বাংলাদেশে শিক্ষিত নারীরা রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছেন বটে। তবে নিরাপদ পরিবেশ, সামাজিক স্বীকৃতি ও পারিবারিক সমর্থনের অভাবে এখনো তাদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি- বলছেন তরুণ শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে রাজনীতিতে নারীর অবস্থান, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বাস্তব চিত্র সম্পর্কে লিখেছেন এস লুপিন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ যতই বাড়ুক শিক্ষিত তরুণীদের অভিমত বলছে, এখনো অনেক পথ বাকি। তারা বলছেন, নিরাপদ ও সহায়ক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় নারী শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা, ভাবনা এবং প্রত্যাশার মধ্য দিয়েই ফুটে উঠেছে রাজনীতিতে নারীর অবস্থান, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বাস্তব চিত্র।
রাজনীতি নিয়ে তরুণ শিক্ষিত নারীদের ভাবনার খোঁজে কথা বলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মার্জিয়া ভূঁইয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আমি এটাকে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ বলে মনে করি না। গত ১৫-১৬ বছরে চলমান একটি ধারার বিরুদ্ধে বড় আন্দোলন হয়েছে- এর মূল কারণই ছিল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। আমরা চাই এমন একটি রাজনীতি যেখানে নারী-পুরুষ সমানভাবে অংশ নিতে পারবে।’
তার মতে, ‘রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণের মাত্রা অন্য যেকোনো সেক্টরের মতোই- অপ্রতুল। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী হলেও তাদের অংশগ্রহণ সে অনুপাতে হয় না। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে নারীদের অংশগ্রহণ রোধক নয়, তবে আমাদের দেশে এখনো তা অনেক পিছিয়ে।’
তিনি আরও জানান, ‘এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে নারী প্রধানমন্ত্রী থাকলেও সংসদ বা সংরক্ষিত আসনের বাইরে নারীর অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। প্রান্তিক পর্যায়ে তো নারীদের উপস্থিতিই প্রায় নেই বললেই চলে। আর যারা এগিয়ে আসেন, তাদের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। ট্রল, কটাক্ষ, এমনকি শারীরিক হেনস্তার মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।’

রাজনীতির পরিবেশ প্রসঙ্গে মার্জিয়া বলেন, ‘‘এটা আমার কাছে একদমই সহায়ক বলে মনে হয় না। একটা প্রচলিত ধারণা আছে যে, ‘ভালো মেয়েরা রাজনীতি করে না’। এমনকি আমাদের সাবেক নারী প্রধানমন্ত্রীরাও অনেক সময় কেবল নারী বলেই নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামী বা অন্যান্য রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল তো নারীদের কার্যকরভাবে দলে নিতে চায় না।”
তবে তিনি আশাবাদী এবং বলেন যে, ‘যুগ বদলেছে। এখন সময় এসেছে নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বাড়ানোর। নতুন প্রজন্মের মেয়েরা, যেমন এনসিপির সদস্য তাসনিম জারারা যেভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন, সেটা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। তবে অবশ্যই আমাদের লিঙ্গ সংবেদনশীল সামাজিকীকরণ করতে হবে।’
অন্যদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাতেমা আলী মনে করেন, ‘রাজনীতি একটি জটিল বিষয়, যা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত হয়। গণ-অভ্যুত্থানের পর সবাই আশা করছিলাম একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ আসবে। কিন্তু এখনই বলা মুশকিল সেটা কতটা বাস্তবায়িত হবে, তবে আমি আশাবাদী।’
তিনি বলেন, ‘নারী হিসেবে রাজনীতি করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসে পরিবার থেকে। আমার পরিবার এখনো রাজনীতিতে অংশগ্রহণ মেনে নিতে পারে না।’
তবে ফাতেমা মনে করেন, নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, যদিও এখনো পরিপূর্ণ নয়। ‘কিছু বাধা আছে, যেমন- সামাজিক চাপ, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, সুযোগের অভাব। এসব কাটিয়ে উঠতে পারলে নারীরাও পুরুষদের মতো রাজনীতিতে সমানতালে অংশ নিতে পারবে।’
বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষেণ এমন যে, ‘এটা এখনো নারীর জন্য নিরাপদ ও সহায়ক নয়। জেন্ডার স্টেরিওটাইপ এখনো ভাঙেনি। যার ফলে রাজনীতিতে নারীরা অংশগ্রহণ করবে এটা এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও অনেকের কাছে স্বাভাবিক ঘটনা নয়।’
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আনিকা তাবাসসুম মনে করেন, রাজনীতি যতটা নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়, বাস্তবে বিষয়টি ততটা নেতিবাচক নয়। তার মতে, ‘রাজনীতি নিয়ে সবারই নিজস্ব মতাদর্শ থাকতেই পারে। তবে বর্তমানে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে, বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি বড় দল যেমন আওয়ামী লীগের পতন হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে নারীরা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কতটুকু সুযোগ-সুবিধা পাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।’
আনিকার মতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এখনো অনেকটা সীমিত এবং তার প্রধান কারণ পারিবারিক অনুমতির অভাব। তিনি বলেন, ‘খুব কম সংখ্যক পরিবার আছে যারা মেয়েদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার অনুমতি দেয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি যেহেতু এখানে কোনো নিশ্চয়তা দেখতে পাচ্ছি না, তাই রাজনীতির দিকে না যাওয়াকেই নিরাপদ মনে করি।’
রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘একেবারেই যে নারীরা অংশগ্রহণ করছে না, তা নয়- তবে তুলনামূলকভাবে পুরুষদের সংখ্যাই বেশি।’
রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে তার অবস্থান স্পষ্ট: ‘আমার কাছে বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবেশ মোটেই নিরাপদ ও সহায়ক মনে হয় না। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ও বাকস্বাধীনতা ছিল না। মতপ্রকাশের জন্য অনেককে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। সাংবাদিকদের জন্য প্রণীত ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’-এর মধ্যেই তার প্রমাণ মেলে।’
নারীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে হলে কী ধরনের পরিবর্তন দরকার- এ প্রশ্নের উত্তরে আনিকা বলেন, ‘নারী-পুরুষ উভয়েরই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি হলেও, যেহেতু নারীরা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে, তাই তাদের জন্য সুযোগ-সুবিধায় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। প্রথমত, রাজনীতিকে নারীদের জন্য নিরাপদ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শুধু আইন/নিয়ম তৈরি করলেই হবে না, আমাদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজে প্রচলিত স্টেরিওটাইপ ধারণাগুলোরও অবসান ঘটাতে হবে।’
সবশেষে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম। এখানে নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবাইকে সমানভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। যেকোনো সেক্টরে যখন নারী-পুরুষ একসঙ্গে কাজ করবে, তখনই সত্যিকারের অগ্রগতি সম্ভব।’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তামান্না আক্তার মনে করেন, রাজনীতি কোনো আলাদা বিষয় নয়; বরং জীবনের প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি বলেন, ‘রাজনীতি আমাদের জীবনধারা, চলাফেরারই একটি রূপ। তবে বর্তমান সমাজে রাজনীতির সঙ্গে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের একটি জটিল সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আর সেই জায়গা দখল করে আছেন পুরুষরা।’
তামান্না বিশ্বাস করেন, রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে, একজন নারী হিসেবে এই অংশগ্রহণের অনুমতি পাওয়াটা এখনো সীমিত। তিনি বলেন, ‘আগেও নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বাধা ছিল, এখনো তা রয়ে গেছে। যদিও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে আমি কিছুটা আশাবাদী, কারণ এখন এনসিপির মতো দলগুলোতে আমরা দেখছি, নারী ও পুরুষ একসঙ্গে কাজ করছে।’
সংরক্ষিত আসনের বাইরে নারীর উপস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আসলে যতটুকু কোটা দেওয়া আছে, তার বাইরে নারীদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি এনসিপি প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে নারী সদস্যরা সরব ভূমিকা রাখছেন, যা উৎসাহজনক।’
তবে রাজনীতির পরিবেশ সম্পর্কে তামান্নার অবস্থান স্পষ্ট। তিনি যুক্ত করেন, এটি এখনো নারীর জন্য নিরাপদ বা সহায়ক নয়। তিনি বলেন, ‘তাসনিম জারার মতো একজন শিক্ষিত ও পেশাদার নারী রাজনীতিতে যোগ দিয়ে যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রোল, কটাক্ষ ও অপমানের শিকার হয়েছেন, তা খুবই হতাশাজনক। তার মতো ব্যক্তিও যদি এসবের মুখোমুখি হন, তাহলে সাধারণ নারীরা কীভাবে আগ্রহী হবে?’
তামান্নার মতে, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। ‘নারীদের প্রতি ঘৃণাসূচক মন্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতামত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে যোগ্য হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে, তাহলেই আমরা সত্যিকারের অগ্রগতির পথে এগোতে পারব’—জানান তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী য়ইমেনু মারমা নারীদের রাজনৈতিক সচেতনতা বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও ভাবনা ভাগ করে বলেন, ‘আমাদের সমাজে নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এখনো নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। নারী যদি রাজনীতিতে যায়, তখনই তাকে অসম্মান বা অপমান সহ্য করতে হয়। এমন অভিজ্ঞতার কথা ভেবে অনেকেই এই পথে আসতে চান না।’
পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। ‘আমার পরিবারও রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেয় না। কারণ, তারা মনে করে এটি নারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ আমরা যদি একটি নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ পেতাম, তাহলে আমরাও দেশের জন্য কিছু করতে পারতাম।’
য়ইমেনু মনে করেন, নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে প্রথমেই রাজনীতিকে একটি নারীবান্ধব প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করতে হবে। ‘যে দিন সমাজ নারীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়াকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করবে, সে দিনই আমরা প্রকৃত অর্থে রাজনৈতিকভাবে নারী-পুরুষের সমতা অর্জন করতে পারব।’
রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণকে ঘিরে শিক্ষিত তরুণীদের ভাবনার এ চিত্র বলে দেয় যে, সমস্যা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে সম্ভাবনাও। নিরাপদ পরিবেশ, পারিবারিক সমর্থন, ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সামাজিক মানসিকতা বদলানো গেলে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শুধু বাড়বেই না; বরং গঠনমূলক নেতৃত্ব তৈরির পথও প্রশস্ত হবে।
.jpg)