নারী মানে শক্তি, সম্ভাবনা, সৃজনশীলতা। নারী মানে একক পরিচয়। সম্পর্ক তাকে সমৃদ্ধ করে, কিন্তু সংজ্ঞায়িত করে না। তাই সময় এসেছে পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলার। পিতা, স্বামী কিংবা সন্তানের পরিচয়ে নয়, বরং নারী নিজের পরিচয়েই নারী।
সমাজের চোখে নারীর পরিচয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বাঁধা- কারও কন্যা, কারও স্ত্রী, কারও মা। নিজের নামে, নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়ে নারীকে দেখা এখনো বহু সমাজই অভ্যস্ত নয়। অথচ নারী একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ; তার নিজস্ব স্বপ্ন, যোগ্যতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বিশ্বাস, শখ, শক্তি ও দুর্বলতা আছে। সে যেমন পরিবারের অংশ, তেমনি নিজের ব্যক্তিসত্তারও মালিক। আজকের পৃথিবীতে সেই ব্যক্তিসত্তার দাবি আরও জোরালো হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে- নারীর পরিচয়ের কেন্দ্রে কি শুধু সম্পর্ক থাকবে, নাকি থাকবে তার নিজের পরিচয়ও?
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে জন্মের পর থেকেই মেয়েদের পরিচয় তৈরি হয় ‘অমুকের মেয়ে’ হিসেবে। কৈশোর পেরোতেই পরিবার ও সমাজ তাদের কাছে প্রত্যাশা করে ‘ভালো স্ত্রী’ হওয়া, আর সন্তান জন্মের পর পরিচয় দাঁড়ায় ‘অমুকের মা’। অদ্ভুতভাবে, নারী যত বেশি দায়িত্ব পালন করে, ততই তার নিজের নামটি আড়াল হতে থাকে। কর্মক্ষেত্রে সফল নারীও বহু ক্ষেত্রে সমাজে পরিচিত থাকে ‘অমুকের বউ’ নামেই। এই অদৃশ্য পরিচয়-নির্মাণ নারীর ব্যক্তিসত্তাকে কীভাবে সংকুচিত করে, তার গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
নারীর পরিচয়কে সম্পর্ককেন্দ্রিক করে দেখার এই মানসিকতা শুধু সামাজিক নয়, সাংস্কৃতিকভাবেও প্রতিষ্ঠিত। সিনেমা-ধর্মীয় বয়ান-সাহিত্য-গান- সবকিছুতেই নারীকে মাতৃত্ব বা ত্যাগের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। যেন নারী তার নিজের জন্য অস্তিত্বশীল নয়, বরং সমাজের জন্য, পরিবার-স্বামীর জন্য, সন্তানের জন্য। এতে নারীর নিজের ভালো লাগা, পছন্দ, উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ার, আর্থিক স্বাধীনতা- সবকিছুই ‘গৌণ’ হয়ে যায়। আর এখানেই প্রশ্ন ওঠে: নারী কি নিজেকে শুধুই সম্পর্কের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করবে?
এমন সামাজিক কাঠামোর কারণে বহু নারীর নিজের পরিচয় গড়ে উঠতে পারে না। তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত থাকে, পেশা বাছাইয়ের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, এমনকি নিজের শরীর-মন সম্পর্কেও তারা স্বাধীন মত প্রকাশ করতে পারে না। নারীর নাম হয়তো সরকারি কাগজে থাকে, কিন্তু বাস্তব সমাজে তাকে পরিচিত করা হয় সম্পর্কের মাধ্যমে। ফলে নারীর আত্মবিশ্বাস, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্র বাধার মুখে পড়ে।
তবে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। শহরকেন্দ্রিক কর্মজীবী নারীরা, উদ্যোক্তা নারীরা, ক্রীড়াবিদ-শিল্পী-গবেষক নারীরা সমাজকে দেখিয়ে দিচ্ছেন- নারী তার নিজের পরিচয়েই আলোকিত। আজকের মেয়েরা উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন, ব্যবসা শুরু করছেন, দেশের বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখছেন। অনেকেই বিবাহ বা মাতৃত্বকে জীবনের একমাত্র গন্তব্য হিসেবে দেখছেন না। তারা নিজের ক্যারিয়ার, স্বপ্ন ও ব্যক্তিসত্তাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ পরিবর্তন শুধু নারীর নয়, বরং পুরো সমাজের চেতনায় একটি বড় পরিবর্তনের প্রতীক।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- পরিবর্তন কতটা গভীরে পৌঁছেছে? শহরে পরিবর্তনের ছোঁয়া থাকলেও গ্রাম ও প্রান্তিক সমাজে পরিস্থিতি এখনো কঠিন। অনেক নারী এখনো নিজের পরিচয়ে দাঁড়াতে পারেন না; সামাজিক চাপ, পরিবারের প্রত্যাশা, আর্থিক নির্ভরতা তাদের সীমাবদ্ধ রাখে। মেয়েকে নিজের নামে পরিচয় করানো অনেক পরিবারেই ‘বেখাপ্পা’ মনে করা হয়। আবার কর্মজীবী নারীর সাফল্যও অনেক সময় ‘ঘর সামলাতে না পারার ব্যর্থতা’ হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ সামাজিক মানসিকতা এখনো বড় বাধা।
নারীর নিজের পরিচয় গঠনের সংগ্রাম শুধু ব্যক্তিগত লড়াই নয়, এটি একটি কাঠামোগত লড়াইও। শিক্ষা, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং মানসিক শক্তি- এই চারটি ক্ষেত্র নারীর ব্যক্তিসত্তা নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন নারী যখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় তার অবস্থান শক্তিশালী হয়। উচ্চশিক্ষা তাকে যুক্তিবোধ দেয়, নিজের স্বপ্নকে বড় করে দেখার ক্ষমতা দেয়। আর প্রযুক্তি আজ নারীর জন্য খুলে দিয়েছে নতুন জগৎ- ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা, রিমোট কাজ। যেখানে তারা নিজের সময় ও পছন্দমতো কাজ করতে পারেন।
তবে শুধু আর্থিক বা পেশাগত স্বাধীনতা পেলেই নারীর পরিচয়ের সংকট মুছে যায় না। প্রয়োজন গভীর মানসিক স্বীকৃতি- নারী একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ, যার পরিচয় সম্পর্কের বাইরেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। সমাজকে এই স্বীকৃতির জায়গা তৈরি করতে হবে। পরিবারকে শিখতে হবে মেয়ের পরিচয় দিতে তার নিজের নামেই। সন্তানের পরিচয়ের পাশেও মায়ের নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরতে হবে। মিডিয়াকে দায়িত্ব নিতে হবে নারীর বহুমাত্রিক ভূমিকা তুলে ধরার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন লিঙ্গ-সংবেদনশীল পাঠ্যক্রম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- নারীকে নিজেকে নিজের পরিচয়ে গ্রহণ করতে হবে।
নারীর পরিচয় নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই যাত্রায় আত্মসম্মান ও আত্মপরিচয় বড় ভূমিকা রাখে। নিজের কাজের মূল্য বোঝা, নিজের সিদ্ধান্তে দৃঢ় থাকা, নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া- এসবই একটি নারীর ব্যক্তিসত্তাকে গড়ে তোলে। সমাজের প্রতিটি মেয়েকে জানাতে হবে- আপনি কারও স্ত্রী বা মা বলেই মূল্যবান নন; আপনি মূল্যবান কারণ আপনি ‘আপনি’।
/এসএল
.jpg)