ঢাকা ৪ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির খসড়া ফাঁস বিশ্বকাপে প্রথম গোলে পর্তুগালের বিপক্ষে সমতায় কঙ্গো ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে: জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল মেসির পর রোনালদোর কীর্তি পর্তুগালের একাদশে রোনালদো ইরান ও লেবাননে মানবিক সহায়তা দেবে চীন লায়লা বাউলের পাশে দাঁড়াল সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ফের উত্তপ্ত লেবানন, নতুন হামলা ইসরায়েলের চুক্তি না মানলে ইরানে ফের হামলার হুমকি ট্রাম্পের ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপন অনুষ্ঠান হবে জুনের শেষ সপ্তাহে ঝিনাইদহে মোটরসাইকেল চোরচক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার জোরপূর্বক মানুষকে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে ভারত—হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দাবি মায়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া হবে, ভারত সীমান্তেও পরিকল্পনা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যারা বলে ‘সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না’ তাদের থেকে সতর্ক থাকুন: প্রধানমন্ত্রী রংপুরের ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় ৬৬৫ নারী নাসার আর্টেমিস থ্রি মিশনের নভোচারীদের নাম চূড়ান্ত নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে দুই শ্রমিক নিহত শেষ যাত্রা জানাজায়, মাঝপথেই থেমে গেল জীবন সাজেকে বিজিবির বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ বিতরণ পিটারসেন অটোমোটিভ মিউজিয়াম অটোমোবাইল ডেস্ক সময় টিভির এমডি জোবায়েরসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ZEEHO Bangladesh ও Riding School BD-এর মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর যুক্তরাষ্ট্রে ৫ হাজার ৮০৭ প্রবাসীর হাতে যাচ্ছে এনআইডি হেরোইনসহ মা-বাবা ও ছেলে আটক, বাড়িতে আগুন সমুদ্রের নিচে চীনের নতুন ডেটা সেন্টার সোনারগাঁয়ে স্কুল ফাঁকি দিয়ে মেঘনায় গোসল, দুই স্কুল ছাত্রের মৃত্যু বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমল ৫ শতাংশের বেশি সোনারগাঁয়ে মেঘনায় গোসলে নেমে ২ শিক্ষার্থীর মৃত্যু নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ডে নির্মিত হচ্ছে ৫টি ‘রিভারাইন পেট্রল ভেসেল’ স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসরে স্যামসাংয়ের নতুন ল্যাপটপ
Nagad desktop

বিচ্ছেদ কি নারীর মুক্তি নাকি নতুন যুদ্ধের শুরু?

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৫:১৪ পিএম
বিচ্ছেদ কি নারীর মুক্তি নাকি নতুন যুদ্ধের শুরু?

বাংলাদেশের শহুরে জীবনধারায় বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং এক ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার সীমানায় নারীর বিবাহবিচ্ছেদের হার সম্প্রতি চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মোট ১৩,২৮৮টি বিচ্ছেদের আবেদন দাখিল হয়, যার প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ আবেদন এসেছে নারীপক্ষ থেকে। এ পরিসংখ্যান আমাদের দেখায় যে, প্রতি প্রায় ৪০ মিনিটে একজন শহুরে নারী নিজের জীবনকে পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। দেশের সার্বিক বিচ্ছেদের হার কম হলেও, এই চিত্র শহুরে নারীর মধ্যে তাদের স্বাধিকারবোধের উত্থান এবং আর্থিক স্বাবলম্বিতার প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে স্পষ্ট করে তোলে।

তবে সংখ্যার এ উজ্জ্বলতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ এবং নীরব অর্থনৈতিক সংগ্রামের কাহিনি। আমাদের সমাজ ও আইন এখনো নারীর গৃহস্থালির কাজ, সন্তান লালন-পালন ও পরিবারের মানসিক ভারসাম্যের দায়িত্বকে কোনো আর্থিক স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে, বিচ্ছেদের পর এই নারীরা কার্যত শূন্য হাতে এক অচেনা বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তাদের জন্য চাকরির সীমিত সুযোগ, দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ের অভাব এবং পৈতৃক বা স্বামী-অর্জিত সম্পত্তিভিত্তিক অধিকারহীনতা জীবনকে সংকটাপন্ন করে তোলে। আন্তর্জাতিক সূচকেও এ দুর্বলতা স্পষ্ট। World Bank-এর ‘Women, Business and the Law-২০২৪’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নারী সক্ষমতার আইনি কাঠামোর মান মাত্র ৩২.৫/১০০, যা আইনি সুরক্ষার দুর্বল বাস্তবায়নকে নির্দেশ করে। সম্পত্তি ভাগবণ্টন, সন্তানের হেফাজত এবং ভরণপোষণ (আলিমনি) পাওয়ার প্রক্রিয়া এত দীর্ঘ ও জটিল যে, তা নারীকে অর্থনৈতিকভাবে আরও দুর্বল করে তোলে।

আর্থিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয় সামাজিক এবং মানসিক চাপ। সমাজ এখনো ‘ডিভোর্সড নারী’কে প্রায়শই অঙ্গীকারহীন বা ব্যর্থ হিসেবে দেখে, যা তার আত্মসম্মানহানি ঘটায় এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে। নারী একা হয়েও তাকেই সন্তান লালনের সব দায় বহন করতে হয়। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত গবেষণায় দেখা গেছে, বিচ্ছেদের পর নারীর মধ্যে উদ্বেগ এবং একাকিত্বের হার ৮৩.৬৪ শতাংশের বেশি, যা মানসিক জীবনে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

গ্রামীণ নারীর বিচ্ছেদ-পরবর্তী সংগ্রাম শহুরে নারীর চেয়ে গুণগতভাবে ভিন্ন এবং বহুলাংশে কঠিন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর উপার্জন ক্ষমতা সীমিত এবং সম্পত্তির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রায় নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ গ্রামীণ নারী বিচ্ছেদের পর সম্পূর্ণভাবে তাদের পিতৃকুল বা ভাইদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যেখানে সামাজিক কলঙ্ক আরও কঠোর হয়। শহুরে নারীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ কিছুটা সহজলভ্য হলেও, গ্রামীণ নারী সামাজিক চাপের কারণে সেই সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন। উপরন্তু, আইনি প্রক্রিয়ায় প্রবেশাধিকারের অভাব তাদের স্থানীয় প্রভাবশালী বা সালিশি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, যেখানে নারীর অধিকার সাধারণত উপেক্ষিত থাকে।

নারীর বিচ্ছেদ কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি সামাজিক কাঠামো, অর্থনীতি এবং মানসিক সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তবে, সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই নীরব সংগ্রামকে নতুন শক্তির উৎসে পরিণত করা যায়। প্রথমত, আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি, আলিমনি এবং সম্পত্তি ভাগবণ্টন সংক্রান্ত আইনের কঠোর ও দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পারিবারিক আইনে গৃহস্থালির কাজের অর্থনৈতিক মূল্য স্বীকৃত হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, আর্থিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। নারীদের জন্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, বিশেষত গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কুটির শিল্পের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন জরুরি।

সর্বোপরি, মানসিক ও সামাজিক সহায়তা এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কাউন্সেলিং, সহায়তা এবং সামাজিক পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলো শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। সমাজকে অবশ্যই মেনে নিতে হবে যে, বিচ্ছেদ মানে ব্যর্থতা নয়, বরং আত্মনির্ভরতা ও নতুন সম্ভাবনার সূচনা। শহরের প্রতিটি নীরব নারী, এবং গ্রামের প্রতিটি আত্মনির্ভরতা প্রত্যাশী নারী; সবার গল্পই সংগ্রামের, প্রত্যয়ের এবং পুনর্জাগরণের গল্প। সমাজ যদি তার পাশে দাঁড়ায়, তাহলে বিচ্ছেদ আর পরাজয় নয়; বরং তা হবে শক্তি, সাহস এবং সম্ভাবনার প্রতীক।

/এস লুপিন

সংবাদ উপস্থাপক থেকে জনপ্রতিনিধি: শামীমা তন্বীর অসাধারণ অভিযাত্রা

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০১:০৫ পিএম
সংবাদ উপস্থাপক থেকে জনপ্রতিনিধি: শামীমা তন্বীর অসাধারণ অভিযাত্রা

একজন নারী যখন নিজের স্বপ্নকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার বানান, তখন তার গল্প অনুপ্রেরণার হয়ে ওঠে হাজারও মানুষের জন্য। যুক্তরাজ্যের লন্ডন বরোর লিটল ইলফোর্ড ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শামীমা নাসরিন তন্বীর পথচলা ঠিক তেমনই এক অনন্য উদাহরণ।

সংবাদ উপস্থাপক, মেডিকেল সেক্রেটারি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব–এসব পরিচয়ের পাশাপাশি এখন তিনি একজন জনপ্রতিনিধি। আর এই অর্জন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি নারীদের সম্ভাবনারও প্রতীক।

টাঙ্গাইলে জন্ম নেওয়া শামীমা নাসরিন তন্বী ছোটবেলা থেকেই মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন। তবে রাজনীতিতে আসার পরিকল্পনা আগে থেকে ছিল না। তার ভাষায়, মানুষের সেবা করার ইচ্ছাই ধীরে ধীরে তাকে এই পথে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন কমিউনিটির নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে তিনি উপলব্ধি করেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় থাকলে আরও কার্যকরভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। সেই উপলব্ধিই তাকে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সাহস জুগিয়েছে।

লন্ডনের স্থানীয় নির্বাচনে তিনি ‘নিউহ্যাম ইন্ডিপেন্ডেন্টস’ পার্টির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছেন। নতুন একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হয়েও মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারা তার কাছে বড় প্রাপ্তি। তন্বীর মতে, এই বিজয় কেবল একজন প্রার্থীর নয়, বরং স্থানীয় মানুষের পরিবর্তনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। মানুষ নতুন নেতৃত্ব ও বাস্তবসম্মত সমাধানে বিশ্বাস রেখেই তাকে নির্বাচিত করেছে।

তার এই যাত্রার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বহুমাত্রিক পরিচয়ের সফল সমন্বয়। একদিকে তিনি যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে (NHS) মেডিকেল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে জনপ্রতিনিধি হিসেবেও মানুষের সেবা করছেন। তিনি মনে করেন, দুটি ক্ষেত্রের মূল উদ্দেশ্য একই–মানুষের কল্যাণ। হাসপাতালের কাজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান, যা কাউন্সিলর হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাকে আরও সংবেদনশীল ও কার্যকর করে তোলে।

সংবাদ পাঠক ও উপস্থাপক হিসেবে সফল ক্যারিয়ার থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তন্বী বলেন–সংবাদ উপস্থাপনা তাকে মানুষের গল্প বলার সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু রাজনীতি তাকে সেই গল্পের বাস্তব সমাধানে কাজ করার সুযোগ এনে দিয়েছে। তিনি শুধু সমস্যার বর্ণনাকারী হতে চাননি; পরিবর্তনের অংশীদার হতে চেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, নারী হিসেবে পথচলায় চ্যালেঞ্জও কম ছিল না। নেতৃত্বের জায়গায় এখনো নারীদের সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রচলিত ধারণা রয়েছে। অনেক সময় নিজেকে বারবার প্রমাণ করতে হয়েছে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম ও সততা থাকলে কোনো বাধাই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তার এই বিশ্বাসই তাকে প্রতিটি ধাপে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে।

রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তন্বীর বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, রাজনীতি কোনোভাবেই শুধু পুরুষদের ক্ষেত্র নয়। সমাজের উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্ব সমানভাবে প্রয়োজন। তাই নারীদের নিজেদের সক্ষমতার ওপর আস্থা রেখে ভয় না পেয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

এই সাফল্যের পেছনে পরিবারের ভূমিকার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তন্বী। ব্যস্ত কর্মজীবনের মাঝেও পরিবারের সমর্থন তাকে মানসিক শক্তি ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি মনে করেন, পরিবারের আস্থা ছাড়া এমন বহুমাত্রিক দায়িত্ব সামলানো সম্ভব হতো না।

লন্ডনের নির্বাচনে তার বিজয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাংলাদেশ, বিশেষ করে টাঙ্গাইল এলাকায় আনন্দের ঢেউ ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করায় অনেকেই এটিকে নিজেদের গর্ব হিসেবে দেখছেন। তন্বী নিজেও এই ভালোবাসায় অভিভূত।

বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশকে তিনি নিজের শিকড় বলে মনে করেন। ভবিষ্যতে শিক্ষা, নারী নেতৃত্ব, যুব উন্নয়ন ও কমিউনিটি উন্নয়ন নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে তার। যুক্তরাজ্যে কাজের অভিজ্ঞতাকে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে চান তিনি। তার বিশ্বাস, প্রবাসে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তন্বী বলেন, প্রথম দায়িত্ব মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা। তিনি চান, তার কাজের মাধ্যমে মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আসুক। দীর্ঘমেয়াদে আরও বৃহত্তর পরিসরে জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা, এমন একটি দৃষ্টান্ত রেখে যাওয়া যাতে আগামী প্রজন্মের মেয়েরা বিশ্বাস করতে পারে—পরিশ্রম, সততা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।

শামীমা নাসরিন তন্বী; যিনি নিজের পেশাগত পরিচয়, ব্যক্তিগত স্বপ্ন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে এক সুতোয় গেঁথে প্রমাণ করেছেন–নেতৃত্বের জন্য লিঙ্গ নয়, প্রয়োজন যোগ্যতা, নিষ্ঠা ও মানুষের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা।

/এসএল

নারী থাকুক নিরাপদে...

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম
নারী থাকুক নিরাপদে...

একটি কন্যাশিশুর জন্মকে ইসলামে শুধু পারিবারিক আনন্দ নয়, বরং আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসেবে দেখা হয়েছে। হাদিসে কন্যাসন্তানকে স্নেহ, লালন-পালন ও উত্তমভাবে প্রতিপালনের মাধ্যমে জান্নাত লাভের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে মায়ের মর্যাদাকে এতটাই উচ্চে স্থান দেওয়া হয়েছে যে, জান্নাতকে মায়ের পদতলে বলা হয়েছে। বোন পরিবারের স্নেহ ও বন্ধনের প্রতীক, আর স্ত্রীকে বলা হয়েছে একে অপরের পোশাক–যিনি জীবনের নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও প্রশান্তির সঙ্গী। 

অথচ বাস্তবতার নির্মম প্রশ্ন হলো–যে সমাজ ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানবিকতার ভাষায় নারীকে এত সম্মান দেয়, সেই সমাজেই মা, বোন ও কন্যার জীবনের নিরাপত্তা আজ কোথায়?
প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুললেই চোখে পড়ে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক সহিংসতা, অ্যাসিড হামলা, অনলাইন হয়রানি কিংবা হত্যার খবর। রাজধানীর মিরপুরে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। সিলেটে মাত্র চার বছরের এক শিশুর জীবন শেষ হয়েছে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে। ঠাকুরগাঁওয়ে আরেক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে জঙ্গলে। এ ছাড়াও ২০২০ সালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে সিলেটের এমসি কলেজে সংঘটিত গণধর্ষণের মামলার বিচার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সংকট নয়; এটি একটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং আইনের শাসনের কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তোলে সবার সামনে।

অনেক সময় অপরাধের ভয়াবহতার চেয়ে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে ভুক্তভোগীর পরবর্তী অভিজ্ঞতা। একজন নির্যাতিত নারী বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো সামাজিক অপমানের মুখোমুখি হন। ধর্ষণের শিকার মেয়েটির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তার পোশাক, চলাফেরা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। পরিবারের অনেকেই ‘সম্মান’ রক্ষার নামে ঘটনাটি গোপন রাখার চেষ্টা করেন। ফলে অপরাধী বুঝে যায় যে, তার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল এবং শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সমস্যা কোথায়? 

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতার পেছনে রয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যখন অপরাধ করে দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তি না পাওয়ার নজির তৈরি হয়, তখন অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমে যায় এবং তারা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। প্রযুক্তির অপব্যবহারও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গোপন ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, সাইবার বুলিং, ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা কিংবা ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনা এখন নারীর নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ।

পারিবারিক শিক্ষার অভাবও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। অনেক পরিবারে ছেলেদের শেখানো হয় না যে নারীর সম্মতি, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মর্যাদা কী। বরং ছোটবেলা থেকেই পুরুষতান্ত্রিক কিছু ধারণা অজান্তে তাদের মধ্যে গেঁথে দেওয়া হয়, যেখানে নারীর প্রতি কর্তৃত্বকে স্বাভাবিক মনে করা হয়।

গণমাধ্যম, বিনোদন এবং সামাজিক পরিবেশও মানুষের আচরণ গঠনে ভূমিকা রাখে। যখন নারীকে শুধু ভোগ্যপণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয় বা সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে দেখানো হয়, তখন তা সমাজে নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে।

সমাধান কী?

তবে এই সংকটের সমাধান অসম্ভব নয়। প্রথমত, আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তার দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত হলে সমাজে শক্ত বার্তা যাবে। দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে একজন নারী অভিযোগ করতে গিয়ে দ্বিতীয়বার নির্যাতনের শিকার না হন। পুলিশ, হাসপাতাল ও আদালতে সংবেদনশীল সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলে-মেয়ে উভয়কেই পারস্পরিক সম্মান, মানবিকতা এবং সম্মতির গুরুত্ব শেখাতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রকৃত শিক্ষা, নৈতিক চর্চা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সমাজকে ইতিবাচকভাবে বদলে দিতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সচেতনতা বাড়ানো এবং সাইবার অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় কথা, নারীর নিরাপত্তাকে শুধু নারীর সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি পরিবারের, একটি সমাজের এবং একটি রাষ্ট্রের সম্মানের প্রশ্ন। যে সমাজ নিজের মা, বোন ও কন্যাকে নিরাপদ রাখতে পারে না, সেই সমাজের উন্নয়ন কখনোই পূর্ণতা পায় না।

/এসএল

অনলাইনে নারীরাই কেন কটূক্তির শিকার?

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ০১:৫০ পিএম
অনলাইনে নারীরাই কেন কটূক্তির শিকার?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক সময় ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের জায়গা। এখন এটি মতপ্রকাশ, পেশাগত পরিচিতি তৈরি, ব্যবসা পরিচালনা এবং সামাজিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু এই একই জায়গা নারীদের জন্য প্রায়ই অপমান, কটূক্তি ও হয়রানির ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। 

প্রশ্ন হলো, অনলাইনে নারীরা কেন এত সহজ টার্গেট? এর উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু প্রযুক্তির দিকে তাকালে হবে না; দেখতে হবে সমাজ, সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার কাঠামোকেও।

অনেকেই মনে করেন, অনলাইন হয়রানি একটি নতুন সমস্যা। বাস্তবে এটি পুরোনো বৈষম্যেরই নতুন রূপ। সমাজে নারীদের পোশাক, চলাফেরা, পেশা বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্তব্য করার যে প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেটিকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

ক্ষমতার রাজনীতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন কটূক্তি অনেক সময় ক্ষমতার রাজনীতির অংশ। সমাজে যখন নারীরা শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন, তখন কিছু মানুষ সেটিকে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত অবস্থানের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।

ফলে নারীদের চুপ করিয়ে দেওয়া, আত্মবিশ্বাস নষ্ট করা কিংবা জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি উপায় হয়ে দাঁড়ায় অনলাইন আক্রমণ। এ কারণেই নারী সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, রাজনীতিবিদ কিংবা জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতারা তুলনামূলক বেশি ঘৃণামূলক মন্তব্যের শিকার হন।

অজ্ঞাত পরিচয়ের সাহস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, অজ্ঞাত পরিচয়ে সক্রিয় থাকার সুযোগ। অনেকেই নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে কটূক্তি করেন। বাস্তব জীবনে যেটি বলার সাহস পান না, সেটিই অনলাইনে নির্দ্বিধায় লিখে ফেলেন।

মনোবিজ্ঞানীরা এটিকে ‘অনলাইন ডিসইনহিবিশন’ বলে থাকেন। অর্থাৎ পর্দার আড়ালে থাকার কারণে মানুষ নিজের আচরণের সামাজিক দায়বদ্ধতা কম অনুভব করে। ফলে সহানুভূতি কমে যায় এবং আক্রমণাত্মক আচরণ বেড়ে যায়।

অ্যালগরিদম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সাধারণত বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়া কনটেন্টকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। দুঃখজনকভাবে বিতর্ক, বিদ্বেষ ও উত্তেজনাপূর্ণ মন্তব্য অনেক সময় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বেশি সম্পৃক্ততা তৈরি করে।

ফলে একটি নারীবিদ্বেষী মন্তব্য বা অপমানজনক পোস্ট অল্প সময়ের মধ্যে হাজারও মানুষের সামনে পৌঁছে যায়। এতে শুধু একজন নারী নন, পুরো অনলাইন পরিবেশই নারীদের জন্য কম নিরাপদ হয়ে ওঠে।

অনেকের ধারণা, অনলাইনের মন্তব্যকে গুরুত্ব না দিলেই হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নিয়মিত কটূক্তি, অপমান বা হুমকির শিকার হলে উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। অনেক নারী নিজের মতামত প্রকাশ করা বন্ধ করে দেন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে সরে যান। আবার অনেকের ক্ষেত্রে এর প্রভাব কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত সম্পর্কেও পড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনলাইন হয়রানি অনেক সময় ভার্চুয়াল জগতের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতেও রূপ নিতে পারে।

পরিবর্তন কোথা থেকে শুরু হবে?

অনলাইনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে সমানভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ঘৃণামূলক বক্তব্য শনাক্ত ও অপসারণে আরও কার্যকর হতে হবে। একই সঙ্গে নারীদের জন্য অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ ও নিরাপদ করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় কথা, অনলাইনে নারীদের বিরুদ্ধে কটূক্তিকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘মজা’ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ প্রতিটি অপমানজনক মন্তব্য শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, নারীদের জনপরিসরে অংশগ্রহণের অধিকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

/এসএল

নারী অধিকার যখন ভূরাজনীতির হাতিয়ার

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম
নারী অধিকার যখন ভূরাজনীতির হাতিয়ার
যুদ্ধ শেষ হলেও নারীদের বেদনা, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তা থেকে যায় দীর্ঘদিন। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমারা ইতিহাসের বিভিন্ন যুদ্ধে নারীদের যুদ্ধের শিকার, প্রতিরোধের প্রতীক; আবার অনেক সময় যুদ্ধের যৌক্তিকতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে আধুনিক বিশ্বে মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও নারী মুক্তির ভাষা যত বেশি শক্তিশালী হয়েছে, ততই এই ভাষাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগও জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে ‘নারী অধিকার রক্ষা’ একটি পরিচিত যুক্তি হিসেবে সামনে এসেছে।

প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি নারীর অধিকার রক্ষার জন্য এসব যুদ্ধ হয়েছে, নাকি নারীমুক্তির ভাষা কখনো কখনো বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক স্বার্থের আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে?

বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার নিয়ে উদ্বেগের কোনো ঘাটতি নেই। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে নারীর শিক্ষা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবু আজও প্রতিমুহূর্তে বিশ্বের অসংখ্য নারী পারিবারিক সহিংসতা, বৈষম্য, দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন। এই বাস্তবতায় অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়, যখন কোনো দেশে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়, তখন হঠাৎ করে সেই দেশের নারীদের মুক্তির প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে।

এই প্রবণতাকে অনেক গবেষক ‘নারী অধিকারের অস্ত্রায়ণ’ বলে অভিহিত করেন। অর্থাৎ নারীর অধিকার ও লিঙ্গসমতার ভাষাকে প্রকৃত সামাজিক পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক, সামরিক বা কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে। সেই সময় পশ্চিমা রাজনৈতিক বক্তব্যে আফগান নারীদের দুর্দশার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। তালেবান শাসনের অধীনে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। অনেকের মতে, এটি ছিল বাস্তব সমস্যার প্রতিফলন। তবে সমালোচকদের একটি অংশের দাবি, নারীর অধিকারের প্রশ্নকে যুদ্ধের নৈতিক বৈধতা তৈরির জন্যও ব্যবহার করা হয়েছিল।

দুই দশকের যুদ্ধের পর আফগানিস্তানের বাস্তবতা কী দাঁড়িয়েছে? লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, হাজার হাজার নারী স্বজন হারিয়েছে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে ফেলেছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে–যে যুদ্ধ নারীর মুক্তির নামে শুরু হয়েছিল, তার চূড়ান্ত ফলাফল কি সত্যিই নারীদের জন্য মুক্তি বয়ে এনেছে?

একই ধরনের বিতর্ক দেখা গেছে ইরাক ও লিবিয়ার ক্ষেত্রেও। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নারী অধিকারের কথা বলে সামরিক হস্তক্ষেপকে সমর্থন করা হলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। আর যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে নারী ও শিশুদের।

কারণ যুদ্ধ কেবল সীমান্তে লড়াই নয়। যুদ্ধ মানে ঘর হারানো, পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়া, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট এবং যৌন সহিংসতার ঝুঁকি বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নারী ও কন্যাশিশুরা প্রায়ই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তারা শুধু বোমা ও গুলির শিকার হয় না; বরং যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও বহন করে।

ফিলিস্তিন থেকে ইরান—যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম মূল্য আজও দিচ্ছেন নারীরাই। গাজার রাফাহ সীমান্ত দিয়ে ফিরে আসা বহু নারী নিজেদের ঘরবাড়ির জায়গায় এখন শুধু ধ্বংসস্তূপ দেখছেন। একসময় যেখানে ছিল সংসার, সন্তানদের হাসি আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন, সেখানে এখন যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন। বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য সংকট, নিরাপত্তাহীনতা ও প্রিয়জন হারানোর বেদনা তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

একইভাবে সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ নামের একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই হামলায় ১৬৫ থেকে ১৭০-এর বেশি স্কুলছাত্রী ও শিক্ষাকর্মী নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই ছিল ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়ে। হামলায় বিদ্যালয় ভবন ধসে পড়ে এবং শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়।

যুদ্ধ শুধু ঘর ভাঙেনি, ভেঙে দিয়েছে তাদের স্বপ্নও। ছবি: সংগৃহীত

এই হামলা শুধু কয়েকটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি; এটি শত শত পরিবারের স্বপ্ন ধ্বংস করেছে। যে মেয়েরা বই হাতে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিল, তারা মুহূর্তেই যুদ্ধের শিকার হয়ে যায়। একই সংঘাতে বহু নারী ও শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, ঘরবাড়ি হারিয়েছেন এবং নিরাপত্তাহীন জীবনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের রাজনৈতিক লক্ষ্য যাই হোক না কেন, এর সবচেয়ে নির্মম মূল্য পরিশোধ করছে সাধারণ নারী ও শিশুরাই।

নারী অধিকারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আরেকটি বিপদ হলো, এটি প্রকৃত নারীবাদী আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যখন কোনো সামরিক শক্তি নারীমুক্তির ভাষা ব্যবহার করে যুদ্ধকে বৈধতা দেয়, তখন অনেক মানুষের কাছে নারী অধিকারের দাবিটিই সন্দেহের বিষয় হয়ে ওঠে। ফলে যারা সত্যিকার অর্থে সমতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য লড়াই করছেন, তাদের কাজও কঠিন হয়ে পড়ে।

আজকের বিশ্বে নারীর অধিকার নিঃসন্দেহে একটি সর্বজনীন মানবাধিকার প্রশ্ন। কিন্তু সেই অধিকার যদি ক্ষমতার রাজনীতির অংশ হয়ে যায়, তা হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় নারীদেরই। কারণ তখন নারীমুক্তি আর মানবিক লক্ষ্য হিসেবে থাকে না; এটি পরিণত হয় কূটনৈতিক ভাষণ, সামরিক কৌশল কিংবা আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের একটি উপাদানে।

যুগোস্লাভিয়া থেকে আফগানিস্তান, ইরাক থেকে লিবিয়া, কিংবা সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত–বহু ক্ষেত্রে সমালোচকরা একই প্রশ্ন তুলেছেন: নারীমুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হওয়া হস্তক্ষেপের শেষ ফলাফল কী সত্যিই নারীদের জীবনকে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। তবে একটি সত্য স্পষ্ট–যুদ্ধ কখনো নারীদের জন্য সহজ বাস্তবতা বয়ে আনে না। নারীর অধিকারকে যদি সত্যিই গুরুত্ব দিতে হয়, তা হলে তা বোমা, নিষেধাজ্ঞা কিংবা আগ্রাসনের মাধ্যমে নয়; শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় নারীদের নেতৃত্বকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই সম্ভব। অন্যথায় নারীমুক্তির স্লোগান বারবার উচ্চারিত হবে, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের ধ্বংসস্তূপে পড়ে থাকবে সেই নারীদেরই স্বপ্ন, যাদের মুক্তির কথা বলে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল।

/এসএল

উপকূলীয় নারীদের জলবায়ু সংগ্রাম নিয়ে রাজধানীতে আলোকচিত্র প্রদর্শনী

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম
উপকূলীয় নারীদের জলবায়ু সংগ্রাম নিয়ে রাজধানীতে আলোকচিত্র প্রদর্শনী

রাজধানীতে উপকূলীয় নারীদের জলবায়ু সহনশীলতা, জীবনসংগ্রাম ও নেতৃত্ব নিয়ে তিন দিনব্যাপী আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘ভয়েজ অফ কোস্টাল ক্লাইমেট রেজিলেন্স’  শুরু হয়েছে । বৃহস্পতিবার বিকেলে পান্থপথের দৃক গ্যালারিতে এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) জেন্ডার-রেসপনসিভ কোস্টাল অ্যাডাপটেশন (জিসিএ) প্রকল্পের উদ্যোগে, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ও বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় এ আয়োজন করা হয়েছে।

প্রদর্শনীতে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জীবন ও সংগ্রামের নানা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও জীবিকাগত সংকট মোকাবিলায় নারীদের অভিযোজন কৌশল, বিকল্প জীবিকা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নেতৃত্বকে আলোকচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে।

আয়োজকরা জানান, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও তা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে নারী নেতৃত্বভিত্তিক জলবায়ু অভিযোজন উদ্যোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, জিসিএ প্রকল্পের জাতীয় প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ আব্দুল হাই আল মাহমুদ, ইউএনডিপি বাংলাদেশের অ্যাসিস্ট্যান্ট রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ সর্দার এম আসাদুজ্জামান এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান মো. আব্দুল কাইয়ুম।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ২১ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দৃক গ্যালারিতে প্রদর্শনীটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এতে আলোকচিত্রী এ বি রশিদের ধারণ করা প্রায় ৮৫টি স্থিরচিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। সরাসরি প্রদর্শনীর পাশাপাশি ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মেও এটি আয়োজন করা হয়েছে।

/এসএল