নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এ বছরের বইমেলা শুরু হয়েছে কিছুটা কম সময় নিয়ে। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভেঙে বিলম্বে শুরু হওয়া এই আয়োজন রমজানের আবহে যেন পূর্ণতা খুঁজে পাচ্ছে না। মেলার প্রাঙ্গণে সেই চিরচেনা উচ্ছ্বাস নেই, নেই মানুষের ঢল, নেই বইপ্রেমী পাঠকদের প্রাণবন্ত আড্ডা। পাঠক ও দর্শনার্থীর উপস্থিতি তুলনামূলক কম; ফলে প্রকাশকরাও পড়েছেন আর্থিক সংকটে। সব মিলিয়ে এবারের বইমেলার আবহে যেন এক ধরনের নীরব বিষাদের ছায়া লেগে আছে।
এই মেলার মূল ভিত্তি একুশের অমলিন চেতনা। ভাষাশহিদদের রক্তে রাঙানো সেই ইতিহাসের আবেগ, সেই আত্মত্যাগের দীপ্তি ঘিরেই গড়ে উঠেছে এই বইমেলা। তাই নির্ধারিত ফেব্রুয়ারির সময় থেকে সরে গেলে সেই আবেগ, সেই ঐতিহ্যের দীপ্ত আলো কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে পড়ে। তবে অনেক প্রকাশকের মতে যদি ঈদের পরে বইমেলা আয়োজন করা যেত, তাহলে পহেলা বৈশাখের উৎসবমুখর আবহে হয়তো বইমেলা অন্যরকম প্রাণ বা মাত্রা পেত।
পাঠক ও প্রকাশকদের মতো লেখকরাও সারা বছর ধরে অপেক্ষা করেন এই মেলার জন্য। বইমেলাকে সামনে রেখে তারা বছরের পর বছর শ্রম দেন, ভাবেন, লেখেন, মনের ভেতর জমে থাকা গল্প, স্মৃতি ও অনুভূতির রঙে রঙিন করেন শব্দের ক্যানভাস। কিন্তু এবারের অনিশ্চয়তার আবহে অনেক প্রকাশকের মধ্যেই দেখা গেছে নতুন বই প্রকাশে অনাগ্রহ, যা স্বভাবতই লেখকদের মনোজগতে এক ধরনের নিরুৎসাহ তৈরি করে। কারণ লেখা শুধু সৃষ্টি করলেই পূর্ণতা পায় না, বরং তা পাঠকের কাছে পৌঁছানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বইমেলা কেবল বই কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক উৎসব, আত্মপরিচয়ের উৎসব। এখানে কেউ আসে বই কিনতে, কেউ আসে প্রিয় লেখকের সঙ্গে দেখা করতে, আবার কেউবা আসে একুশের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে এই মহৎ আয়োজনে অংশ নিতে।
আমি কবিতা, শিশুসাহিত্য ও প্রবন্ধ লিখলেও আমার মূল সাধনা কথাসাহিত্যে। কারণ কথাসাহিত্য মানুষের জীবনের বহুমাত্রিক রূপকে সবচেয়ে গভীরভাবে ধারণ করতে পারে। মানুষের হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, দেশপ্রেম, স্বপ্ন ও সংগ্রাম সবকিছুই এখানে জায়গা পায়। কখনো তা মৃদু আবেগে ভাসিয়ে নেয়, কখনো আবার গভীর মানবিক বোধের স্পর্শে পাঠকের হৃদয়কে আলোড়িত করে। সেই কারণে কথাসাহিত্য আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে এবং আমি নিজেকে কথাসাহিত্যিক পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।
ছোটবেলা থেকেই নানান সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠা আমার। সেই সময়েই পাঠ্যপুস্তকের বাইরের বইয়ের জগৎ আমাকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে। গল্প, উপন্যাস, কবিতা যা পেয়েছি তাই পড়েছি গভীর আগ্রহে। সেই পাঠ, সেই অভিজ্ঞতা আর জীবনের নানা রঙের সঙ্গে মিশে আমার ভেতরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের বোধ। সেই বোধই আমাকে ধীরে ধীরে কথাসাহিত্যের পথে নিয়ে এসেছে।
এবারের বইমেলায় ঝুমঝুমি প্রকাশন থেকে আমার কিশোর উপন্যাস ‘দক্ষিণমুখী ঘর’ প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া আমার গানের জীবনের নানা স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা স্মৃতিগল্পের বই ‘আমার গানের মৌমাছিরা’ প্রকাশ করেছে জাগৃতি প্রকাশনা সংস্থা। পাশাপাশি পাঞ্জেরী পাবলিকেন্স থেকে প্রকাশিত হচ্ছে আমার সম্পাদিত গ্রন্থ ‘একাত্তরের দুর্নিবার নারী মুক্তিযোদ্ধা ও দুঃসহ স্মৃতি’, যেখানে মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবিস্মরণীয় সাহস ও ত্যাগের গল্প উঠে এসেছে।
পাঠকদের কাছে আমার আন্তরিক আহ্বান–সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে বইমেলায় আসুন, বই কিনুন; বইকে জীবনের অংশ করে তুলুন। ছোট শিশুর হাতে খেলনা হিসেবে একটি বই তুলে দিন। সে হয়তো প্রথমে সেটি দিয়ে খেলবে, উল্টেপাল্টে দেখবে, রঙিন ছবির দিকে তাকিয়ে হাসবে। কিন্তু অজান্তেই তার সঙ্গে তৈরি হবে বইয়ের এক গভীর বন্ধুত্ব। খেলতে খেলতেই সে বইকে চিনবে, বইকে ভালোবাসবে, আর একসময় বইই হয়ে উঠবে তার জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কবি।
অনুলিখন: মুসতাক মুকুল।