এবারের একুশে বইমেলা শুরু থেকেই একধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে চলেছে। যে সময়ে কর্তৃপক্ষ বইমেলার আয়োজন করল, তাতে জেনেশুনে বিষ করেছি পানের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হবেন- এটা জেনেও প্রকাশকরা মেলায় অংশ নিলেন শুধু একুশের চেতনা ও ধারাবাহিকতাকে রক্ষার দায়বোধ থেকে। আগের সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও বাংলা একাডেমি যদি অন্যদের মতামতকে মূল্য দিয়ে নির্ধারিত সময়ে বইমেলা করতেন, তাহলে সেটি হতো সর্বজনগ্রাহ্য, নির্ভার ও নির্মল এক সাংস্কৃতিক উৎসব।
এবারের মেলায় পাঠকের উপস্থিতি কম, বিক্রিও তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। প্রকাশকরা অর্থনৈতিকভাবে বিরাট একটি ধাক্কা খেলেন। অনেকের পক্ষে হয়তো ঘুরে দাঁড়ানোই খুব কষ্টকর হবে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। সরকারি উদ্যোগে ভালো বই কেনা, স্কুল-কলেজে বই পড়াকে উৎসাহিত করা, পাঠাগারগুলোর কার্যক্রমকে গতিশীল করা এবং জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও নিয়মিত বইমেলার আয়োজন করা হলে বই পড়ার সংস্কৃতি নতুন করে প্রাণ পেতে পারে।
রয়্যালটি নিয়ে মাঝে মাঝে কিছু অভিযোগ শোনা যায়। তবে বাস্তবে এর বেশির ভাগই ভ্রান্ত ধারণা বা ভুল-বোঝাবুঝি থেকে তৈরি। অনেক সময় যেসব বই খুব বেশি বিক্রি হয় না কিংবা যেসব বই লেখক নিজ খরচে প্রকাশ করেন, সেসব ক্ষেত্রে এই ধরনের অভিযোগ বেশি ওঠে। একটি বই যদি মাত্র ৫০ বা ৬০ কপি বিক্রি হয়, তাহলে প্রকাশকের পক্ষে তার বিনিয়োগকৃত অর্থই ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে লেখককে রয়্যালটি দেওয়ার প্রশ্নও বাস্তবতার মুখে জটিল হয়ে যায়। তবে পেশাদার লেখকদের ক্ষেত্রে রয়্যালটি একটি স্বাভাবিক ও স্বীকৃত প্রক্রিয়া এবং প্রকাশনা জগতে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়।
ইদানীং আরেকটি বিষয় উদ্বেগজনকভাবে চোখে পড়ছে–ভুল বানান, সম্পাদনাহীন কিংবা অপরিকল্পিত বই প্রকাশ পাচ্ছে। এই প্রবণতা প্রকাশনাশিল্পের মানোন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমি মনে করি, একটি বই শুধু মুদ্রিত পৃষ্ঠা নয়; এটি ভাষা, চিন্তা ও নান্দনিকতার সম্মিলিত শিল্প। সেই শিল্পের যথাযথ যত্ন ও সম্পাদনার অভাব হলে সাহিত্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে আশার কথা, কিছু তরুণ ভালো প্রকাশক এসেছেন, তারা যত্ন নিয়ে তাদের কাজে সৃজনশীলতার সাক্ষর রাখছেন। কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা সাহিত্যমূল্যকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। অনন্যা সেই ধারার একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সব সময় ভালো পাণ্ডুলিপিকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। পাণ্ডুলিপি যাচাই, যথাযথ সম্পাদনা, বানান সংশোধন এবং প্রকাশ উপযোগী করে তোলার প্রতিটি ধাপে আমরা যত্নবান থাকার চেষ্টা করি। তবু এ কথা সত্যি যে, বর্তমানে সত্যিকারের ভালো মানের পাণ্ডুলিপির বড্ড অভাব দেখছি। নানা অনিশ্চয়তা ও বাস্তব পরিস্থিতির কারণে এবারের বইমেলায় অনন্যা মাত্র ৩০টি বই প্রকাশ করেছে, যেখানে গত বছরও আমাদের প্রায় ১৪০টির মতো বই প্রকাশিত হয়েছিল।
এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও যেসব পাঠক ও ক্রেতা বইমেলায় আসছেন ও বই কিনছেন, তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। ঈদ আসন্ন, তাই পাঠকদের বলব এবারের ঈদে প্রিয়জনদের উপহার দেওয়ার তালিকায় বই রাখুন।
লেখক: স্বত্বাধিকারী, অনন্যা। অনুলিখন: মুসতাক মুকুল