একুশ শতকে এসে কর্মজীবনে প্রবেশের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাসঙ্গিক দক্ষতার অভাব। দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এখনো কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার মতো কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। এই ঘাটতি পুষিয়ে দিচ্ছে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার ক্লাবগুলো। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী দক্ষতা অর্জন, শিল্প খাত সম্পর্কে বাস্তব ধারণা এবং আত্মবিশ্বাস তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রেখে চলেছে এসব ক্লাব। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার ক্লাবের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন মো. আশিকুর রহমান
কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করতে প্রচেষ্টা করে যাচ্ছি
শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করার প্রয়াসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যারিয়ার ক্লাব নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও পেশাগত প্রস্তুতির লক্ষ্যে নিয়মিত আয়োজন করা হচ্ছে সিভি রাইটিং সেশন, মক ইন্টারভিউ, স্কিল ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কশপ, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং করপোরেট গ্রুমিং-সংক্রান্ত সেমিনার। ক্লাবের উদ্যোগে ইতোমধ্যে সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৮টি ‘চাকরি মেলা’ এবং ৭টি ‘ক্যারিয়ার ফেস্ট’। এসব আয়োজনে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষার্থী সরাসরি ক্যাম্পাস থেকেই চাকরির সুযোগ পেয়েছেন। একই সঙ্গে ইন্টার্নশিপ ও চাকরির সুযোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং ক্যারিয়ার কেন্দ্রিক নানা উদ্যোগ, যেমন- Brandedge- National Case Competition- এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তবভিত্তিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যারিয়ার ক্লাবের প্রধান লক্ষ্য হলো- প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তার কাঙ্ক্ষিত ক্যারিয়ার যাত্রা শুরু করতে পারেন।
আজমাইন হোসাইন সাব্বির , সভাপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যারিয়ার ক্লাব
দক্ষতা যদি না বাড়ে, ডিগ্রি একা কিছুই নয়
বতর্মানে আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি, যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষতাকে প্রতিনিয়ত হালনাগাদ না করা। ব্যাপারটা এতটাই কঠিন হয়ে উঠেছে যে দুই বছর আগে অর্জিত দক্ষতাগুলোও যেন এখন আদিকালের বলে মনে হয়। একজন শিক্ষার্থীকে কর্মক্ষেত্রের জন্য যোগ্য প্রার্থী হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসা উচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। আর ঠিক এখানেই আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার ক্লাবগুলোর ভূমিকার কথা।
চাহিদা মোতাবেক প্রয়োজনীয় কী কী দক্ষতা একজন শিক্ষার্থীকে কর্মক্ষেত্রের জন্য উপযুক্ত করে তোলে, সেসব বিষয়ের ওপর বিভিন্ন সেমিনার আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার ক্লাব। এ ছাড়া ভিন্ন ভিন্ন পেশাজীবনের গুরুত্ব অনুধাবনবিষয়ক কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে ক্যারিয়ার ক্লাব শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
ফারহান নাদিম ফাহিম, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যারিয়ার ক্লাব
শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছি
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪% আসে রেডিমেড গার্মেন্টস খাত থেকে। আর এর উন্নয়নের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে দক্ষ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারদের। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যারিয়ার ক্লাব ভবিষ্যতের এই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারদের দক্ষ করে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা নিয়মিত কর্মশালা, প্রতিযোগিতা ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সহায়তার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের এই সহায়তার ক্ষেত্র শুধু অ্যাকাডেমিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজের সক্ষমতা, নেতৃত্বগুণ, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিস্তৃত। বিশেষ করে যারা ভবিষ্যতে টেক্সটাইল প্রকৌশলী হিসেবে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবে, তাদের জন্য এই অভিজ্ঞতাগুলো অনেক বেশি কার্যকর হবে। শিল্পের চাহিদা ও বাস্তবতা সম্পর্কে আগাম ধারণা তাদের কর্মদক্ষতা বাড়াবে এবং উন্নত পেশাগত মূল্যবোধ গড়ে তুলবে। আমরা বিশ্বাস করি, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারদের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে।
মো. নাজমুছ সাকিব , সভাপতি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যারিয়ার ক্লাব
দক্ষতা উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকায় আমাদের ক্লাব
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যারিয়ার ক্লাব অ্যাকাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে কর্মজীবনের প্রস্তুতির ব্যবধান দূরীকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। আমরা নিয়মিত ক্যারিয়ার-সংক্রান্ত সেমিনার, আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক সেশন, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মশালা এবং নেটওয়ার্কিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুতে কাজ করছি। সম্প্রতি আমরা নোবিপ্রবিতে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা সেমিনারের আয়োজন করেছি। একই সঙ্গে দেশের নামকরা করপোরেট নেতৃবৃন্দ ও পেশাগত জীবনে সফল এমন প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে কর্মজীবনভিত্তিক অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করেছি। ইউএনডিপি বাংলাদেশের সহযোগিতায় আমরা কোর্সেরা এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের সনদপ্রাপ্ত শীর্ষ চাহিদাসম্পন্ন আইটি ও ইংরেজি কোর্স শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে প্রদান করছি। এ ছাড়াও, আমরা মেন্টরশিপ, সিভি লেখার সহায়তা এবং সফট স্কিল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি- যারা স্থানীয় ও বৈশ্বিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনে সক্ষম।
মোহাম্মদ মাহমুদ হাসান, সভাপতি, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যারিয়ার ক্লাব
চাকরি নয়, নেতৃত্বের জন্যও প্রস্তুত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা
আমাদের ক্লাব শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ রাখে না। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব জীবনে কাজে লাগে এমন নানা দক্ষতা গড়তে সাহায্য করে ক্যারিয়ার ক্লাব। বিশেষ করে যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ, টিমওয়ার্ক ও সমস্যা সমাধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করে আমাদের সংগঠনটি। এই ক্লাবের লক্ষ্য হলো- শিক্ষার্থীদের ২১ শতকের চাকরির বাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলা। যাতে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চাকরির প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে এবং সফল হতে পারে। নিয়মিত স্কিল ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কশপ, সিভি বিল্ডিং সেশন, মক ইন্টারভিউ এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করি। করপোরেট এক্সপার্ট ও বিশ্ববিদ্যালযয়ের অ্যালামনাইদের দিয়ে সেশনের মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের শিল্প খাতের বাস্তব চিত্র, করপোরেট কালচার ও ক্যারিয়ার সম্ভাবনার সঙ্গে পরিচিত করি। আমাদের মূলমন্ত্র- ‘Stay One Step Ahead’। আর এই দর্শন মেনেই আমরা তরুণদের শুধু চাকরি নয়, ভবিষ্যতের নেতৃত্বের জন্যও প্রস্তুত করি।
তাহমিদ আলিফ, সভাপতি, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যারিয়ার ক্লাব
/রিয়াজ