চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শুভ হোসেন। চলতি বছরের ১৬ জুলাইয়ের আগেও দুই চোখে দিব্যি দেখতেন। কিন্তু এখন কোনো চোখেই দেখেন না তিনি। ইতোমধ্যে তার বাম চোখটি সম্পূর্ণ অন্ধ। ডান চোখেও দৃষ্টিশক্তি নেই। কিছুই দেখেন না তিনি। সবসময় কালো চশমা পরে থাকতে হয় থাকে। বই পড়া দূরে থাক বন্ধুদেরও চেনেন না ঠিক মতো। সহপাঠীরা ফাইনাল পরীক্ষায় বসে পরের বর্ষে পার হতে চললেও শুভ থাকছেন পিছিয়েই। দুনিয়াটা যেন কালো গ্লাসেই বন্দি হয়ে গেছে শুভর। ডান চোখে হালকা আঁচ করতে পারেন। তাতেই ভরসা হাঁটা-চলার।
খবরের কাগজকে শুভ সেদিনের ঘটনা বর্ণনা দিয়ে বলেন, চলতি বছরের ১৬ জুলাই। কোটাসংস্কার আন্দোলন সারাদেশ ওইদিন থেকেই উত্তপ্ত ওঠে। বন্দর শহর চট্টগ্রামের মুরাদপুরে শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহর স্টেশনে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে। সেদিন চবির শাটল ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপরও শুভ ও তার বন্ধুরা আন্দোলনের ডাকে লোকাল বাসে চলে আসেন চট্টগ্রাম শহরে।
তবে ওইদিন বিকাল সাড়ে ৩টায় ষোলশহর স্টেশন থেকে নির্ধারিত কর্মসূচি শুরুর আগেই স্টেশনে অবস্থান নেয় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তাদের সবার হাতে ছিল লাঠিসোঁটা ও পাথর।
দুপুর তিনটার দিকে আন্দোলনকারীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে স্টেশনের দিকে আসতে শুরু করেন। তবে স্টেশনে না গিয়ে তারা মুরাদপুর মোড়ে অবস্থান নেন। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের একটি মিছিল মুরাদপুরে গিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও পাথর নিক্ষেপ এবং ককটেল বিস্ফোরণ। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার ওই সংঘর্ষে সেদিন শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালায় ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডাররা। ওইদিন গুলির নির্দেশ দিতে দেখা গেছে যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর বাবরকে। তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আজিম রনিও।
সেদিন শুভর চোখে গুলি লাগে। চোখের ভেতরের তিনটি লেয়ার ভেদ করে একেবারে মস্তিস্কের কাছে ছুঁয়ে যায় একটি রাবার বুলেট। এরপর থেকে নানা স্থানে চিকিৎসা করালেও চোখ ভালো হয়নি। এখন অপর চোখটিতেও পড়ছে অন্ধত্বের প্রভাব।
চিকিৎসক জানিয়েছেন, তার চোখের রেটিনা ও কর্ণিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কর্ণিয়ার কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও রেটিনা ভালো হয়নি।
তিনি বলেন, হাসিনার পতনের ৫ মাসেও জুলাই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে তিনি কোনো সহায়তা পাননি। তবে আবেদন করেছেন। ইতোমধ্যে তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা অন্তত ১৫ বার আসা-যাওয়া করেছেন। এভাবেই চিকিৎসা করে তার দেড় লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। চিকিৎসা দেরিতে হওয়ায় চোখ হারানোর শঙ্কায় আছেন তিনি। তিনি বলেন, আমার স্বপ্ন ছিল পুলিশ ক্যাডার হব। কিন্তু মনে হচ্ছে আমার দীর্ঘ মেয়াদি ক্ষতি হলো চোখের। হয়তো পুলিশ ক্যাডার হতে পারব না। কারণ চোখে না দেখার কারণে ঝরে পড়ব। তাই মনস্থির করেছি আমি শিক্ষক হব।
শুভ বলেন, দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করতেই আমাদের আন্দোলন ছিল। অধিকার চাইতে গিয়ে যখন আমরা রাজাকার অ্যাখ্যায়িত হলাম। এমনকি আমাদের শতশত শিক্ষার্থীরা গুলিতে শহিদ হলো। অসংখ্য মায়ের বুক খালি হলো। আমার সামনেই অনেককে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি। যা কখনও পূরণ করা সম্ভব নয়। ডাক এলো দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করার। আর এটি সম্ভব ছাত্রদের পক্ষে। ছাত্রদের ডাকেই দেশবাসী ঝাঁপিয়ে পড়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে বিদায় করতে।
তিনি বলেন, বর্তমানে কিছুই দেখতে পাননা চোখে। সবসময় চশমা পড়ে থাকেন যেন চোখে ময়লা না পড়ে। কাউকে চিনতেও কষ্ট হয়। চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষা প্রায় শেষের দিকে। শুভ অংশ নিতে পারেননি। শুভ হোসেন বলেন, দেশের জন্যই আমাদের এই আত্মত্যাগ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা এদেশ স্বাধীন করেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে। কিন্তু ২০২৪ সালে দেশকে ফ্যাসিস্ট খুনী শাসকের হাত থেকে আরও একবার স্বাধীন করেছে এই দেশের বীর ছাত্র-জনতা। আমি চাই দেশ বৈষম্যমুক্তভাবেই এগিয়ে যাক। কারো সঙ্গে যেন কোনো বৈষম্য না হয়। তা যদি হয় এতো এতো রক্ত বৃথা যাবে। আন্দোলনের স্পীরিটের সঙ্গে হবে বেঈমানী। সরকার থেকে শুরু করে সবার প্রতি আহ্বান জানাই প্রতিবেশী, বন্ধু, স্বজন, সবার সঙ্গে যেন ভালো আচরণ করা হয়। কেউ যেন কোথাও বঞ্চিত না হন। সব অধিকারের সুন্দর বাংলাদেশ চাই। তাহলেই আমরা আমাদের এই কষ্ট, আত্মত্যাগ, শহিদের রক্ত সফল হয়েছে ধরে নিব। এসময় তিনি সকল আহতকে সুচিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলার দাবি জানান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে।
মনির/মাহফুজ/এমএ/