বাংলাদেশের শহুরে জীবনধারায় বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং এক ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার সীমানায় নারীর বিবাহবিচ্ছেদের হার সম্প্রতি চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মোট ১৩,২৮৮টি বিচ্ছেদের আবেদন দাখিল হয়, যার প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ আবেদন এসেছে নারীপক্ষ থেকে। এ পরিসংখ্যান আমাদের দেখায় যে, প্রতি প্রায় ৪০ মিনিটে একজন শহুরে নারী নিজের জীবনকে পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। দেশের সার্বিক বিচ্ছেদের হার কম হলেও, এই চিত্র শহুরে নারীর মধ্যে তাদের স্বাধিকারবোধের উত্থান এবং আর্থিক স্বাবলম্বিতার প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে স্পষ্ট করে তোলে।
তবে সংখ্যার এ উজ্জ্বলতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ এবং নীরব অর্থনৈতিক সংগ্রামের কাহিনি। আমাদের সমাজ ও আইন এখনো নারীর গৃহস্থালির কাজ, সন্তান লালন-পালন ও পরিবারের মানসিক ভারসাম্যের দায়িত্বকে কোনো আর্থিক স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে, বিচ্ছেদের পর এই নারীরা কার্যত শূন্য হাতে এক অচেনা বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তাদের জন্য চাকরির সীমিত সুযোগ, দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ের অভাব এবং পৈতৃক বা স্বামী-অর্জিত সম্পত্তিভিত্তিক অধিকারহীনতা জীবনকে সংকটাপন্ন করে তোলে। আন্তর্জাতিক সূচকেও এ দুর্বলতা স্পষ্ট। World Bank-এর ‘Women, Business and the Law-২০২৪’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নারী সক্ষমতার আইনি কাঠামোর মান মাত্র ৩২.৫/১০০, যা আইনি সুরক্ষার দুর্বল বাস্তবায়নকে নির্দেশ করে। সম্পত্তি ভাগবণ্টন, সন্তানের হেফাজত এবং ভরণপোষণ (আলিমনি) পাওয়ার প্রক্রিয়া এত দীর্ঘ ও জটিল যে, তা নারীকে অর্থনৈতিকভাবে আরও দুর্বল করে তোলে।
আর্থিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয় সামাজিক এবং মানসিক চাপ। সমাজ এখনো ‘ডিভোর্সড নারী’কে প্রায়শই অঙ্গীকারহীন বা ব্যর্থ হিসেবে দেখে, যা তার আত্মসম্মানহানি ঘটায় এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে। নারী একা হয়েও তাকেই সন্তান লালনের সব দায় বহন করতে হয়। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত গবেষণায় দেখা গেছে, বিচ্ছেদের পর নারীর মধ্যে উদ্বেগ এবং একাকিত্বের হার ৮৩.৬৪ শতাংশের বেশি, যা মানসিক জীবনে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
গ্রামীণ নারীর বিচ্ছেদ-পরবর্তী সংগ্রাম শহুরে নারীর চেয়ে গুণগতভাবে ভিন্ন এবং বহুলাংশে কঠিন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর উপার্জন ক্ষমতা সীমিত এবং সম্পত্তির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রায় নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ গ্রামীণ নারী বিচ্ছেদের পর সম্পূর্ণভাবে তাদের পিতৃকুল বা ভাইদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যেখানে সামাজিক কলঙ্ক আরও কঠোর হয়। শহুরে নারীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ কিছুটা সহজলভ্য হলেও, গ্রামীণ নারী সামাজিক চাপের কারণে সেই সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন। উপরন্তু, আইনি প্রক্রিয়ায় প্রবেশাধিকারের অভাব তাদের স্থানীয় প্রভাবশালী বা সালিশি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, যেখানে নারীর অধিকার সাধারণত উপেক্ষিত থাকে।
নারীর বিচ্ছেদ কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি সামাজিক কাঠামো, অর্থনীতি এবং মানসিক সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তবে, সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই নীরব সংগ্রামকে নতুন শক্তির উৎসে পরিণত করা যায়। প্রথমত, আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি, আলিমনি এবং সম্পত্তি ভাগবণ্টন সংক্রান্ত আইনের কঠোর ও দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পারিবারিক আইনে গৃহস্থালির কাজের অর্থনৈতিক মূল্য স্বীকৃত হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, আর্থিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। নারীদের জন্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, বিশেষত গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কুটির শিল্পের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন জরুরি।
সর্বোপরি, মানসিক ও সামাজিক সহায়তা এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কাউন্সেলিং, সহায়তা এবং সামাজিক পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলো শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। সমাজকে অবশ্যই মেনে নিতে হবে যে, বিচ্ছেদ মানে ব্যর্থতা নয়, বরং আত্মনির্ভরতা ও নতুন সম্ভাবনার সূচনা। শহরের প্রতিটি নীরব নারী, এবং গ্রামের প্রতিটি আত্মনির্ভরতা প্রত্যাশী নারী; সবার গল্পই সংগ্রামের, প্রত্যয়ের এবং পুনর্জাগরণের গল্প। সমাজ যদি তার পাশে দাঁড়ায়, তাহলে বিচ্ছেদ আর পরাজয় নয়; বরং তা হবে শক্তি, সাহস এবং সম্ভাবনার প্রতীক।
/এস লুপিন
.jpg)