাইল খানের গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘সাময়িকপত্রে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক’ বইমেলায় এনেছে ইউপিএল। এই গ্রন্থ ১৯০১ থেকে ১৯৪৭ সালের বাংলা অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে। বইটি কেবল রাজনৈতিক ইতিহাসকে আলোকপাত করে না, বরং সেই সময়ের হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক, জমিদারি প্রথা, শিক্ষার অগ্রগতি এবং মধ্যবিত্তের উত্থানসহ সমাজের বহুমাত্রিক পরিবর্তনগুলোকে সাহিত্য ও চিন্তাধারার সঙ্গে সংযুক্ত করে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছে।
বইমেলায় খবরের কাগজের স্টলে এসেছে কণ্ঠধ্বনি প্রকাশনীর গবেষণাধর্মী বই ‘কুষ্টিয়ার মৃৎশিল্প’। ড. মুহম্মদ এমদাদ হাসনায়েন ও ড. সারিয়া সুলতানার এই বইটি পাঠককে এক নিখুঁত ভ্রমণে নিয়ে যায়, যেখানে মাটি আর মানুষের অমোঘ সম্পর্ক ফুটে উঠেছে। বইটি শুধু মৃৎশিল্পের কারিগরি তথ্য প্রদান করে না, বরং শিল্পের সঙ্গে মানুষের ঐতিহ্য, শ্রম এবং আবেগের অন্তরঙ্গ সংযোগকে তুলে ধরে।
অন্যধারা থেকে এসেছে এ সময়ের জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইনের ‘নীলকণ্ঠী’ উপন্যাসটি। এই উপন্যাস মানুষের যুক্তি আর আবেগের চিরন্তন দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছে। চরিত্রগুলো বলছে, বিজ্ঞান যেখানে ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’-র উত্তর দিতে বদ্ধপরিকর, প্রেম সেখানে সবসময়ই এক অবাধ্য ব্যাকরণহীন অনুভূতি।
নালন্দার স্টলে কথা হচ্ছিল কবি রাসেল আসাদের সঙ্গে। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘অনুসূর্যের উত্তাপ’ এনেছে এই প্রকাশনী। কবি রাসেল জানান, তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবি ও শ্মশান’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। এরপর তিনি নিয়মিত কবিতা লিখলেও কাব্যগ্রন্থ আর প্রকাশ করা হয়নি। তিনি জানান, ‘অনুসূর্যের উত্তাপ’ কাব্যগ্রন্থটি নারী মুক্তি, মানবিক প্রেম এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি গভীর ভাবনা ও আহ্বান তুলে ধরেছে।
অনন্যা থেকে এসেছে তৌহিদুর রহমানের কাব্যগ্রন্থ ‘কী মায়ায় বেঁধেছো আমায়’। একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি কুড়িগ্রামের মধুপুরে ‘তৌহিদুর রহমান সাহিত্য পরিষদ’ পরিচালনা করেন তিনি। কবিতার পাশাপাশি তিনি লেখেন ছোটগল্প। শুক্রবার বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লেকপাড়ে কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে কবির বন্ধুরা মেতেছিলেন আড্ডায়।
বইমেলার নানা আয়োজন
গতকাল শুক্রবার ছিল অমর একুশে বইমেলার নবম দিন। এদিন বেলা ১১টায় খুলে যায় মেলার দুয়ার। বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত ছিল শিশুপ্রহর। গতকাল সকালে বাংলা একাডেমির সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সভাগৃহে অমর একুশে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরে বিকেলে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘জন্মশতবর্ষ: কলিম শরাফী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অনিমা রায়; আলোচনায় অংশ নেন সাইম রানা। সভাপতিত্ব করেন সাধন ঘোষ। ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন মৃদুল মাহবুব ও এহসান মাহমুদ।
আজ শনিবার মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। আজ একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শিশুকিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘জন্মশতবর্ষ: নূরজাহান বেগম’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন গবেষক ইসরাইল খান। আলোচনায় অংশ নেবেন কবি সোহরাব হাসান।