আজকের বিশ্বে নারীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দায়িত্ব পালন করছেন। যেমন- কর্মক্ষেত্র, পরিবার, সমাজ এবং ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের উপস্থিতি ও ভূমিকা বেড়েছে। অগ্রগতির এই পথচলার মাঝেও নারীরা প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হচ্ছেন অসংখ্য অদৃশ্য চাপ, অবাস্তব প্রত্যাশা এবং মানসিক ক্লান্তির। নারীর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, বাস্তবে তার চ্যালেঞ্জ ততটাই জটিল ও বহুস্তরীয় হচ্ছে।
সমাজ নারীর কাছে যে পরিমাণ প্রত্যাশা রাখে, তা অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। যেমন- কর্মক্ষেত্রে একজন নারীকে হতে হয় দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সক্ষম। সর্বোপরি, একজন শক্তিশালী পেশাজীবী। অথচ ঘরে ফিরলেই তার কাছ থেকে চাওয়া হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চরিত্র। যেমন- কোমল, ধৈর্যশীল, সবার প্রতি সহানুভূতিশীল এবং একাই সব সামলে নেওয়ার অদৃশ্য ক্ষমতা। এই দুই বিপরীত ভূমিকার মাঝখানে নারীকে প্রতিনিয়ত ভারসাম্য ধরে রাখতে হয়। আর এই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টাই অনেক সময় মানসিক চাপ, ক্লান্তি এবং আত্মসম্মানহানির দিকে ঠেলে দেয়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সমাজের ‘পারফেক্ট নারী’র ধারণা নারীদের নিজের বাস্তবিক চাহিদা ও সীমাবদ্ধতাকে আড়াল করতে বাধ্য করে। বহু নারীই নিজের আবেগ, ক্লান্তি বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে দ্বিধা করেন। কারণ তাদের শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্যের স্বস্তিই আগে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে তারা আবেগগতভাবে নিঃশেষিত হয়ে পড়েন।
এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে সামাজিক মাধ্যম। এখানে মানুষ নিজের জীবনের শুধু সাজানো অংশটাই তুলে ধরে। প্রতিদিন নিখুঁত সাজপোশাক, নিখুঁত ঘর-সংসার, নিখুঁত সম্পর্ক এবং নিখুঁত শরীরের প্রদর্শনী নারীদের সামনে এক অবাস্তব মানদণ্ড তৈরি করে। বাস্তব জীবনের ক্লান্তি, ব্যর্থতা বা অসম্পূর্ণতার পাশে এই নিখুঁত ছবিগুলো তুলনা তৈরি করে, যা নারীর আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করে এবং মাঝে মাঝেই নিজের প্রতি ক্ষোভ বা অপর্যাপ্ততার অনুভূতি জন্ম দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ ধরনের তুলনামূলক মানসিকতা নারীর মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু উদ্বেগ বাড়ায় না, বরং নিজের সাফল্যকেও তুচ্ছ মনে করিয়ে দেয়।
গত এক দশকে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, নেতৃত্বের জায়গাতেও তারা উঠে এসেছেন। কিন্তু এখনো ‘পুরুষকেন্দ্রিক’ কর্মসংস্কৃতি অনেক নারীকে অদৃশ্য বাধার সামনে দাঁড় করায়। প্রতিষ্ঠিত আচরণ পুরুষ নেতার ক্ষেত্রে প্রশংসা পেলেও নারীর ক্ষেত্রে সেটিই ‘রূঢ়’ বা ‘ক্ষতিকর’ হিসেবে দেখা হয়। আবার অনেক সময় একই কাজ করেও নারীকে বেশি পরিশ্রম করতে হয় নিজেকে প্রমাণের জন্য। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে মাতৃত্ব, সন্তানের যত্ন, বয়স্ক অভিভাবকের দায়িত্ব এসব বিষয় নারীকে অন্যভাবে বিবেচনার দাবি রাখলেও বাস্তবতা ভিন্ন। নমনীয়তা, পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন সুবিধা বা মানসিক স্বাস্থ্যের সহায়তা না থাকায় বহু নারী কর্মজীবনে বার্নআউটের শিকার হন।
স্বাস্থ্যসেবায়ও নারীরা বৈষম্যের শিকার হোন। নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য দুটিই দীর্ঘদিন ধরে গবেষণায় অবহেলিত। বিশ্বব্যাপী নারীরাই জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি, কিন্তু নারীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত গবেষণার হার খুবই কম। ফলে নারীর জীবনচক্রভিত্তিক অনেক সমস্যা মাসিক ব্যথা, হরমোনজনিত পরিবর্তন, সন্তান জন্মের পর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ, মেনোপজ সবই উপেক্ষিত থেকে যায়।
এ কারণে মানসিক স্বাস্থ্যেও তার প্রভাব পড়ে। ঘুমের অভাব, স্ট্রেস, হরমোন পরিবর্তন এবং সামাজিক চাপ একসঙ্গে কাজ করে নারীদের উদ্বেগ ও হতাশার ঝুঁকি দ্বিগুণ করে দেয়। এর সঙ্গে আছে অনিশ্চিত প্রজনন স্বাস্থ্য, গর্ভপাতসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রাপ্যতা বা সঠিক চিকিৎসার অভাব নারীর মানসিক স্থিতি নষ্ট করতে বড় ভূমিকা রাখে।
তা ছাড়া ঘরে-বাইরে সমানভাবে কাজ করলেও নারীরা এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে গৃহস্থালি কাজ, সন্তানের পড়াশোনা থেকে শুরু করে বয়স্ক সদস্যদের যত্ন সবই পালন করেন। এই ‘মেন্টাল লোড’ অনেক সময়ই অদৃশ্য থাকে, কেউ তা মূল্যায়ন করে না। এই বাড়তি দায়িত্ব নারীদের ব্যক্তিগত সময় কমিয়ে দেয়, নিজের প্রয়োজনকে পেছনে ঠেলে দেয়, আর মানসিক ক্লান্তি ধীরে ধীরে জমতে থাকে। নারীদের অনেকে বলেন, ‘সবাইকে সামলে চলতে গিয়ে নিজের জন্য সময়ই থাকে না।’ এই সময়হীনতাই উদ্বেগ, রাগ, হতাশা ও অপরাধবোধসহ নানা মানসিক চাপের জন্ম দেয়।
একজন থেরাপিস্টের দৃষ্টিতে নারীর মানসিক সুস্থতার বড় অংশজুড়েই আছে ‘বাউন্ডারি’ তৈরি করা। অর্থাৎ নিজের প্রয়োজন ও অন্যের প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য আনতে পারা। অনেক নারীই ‘না’ বলতে সংকোচ বোধ করেন। ফলে তারা নিজের শক্তি ফুরিয়ে ফেলেন অন্যের প্রয়োজন পূরণ করতে গিয়ে।
নারীদের অন্যতম বড় শক্তি হলো নিজেদের মধ্যে সংযোগ গড়ে তোলা। বন্ধু, সহকর্মী, পরিবার বা থেরাপিস্ট কারও সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা মানসিক চাপ কমাতে অত্যন্ত কার্যকর। যারা নিয়মিত অনুভূতি ভাগ করে নেন, তারা পরিসংখ্যান অনুযায়ী ডিপ্রেশন ও উদ্বেগ কম অনুভব করেন।
সব মিলিয়ে সমাজের প্রত্যাশা, ঘরের ভূমিকা, কর্মক্ষেত্রের চাপ এবং সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব—সবকিছু মিলে নারীর মানসিক স্বাস্থ্য একটি অদৃশ্য চাপের বলয়ে বন্দি হয়ে পড়ে। এই বলয় ভাঙতে হলে প্রয়োজন আরও বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা, সমর্থনমূলক পরিবেশ এবং নারীর নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা। এবং দিনের শেষে একটি প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নারীরা নিজেদের জন্য কতটা সময় রাখছেন?একটি ছোট পদক্ষেপ, নিজেকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে পুরো জীবনের মানসিক ভারসাম্য।
তথ্যসূত্র: সাইকোলজি টুডে
/এসএল
.jpg)