ইউরোপের যে কয়টি দেশ বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য সবচেয়ে বেশি সুযোগ সুবিধা দেয় তার মধ্যে ইতালি অন্যতম। বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী দেশটিতে পাড়ি জমায় তাদের জ্ঞান পিপাসা মিটাতে। আর আপনিও যদি সেই দলের পথিক হতে চান, তাহলে জেনে নিন ইতালিতে পাড়ি জমানোর সব খুঁটিনাটি। আর আজই করে ফেলুন নিজেই নিজের আবেদন।
কোর্স নির্বাচন ও সেমিস্টার
ইতালিতে সরকারি ও বেসরকারি ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিংয়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি ও ইতালীয় উভয় ভাষায় কোর্স অফার করা হয়ে থাকে।
যদি আপনি ইতালীয় ভাষায় পারদর্শী না হয়ে থাকেন- তাহলে অবশ্যই ইংরেজি কোর্স পছন্দ করবেন। এদেশে মোট ৫৮টি সরকারি ও ১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ভিজিট করে নিজের কোর্স বেছে অবশ্যই অ্যাডমিশন অফিসে মেইল করে খুঁটিনাটি বিষয় জেনে নিবেন।
দেশটিতে প্রথম সেমিস্টার শুরু হয় সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে আর শেষ হয় জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে। অপরদিকে, দ্বিতীয় সেমিস্টার শুরু হয় ফেব্রুয়ারি মাসে আর শেষ হয় জুলাই মাসে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে তা পরিবর্তিত হতে পারে।
ভাষাগত যোগ্যতা
বর্তমানে ইতালিতে ভিসার জন্য আইইএলটিএসে ৬.০০ ব্যান্ডস্কোর প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে ইতালীয় ভাষার জন্য কমপক্ষে B2 Level Euro pass Language Passport Classification প্রয়োজন। তবে বি-২ লেভেল পাস করলে ইতালিতে গিয়ে আপনাকে ভার্সিটিতে আবার পরীক্ষায় বসতে হবে।
টিউশন ফি
ইতালিতে টিউশন ফি তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী এ দেশকে উচ্চশিক্ষার গন্তব্যস্থল হিসেবে বিবেচনা করে। এই দেশে প্রতিবছরে পড়াশোনা বাবদ ১৮০০ থেকে ৮০০০ ইউরো খরচ হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্স ভেদে এই খরচ বাড়তে বা কমতে পারে।
বৃত্তি
ইতালিতে বিভিন্ন ধরনের বৃত্তির সুযোগ রয়েছে। সরকারিসহ বিভিন্ন স্কলারশিপে বিভিন্ন ধরনের অনুদান দেওয়া হয়ে থাকে। বিশ্বমন্দার কথা মাথায় রেখে সাজেশন থাকবে অবশ্যই বৃত্তির জন্য চেষ্টা করবেন। কারণ খণ্ডকালীন চাকরি করে ইতালিতে পড়াশোনা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাচ্ছে দিনকে-দিন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন পর্ব
ইতালিতে ব্যাচেলর প্রোগ্রামে যেতে আপনাকে ন্যূনতম এইচএসসি পাস করতে হবে। মাস্টার্স প্রোগ্রামের জন্য ব্যাচেলর ডিগ্রিধারী এবং পিএইচডি প্রোগ্রামের জন্য মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করতে হবে।
এই দেশে প্রথমেই আপনাকে আপনার পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিজের সব তথ্য দিয়ে ইমেইলের মাধ্যমে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্য কি না সেটা যাচাই করিয়ে নিতে হবে। তারপর এম্বাসিতে গিয়ে প্রি-অ্যাপ্লিকেশন রিকোয়েস্ট করতে হবে এবং ভর্তির আবেদনপত্রসহ সব কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
এম্বাসি সেই আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাবে এবং পরবর্তী সময়ে আপনাকে রেজাল্ট জানিয়ে দেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে আবেদনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভিন্ন হয়ে থাকে। নিচে একটি সাধারণ ধারণা দেওয়া হলো:
- পরিচয়পত্রের কপি
- পাসপোর্ট সাইজের ছবি
- অ্যাকাডেমিক সনদ ও নম্বরপত্রের কপি
- সিভি
- রেকমেন্ডেশন ও মটিভেশন লেটার
- আইইএলটিএস বা টোফেল পরীক্ষার সনদ
- বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন ফর্ম
ইতালিতে যেতে সব শিক্ষার্থীকে International Organization for Migration (IOM) এর মাধ্যমে সকল কাগজপত্র ভেরিফিকেশন করাতে হবে। তবে এই বিষয়ে চিন্তার কারণ নেই, ঢাকাতেই আছে IMO-এর আফিস।
ব্যাংক সলভেন্সি বা আর্থিক সক্ষমতার সনদ
ইতালিতে পড়ার খরচ চালাতে পারবে এমন পরিমাণ টাকা ব্যাংকে জমা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে আপনাকে ৮,০০০-১২,০০০ ইউরো আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেখাতে হবে।
ভিসা আবেদন পর্ব
ইতালিতে সাধারণত তিন ধরনের স্টুডেন্ট ভিসা অফার করা হয়ে থাকে।
(১) স্টুডেন্ট ভিসা সাব ক্লাস ৫০০: ৫ থেকে ৬ বছর মেয়াদি এই ভিসার কোনো স্পন্সর দরকার পড়ে না এবং এই ভিসা পেলে আপনি ইতালিতে পার্ট টাইম জবও করতে পারবেন।
(২) স্টুডেন্ট গার্ডিয়ান ভিসা সাবক্লাস ৫৯০: এই ভিসায় স্টুডেন্ট আবেদন করতে পারে কিন্তু এই ভিসা পেতে ৩০,০০০-৩৫,০০০ টাকা খরচ হবে এবং আপনার অ্যাকাউন্টে যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ দেখাতে হবে সঙ্গে পরিবারের কাউকে আগে থেকেই ইতালির অধিবাসী হতে হবে। এই ভিসায় আপনি চাইলেই পার্টটাইম জব করতে পারবেন।
(৩) স্পেশাল ক্যাটাগরি স্টুডেন্ট ভিসা সাব ক্লাস ৪৪৪: এই ভিসায় আপনি চাকরি করা থেকে শুরু করে অন্যান্য সুবিধাও পাবেন। যেমন- এই ভিসার কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে না। এ ছাড়া আপনার আবেদন খরচের প্রয়োজন পড়বে না। তবে ভিসা পেতে গেলে আপনার পরিবারের কাউকে ইতালির অধিবাসী হতে হবে।
আপনি কোন ধরনের ভিসার জন্য আবেদন করবেন সেটা নির্বাচন করে সেই ফরম এম্বাসির ওয়েব সাইট থেকে ডাউনলোড করে পূরণ করতে হবে। সাপোর্টেড ডকুমেন্টস দিয়ে এম্বাসিতে জমা দিতে হবে।
ভিসা আবেদনের জন্য সাধারণ চেকলিস্ট হলো:
- পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের কপি
- পাসপোর্ট সাইজের চারটি ছবি
- অ্যাকাডেমিক সনদ ও নম্বরপত্রের কপি
- সিভি
- রেকমেন্ডেশন ও মটিভেশন লেটার
- আইইএলটিএস বা টোফেল পরীক্ষার সনদ
- বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন ফর্ম
- অফার লেটার
ভিসা আবেদন ও ভর্তির আবেদনের জন্য কমপক্ষে ৯০-১২০ দিন সময় লাগে।
জীবন-যাত্রার ব্যয়
ইতালিতে আবাসন খাতে আপনাকে মাসে গুনতে হবে ৩০০ থেকে ১০০০ ইউরো এবং থাকা খাওয়া সব মিলিয়ে খরচ হবে ১০০০ থেকে ১৫০০ ইউরো। দেশটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে চিন্তার কারণ নেই- প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসন খোঁজার জন্য নিজস্ব আফিস থাকে।
খণ্ডকালীন চাকরি
ইতালিতে আপনি সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা খণ্ডকালীন চাকরি করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু বর্তমানে চাকরি পাওয়া অনেক কঠিন হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে ইতালীয় ভাষা ও পূর্ব কাজের অভিজ্ঞতা আপনাকে কাজ পেতে সাহায্য করবে।
কোর্স শেষে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ
ইতালিতে ফুল টাইম কাজের সনদ জমা দিয়ে স্টুডেন্ট ভিসা থেকে পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট ক্যাটাগরিতে ভিসা পরিবর্তন করার সুযোগ আছে। তবে এই কাজটি একটু সময় সাপেক্ষ। পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট পাওয়ার পর আপনি ইতালিতে নাগরিকত্ব পেতে চাইলে বৈধভাবে সেখানে ১০ বছর বসবাস করতে হবে। সূত্র: studyspice.com, লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
/রিয়াজ