প্রায় ৩৩ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ছাত্রশিবির আয়োজিত নবীনবরণ অনুষ্ঠানে রাকসু, ডাকসু ও চাকসুর ভিপি একই মঞ্চে মিলিত হয়েছেন।
শনিবার (১৫ নভেম্বর) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে এ আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষের নবীনবরণ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় তিন সহস্রাধিক নবীন শিক্ষার্থীদের ফুল, কলম, গোলাম আজমের বইসহ নানা উপহারসামগ্রী দিয়ে বরণ করে নেয় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।
নবীন বরণ অনুষ্ঠানে শাখা ছাত্রশিবিরের নেতারা জানান, সবশেষ শাখা ছাত্রশিবিরের আয়োজনে ক্যাম্পাসে ১৯৮২ সালে নবীন বরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। সেদিন অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগ, ছাত্র মৈত্রীসহ কয়েকটি সংগঠনের হামলায় ৪ জন শিবিরকর্মী নিহত হয়। এরপরে বিভিন্ন সময়ে শিবিরের নবীনবরণ স্থানীয় বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠিত হলেও প্রায় চার দশক পরে এ বছর ক্যাম্পাসে আয়োজিত হয়েছে।
রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ উদ্বোধনী বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, '১৯৮২ সালের ১১ মার্চ ছাত্রশিবির রাবি শাখা একটি নবীনবরণ আয়োজন করে। ওই নবীনবরণের পর আমাদের চার ভাই আর ঘরে ফিরে যেতে পারেননি, কারণ ফ্যাসিবাদের দোসরদের আঘাতে আমাদের চারজন ভাই শহিদ হন। তাদেরকে ইসলামি ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে সারা বাংলাদেশে প্রথম শহিদ হিসেবে আজও স্মরণ করে। এই ঘটনার পর থেকে প্রতি বছর ১১ মার্চ ছাত্রশিবির ‘শহিদ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। এটি ছিল রাবি ছাত্রশিবিরের ওপর জুলুমের ইতিহাস।'
ইসলামি ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, 'জুলাইকে নিয়ে একটা শ্রেণি ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে। জুলাই ছিল সবার। এখানে একক কোনো নেতা ছিল না। আমাদের যে সাহসী যোদ্ধাগুলো ছিল জুলাইকে নিয়ে ব্যবসা করার কারণে আজকে তারা মানুষের চোখে ভিলেন হয়ে গিয়েছে। জুলাইয়ের ভিত্তি ছিল অন্যায়ের সামনে কখনো মাথা নত না করা। পুরাতন বা নব্য কোনো ফ্যাসিবাদের হাতেই আমরা জুলাইকে বিক্রি হতে দিব না।'
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চাকসু ভিপি রনি বলেন, 'মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তারা যদি বিভিন্ন দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা প্রত্যেক ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা আমাদের কাজের প্রতি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।'
এ ছাড়া, তিনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বের কাজে কর্মকর্তাদের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করে বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
ডাকসু ভিপি সাদেক কায়েম আওয়ামী লীগকে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, আজকের নবীন বরণ থেকে আমি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, খুনি হাসিনাকে দেশে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে এবং তাকে ফাঁসি নিশ্চিত করতে হবে। তার সহযোগীদেরও বিচার করা উচিত।'
তিনি হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে মন্তব্য করে বলেন, 'খুনি হাসিনা ছাত্রশিবিরের উপর বর্বরোচিত নির্যাতন চালিয়েছে এবং সর্বশেষ ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধও করেছিল। কিন্তু ছাত্রশিবির মানুষের হৃদয়ে থেকে গেছে এবং হাসিনা দিল্লিতে পালিয়েছে। ছাত্রশিবির দেশের মানুষের ন্যায়ের পক্ষে লড়ে যাবে।'
তিনি আদালত, সচিবালয় এবং আইন বিভাগে ফ্যাসিবাদের দোসরদের ষড়যন্ত্রের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'যারা মাথাচাড়া দিতে চায়, তাদের প্রতিহত করুন। হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।'
রাবি শিক্ষার্থীদের ত্যাগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'ছোটবেলা থেকে রাবি শিক্ষার্থীদের ত্যাগের গল্প শুনে বড় হয়েছি। বিগত ফ্যাসিবাদী সময়ে এই ক্যাম্পাসে গণরুম এবং গেস্ট রুমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনে করা হত। শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার হরণ করা হত। কেউ ইসলাম চর্চা করলে তাকে ট্যাগিং করা হত।'
এ সময় রাবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের সভাপতিত্বে ও ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মুজাহিদ ফয়সালের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাইন উদ্দিন খান।
এ ছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন- ইসলামি ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম, ঢাকসু ভিপি সাদেক কায়েম, চাকসু ভিপি ইব্রাহিম রনি, কলা অনুষদের ডিনস বেলাল হোসেন, রাবি ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি আব্দুল মোহাইমিনসহ অন্যান্য নেতাকর্মীরা।
শাকিবুল হাসান/সুমন




