নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনার বিচারের দাবিতে ঘোষিত বিক্ষোভ মিছিল শেষ পর্যন্ত করতে পারেনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)।
পূর্বঘোষণা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হল মোড়ে কর্মসূচিটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে তা স্থগিত ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচি স্থগিতের ঘটনাকে ঘিরে ক্যাম্পাসজুড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
চাকসুর পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল, নরসিংদীসহ সারা দেশে সংঘটিত ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনাগুলোর দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে এ বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। তবে ঘোষিত সময়ে কর্মসূচি বাস্তবায়ন না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী হতাশা প্রকাশ করেন। তাদের মতে, এমন একটি স্পর্শকাতর জাতীয় ইস্যুতে ঘোষিত কর্মসূচি শেষ মুহূর্তে স্থগিত হওয়া হতাশাজনক এবং ছাত্র সংসদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
চাকসুর ২৬টি পদের মধ্যে ২৪টি পদে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা নির্বাচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে একইদিন সন্ধ্যায় সংগঠনটির উদ্যোগে আয়োজিত ইফতার মাহফিলকে ঘিরেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিফ রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, নরসিংদীর ঘটনায় জামায়াতের এক নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকায় চাকসু কর্মসূচি স্থগিত করেছে। তিনি চাকসুর সমালোচনা করে একে 'দলান্ধ চাকসু' বলে উল্লেখ করেন।
একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী অঙ্গনের নেত্রী সুমাইয়া শিকদার এই বিক্ষোভ করতে না পারাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে ধন্যবাদ দেন চাকসুকে।
সমুদ্র তত্ত্ববিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ইয়াসিন আরাফাতও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কর্মসূচি স্থগিতের বিষয়ে এখনো শিক্ষার্থীদের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, যা ছাত্রসমাজের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
তবে চাকসুর নেতারা উপস্থিতি কম হওয়ার আশঙ্কাকেই কর্মসূচি স্থগিতের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। চাকসুর যোগাযোগ ও আবাসন সম্পাদক ইসহাক ভূঁইয়া বলেন, 'সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে এমন একটি সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল, যখন অনেক শিক্ষার্থী ইফতার, তারাবির নামাজ বা টিউশনের কারণে উপস্থিত থাকতে পারতেন না। এ কারণে কাঙ্ক্ষিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হওয়ার আশঙ্কা থেকেই কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।'
চাকসুর সাধারণ সম্পাদক সাইদ বিন হাবিব বলেন, 'আমাদের প্রোগ্রাম মাগরিবের পরে নির্ধারিত ছিল। একইদিন আরেকটি বড় আয়োজন থাকায় উপস্থিতি কম হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে জুমার নামাজের পর কর্মসূচি হওয়ায় সেখানে বেশি উপস্থিতি দেখা গেছে। উপস্থিতি কম হওয়ার আশঙ্কা থেকেই আমরা অনিবার্য কারণবশত কর্মসূচি স্থগিত করেছি। তবে শিগগিরই বিক্ষোভ মিছিল বা অন্য কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।'
তিনি নরসিংদীর ঘটনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, 'যে ঘটনাটি ঘটেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি সরাসরি একজন বিএনপি নেতার ছেলে। গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি টাকার বিনিময়ে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তাদেরই ছত্রছায়ায় মেয়েটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন সরকার গঠনের পর একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু দেশে একটি মবতন্ত্র কায়েম হয়েছে। আমরা মবতন্ত্র থেকে বাংলাদেশকে সুস্থধারার রাজনৈতিক পরিবেশে ফিরিয়ে নিতে চাই। ধর্ষণের ঘটনা শুধু একটি জায়গায় নয়, ৫ আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি। চাকসুর জিএস হিসেবে আমি এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানাচ্ছি।'
এদিকে একইদিন সন্ধ্যায় শিবির আয়োজিত ইফতার মাহফিলে চাকসুর ভিপি বলেন, দেশে চলমান সহিংসতা ও নরসিংদীর ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন এবং এ ধরনের অপরাধ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ঘোষিত কর্মসূচি স্থগিত হওয়ার ঘটনায় ক্যাম্পাসে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় ইস্যুতে ছাত্র সংসদের আরও সক্রিয় ও দৃঢ় ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন। এদিকে চাকসুর পক্ষ থেকে শিগ্গিরই নতুন কর্মসূচি ঘোষণার আশ্বাস দেওয়া হলেও, ধর্ষণ ও সহিংসতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ছাত্রসমাজের প্রত্যাশা পূরণে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
আল আরাফ/সুমন/




