প্রথমেই মুক্তিযুদ্ধের কিছু গল্প দিয়ে শুরু করি, যা আমার মায়ের মুখ থেকে শোনা। তিনি সে সময়টায় যা দেখেছেন তা-ই আমার লেখায় সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। সময়টা ছিল ১৯৭১ সালের মার্চ মাস। চারদিকে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। এ দেশের অকুতোভয় বীর নারীরাও দেশের তরে যুদ্ধে শরিক হন। ফরিদপুরে মায়ের কয়েকজন কলেজ সহপাঠী সে সময় দেশমাতৃকার জন্য গেরিলা যুদ্ধের রণকৌশল শিখে নেন। এর মধ্যে গায়ত্রী সাহার নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য সৈনিক।
তিনি সাহস দেখিয়েছিলেন পাকিস্তানি ক্যাম্পে প্রবেশ করার। তিনি চুলের খোঁপায় ওয়্যারলেস সেট করে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়মিত যেতেন ফল বিক্রি করতে। উদ্দেশ্য তাদের ভেতরের তথ্য যাতে মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের সহজে দিতে পারেন। কোথায় পাকিস্তানি বাহিনী বাংকার স্থাপন করেছে বা করবে, কোথায় পরবর্তী অভিযান পরিচালিত হবে, এ তথ্যগুলো গেরিলা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গায়ত্রী সাহা পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে কৌশলে বের করে নিতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে এ দেশের হাজারো গায়ত্রী সেদিন পথে নেমেছিলেন। জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও গায়ত্রী সাহা দেশের জন্য জীবনবাজি রেখে মুক্তির লড়াইয়ে শরিক হন। পরবর্তী সময়ে দেশ স্বাধীন হলে বাংলাদেশ সরকার তাকে পুরস্কৃত করে বলে জানা যায়।
শুধু অস্ত্র হাতেই যে নারীরা যুদ্ধ করেছেন, তাই নয়। তারা মেধা, সাহস ও প্রেরণা দিয়ে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার পাশে থেকেছেন। কেউ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার সংগ্রহ করেছেন, কেউ জাতীয় পতাকা সেলাই করেছেন রাত জেগে। কেউ কবিতা লিখেছেন, গান লিখেছেন রণসঙ্গীদের উৎসাহিত করার জন্য। বাঙালি নারীরা জাগতে শুরু করলে তাদের থামানো যায় না। এ দেশের মুক্তিকামী নারীরা সেদিন বীরদর্পে গর্জে উঠেছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন অসংখ্য বাঙালি নারী।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ভূমিকা ছিল অসামান্য। তারা সংগ্রাম করেছেন দেশের ভেতর, কখনো কোনো বন্দিশালায়, যুদ্ধক্ষেত্রে বা ভারতের শরণার্থী শিবিরে। মা শরণার্থীদের বিষয়ে যখন বলছিলেন তখন তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। আমি দেখতে পেলাম মায়ের দুচোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। ফরিদপুর থেকে মাগুরা হয়ে দলবেঁধে ছুটছে হাজার হাজার শরণার্থী। সবার গন্তব্য ভারতের শরণার্থী শিবির। মা হঠাৎ দেখতে পেলেন তারই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা তালি দেওয়া সাদা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে শরণার্থীদের ঢলে মিশে পথ চলছেন। মা হঠাৎ করে তারই শিক্ষককে দেখতে পেয়ে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। মাতৃভূমির এক মুঠো মাটি হাতে নিয়ে তিনি অঝোরে কাঁদলেন। মা বাড়ি থেকে শরণার্থীদের জন্য মুড়ি-মুরকি এনে দিলেন। মানুষগুলো সারা পথ হেঁটে হেঁটে দুর্বল হয়ে গেছে। নারী ও শিশুরা পথে তরমুজের খোসা চিবিয়ে খাচ্ছে। কী অসহায়ত্ব নিয়ে তিনি আমাকে কথাগুলো বলছিলেন!
৩০ লাখ শহিদের আত্মত্যাগ ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই দেশ। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির লড়াইয়ে শরিক হয়েছিল সেদিন সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা বাঙালিদের শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, সঙ্গে নির্যাতন করেছে ৫ লাখেরও বেশি নারীকে। যারা পরিচিত বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। বন্দিশালায় শত শত নারীর বোবাকান্না আর আর্তচিৎকারে কেঁপেছে এদেশের আকাশ-বাতাস। এসব নারীরা নিজেদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের কথা আর বলতে চান না। হৃদয় শুকিয়ে গেছে তাদের। চোখের সামনে বাবা ও ভাইকে হারিয়েছেন কতজন, কেউ দেখেছেন আত্মীয়-স্বজনের মর্মান্তিক মৃত্যু।
কত মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। আজ যারা বেঁচে আছেন তাদের কাছে এসবই দুঃসহ স্মৃতি। সে স্মৃতি আজও অনেককে কাঁদায়। কত যে বন্দিশালা এই বাংলার মাটিতে সেদিন তৈরি হয়েছিল তার ইয়ত্তা নেই। বাংকারে বাংকারে অসংখ্য বিবস্ত্র নারী পড়ে থাকার দৃশ্য অবলোকন করে কেউ আর স্বাভাবিক থাকতে পারেননি। একাত্তরে সাহসী নারীরা জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও থেমে থাকেননি। তারা বাংলাদেশ নামক স্বাধীন সার্বভৌম দেশ প্রতিষ্ঠায় সর্বত্র সংগ্রাম করেছেন। হে বাঙালি নারী, তোমাদের জন্য আমাদের সালাম ও শ্রদ্ধা। লাল সবুজ পতাকা ওড়াতে গেলেই তোমাদের মুখচ্ছবি ভেসে আসে। স্বমহিমায় বেঁচে থাকো বাঙালি নারী।
লেখক: সহকারী সম্পাদক, খবরের কাগজ এবং স্থানীয় সরকার গবেষক
/ফারজানা ফাহমি
.jpg)