চৌকাঠ ডিঙিয়ে নারী ঘরের বাইরে পা রেখেছেন অনেক আগেই। পুরুষের পাশাপাশি কাজ করছেন সমান তালে। কায়িক শ্রম, মেধাভিত্তিক বা কোনো চ্যালেঞ্জিং পেশা- সব ক্ষেত্রেই নারীরা নিজেদের প্রমাণ করেছেন সফলভাবে। তবুও কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রবেশের বিষয়টি এখনো চ্যালেঞ্জিং। কর্মজীবী নারীদের জন্য রয়েছে নানা সামাজিক বাধা, বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা। কর্মজীবনে নারী বলেই কারও হয়েছে খারাপ অভিজ্ঞতা। কেউ আবার উচ্চশিক্ষিত হয়েও সুযোগ পাননি নিজের দক্ষতাকে প্রকাশ করার। কর্মজীবনে প্রবেশে বাধা, প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি নিয়ে কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন তাসনিম তাজিন
‘রাতে ফেরা পছন্দ করতেন না বাড়িওয়ালা’
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক পাস করে বের হন লিয়া আক্তার। স্নাতক শেষে যুক্ত হয়েছিলেন একটি আইটি কোম্পানিতে। বাসা থেকে কর্মস্থল দূরে হওয়ায় বাসায় ফিরতে কিছুটা দেরি হতো তার। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত অভিযোগ করতেন বাসার মালিক।
লিয়া বলেন, রাত ৮টায় অফিস শেষ করে জ্যাম ঠেলে বাসায় ফিরতে ১১টা বেজে যেত। মেয়েদের এত রাতে বাড়ি ফেরা নিরাপদ নয় বলে প্রায়ই রাগ করতেন বাড়িওয়ালা। সন্ধ্যার ভেতর বাড়ি ফেরা যাবে, এমন চাকরি কেন করছে না বলেও অভিযোগ করতেন অনেক সময়। চাইলেই তো আর নিজের ইচ্ছামতো চাকরি পাওয়া যায় না। ব্যাচেলরদের জন্য যেকোনো নতুন জায়গায় বাসা নেওয়াও সহজ নয়। বর্তমানে লিয়া উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তিনি জানান, এখানে শুরু থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন পার্টটাইম কাজ করছেন। কাজ শেষে রাত ১২টার পরও বাড়ি ফিরতে অনিরাপদ বোধ হয় না। পুরুষ হোক বা নারী- কাজ শেষে রাতে ঘরে ফেরা নিয়ে কারও অভিযোগ নেই। তিনি মনে করেন, ঘরের বাইরে নারীদের নিরাপত্তা অবশ্যই প্রয়োজন। পাশাপাশি নারীদের চলাফেরার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার মানসিকতাও বদলানো প্রয়োজন। যার কোনোটিই বাংলাদেশে নেই। তাই দেশে ফিরতে তেমন আগ্রহ পান না তিনি।
‘স্বামীর বাধায় স্বপ্ন পূরণ হলো না’
সমাজে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার আশায় দন্তচিকিৎসা নিয়ে পড়েছিলেন স্বপ্না হোসেন (ছদ্ম নাম)। বিয়ের পর ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে বাধা হয়ে দাঁড়ান স্বামী। পেশা জীবনের জন্য মা-শাশুড়ির সহযোগিতা নিয়ে বাচ্চা মানুষ করতে পারবেন না, সাফ জানিয়ে দেন তিনি। কথা না মানলে বাচ্চাদের রেখে তালাক দিয়ে দেবেন বলেও হুমকি দেন স্বামী। মেয়েদের তালাক হওয়া সমাজ ভালো চোখে দেখবে না। তাই স্বামীর এমন কথার পর বাবার পরিবারও চাপ দেয় ক্যারিয়ারের চিন্তা পুরোপুরি বাদ দিতে। স্বপ্না বলেন, চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়ে সাধারণত কেউ ঘরে বসে থাকেন না। উচ্চশিক্ষিত স্বামীও তার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইচ্ছা বুঝতে পারবেন বলেই মনে করেছিলেন তিনি। কিন্তু বাস্তবতা বিপরীত। এক ছেলে ও এক মেয়ের মা স্বপ্না। সন্তানরা বড় হচ্ছে। নিজের ইচ্ছা জলাঞ্জলি দিলেও মেয়েকে দক্ষ, সাবলম্বী করতে আজীবন সমর্থন জুগিয়ে যাবেন বলে জানান তিনি। স্বপ্না মনে করেন, বিয়ের আগেই নিজের ক্যারিয়ার, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা উচিত। অনেকে বিয়ের আগে রাজি হলেও বিয়ের পর চাকরিতে বাধা দেন। নারীরা নিজের ইচ্ছার মূল্যায়ন না করলে পরে আক্ষেপ হয়। নিজেদের মতামত, ইচ্ছা ও অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়াও উচিত।
‘যৌন হেনস্তায় চাকরি ছাড়ি’
একটি সংবাদ মাধ্যম অফিসে ব্যবস্থাপনা বিভাগে চাকরি করতেন শান্তা (ছদ্ম নাম)। মালিকপক্ষের এক কর্মকর্তার আচরণ অস্বস্তিকর লাগত শুরু থেকেই। একদিন তিনি কিছু দরকারি কাগজপত্র নিয়ে তার রুমে যেতে বলেন। রুমে যাওয়ার পরই সরাসরি গায়ে হাত দিয়ে বসেন ওই ব্যক্তি। সে যাত্রায় চিৎকার ও প্রতিবাদ করে রুম থেকে বের হয়ে রক্ষা পেয়েছিলেন শান্তা। তবে পরদিনই চাকরি ছাড়তে হয়েছিল তাকে।
আমাদের দেশে কর্মস্থলে যৌন হয়রানির শিকার হলে তার জন্য রয়েছে নির্ধারিত আইনি ব্যবস্থা। কোনো আইনি সাহায্য নিয়েছিলেন কিনা- জানতে চাইলে বলেন, ক্ষমতাবান মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস করেননি। তাছাড়া, একজন নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্তার শিকার হলে অনেক সহকর্মী ওই নারীকে নিয়েই রসিকতা করেন। তাই দ্রুত চাকরি ছেড়ে বের হয়ে যান তখন। হঠাৎই চাকরি ছাড়ায় বেশ কঠিন অবস্থায় পড়েছিলেন শান্তা। পরিবারের বড় মেয়ে হিসেবে ছোট এক ভাই ও বোনের পড়ার খরচ, ঢাকায় নিজের থাকা-খাওয়ার খরচ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় সময় পার করেছেন অনেক দিন।
‘সব পেশা গ্রহণযোগ্য নয়’
উচ্চমাধ্যমিক শেষে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন জান্নাতুল মাওয়া। এ ক্ষেত্রে মাওয়ার প্রেমিকের ছিল পূর্ণ সমর্থন। বিপত্তি বাধে যখন সরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউট ছাড়া আর কোথাও সুযোগ পাননি তিনি।
বর্তমানে নার্সিং নিয়ে অধ্যয়নরত মাওয়া জানান, এখানে আসতে বাধা দিয়েছিলেন তার সঙ্গী। সঙ্গীর ভাষ্যমতে, নার্সিং পেশায় থাকা নারীদের জন্য সম্মানজনক নয়। এই পেশায় জড়িত নারীদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে সমাজ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেকোনো সাধারণ বিষয়ে পড়াশোনা করতে বলেন তাকে। মাওয়া জানান, তিনি অপারগ ছিলেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মতো সামর্থ্য তার ছিল না। তাই সম্পর্কের ইতি টানেন।
মাওয়া মনে করেন, নার্স, পুলিশ বা চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীরা যারা কাজ করেন তাদের কাজের সঙ্গে চরিত্রকে মিলিয়ে ফেলার এক অদ্ভুত প্রবণতা আছে সমাজের। এই অবান্তর ধারণার বিরোধিতা করতেই নার্সিংয়ে পড়ার জেদ আরও চেপে বসেছিল তার। এমন ধারণা একসময় পুরোপুরি বদলাবে বলে আশা রাখেন তিনি।
বহুদিন ধরে যে সমাজব্যবস্থা ঘুণে ধরা, তা সহজে বদলায় না। তবু দিনবদলের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলতে হয়। গানের একটি লাইনের মতো বলতে হয়, ‘বন্দি জীবন ঘুরে দাঁড়ালেই মুছে যাবে অবরোধ’।
জাহ্নবী