দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে শেষ হলো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (শাকসু) ওপর হাইকোর্টের দায়ের করা ২৮ দিনের স্থগিতাদেশ। এবার কি শাকসুর আলো দেখবে শাবিপ্রবি? নির্বাচন কি হবে? এ নিয়ে প্রশ্ন জাগছে প্রার্থীসহ সব শিক্ষার্থীর মাঝে।
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে ২০ জানুয়ারি শাকসুর চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা ও পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও নির্বাচনের ঠিক আগের দিন গত ১৯ জানুয়ারি শাকসুর এক দিন আগে হাইকোর্টে করা এক রিটের কারণে ২৮ দিনের স্থগিতাদেশ দেন হাইকোর্ট। এর প্রতিবাদে তখন বিশ্ববিদ্যালয় কমপ্লিট শাটডাউনের ঘোষণা দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। পরবর্তী সময়ে সেশন জটের কথা চিন্তা করে কমপ্লিট শাটডাউন তুলে নেন তারা এবং ২৮ দিনের স্থগিতাদেশ শেষে শাকসু আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেয় প্রশাসন।
অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি। শিক্ষার্থীরা রাত ১২টার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাকসুর দাবি নিয়ে কথা বলা শুরু করেছেন। এ ব্যাপারে কথা হয় শাকসুতে শিবির সমর্থিত দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী দেলোয়ার হাসান শিশিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি ইতোমধ্যে ভিসি, প্রো-ভিসি, ট্রেজারার স্যারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শাকসু নিয়ে উনাদের চিন্তা-ভাবনা নিয়ে কথা বলেছি। উনাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, আদালত থেকে এ ব্যাপারে শুনানি আসতে হবে। তখন আমি যত দ্রুত সম্ভব সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা নিয়ে রমজানের আগেই শাকসু নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়ে এসেছি। স্যাররাও দ্রুত এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’
শাকসু নির্বাচনের দাবিতে নতুন কোনো কর্মসূচির কথা ভাবছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রশাসন থেকে যদি স্বাভাবিকভাবেই ভালো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তো কর্মসূচির দরকার নেই। তবে আরও যারা নির্বাচনে প্রার্থী আছেন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা যদি চায় যে, নতুন করে আবারও কর্মসূচির প্রয়োজন আছে। তা হলে হবে আর যদি সবাই মনে করে প্রয়োজন নেই তা হলে না। সবার সঙ্গে কথা বলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
ছাত্রদল সমর্থিত সম্মিলিত সাস্টিয়ান ঐক্য প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী মুস্তাকিম বিল্লাহ বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাস তো মাত্র খুলছে তাই এখনো সব শিক্ষার্থী আসেনি। আমরা যারা শাকসুর আন্দোলনে ছিলাম, সবাই চিন্তা করছি যেহেতু আমাদের ২৮ দিনের যে নিষেধাজ্ঞা সেটা শেষ, আমরা খুব শিগগিরই দু-এক দিনের মধ্যে আগের মতো আন্দোলন শুরু করব। সব প্যানেলের শিক্ষার্থীরা মিলে কীভাবে আন্দোলনকে পরিচালনা করা যায়, সে ব্যাপারে আমরা একটা মিটিং ডাকছি। এই মিটিং শেষে আমরা কালকে বা পরশু থেকে আন্দোলন শুরু করে দেব। এখন যেহেতু আর কোনো ধরনের বাধা নেই তাই কোনো ধরনের বাহানা বা রিট করে শাকসুকে আর আটকে রাখা যাবে না। আমরা খুব শিগিরই মাঠে নামব এবং যেকোনো মূল্যে শাকসু আদায় করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’
এদিকে শাকসু নিয়ে নানা নাটকীয়তার মাঝে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন স্বতন্ত্র সাধারণের ঐক্যস্বর প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী মুহয়ী শারদ। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শাকসু থেকে সরে আসার ঘোষণা দেওয়ার অন্যতম একটা কারণ ছিল আমার মায়ের অসুস্থতা। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে আমি বাসা থেকে সিলেটের উদ্দেশে রওনা দেব। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ব্যাপারে আমি যে পোস্টটা দিয়েছিলাম সে ব্যাপারে আমি এখনো নির্বাচন কমিশনের কাছে মনোনয়নপত্র বাতিল করার ব্যাপারে কোনো আবেদন করিনি। তখন আমি এ ব্যাপারে আরও চিন্তাধারা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এ ব্যাপারে সিলেটে যাওয়ার পর আমার সঙ্গে যারা ছিলেন তাদের সঙ্গে আলোচনা করে আমি পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’
শাকসু আদায়ের আন্দোলনের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘শাকসুর আন্দোলনে আমরা শুরু থেকেই ছিলাম। এখনো যদি আমরা ওই পরিস্থিতিতে বুঝি যে, সার্বিক আইনগতভাবে আন্দোলনটা শুরু করা উচিত বা আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের দাবিটা আদায় হবে, তাহলেই আমরা এর সঙ্গে যুক্ত হব বা অর্গানাইজ করব।’
হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের পর শাকসু নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়েছিল, তাদের পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। প্রশাসন অনুমতি দিলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে কোনো বাধা নেই। এখন যেহেতু স্থগিতাদেশ শেষ হয়েছে, এবার শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে কোনো বাধা আছে কি না এবং কবে অনুষ্ঠিত হতে পারে জানতে চাইলে শাকসু নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনের পূর্ণ প্রস্তুতি ছিল। তারপর একটা রিটের কারণে হাইকোর্ট সেটা স্থগিত করেছে। রিট হওয়ার কারণে বিষয়টা এখন প্রশাসনের ওপর নির্ভর করছে। কারণ প্রশাসন এটা ডিল করছে। এখন প্রশাসনের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত আসবে আমরা সে অনুযায়ী কাজ করব। নির্বাচন কমিশন তো আদালতের সঙ্গে সম্পৃক্ত না বা যে ভূমিকা পালন করার কথা সেটা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব না আসলে। এই ভূমিকা পালনের দায়িত্ব প্রশাসনের। তাই আমার মনে হয় এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বরত প্রশাসন সিদ্ধান্ত দিতে পারবে। আমরা নিজেরাও অপেক্ষা করছি নির্বাচন আসলে হবে কি না বা হলেও কবে হবে। আমরা তারিখ পেলে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে নেব।’
এ ব্যাপারে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও পদাধিকার বলে শাকসু সভাপতি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলার জন্য মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে উপাচার্যের সেক্রেটারি ড. আ ফ ম সালাহুদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, উপাচার্য মাত্র অফিস থেকে বের হয়ে গেছেন। আজকে কোনোভাবে যোগাযোগ করা যাবে কি না জানতে চাইলে তিনি কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেননি।
পরবর্তী সময়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘প্রথমত শাকসুকেন্দ্রীক যেকোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া একমাত্র উপাচার্যের হাতে। দ্বিতীয়ত, রিট হওয়ার পর যখন শাকসু স্থগিত হয়েছিল তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে রিট ভ্যাকেট করার জন্য চেষ্টা করা হয়েছিল। এখন ফুল কেবিনেটে হিয়ারিং না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারছে না। এখন হিয়ারিংটা হতে হবে। তখন আদালত একটা নির্দিষ্ট তারিখ বা সীমারেখা দিয়ে বলতে পারে যে, হয় এই তারিখের মধ্যে নির্বাচন করেন অথবা বলতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারে। এটা পেলে তখনই কার্যক্রম শুরু হবে।’




