দেশে নিবন্ধিত ১১২১ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর মধ্যে ৩৩১ প্রজাতির উপস্থিতি রয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। অর্থাৎ, দেশের মোট বন্যপ্রাণীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রজাতি আশ্রয় নিয়েছে শুধুমাত্র এই ক্যাম্পাসে।
বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার (৩ মার্চ) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এ তথ্য তুলে ধরেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মো. ফরিদ আহসান।
প্রাকৃতিক পরিবেশের দিক থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় ব্যতিক্রম। বিস্তীর্ণ পাহাড়, ঘন সবুজ বনভূমি ও ঝোপঝাড়ে ঘেরা এই ক্যাম্পাস কার্যত একটি প্রাকৃতিক অভয়ারণ্যের রূপ নিয়েছে। এই অরণ্যে বসবাস করে নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী, যার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সহাবস্থানে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন শিক্ষার্থীরাও। বিভিন্ন আবাসিক হলে প্রায়ই দেখা মেলে বিষধর গ্রিন পিট ভাইপার সাপের, আবার কখনও বৃহৎ আকৃতির অজগর সাপও ধরা পড়ে ক্যাম্পাস এলাকায়। সন্ধ্যা নামলে খাবারের সন্ধানে নেমে আসা বন্য শুকরের দল কিংবা পাহাড়ের গহীন অরণ্য থেকে লোকালয়ে চলে আসা হরিণও নতুন নয় বিশ্ববিদ্যালয়বাসীর কাছে।
“ওষধি ও সুগন্ধি উদ্ভিদ: স্বাস্থ্য, ঐতিহ্য ও জীবিকার সংরক্ষণ” প্রতিপাদ্যে দিনব্যাপী কর্মসূচির সূচনা হয় সকাল সাতটায়, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বন্যপ্রাণী দেখা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। পরে বন্যপ্রাণী বিষয়ক উপস্থাপনা, প্রাণী চেনা প্রতিযোগিতা এবং একটি র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। জীববিজ্ঞান অনুষদ থেকে শুরু হওয়া র্যালিটি মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ অনুষদের মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা শেষে বন্যপ্রাণী পাজল ও কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
প্রবন্ধ উপস্থাপনায় অধ্যাপক ফরিদ আহসান বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। তার দেওয়া তথ্যমতে, দেশে থাকা ৭০ প্রজাতির ব্যাঙের মধ্যে ২২ প্রজাতি, ১৭০ প্রজাতির সরীসৃপের মধ্যে ৫৯ প্রজাতি এবং ৭৩২ প্রজাতির পাখির মধ্যে ২৩০ প্রজাতি এই ক্যাম্পাসে পাওয়া যায়। এছাড়া ১৩৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রজাতির বসবাস রয়েছে এখানে। সব মিলিয়ে দেশের মোট বন্যপ্রাণীর একটি বড় অংশের উপস্থিতি এই ক্যাম্পাসেই।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার। তিনি বলেন, জীববিজ্ঞান বিভাগকে আরও সুপরিকল্পিতভাবে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে, বিশেষ করে যারা গাছ, মাছ, পাখি ও বন সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। তার মতে, পরিবেশ ও প্রাণী সংরক্ষণ এখন কেবল আলোচনার বিষয় নয়, বরং মানব অস্তিত্বের প্রশ্ন। পৃথিবী রক্ষায় আমরা কতটা ব্যয় করছি এবং ধ্বংসের পেছনে কতটা ব্যয় করছি—এই আত্মসমালোচনামূলক প্রশ্ন সমাজের সব স্তরে তোলা প্রয়োজন। তিনি ক্যাম্পাস থেকেই গবেষণা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান।
চিটাগাং বার্ড ক্লাব-এর উপদেষ্টা ডা. মহিউদ্দিন সিকদার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মূলত গবেষণাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত, যেখানে উন্নত ল্যাব ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে University of Oxford ও University of Cambridge-এর গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার উদাহরণ তুলে ধরে দেশের উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বার্ড ক্লাবের সভাপতি রিদওয়ান রায়হান মুহিব বলেন, এ ধরনের আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য প্রতিযোগিতা নয়; বরং বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি। তিনি বলেন, অংশগ্রহণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা গেলে সংরক্ষণ চেতনা আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে তিনি আয়োজনে নেপথ্যে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবকদের অবদানও তুলে ধরেন।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোসাম্মৎ রাশেদা চৌধুরী। এছাড়া বক্তব্য দেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব-এর সহসভাপতি গোলাম শফিক। অনুষ্ঠান শেষে প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা।
বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবসের এই আয়োজন করেছে প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বার্ড ক্লাব (সিইউবিসি)। সহযোগিতায় ছিল প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব।
আল আরাফ/নাঈম




